দুর্যোগ মোকাবেলার আচরণবিধি কেমন হওয়া উচিত

  সহস্র সুমন ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মতো দেশে দুর্যোগে বা বিপদে-আপদে একজন আরেকজনের কাছে ছুটে আসবে এটাই স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি সামাজিক তত্ত্ব আছে, যেখানে বলা হয়েছে, দুর্যোগপূর্ব এবং পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে।

কিন্তু মহামারী বা ছোঁয়াচে রোগ ব্যবস্থাপনার প্রথম কথা হল ‘সামাজিক দূরত্ব’ মেনে চলতে হবে। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে এবং প্রশাসনিকভাবে এ ‘সামাজিক দূরত্ব’ ধারণাকে যেভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন ছিল তা করতে পারিনি।

কেন পারিনি তার আবার কিছু পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, অনেকেই সেগুলো বয়ান করে ‘না পারা’কে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু সেখানেও যুক্তি হল, যদি সেটি নিয়েও একটু ভাবা যায় তবে সেই প্রেক্ষিতগুলোকে জয় করা সম্ভব।

সামাজিক দূরত্ব বোঝার আগে বুঝতে হবে এ ধারণাগুলো এসেছে ‘Sociology of health and illness’ এবং ‘epidemiology’ থেকে। মহামারী সবসময়ই সমাজে থাকে, কেবল তা এমন মারাত্মক আকার ধারণ করে না।

ভ্যাক্সিন থাকলে ভ্যাক্সিন দিয়ে, আর তা না থাকলে আমরা তাকে আমাদের আচরণ ও প্রস্তুতি দিয়ে মোকাবেলা করি। ১৯১৮-১৯২০ সালের স্প্যানিস ফ্লু থেকে বাঁচার জন্য হ্যান্ডশেক করা বন্ধ হয়, মাস্ক পরিধানের ব্যবস্থা করা হয়।

ইতিহাসের পাতায় পাতায় মহামারীর কাহিনী রয়েছে। ডায়রিয়া, কলেরা, বসন্ত, টাইফয়েড, পোলিও ইত্যাদি। প্রতিটি সংক্রামক রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত সামাজিক দূরত্বই একমাত্র প্রতিকার।

এইডস রোগ যখন পৃথিবীতে এসেছিল সেটিও একটি মহামারী আকার ধারণ করেছিল। আফ্রিকা ও ইউরোপে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল এ রোগের বিস্তারে।

কিন্তু তাকে দমন করা সম্ভব হয়েছিল মানবিক আচরণ পরিবর্তন যেমন নিরাপদ যৌন সম্পর্ক, ইনজেকশন বা অন্যের ব্যবহৃত ব্লেড ব্যবহার পরিহার ইত্যাদির মাধ্যমে।

যে কোনো রোগের, বিশেষ করে মহামারীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে প্রযুক্তির সঙ্গে সামাজিক ও মানবিক আচরণে পরিবর্তন আনতে হয়। যেটি করতে সুস্পষ্টভাবে ব্যর্থ হয়েছে ইতালি এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশ।

ইংল্যান্ডে এ ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করতে গিয়ে ‘হেইট ক্রাইম’ এবং ‘সোশ্যাল ডিসক্রিমিনেশন’ বেড়ে গেছে।

চীনা বা এশীয় দেখলেই তাদের টিজ করা, ঘুষি মেরে চলে যাওয়ার মতো ঘটনা লন্ডন, ব্রিস্টলের মতো শহরে ঘটেছে অহরহ।

সামাজিক দূরত্ব মানে মানুষে মানুষে শারীরিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখা, তাকে মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দেয়া নয় বা ঘৃণা করা নয়।

একটা দেশে সর্বস্তরের জনতা এসব ক্রিটিক্যাল বিষয় বুঝবে এবং সে অনুযায়ী আচরণ করবে-এমনটি যদি কোনো নীতিনির্ধারক মনে করেন তবে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। সাধারণ মানুষ সবসময় সাধারণ।

তারা চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিক, দিনমজুর, শ্রমিকসহ নানা পেশা ও জ্ঞানের সমন্বয়ে সৃষ্ট এক মাল্টিকালার মার্বেল। তাদের বোঝানোর দায়িত্ব নীতিনির্ধারক, আমলা বা রাজনীতিকদের।

সাধারণ মানুষ কক্সবাজার চলে যেতে চাইবেই, বাড়ির বের হতে চাইবেই, মালামাল কিনে স্টোর করতে চাইবেই। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা, রাজনীতিকরা এমন টুল বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দাঁড় করাবেন যে, সেগুলো করার রাস্তা থাকবে না।

যখনই সেই রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, সাধারণ মানুষ এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে। সেই প্রতিক্রিয়া বা গ্রিভেন্স ম্যানেজমেন্টের জন্য বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে।

সবাই মিলে জনগণকে কঠিন তত্ত্ব ভেঙে সহজ করে বুঝিয়ে দিতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে কেন আমরা স্কুল বন্ধ করছি, বুঝিয়ে দিতে হবে কেন বিয়ের অনুষ্ঠান, এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানও এ সময় নিষিদ্ধ।

শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত করলে বা পুলিশি তদারকি বাড়ালে জনগণ হয়তো ভয়ে তার আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে; কিন্তু নীতির যে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তা নষ্ট হতেই থাকবে।

সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা লোপ পাবে। জনগণ অবচেতন হলেও বুঝতে চায় কী হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে? যখন তারা এর উত্তর সচেতন মানুষের কাছ থেকে পায় না বা পেলেও বোঝে না, তখন তারা নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দেয় বা স্থানীয় ফতোয়াবাজদের কথায় প্রভাবিত হয়।

মহামারী প্রতিরোধের জন্য যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদন কেন্দ্র, উপাসনালয়, অফিস-আদালত বন্ধের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হয়, তাই মানুষ একটা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যায়।

অথচ এ সময় সবচেয়ে প্রয়োজন হল আত্মবিশ্বাস ও আস্থা। মানুষ যেহেতু একটি ভীতিকর অনুভূতি নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করে, তাই এ সময় যে কোনো তথ্যের ঘাটতি বা তথ্য বিভ্রান্তি তারা মেনে নিতে পারে না।

বিশেষ করে এটি যদি সরকারের তরফ থেকে আসে। মিডিয়া সব সময় দেখাচ্ছে পৃথিবীতে কী আকার ধারণ করেছে এই রোগ; অথচ সে সময় যদি সরকারের উচ্চপদস্থ কেউ বলে, সমস্যা নেই, ‘আল্লাহ ভরসা’; তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে।

গণজমায়েত বন্ধ করে দিয়ে যদি তার বিপরীতে নির্বাচনী প্রচারণা চলে উৎসবমুখর পরিবেশে, তখনও মহামারী প্রতিরোধের সব আয়োজন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এটিই স্বাভাবিক।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, বিপদের সময়, মহামারীর সময় এবং অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকার আস্থা হারায় সবচেয়ে বেশি। আবার এ সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে, সঠিক বক্তব্য দিতে পারলে সরকার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশি।

এ সময় মানুষকে সঠিক তথ্য দিতে হবে, সঠিক আচরণ করতে হবে। যাদের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবেলা হবে যেমন- ডাক্তার, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, সংবাদকর্মী বা যে কোনো অংশীজন- তাদের যতটা সম্ভব নিরাপত্তা দিতে হবে। অন্তত এমন আচরণ বজায় রাখতে হবে যেন তারা মানসিকভাবে সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়ে না ফেলে।

কারণ এ মহামারী যতটা না প্রযুক্তির কাছে নত, তার চেয়ে নত মানুষের আচরণের কাছে। আর নীতিনির্ধারকরা পাবলিক ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করেন।

পাবলিক বিহেভিয়র যদি সোশ্যাল ইন্সট্যাবিলিটির কারণ হয় সে ব্যর্থতার দায় কি পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা বা পলিসি মেকাররা এড়িয়ে যেতে পারেন? প্রগতির প্রতিশ্রুতিশীল এ সরকারের কাছে সাধারণ মানুষ তা-ই আশা করে। সে আশা পূরণের উপযুক্ত সময় হতে পারে এ দুর্যোগ।

সহস্র সুমন : পাবলিক পলিসি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার, যুক্তরাজ্য; সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (প্রেষণে উচ্চশিক্ষায় যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত)

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত