দেবদূতের আশিসের আশায়
jugantor
দেবদূতের আশিসের আশায়

  মা হ মু দ ফা রু কী  

০৭ মে ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুম আসছে না। জানালার পাশে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। বাইরের বৃষ্টি ফোঁটার মতো চোখ থেকে ঝরে পড়া স্মৃতির আঘাতে ঝাপসা হয়ে আসছে দূরের আকাশ। সেখানে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ, নদীর স্রোতধারায় বৃষ্টির ফোঁটা। আকাশে মেঘ, টিনের চালে বৃষ্টির টাপুর-টুপুর শব্দ। বিদ্যুতের চমক, থেকে থেকে মেঘের ডাক। জা

নালার সামনে পেয়ারা গাছটার বৃষ্টিভেজা কিছু পাতা বাতাসে দোল খেয়ে আবার স্থির হয়ে যাচ্ছে। বর্ষার পানিতে ছোট্ট পুকুরটি টইটুম্বুর। আঁকাবাঁকা মেঠো পথে ভোরের কুয়াশা ভরা দূর্বাঘাসের উপর সিক্ত শিশির বিন্দু। মটরশুঁটির লতা, হলুদ সরিষা ফুলের ক্ষেত, নাড়ার আগুনে মটরশুঁটি পুড়িয়ে খাওয়ার স্মৃতি।

চোখের পাতায় আজ শুধু ফুল হয়ে ফুটে উঠছে সবুজ লতাপাতায় ঘেরা বুজি (দাদি) আর আব্বার চিরনিদ্রায় শায়িত কবর দুটি এবং তাদের স্মৃতিবিজড়িত মরিচা পড়া টিনের ঘরটি।

সেই সবুজশ্যামল গ্রাম থেকে সাত সাগর আর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসেছি ইট-কাঠের নির্ঘুম শহর নিউইয়র্কে। কত নগর, কত জনপদ-জনগোষ্ঠী, কত ধর্ম-বর্ণ ও কর্মজীবী মানুষের সঙ্গে চলছি। আমার দেশ ও জাতি পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তাদের মিছিলে আমিও শামিল হয়েছি সপরিবারে।

ম্যানহাটনে দাঁড়িয়ে দেখেছি মাটির বাঁধভাঙা নদীর স্রোতের মতো মানুষের ছুটে চলা। নিউইয়র্কে আমার দীর্ঘদিন বসবাস জীবনে কখনও দেখিনি এ শহরটি নিশ্চুপ, জনশূন্য। কিন্তু আজ যেন সৃষ্টির ইতিহাসকে পেছনে ফেলে গভীর ঘুমে আচ্ছাদিত এ শহর।

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, মানুষের মলিন মুখ, ক্ষণে ক্ষণে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনে মনে হচ্ছে, এই বুঝি ইস্রাফিলের সিঙার ফুৎকারে পৃথিবী ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

মানুষের বুকের মধ্যে জমাট বেঁধেছে বৃষ্টি পানির বন্যা; নৌকার মাঝি দিশেহারা, টালমাটাল। কুল ছিঁড়ে আজ অকূলে যাই এমন সম্বল নেই নিকটে। অনেক পরিচিত মুখই ইতোমধ্যে পাড়ি দিয়েছে শেষ ঠিকানায়। স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছে লাশের বন্যায়, তবুও মানুষের বাঁচার আকুতি।

আমরা এখন রাতজাগা পাখির মতো পাখা গুটিয়ে ঘরের ভেতর অপেক্ষমাণ দেবদূতের আশিসের আশায়। চারপাশে মৃত্যুর মিছিল, মানুষের জীবনে একদিন একদিন করে বাঁচা। মেঘের চোখে যতটা জল, মানুষের চোখে তার চেয়েও বেশি জল জমেছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ ন্যূনতম সস্তা স্বপ্নগুলোও এখন বিধাতার কাছে অনেক দামি। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে আর কাকে যেন কিছু বলতে চাইছে।

আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, আমরা শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পৃথিবীতে আসিনি। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আর্তমানবতা ও মমত্ববোধ। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা মিলত না। খাবারে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা সবই।

পৃথিবীর মানুষের মনুষ্যত্ব যখন লাইফ সাপোর্টের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই অদেখা এক ভাইরাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা মানুষ। সময় গড়িয়ে যাবে, আমরা সবাই ভুলে যাব আজকের দিনটিকে। আজকের এই লাশের বন্যা আমরা কি মনে রাখতে পারব? একসময় আমরা ভুলে যেতেও ভুলে যাব। আমরা সবাই স্মৃতিঘেরা মানুষ।

স্মৃতিকে চোখের সামনে এনে ভাবতে কতই না ভালো লাগে। আমরা তো প্রতিদিনের স্মৃতি নিয়েই চলছি অবিরত, দিনের পর দিন। ধাবমান সময় ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি সবাই। প্রতিদিন গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতি শুধু জমা হয় জীবনের খাতায়। ফেলে আসা স্মৃতি প্রত্যেক মানুষকেই কোনো না কোনো সময় নিজের অজান্তেই ভাবিয়ে তুলবে।

কিছু মানুষের বেঁচে থাকা হবে প্রিয় মানুষকে হারানোর দুঃসহ বেদনার দীর্ঘশ্বাস। সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, রাগ-অভিমান, চাওয়া-পাওয়া- সবকিছুই আবারও জীবনযাপনের নিত্যসঙ্গী হয়ে স্মৃতির ভাণ্ডারে জমতে থাকবে।

প্রিয় জন্মভূমি-মাতৃভূমি স্বজনে ঘেরা চিরচেনা নিসর্গের দুর্বার আকর্ষণ আজ আমাকে বারংবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্বদেশি প্রকৃতির কাছে। শেকড়ের মমতায় মাটির কাছে, অরণ্যের কাছে, মার আঁচলে বাঁধা স্নেহ-মমতার কাছে। স্বপ্ন, সত্য আর সুন্দরের কাছে।

মাহমুদ ফারুকী : নিউইয়র্ক, আমেরিকা প্রবাসী

দেবদূতের আশিসের আশায়

 মা হ মু দ ফা রু কী 
০৭ মে ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুম আসছে না। জানালার পাশে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। বাইরের বৃষ্টি ফোঁটার মতো চোখ থেকে ঝরে পড়া স্মৃতির আঘাতে ঝাপসা হয়ে আসছে দূরের আকাশ। সেখানে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ, নদীর স্রোতধারায় বৃষ্টির ফোঁটা। আকাশে মেঘ, টিনের চালে বৃষ্টির টাপুর-টুপুর শব্দ। বিদ্যুতের চমক, থেকে থেকে মেঘের ডাক। জা

নালার সামনে পেয়ারা গাছটার বৃষ্টিভেজা কিছু পাতা বাতাসে দোল খেয়ে আবার স্থির হয়ে যাচ্ছে। বর্ষার পানিতে ছোট্ট পুকুরটি টইটুম্বুর। আঁকাবাঁকা মেঠো পথে ভোরের কুয়াশা ভরা দূর্বাঘাসের উপর সিক্ত শিশির বিন্দু। মটরশুঁটির লতা, হলুদ সরিষা ফুলের ক্ষেত, নাড়ার আগুনে মটরশুঁটি পুড়িয়ে খাওয়ার স্মৃতি।

চোখের পাতায় আজ শুধু ফুল হয়ে ফুটে উঠছে সবুজ লতাপাতায় ঘেরা বুজি (দাদি) আর আব্বার চিরনিদ্রায় শায়িত কবর দুটি এবং তাদের স্মৃতিবিজড়িত মরিচা পড়া টিনের ঘরটি।

সেই সবুজশ্যামল গ্রাম থেকে সাত সাগর আর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসেছি ইট-কাঠের নির্ঘুম শহর নিউইয়র্কে। কত নগর, কত জনপদ-জনগোষ্ঠী, কত ধর্ম-বর্ণ ও কর্মজীবী মানুষের সঙ্গে চলছি। আমার দেশ ও জাতি পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তাদের মিছিলে আমিও শামিল হয়েছি সপরিবারে।

ম্যানহাটনে দাঁড়িয়ে দেখেছি মাটির বাঁধভাঙা নদীর স্রোতের মতো মানুষের ছুটে চলা। নিউইয়র্কে আমার দীর্ঘদিন বসবাস জীবনে কখনও দেখিনি এ শহরটি নিশ্চুপ, জনশূন্য। কিন্তু আজ যেন সৃষ্টির ইতিহাসকে পেছনে ফেলে গভীর ঘুমে আচ্ছাদিত এ শহর।

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, মানুষের মলিন মুখ, ক্ষণে ক্ষণে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনে মনে হচ্ছে, এই বুঝি ইস্রাফিলের সিঙার ফুৎকারে পৃথিবী ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

মানুষের বুকের মধ্যে জমাট বেঁধেছে বৃষ্টি পানির বন্যা; নৌকার মাঝি দিশেহারা, টালমাটাল। কুল ছিঁড়ে আজ অকূলে যাই এমন সম্বল নেই নিকটে। অনেক পরিচিত মুখই ইতোমধ্যে পাড়ি দিয়েছে শেষ ঠিকানায়। স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছে লাশের বন্যায়, তবুও মানুষের বাঁচার আকুতি।

আমরা এখন রাতজাগা পাখির মতো পাখা গুটিয়ে ঘরের ভেতর অপেক্ষমাণ দেবদূতের আশিসের আশায়। চারপাশে মৃত্যুর মিছিল, মানুষের জীবনে একদিন একদিন করে বাঁচা। মেঘের চোখে যতটা জল, মানুষের চোখে তার চেয়েও বেশি জল জমেছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ ন্যূনতম সস্তা স্বপ্নগুলোও এখন বিধাতার কাছে অনেক দামি। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে আর কাকে যেন কিছু বলতে চাইছে।

আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, আমরা শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পৃথিবীতে আসিনি। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আর্তমানবতা ও মমত্ববোধ। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা মিলত না। খাবারে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা সবই।

পৃথিবীর মানুষের মনুষ্যত্ব যখন লাইফ সাপোর্টের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই অদেখা এক ভাইরাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা মানুষ। সময় গড়িয়ে যাবে, আমরা সবাই ভুলে যাব আজকের দিনটিকে। আজকের এই লাশের বন্যা আমরা কি মনে রাখতে পারব? একসময় আমরা ভুলে যেতেও ভুলে যাব। আমরা সবাই স্মৃতিঘেরা মানুষ।

স্মৃতিকে চোখের সামনে এনে ভাবতে কতই না ভালো লাগে। আমরা তো প্রতিদিনের স্মৃতি নিয়েই চলছি অবিরত, দিনের পর দিন। ধাবমান সময় ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি সবাই। প্রতিদিন গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতি শুধু জমা হয় জীবনের খাতায়। ফেলে আসা স্মৃতি প্রত্যেক মানুষকেই কোনো না কোনো সময় নিজের অজান্তেই ভাবিয়ে তুলবে।

কিছু মানুষের বেঁচে থাকা হবে প্রিয় মানুষকে হারানোর দুঃসহ বেদনার দীর্ঘশ্বাস। সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, রাগ-অভিমান, চাওয়া-পাওয়া- সবকিছুই আবারও জীবনযাপনের নিত্যসঙ্গী হয়ে স্মৃতির ভাণ্ডারে জমতে থাকবে।

প্রিয় জন্মভূমি-মাতৃভূমি স্বজনে ঘেরা চিরচেনা নিসর্গের দুর্বার আকর্ষণ আজ আমাকে বারংবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্বদেশি প্রকৃতির কাছে। শেকড়ের মমতায় মাটির কাছে, অরণ্যের কাছে, মার আঁচলে বাঁধা স্নেহ-মমতার কাছে। স্বপ্ন, সত্য আর সুন্দরের কাছে।

মাহমুদ ফারুকী : নিউইয়র্ক, আমেরিকা প্রবাসী

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস