করোনাভাইরাস ও পানি বিশুদ্ধকরণ
jugantor
করোনাভাইরাস ও পানি বিশুদ্ধকরণ

  ড. মো. ইকবাল হোসেন, ড. মো. শাহিনুর ইসলাম, ড. শোয়েব আহমেদ  

২৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানির অপর নাম জীবন। অস্বাস্থ্যকর বা অণুজীব (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া) বহনকারী পানি পান করার মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রতি বছর অনেক জীবনহানি ঘটে থাকে।

বিশেষভাবে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে এ জীবনহানি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়। এরই সতর্কতা হিসেবে, বিশ্বের অন্যান্য নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মতো বাংলাদেশেও গ্রাম কিংবা শহরে বসবাসকারী বিভিন্ন শ্রেণীপেশার অনেক মানুষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে খাবার পানি ফুটিয়ে পান করে থাকেন। কিন্তু এ খাবার পানি অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ফুটানো হলে ইতিবাচক ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। এজন্য পানি ফুটানোর সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি আমাদের সবার জানা উচিত বলে মনে করি।

প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে, খাবার পানিকে ‘সঠিক প্রক্রিয়ায়’ এবং ‘যথেষ্ট সময় ধরে’ ফুটালে তাতে বিদ্যমান রোগজনিত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। মনে রাখা জরুরি, পানিকে ‘অসঠিক প্রক্রিয়ায়’ বা ‘দীর্ঘসময় ধরে’ ফুটালেও ঝুঁকি থেকে যায়। আরও একটি বিষয় পাশাপাশি উল্লেখ করা দরকার। পানির সঙ্গে যদি ক্ষতিকারক মিনারেল, কেমিক্যালস বা ফার্মাসিউটিক্যাল-জাতীয় পদার্থ বিদ্যমান থাকে, সেক্ষেত্রে পানিকে সঠিকভাবে ফুটালেও এসব ক্ষতিকর পদার্থের বিষয়ে সুরক্ষা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পানিতে বিদ্যমান রোগজনিত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা ও প্রতিবেদন অনুসারে খাবার পানি ফুটানোর জন্য নিম্নের কার্যপ্রণালী অনুসরণ করা যেতে পারে।

কীভাবে কতক্ষণ পানি ফুটাবেন

১. প্রথমে চুলা/বার্নার জ্বালিয়ে পানিকে তাপ দেয়া শুরু করুন এবং অপেক্ষা করুন। ২. পানি পূর্ণমাত্রায় ফুটন্ত (স্বাভাবিক চাপে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রকট বুদ্বুদ্ ও বাষ্পীভবন) অর্থাৎ রোলিং বয়েলিং অবস্থায় পৌঁছানোর পর থেকে অবশ্যই এক মিনিট অপেক্ষা করুন। ৩. অতঃপর চুলা নিভিয়ে দিন অথবা পানির পাত্র চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন। ৪. পানিকে স্বাভাবিকভাবে ঠাণ্ডা হতে দিন।

বি.দ্র. : পান করার আগে ঠাণ্ডা পানি আপনার কাছে বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় ফিল্টার বা পরিশ্রুত করে নিন।

পূর্ণমাত্রায় ফুটন্ত (স্বাভাবিক চাপে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রকট বুদ্বুদ্ ও বাষ্পীভবন) অর্থাৎ রোলিং বয়েলিং অবস্থায় পৌঁছানোর পর এক মিনিটই পানিতে বিদ্যমান রোগজনিত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় করার জন্য যথেষ্ট। অতিরিক্ত সময় ধরে তাপ দিলে পাত্রের পানি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে কমতে থাকবে, যা ‘ল্যাটেন্ট-হিট-লসের’ মাধ্যমে প্রচুর জ্বালানি অপচয় করে থাকে। তাছাড়া পানিতে ক্ষতিকারক মিনারেল, কেমিক্যালস বা ফার্মাসিউটিক্যাল-জাতীয় পদার্থ থাকলে পানি কমে যাওয়ার কারণে এগুলোর ঘনত্বও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ওই ক্ষতিকারক পদার্থের ঘনমাত্রা খাবার পানির জন্য নির্দেশিত ঘনমাত্রা থেকে বেশি হয়ে যেতে পারে। সুতরাং নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় ধরে পানি ফুটানোর ক্ষতি দ্বিমাত্রিক বলা চলে।

উল্লেখ্য, পানিকে ৬৫ বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অধিকতর সময় ধরে ফুটানোর কিছু নির্দেশনা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু যথার্থ তাপমাত্রা পরিমাপক না থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে পানিতে ৬৫ বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ঠিকমতো অর্জিত হয়েছে কিনা, তা বোঝা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। অপরদিকে প্রকট বুদ্বুদ্সহ পূর্ণমাত্রায় ফুটন্ত অবস্থা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ। কাজেই পূর্ণমাত্রায় বা রোলিং বয়েলিং অবস্থায় এক মিনিট অধিকতর নির্ভরযোগ্য।

করোনাভাইরাস প্রেক্ষাপটে জানা জরুরি যে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের ৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, খাবার পানিতে নভেল করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব বা উপস্থিতি এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সুতরাং পানি পরিশ্রুত (ফিল্টার) এবং জীবনমুক্তকরণ কাজে ইতোমধ্যে ব্যবহৃত প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগই পানিতে নভেল করোনাভাইরাস দূর বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে বলে ধরে নেয়া যায়।

আসুন দুর্যোগে জ্বালানির সঠিক ব্যবহার করি এবং অপচয় রোধ করি। সঠিকভাবে ফুটিয়ে নিরাপদ পানি পান করি।

ড. মো. ইকবাল হোসেন, ড. মো. শাহিনুর ইসলাম, ড. শোয়েব আহমেদ : সহযোগী অধ্যাপক, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট

করোনাভাইরাস ও পানি বিশুদ্ধকরণ

 ড. মো. ইকবাল হোসেন, ড. মো. শাহিনুর ইসলাম, ড. শোয়েব আহমেদ 
২৮ এপ্রিল ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানির অপর নাম জীবন। অস্বাস্থ্যকর বা অণুজীব (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া) বহনকারী পানি পান করার মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রতি বছর অনেক জীবনহানি ঘটে থাকে।

বিশেষভাবে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে এ জীবনহানি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়। এরই সতর্কতা হিসেবে, বিশ্বের অন্যান্য নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মতো বাংলাদেশেও গ্রাম কিংবা শহরে বসবাসকারী বিভিন্ন শ্রেণীপেশার অনেক মানুষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে খাবার পানি ফুটিয়ে পান করে থাকেন। কিন্তু এ খাবার পানি অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ফুটানো হলে ইতিবাচক ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। এজন্য পানি ফুটানোর সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি আমাদের সবার জানা উচিত বলে মনে করি।

প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে, খাবার পানিকে ‘সঠিক প্রক্রিয়ায়’ এবং ‘যথেষ্ট সময় ধরে’ ফুটালে তাতে বিদ্যমান রোগজনিত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। মনে রাখা জরুরি, পানিকে ‘অসঠিক প্রক্রিয়ায়’ বা ‘দীর্ঘসময় ধরে’ ফুটালেও ঝুঁকি থেকে যায়। আরও একটি বিষয় পাশাপাশি উল্লেখ করা দরকার। পানির সঙ্গে যদি ক্ষতিকারক মিনারেল, কেমিক্যালস বা ফার্মাসিউটিক্যাল-জাতীয় পদার্থ বিদ্যমান থাকে, সেক্ষেত্রে পানিকে সঠিকভাবে ফুটালেও এসব ক্ষতিকর পদার্থের বিষয়ে সুরক্ষা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পানিতে বিদ্যমান রোগজনিত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা ও প্রতিবেদন অনুসারে খাবার পানি ফুটানোর জন্য নিম্নের কার্যপ্রণালী অনুসরণ করা যেতে পারে।

কীভাবে কতক্ষণ পানি ফুটাবেন

১. প্রথমে চুলা/বার্নার জ্বালিয়ে পানিকে তাপ দেয়া শুরু করুন এবং অপেক্ষা করুন। ২. পানি পূর্ণমাত্রায় ফুটন্ত (স্বাভাবিক চাপে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রকট বুদ্বুদ্ ও বাষ্পীভবন) অর্থাৎ রোলিং বয়েলিং অবস্থায় পৌঁছানোর পর থেকে অবশ্যই এক মিনিট অপেক্ষা করুন। ৩. অতঃপর চুলা নিভিয়ে দিন অথবা পানির পাত্র চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন। ৪. পানিকে স্বাভাবিকভাবে ঠাণ্ডা হতে দিন।

বি.দ্র. : পান করার আগে ঠাণ্ডা পানি আপনার কাছে বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় ফিল্টার বা পরিশ্রুত করে নিন।

পূর্ণমাত্রায় ফুটন্ত (স্বাভাবিক চাপে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রকট বুদ্বুদ্ ও বাষ্পীভবন) অর্থাৎ রোলিং বয়েলিং অবস্থায় পৌঁছানোর পর এক মিনিটই পানিতে বিদ্যমান রোগজনিত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় করার জন্য যথেষ্ট। অতিরিক্ত সময় ধরে তাপ দিলে পাত্রের পানি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে কমতে থাকবে, যা ‘ল্যাটেন্ট-হিট-লসের’ মাধ্যমে প্রচুর জ্বালানি অপচয় করে থাকে। তাছাড়া পানিতে ক্ষতিকারক মিনারেল, কেমিক্যালস বা ফার্মাসিউটিক্যাল-জাতীয় পদার্থ থাকলে পানি কমে যাওয়ার কারণে এগুলোর ঘনত্বও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ওই ক্ষতিকারক পদার্থের ঘনমাত্রা খাবার পানির জন্য নির্দেশিত ঘনমাত্রা থেকে বেশি হয়ে যেতে পারে। সুতরাং নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় ধরে পানি ফুটানোর ক্ষতি দ্বিমাত্রিক বলা চলে।

উল্লেখ্য, পানিকে ৬৫ বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অধিকতর সময় ধরে ফুটানোর কিছু নির্দেশনা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু যথার্থ তাপমাত্রা পরিমাপক না থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে পানিতে ৬৫ বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ঠিকমতো অর্জিত হয়েছে কিনা, তা বোঝা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। অপরদিকে প্রকট বুদ্বুদ্সহ পূর্ণমাত্রায় ফুটন্ত অবস্থা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ। কাজেই পূর্ণমাত্রায় বা রোলিং বয়েলিং অবস্থায় এক মিনিট অধিকতর নির্ভরযোগ্য।

করোনাভাইরাস প্রেক্ষাপটে জানা জরুরি যে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের ৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, খাবার পানিতে নভেল করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব বা উপস্থিতি এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সুতরাং পানি পরিশ্রুত (ফিল্টার) এবং জীবনমুক্তকরণ কাজে ইতোমধ্যে ব্যবহৃত প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগই পানিতে নভেল করোনাভাইরাস দূর বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে বলে ধরে নেয়া যায়।

আসুন দুর্যোগে জ্বালানির সঠিক ব্যবহার করি এবং অপচয় রোধ করি। সঠিকভাবে ফুটিয়ে নিরাপদ পানি পান করি।

ড. মো. ইকবাল হোসেন, ড. মো. শাহিনুর ইসলাম, ড. শোয়েব আহমেদ : সহযোগী অধ্যাপক, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট