তৃতীয় মত

এটা মানুষের অপরাধের জন্য প্রকৃতির প্রতিশোধ

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। জয়ীও হয়েছে। চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়েছে বলা যায় না। প্রকৃতিও সুযোগ পেলে মানুষের ওপর আঘাত হানে। মানুষ তার সামনে অসহায়। পৃথিবীর আবহাওয়া ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে দ্রুত।
ছবি: এএফপি

সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। জয়ীও হয়েছে। চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়েছে বলা যায় না। প্রকৃতিও সুযোগ পেলে মানুষের ওপর আঘাত হানে। মানুষ তার সামনে অসহায়। পৃথিবীর আবহাওয়া ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে দ্রুত।

নিত্যনতুন রোগ-জীবাণু জন্ম নিচ্ছে। উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে দেশগুলোয় একেকটা ভয়ংকর রোগের মহামারী দেখা দিচ্ছে। এখন সারা বিশ্ব আতঙ্কিত চীন থেকে আগত করোনাভাইরাসের প্রকোপে। মৃত্যুদূতের মতো এই ভাইরাস সর্বত্র ছড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ এতকাল ধরে পরিচিত ঝড়-বন্যার দেশ হিসেবে। ব্রিটেন পরিচিত ঠাণ্ডার দেশ, বরফ ও তুষারপাত এবং তুষারঝড়ের দেশ হিসেবে। এখন প্রকৃতি ও আবহাওয়া বদলাচ্ছে। এটাই বিজ্ঞানী ও আবহাওয়া বিশারদরা ভয় করছিলেন।

বাংলাদেশে এবার ব্রিটেনের মতো বরফ পড়েছে কোনো কোনো স্থানে। শীতে মানুষ মারা গেছে। আর ব্রিটেনে গত তিন-চার বছর ধরে বাংলাদেশের মতো ঝড়-বৃষ্টি-প্লাবন শুরু হয়েছে।

ব্রিটেনে আসার পর দেখেছি এ দেশের সামার বা গ্রীষ্মকাল বাংলাদেশের শরৎ-হেমন্তের মতো। এখন লন্ডনে দেখছি সামারে ঘরে ঘরে ইলেকট্রিক ফ্যান চালাতে হয়। ওরা এই সামারকে নাম দিয়েছে ইন্ডিয়ান সামার। ব্রিটেন ও ফ্রান্সে এখন অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং বন্যা লেগেই আছে।

বন্যার সময় জরুরি ভিত্তিতে উপদ্রুত এলাকা থেকে লোকাপসরণ করতে হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে অনেক শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এবারেও ঝড়ে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেক সময় এই ঝড়-বন্যায় গাড়ি-ঘোড়া-ট্রেন-বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিমান চলাচল স্থগিত রাখা হয়।

মাত্র গত সপ্তাহেই লন্ডনসহ ব্রিটেনে ভয়ংকর ঝড় হয়ে গেছে। এই ঝড়ের নাম ছিল সিয়ারা (ciara)। এই ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি সামলে উঠতে না উঠতেই আজ (শনিবার) আবার ভয়ানক বৃষ্টি ও ঝড়ের বিপদসংকেত দেয়া হয়েছে আবহাওয়া অফিস থেকে।

এই ঝড়ের নাম দেয়া হয়েছে ডেনিস (denis)। বলা হয়েছে ডেনিস হবে সিয়ারার চাইতেও ভয়ংকর। মানুষজনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

এই নিবন্ধটা যখন শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ঘরে বসে লিখছি, তখন আসন্ন ঝড়, বৃষ্টি ও প্লাবনের আঘাতের শঙ্কায় আর সবার মতো আমিও শঙ্কিত। স্কটল্যান্ডে ঝড় আঘাত করেছে। তার গতিবেগ হ্রাস না পেলে লন্ডনও রক্ষা পাবে না।

এটা কি মানুষের বুদ্ধিভ্রম আর কৃতকর্মের জন্য প্রকৃতির প্রতিশোধ? মনে হয় সেটাই সম্ভব। সেই আদিকাল থেকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গাছ কাটা চলছে অবাধে। আমাদের দেশে খাল-বিল-নদী বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা মাটির পাহাড় কেটে ফেলছে।

মানুষের তৈরি পলিথিন, নানা বর্জ্যদ্রব্য পরিবেশ দূষিত করে ফেলছে। তার ওপর বিজ্ঞানীদের সাবধানবাণী উপেক্ষা করে বছরের পর বছর সমুদ্রের জলে পরীক্ষামূলকভাবে আণবিক বোমার বিস্ফোরণ এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য থেকে বিষাক্ত রাসায়নিকের সংক্রমণে ক্যান্সার, নিউকোমিয়া ইত্যাদি ঘাতক রোগের ক্রমশ ব্যাপক বিস্তার ঘটছে।

সারা বিশ্বের পরিবেশ ও আবহাওয়া এমনভাবে দূষিত হচ্ছে যে, এখনি তার প্রতিকার ব্যবস্থা না হলে সারা বিশ্বে বিপর্যয় দেখা দেবে।

কিন্তু মানবসভ্যতার এই বিপদাশঙ্কা সম্পর্কে উন্নত ও ধনী দেশগুলো একেবারেই নির্বিকার।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো প্রকৃতি ও আবহাওয়া দূষণের বিষয়টি ক্রমাগত উপেক্ষা করে চলেছেন। আবহাওয়া ও প্রকৃতি দূষণমুক্ত করার আন্তর্জাতিক ফোরামে ছোট ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে সংগ্রাম করে চলেছেন শেখ হাসিনা। আমাদের দেশে সুন্দরবন ও এই বনের প্রাণী রক্ষার আন্দোলন চলছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, মানুষ যদি এখনও সতর্ক হয়ে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা হ্রাসের এবং সমুদ্রের গভীরতা কমতে থাকার কোনো প্রতিকার না করে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি অংশ ভয়াবহ প্লাবনে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

এই প্লাবন হবে হিমালয়ের উপরিভাগ উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে বহু শতকের জমা বরফ গলিয়ে যখন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পাঠাবে। সমুদ্রের তলদেশ সেই বন্যা ধরে রাখতে না পারায় সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ঘটবে। তাতে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি এলাকা প্লাবিত হবে। বহু দেশ বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। যেসব দেশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশও পড়ে।

বহুকাল ধরে বাংলাদেশে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে। বাংলাদেশ সমুদ্রগর্ভ থেকে উত্থিত হয়েছে, আবার সমুদ্র গর্ভেই বিলীন হয়ে যাবে। কথাটা কতটা সঠিক, তা আমার মতো আনাড়ির পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

কিন্তু সাম্প্রতিককালে ভূতত্ত্ববিদদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের বহু এলাকায় নিচু থেকে মাটির স্তর সরে যাচ্ছে। নদী তার অদৃশ্য এলাকা বাড়াচ্ছে। ঢাকা ও চাঁদপুর শহরে ভয়াবহভাবে নিচের মাটির স্তর সরছে। এটা এখনও বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেনি। কিন্তু সতর্ক না হলে একসময় বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছবে।

এই সতর্কবাণী যে উপেক্ষা করার মতো নয়, তার একটা বড় প্রমাণ কিছুকাল আগে চাঁদপুর শহরে এক এক করে তিনটি ভবন হঠাৎ মাটির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে। বাসিন্দারা ভবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে প্রাণ বাঁচায়।

এর কিছুকাল পর ঢাকা শহরেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। বাড়ি হেলে পড়তে থাকে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের তলদেশ থেকেও মাটির স্তর সরে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে বলে কোনো কোনো ভূ-বিশেষজ্ঞ বলেছেন।

প্রকৃতি-দূষণের আরও একটা বিপজ্জনক দিক হল পুরনো রোগ ও নতুন রোগের মহামারী আকারে প্রাদুর্ভাব। বাংলাদেশে এক সময় ছিল ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কলেরার মহামারীরূপে বিস্তার লাভ। তা রোধ করা গিয়েছিল। এখন নাকি কোনো কোনো এলাকায় তা আবার দেখা দিচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল পরপর দু’বার ডেঙ্গুর মহামারীরূপে দেখা দেয়া। তা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা পর্যন্ত ছড়িয়েছিল।

এখন আণবিক বোমার চাইতেও যে ভয়ানক শত্রু, বিশ্বের উন্নত উন্নয়নশীল নির্বিশেষে বহু দেশের দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে তার নাম করোনাভাইরাস। চীনের একটি প্রদেশ থেকে তার উৎপত্তি। এখন লন্ডন, সিঙ্গাপুরেও তা ছড়িয়েছে।

ঢাকায়ও কিছু রোগীকে আক্রান্ত সন্দেহে ডাক্তারদের কাছে নেয়া হয়েছিল। এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে সারা বিশ্বে সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে। আণবিক বোমার চাইতেও এই করোনাভাইরাসকে ভয়ংকর বললাম এ জন্য যে, এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে ওষুধ বিজ্ঞানীরা জরুরি চেষ্টা চালাচ্ছেন।

করোনাভাইরাস চীনে দেখা দেয়ার পর সে দেশে প্রায় দু’হাজার লোকের মৃত্যু ঘটেছে। দু’শর মতো স্বাস্থ্যকর্মী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। লন্ডনে ওয়েস্ট এন্ডে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চীন থেকে আগত বিমানযাত্রীদের কোয়ারেনটাইনে রেখে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চীন থেকে যাত্রীবাহী বিমানের চলাচল স্থগিত রাখা হয়েছে। ব্রিটেনে হ্যান্ডশেক করা, সভা সম্মেলনে একত্র হওয়া আপাতত বন্ধ রাখা ভালো বলে সরকার নির্দেশ দিয়েছে। ব্রিটিশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, মার্চ-এপ্রিলের দিকে ব্রিটেনে এই ভাইরাসের বেশি বিস্তার ঘটতে পারে।

এখন প্রশ্ন, চীনে এই মৃত্যুদূত ভাইরাসের আবির্ভাব এবং এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কীভাবে সম্ভব হল? এর উত্তর এখনও কারও জানা নেই। তবে গুজব হচ্ছে, আফ্রিকার একটি দেশে আমেরিকার সিআইএ তৎকালীন কমিউনিস্ট দেশগুলোর ওপর ব্যবহারের জন্য রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির গোপন পরীক্ষা চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।

তার ফলে এইচআইভি, লুকোমিয়া ইত্যাদি মারাত্মক রোগের জীবাণু বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানে চীনও তাদের একটি রাজ্যে একই ধরনের গবেষণা চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে এবং সারা বিশ্বে তার ভাইরাস ছড়াচ্ছে।

এই গুজব সত্য কী মিথ্যা তা এখন পর্যন্ত জানার কোনো উপায় নেই। তবে এ কথা সত্য, রাশিয়ার চেরনোবিলে আণবিক শক্তি কেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তার তেজস্ক্রিয়াজনিত রোগে ভুগতে হয়েছে বিশ্বের বহু দেশকে। প্রকৃতি দূষণের জন্য বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী ও সমাজতন্ত্রী সাবেক দুই শিবিরই দায়ী। প্রকৃতিকে মিত্র না বানিয়ে তার সঙ্গে শত্রুতা করে বিশ্বের মানুষ যদি শুধু নিজের স্বার্থ ও সুবিধা দেখে, তাহলে প্রকৃতি যে তার প্রতিশোধ নেবে এবং নিচ্ছে, এটা দৃশ্যমান। ম্যালথাস সাহেব কী বলেন? মানুষ যখন বিশ্বে তার সংখ্যা এমনভাবে বাড়াতে থাকে যে, প্রকৃতির জন্য তা ভারবাহী হয়ে ওঠে, তখন প্রকৃতিই নিজে ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ, মহামারী দ্বারা এই জনসংখ্যা কমিয়ে ভারসাম্য আনে।

ঝড়ের ভয়ে শঙ্কিত অবস্থায় লেখা শেষ করছি। পাঠকদের কাছে দোয়া চাই।

লন্ডন, ১৫ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ২০২০

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১২৩ ৩৩ ১২
বিশ্ব ১৩,১০,১০২২,৭৫,০৪০৭২,৫৫৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×