সংকট মোকাবেলায় টাকা ছাপানো এবং নাগরিকদের করণীয়
jugantor
সংকট মোকাবেলায় টাকা ছাপানো এবং নাগরিকদের করণীয়

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু কঠোরভাবে কার্যকর না করার কারণে সরকারের অঘোষিত লকডাউন করোনা সংক্রমণ রোধে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এটার সুনিশ্চিত প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণ ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে।

শুধু কঠোরভাবে কার্যকর না করার কারণে সরকারের অঘোষিত লকডাউন করোনা সংক্রমণ রোধে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এটার সুনিশ্চিত প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণ ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে।

আমাদের একটা কথা মনে রাখা জরুরি, করোনার সমস্যা শুরুর আগেই সামষ্টিক অর্থনীতির একটা সূচক, বৈদেশিক রেমিটেন্স ছাড়া আর সব সূচক ছিল নিম্নমুখী। এর সঙ্গে এখন স্থানীয় পর্যায়ে এবং বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাব যুক্ত হয়ে অর্থনীতিতে খুব বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে, এটা নিশ্চিত।

করোনা মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও তার মতো করে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে, সেগুলো মূলত কতগুলো ঋণ যার প্রায় পুরোটাই দেয়া হবে বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থার মধ্য থেকেই।

এই প্রণোদনার ঘোষণা দেয়ার পর সরকারের বেশ সমালোচনা হচ্ছে, কারণ কৃষিতে এবং এই লকডাউনের কারণে চরমভাবে দুর্দশাগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষের ভরণপোষণের জন্য সত্যিকার অর্থে তেমন কিছুই করা হয়নি। সবাই জোর দাবি করছেন, এই ক্ষেত্রেও সরকারের আরও বেশি ব্যয় করা উচিত।

এই মুহূর্তে সবাই ব্যয়ের নানা খাত দেখাচ্ছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সেই অর্থের সংস্থান সরকার করবে কোথা থেকে? সবচেয়ে ভালো হতে পারত যদি এই বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি খুব ভালোভাবে কাটছাঁট করে বাকি সম্পূর্ণ অর্থ এ ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়।

অর্থনীতিবিষয়ক বিভিন্ন থিংকট্যাংক এবং অর্থনীতিবিদরাও একই রকম পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটা আসলে কতটুকু সম্ভব?

করোনার প্রাদুর্ভাবের আগেই এডিবির আকার দুই লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

এরপর মার্চ মাসে তো করোনার ডামাডোল শুরু হল, তাই যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায়, এই খরচ আর খুব একটা বাড়েনি। তাহলে কাগজে-কলমে অন্তত এক লাখ কোটি টাকার বেশি এখনও খরচ হয়নি। করোনার পেছনে খরচ না করলেও কি এই টাকা খরচ হতো?

প্রশ্নটা আসলে হওয়া উচিত এই টাকার সংস্থান কি ছিল? করোনা আসার আগেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচক নিম্নগামী ছিল। আমাদের বাজেটের ৬৫ শতাংশেরও বেশি এখনও পরোক্ষ কর, যা আমদানি-রফতানি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্রির ক্ষেত্রে শুল্ক এবং ভ্যাটের মাধ্যমে হয়। ২০১৯ সালে গত ১০ বছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাচ্ছিল।

এতে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়া এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সারা বছরে ব্যাংক থেকে নেয়ার জন্য নির্ধারিত ঋণের চেয়ে বেশি ঋণ সরকার করে ফেলেছিল।

এদিকে করোনার কারণে দেশের খুব বড় একটা উৎসব পহেলা বৈশাখে কোনোরকম বিক্রি হয়নি। রমজান মাস শুরু হয়েছে এবং এই মাসেও তেমন কিছু হবে না এবং খুবই আশঙ্কা আছে আমাদের কেনাবেচার একটা খুব বড় উপলক্ষ ঈদুল ফিতরে এবার খুব বেশি বিক্রি হবে না।

এছাড়াও ভোগ্যপণ্য আর ওষুধ ছাড়া কোনো কিছুরই বিক্রি নেই প্রায়। আমাদের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশ নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর। এখন অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাওয়া মানেই হচ্ছে আমদানি কমে যাওয়া, তাতে শুল্ক-ভ্যাট কমে যাওয়া।

এছাড়াও যেহেতু দেশের শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চরম সমস্যায় পড়েছে তাই অনেক ক্ষেত্রেই সরকারকে শুল্ক-ভ্যাট এবং করের ছাড় দিতে হবে।

দেশের ভেতরের ভোগ যখন কমে যায় তখন চাকরিজীবী (এদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি আছে) ছাড়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করাও একই রকমভাবে ঝুঁকিতে পড়বে। তাহলে সরকার আয় করবে কোথা থেকে?

ব্যাংকের তারল্য বৃদ্ধির যাবতীয় টুল ব্যবহার করে সরকারের পক্ষে ব্যাংকে যে পরিমাণ তারল্য সৃষ্টি করা সম্ভব হবে, সেটা হবে ভীষণ অপ্রতুল। যেটুকু টাকা আয় করবে সরকার সেটার বড় অংশই ব্যয় হয়ে যাবে সরকারের অগ্রাধিকারের কিছু প্রকল্পে।

খুব সহজ পথ সরকারের সামনে খোলা থাকে- ইচ্ছামতো টাকা ছাপিয়ে নানা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তহবিলের জোগান দেয়া। মূলধারার অর্থনীতিবিদরা এভাবে টাকা ছাপানোর বিরুদ্ধে খুব শক্তভাবে কথা বলেন, কারণ এটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করে।

কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ধারণার বাইরে গিয়ে অর্থনীতিতে নতুন আলোচনা খুব জোরেশোরে চলছে যেখানে বলা হচ্ছে সরকার তার নানারকম প্রকল্পের অর্থ জোগান দেয়ার জন্য শুধু করদাতা, ব্যাংক ঋণে বা বন্ডের ওপর নির্ভর না করে তার প্রয়োজন মতো টাকা ছাপিয়ে নেয়া উচিত।

এটি পরিচিত মডার্ন মনিটারি থিওরি (এমএমটি) নামে। টাকা ছাপানোর এ বিষয়টি আমাদের দেশে খুব আলোচনায় এসেছে কারণ, এবারের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি এই পরামর্শটি দিয়েছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন এমন মানুষ এর প্রতিবাদ করছেন।

এতে কোনো সন্দেহ নেই, টাকা অতি মূল্যায়িত। নিয়ম করে বাজারে ডলার ছেড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার মূল্য কৃত্রিমভাবে ধরে রেখেছিল। যেহেতু আমাদের রফতানির চেয়ে আমদানির পরিমাণ বেশি, তাই অনেক বেশি মানুষকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

কিন্তু পরিস্থিতি এমন থাকছে না আর বেশিদিন। করোনার কারণে আমদানির পরিমাণ এই মুহূর্তে কম থাকার কারণে রিজার্ভের চাপ তেমন হচ্ছে না, তবে করোনা চলে যাওয়ার পর আমদানি অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য পণ্য রফতানি কমবে। এছাড়াও তেলের দাম তলানিতে পড়ে যাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের কর্মীদের ফিরে আসার সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়বে এবং এই ক্ষেত্রে আমাদের আয় কমে যাবে।

একটা আশা অবশ্য জাগাচ্ছে জ্বালানি তেলের মূল্য পড়ে যাওয়া। এছাড়াও করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক সংকটে মানুষের ভোগের পরিমাণ কমে গিয়ে আমদানিও কমে যাবে অনেকটা। তাতে ব্যালান্স অব পেমেন্টে যতটা ঘাটতি হওয়ার কথা মনে হচ্ছে ততটা সম্ভবত হবে না। কিন্তু তার পরও এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক অতিমূল্যায়িত টাকার মূল্য খুব বেশিদিন বাজারে ডলার ছেড়ে ধরে রাখতে পারবে না, ফলে টাকা তার মূল্য হারাবেই। এতে নিশ্চিতভাবেই মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে।

এ রকম একটা মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা সামনে রেখে টাকা ছাপানো মূল্যস্ফীতিকে অনেক বেশি উসকে দিতেই পারে। এখানে একটা বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, তবে মডার্ন মনিটারি থিওরি বলে টাকা ছাপালেই সেটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে এটা একেবারেই নিশ্চিত ব্যাপার নয়। ওই তত্ত্বের প্রবক্তারা বলেন, একটা দেশ যদি পূর্ণ কর্মসংস্থানের পর্যায়ে তখন এটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। এছাড়াও টাকা কোথায় কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারণ করে মূল্যস্ফীতি হবে কিনা, হলে কতটুকু হবে। এই কারণেই পূর্ণ কর্মসংস্থানের পর্যায়ের অনেক দূরে থাকার পরও নিকট-অতীতে জিম্বাবুয়েতে টাকা ছাপানো চরম মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছিল। তবে তত্ত্বের পক্ষের অর্থনীতিবিদরা বলেন, কখনও যদি সেই মূল্যস্ফীতি হয়েই যায়, বাজার থেকে টাকা তুলে নেয়ার মতো অনেক রকম টুল সরকারের হাতে আছে, সরকার চাইলেই সেটা করতে পারে।

নতুন ছাপানো এই টাকা যদি উৎপাদনশীল খাতে ব্যয়িত হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং এই টাকা যদি দরিদ্র মানুষের কাছে খরচের জন্য সরাসরি চলে যায়, তাহলে এর খারাপ প্রভাব থাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, একই পরিমাণ টাকা কয়েকজন ধনীর কাছে না গিয়ে কয়েক হাজার গরিবের হাতে গেলে সেটা অভ্যন্তরীণ ভোগে অনেক বেশি কাজে লাগে বলে সেটার অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বড়; কথাটি অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ ব্যানার্জিও বলেছেন।

পরিস্থিতি দেখে এটা স্পষ্ট, এই মুহূর্তে সরকারকে দুটো অপ্রীতিকর সিদ্ধান্তের একটা নিতেই হবে- টাকা না ছাপালে করোনাকালীন এবং করোনা-পরবর্তী প্রণোদনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জোগাতে পারবে না, আবার টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি। আমি বিশ্বাস করি, টাকা ছাপানো ছাড়া সরকার চালানোই সম্ভব হবে না; তাই সরকার এটা করবেই, আমরা যা-ই বলি না কেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা হওয়া উচিত সেই টাকা যেন বরাবরের মতো সরকারের কিছু ক্রোনির হাতে চলে না গিয়ে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, সেই চাপ ক্রমাগত জারি রাখা।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

সংকট মোকাবেলায় টাকা ছাপানো এবং নাগরিকদের করণীয়

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
২৭ এপ্রিল ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শুধু কঠোরভাবে কার্যকর না করার কারণে সরকারের অঘোষিত লকডাউন করোনা সংক্রমণ রোধে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এটার সুনিশ্চিত প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণ ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে।
ছবি: সংগৃহীত

শুধু কঠোরভাবে কার্যকর না করার কারণে সরকারের অঘোষিত লকডাউন করোনা সংক্রমণ রোধে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এটার সুনিশ্চিত প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণ ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গেছে।

আমাদের একটা কথা মনে রাখা জরুরি, করোনার সমস্যা শুরুর আগেই সামষ্টিক অর্থনীতির একটা সূচক, বৈদেশিক রেমিটেন্স ছাড়া আর সব সূচক ছিল নিম্নমুখী। এর সঙ্গে এখন স্থানীয় পর্যায়ে এবং বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাব যুক্ত হয়ে অর্থনীতিতে খুব বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে, এটা নিশ্চিত।

করোনা মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও তার মতো করে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে, সেগুলো মূলত কতগুলো ঋণ যার প্রায় পুরোটাই দেয়া হবে বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থার মধ্য থেকেই।

এই প্রণোদনার ঘোষণা দেয়ার পর সরকারের বেশ সমালোচনা হচ্ছে, কারণ কৃষিতে এবং এই লকডাউনের কারণে চরমভাবে দুর্দশাগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষের ভরণপোষণের জন্য সত্যিকার অর্থে তেমন কিছুই করা হয়নি। সবাই জোর দাবি করছেন, এই ক্ষেত্রেও সরকারের আরও বেশি ব্যয় করা উচিত।

এই মুহূর্তে সবাই ব্যয়ের নানা খাত দেখাচ্ছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সেই অর্থের সংস্থান সরকার করবে কোথা থেকে? সবচেয়ে ভালো হতে পারত যদি এই বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি খুব ভালোভাবে কাটছাঁট করে বাকি সম্পূর্ণ অর্থ এ ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়।

অর্থনীতিবিষয়ক বিভিন্ন থিংকট্যাংক এবং অর্থনীতিবিদরাও একই রকম পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটা আসলে কতটুকু সম্ভব?

করোনার প্রাদুর্ভাবের আগেই এডিবির আকার দুই লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

এরপর মার্চ মাসে তো করোনার ডামাডোল শুরু হল, তাই যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায়, এই খরচ আর খুব একটা বাড়েনি। তাহলে কাগজে-কলমে অন্তত এক লাখ কোটি টাকার বেশি এখনও খরচ হয়নি। করোনার পেছনে খরচ না করলেও কি এই টাকা খরচ হতো?

প্রশ্নটা আসলে হওয়া উচিত এই টাকার সংস্থান কি ছিল? করোনা আসার আগেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচক নিম্নগামী ছিল। আমাদের বাজেটের ৬৫ শতাংশেরও বেশি এখনও পরোক্ষ কর, যা আমদানি-রফতানি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্রির ক্ষেত্রে শুল্ক এবং ভ্যাটের মাধ্যমে হয়। ২০১৯ সালে গত ১০ বছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাচ্ছিল।

এতে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়া এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সারা বছরে ব্যাংক থেকে নেয়ার জন্য নির্ধারিত ঋণের চেয়ে বেশি ঋণ সরকার করে ফেলেছিল।

এদিকে করোনার কারণে দেশের খুব বড় একটা উৎসব পহেলা বৈশাখে কোনোরকম বিক্রি হয়নি। রমজান মাস শুরু হয়েছে এবং এই মাসেও তেমন কিছু হবে না এবং খুবই আশঙ্কা আছে আমাদের কেনাবেচার একটা খুব বড় উপলক্ষ ঈদুল ফিতরে এবার খুব বেশি বিক্রি হবে না।

এছাড়াও ভোগ্যপণ্য আর ওষুধ ছাড়া কোনো কিছুরই বিক্রি নেই প্রায়। আমাদের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশ নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর। এখন অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাওয়া মানেই হচ্ছে আমদানি কমে যাওয়া, তাতে শুল্ক-ভ্যাট কমে যাওয়া।

এছাড়াও যেহেতু দেশের শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চরম সমস্যায় পড়েছে তাই অনেক ক্ষেত্রেই সরকারকে শুল্ক-ভ্যাট এবং করের ছাড় দিতে হবে।

দেশের ভেতরের ভোগ যখন কমে যায় তখন চাকরিজীবী (এদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি আছে) ছাড়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করাও একই রকমভাবে ঝুঁকিতে পড়বে। তাহলে সরকার আয় করবে কোথা থেকে?

ব্যাংকের তারল্য বৃদ্ধির যাবতীয় টুল ব্যবহার করে সরকারের পক্ষে ব্যাংকে যে পরিমাণ তারল্য সৃষ্টি করা সম্ভব হবে, সেটা হবে ভীষণ অপ্রতুল। যেটুকু টাকা আয় করবে সরকার সেটার বড় অংশই ব্যয় হয়ে যাবে সরকারের অগ্রাধিকারের কিছু প্রকল্পে।

খুব সহজ পথ সরকারের সামনে খোলা থাকে- ইচ্ছামতো টাকা ছাপিয়ে নানা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তহবিলের জোগান দেয়া। মূলধারার অর্থনীতিবিদরা এভাবে টাকা ছাপানোর বিরুদ্ধে খুব শক্তভাবে কথা বলেন, কারণ এটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করে।

কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ধারণার বাইরে গিয়ে অর্থনীতিতে নতুন আলোচনা খুব জোরেশোরে চলছে যেখানে বলা হচ্ছে সরকার তার নানারকম প্রকল্পের অর্থ জোগান দেয়ার জন্য শুধু করদাতা, ব্যাংক ঋণে বা বন্ডের ওপর নির্ভর না করে তার প্রয়োজন মতো টাকা ছাপিয়ে নেয়া উচিত।

এটি পরিচিত মডার্ন মনিটারি থিওরি (এমএমটি) নামে। টাকা ছাপানোর এ বিষয়টি আমাদের দেশে খুব আলোচনায় এসেছে কারণ, এবারের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি এই পরামর্শটি দিয়েছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন এমন মানুষ এর প্রতিবাদ করছেন।

এতে কোনো সন্দেহ নেই, টাকা অতি মূল্যায়িত। নিয়ম করে বাজারে ডলার ছেড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার মূল্য কৃত্রিমভাবে ধরে রেখেছিল। যেহেতু আমাদের রফতানির চেয়ে আমদানির পরিমাণ বেশি, তাই অনেক বেশি মানুষকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

কিন্তু পরিস্থিতি এমন থাকছে না আর বেশিদিন। করোনার কারণে আমদানির পরিমাণ এই মুহূর্তে কম থাকার কারণে রিজার্ভের চাপ তেমন হচ্ছে না, তবে করোনা চলে যাওয়ার পর আমদানি অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য পণ্য রফতানি কমবে। এছাড়াও তেলের দাম তলানিতে পড়ে যাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের কর্মীদের ফিরে আসার সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়বে এবং এই ক্ষেত্রে আমাদের আয় কমে যাবে।

একটা আশা অবশ্য জাগাচ্ছে জ্বালানি তেলের মূল্য পড়ে যাওয়া। এছাড়াও করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক সংকটে মানুষের ভোগের পরিমাণ কমে গিয়ে আমদানিও কমে যাবে অনেকটা। তাতে ব্যালান্স অব পেমেন্টে যতটা ঘাটতি হওয়ার কথা মনে হচ্ছে ততটা সম্ভবত হবে না। কিন্তু তার পরও এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক অতিমূল্যায়িত টাকার মূল্য খুব বেশিদিন বাজারে ডলার ছেড়ে ধরে রাখতে পারবে না, ফলে টাকা তার মূল্য হারাবেই। এতে নিশ্চিতভাবেই মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে।

এ রকম একটা মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা সামনে রেখে টাকা ছাপানো মূল্যস্ফীতিকে অনেক বেশি উসকে দিতেই পারে। এখানে একটা বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, তবে মডার্ন মনিটারি থিওরি বলে টাকা ছাপালেই সেটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে এটা একেবারেই নিশ্চিত ব্যাপার নয়। ওই তত্ত্বের প্রবক্তারা বলেন, একটা দেশ যদি পূর্ণ কর্মসংস্থানের পর্যায়ে তখন এটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। এছাড়াও টাকা কোথায় কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারণ করে মূল্যস্ফীতি হবে কিনা, হলে কতটুকু হবে। এই কারণেই পূর্ণ কর্মসংস্থানের পর্যায়ের অনেক দূরে থাকার পরও নিকট-অতীতে জিম্বাবুয়েতে টাকা ছাপানো চরম মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছিল। তবে তত্ত্বের পক্ষের অর্থনীতিবিদরা বলেন, কখনও যদি সেই মূল্যস্ফীতি হয়েই যায়, বাজার থেকে টাকা তুলে নেয়ার মতো অনেক রকম টুল সরকারের হাতে আছে, সরকার চাইলেই সেটা করতে পারে।

নতুন ছাপানো এই টাকা যদি উৎপাদনশীল খাতে ব্যয়িত হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং এই টাকা যদি দরিদ্র মানুষের কাছে খরচের জন্য সরাসরি চলে যায়, তাহলে এর খারাপ প্রভাব থাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, একই পরিমাণ টাকা কয়েকজন ধনীর কাছে না গিয়ে কয়েক হাজার গরিবের হাতে গেলে সেটা অভ্যন্তরীণ ভোগে অনেক বেশি কাজে লাগে বলে সেটার অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বড়; কথাটি অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ ব্যানার্জিও বলেছেন।

পরিস্থিতি দেখে এটা স্পষ্ট, এই মুহূর্তে সরকারকে দুটো অপ্রীতিকর সিদ্ধান্তের একটা নিতেই হবে- টাকা না ছাপালে করোনাকালীন এবং করোনা-পরবর্তী প্রণোদনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জোগাতে পারবে না, আবার টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি। আমি বিশ্বাস করি, টাকা ছাপানো ছাড়া সরকার চালানোই সম্ভব হবে না; তাই সরকার এটা করবেই, আমরা যা-ই বলি না কেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা হওয়া উচিত সেই টাকা যেন বরাবরের মতো সরকারের কিছু ক্রোনির হাতে চলে না গিয়ে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, সেই চাপ ক্রমাগত জারি রাখা।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

০৪ ডিসেম্বর, ২০২১