করোনা প্রতিরোধে করণীয়

  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (অব.) ১৪ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারা পৃথিবী আজ প্রায় অচল। এক অতি ক্ষুদ্র জীবাণু (ভাইরাস) যা মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ঘটায়, তার ভয়ে। এই ভয়ে ভীত পৃথিবীর শক্তিধর শাসকরা। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ যে কেউ আক্রান্ত হচ্ছেন, ক্ষেত্রবিশেষে মারাও যাচ্ছেন। সংক্রামক এ ব্যাধির নাম করোনাভাইরাস; এটির নতুন সংস্করণ কোভিড-১৯।

ব্রিটেনের রানীসহ তাদের পরিবারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নেয়া হয়েছে শহর ছেড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে নির্মিত বড় প্রাসাদে। সৌদি বাদশাহ্কে তেমনি নির্মল পরিবেশের একটি দ্বীপে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী সোজাসাপ্টা বলেছেন, তাদের যা সম্পদ রয়েছে; তার সবটুকু দিয়ে এ ব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। তবু আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। লাশ দাফনের জন্যও সিরিয়াল প্রথা চালু হয়েছে। এত লাশ কে দাফন করবে।

আর দাফন প্রক্রিয়াও জটিল। যে কেউ, যে কোনো পোশাক পরিধান করে, যে কোনো স্থানে তো আর দাফন ক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে না। সেজন্য ইতালির প্রধানমন্ত্রী সবাইকে স্রষ্টার অনুগ্রহ প্রার্থনা করতে বলেছেন। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তাদের এ বিপদ উপশম বা প্রশমন সম্ভব নয়।

জার্মানির অর্থমন্ত্রী কোভিড-১৯ ব্যাধির আক্রমণে পর্যুদস্ত অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আত্মহত্যা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের (থিওডর রুজভেল্ট) নাবিকরা সমুদ্রে থেকেও আক্রান্ত হয়েছেন। আমেরিকায় পুলিশ, ডাক্তারসহ অগণিত মানুষের মৃত্যুর পর লাশ দাফন হচ্ছে গণকবরে। বিশাল শক্তিধর, পারমাণবিক বোমার অধিকারীরা আজ নিরুপায়।

ঘরবন্দি জীবনযাপন করছেন। যাতে সংক্রমণ কমে যায়, মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়। এখন পৃথিবীর বড় শক্তি ও ক্ষমতাধর শাসকদের দেশ আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনে নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের সংকট শুরু হয়েছে। এমনকি অর্থ থাকলেও আমদানি করা দুরূহ ও কঠিন হচ্ছে তাদের।

আমাদের দেশেও দুর্দশা। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, দোকানদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকট চরমে। খাদ্যের জন্য মানুষ রাস্তায় নামছে। এমন অবস্থায় ১৭ কোটি মানুষের এদেশে কী হবে, আমাদের ভবিষ্যৎ কী; এসব প্রশ্ন আসেই। আমাদের আয়ের দুটি বড় খাত গার্মেন্ট শিল্প ও বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের অর্থ প্রেরণ বা রেমিটেন্সের ওপরও এসেছে আঘাত। গত ২ মাস ধরেই অস্থিরতা সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের রফতানি স্থবির। আরও ২/৩ মাস এ অবস্থা চললে আমরা কোথায় যাব!

আর যেসব দেশ আমাদের পোশাক দ্রব্যাদি আমদানি করে, তাদের অবস্থাও তথৈবচ। তাদের অর্ডার অনুযায়ী বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত করতে পারলেও তারা যে আমদানি স্থগিত বা সময় বৃদ্ধি করে দিয়েছে, তার প্রভাব কী হবে? মোটামুটি ৩৪ বিলিয়ন ডলারের এ খাতে এ বছর কতটুকু আয় হবে? ইতোমধ্যে ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তার ওপর শ্রমঘন এ শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যারা রেমিটেন্স পাঠান, তাদের একটি অংশ দেশে এসেছেন ভয়ে, আতঙ্কে। তারা কি পূর্বতন কর্মস্থলে যোগদান করতে পারবেন? তাদের পূর্বতন কর্মস্থল কি সুরক্ষিত থাকবে? ওইসব দেশে অর্থনীতির গতি কি ঠিক থাকবে? অর্থাৎ সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা।

একটি বহুল প্রচলিত কথা হচ্ছে- যেমন তুমি; তেমনি তোমার সরকার। অর্থাৎ সরকার আকাশ থেকে পড়বে না। জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষাই প্রতিফলিত হয় তাদের সরকারের মাধ্যমে। যেমন বর্তমান কঠিন সময়ে কৃষক তার উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য পাচ্ছেন না। যেহেতু ক্রেতা কম; যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। অন্যদিকে শহরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। যে যেভাবে পারছে, যেন টাকা কামানোই ১ নম্বর উদ্দেশ্য। ব্যবসায়ীদের এই অংশ, এই আতঙ্কের মধ্যেও ক্রেতাকে যত ঠকাতে পারেন, যত বেশি দামে নিতে বাধ্য করতে পারেন; ততই যেন তাদের প্রশান্তি। টাকা উপার্জনের এ প্রবণতা অন্যান্য মুসলিম দেশে কম।

বিশেষত রোজার সময়, অন্যান্য দেশে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখা, ওজন ঠিক রাখা ও মাল সরবরাহে ব্যবসায়ীরা উন্মুখ থাকেন। আর বাংলাদেশে রোজা আসা মানেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সরকার জেল-জরিমানা করেও এ অবস্থার কূল-কিনারা করতে পারছে না। আশ্চর্য আমাদের আমল। দ্বিতীয় একটি বিষয় আরও পীড়াদায়ক; রিলিফ, সাহায্য, সরকারি ত্রাণ বিতরণে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি অংশ যা চুরি করতে পারেন, যেন তাই লাভ! আশ্চর্য এ চরিত্র।

প্রশাসন এদের ধরছে, জরিমানা করছে, জেলে দিচ্ছে। হাতকড়া দিচ্ছে। অথচ কী বেহায়া এরা। লাজলজ্জা এদের স্পর্শ করে বলে মনে হয় না। একটি বিষয় প্রায়ই মনে আসে, এদের বাবা-মা ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন এদের কেন ঘৃণা করে না, কেন এদের বয়কট করে না, কেন এদের সংস্রব ত্যাগ করে না!

তুরস্ক মডেল

প্রতিটি দেশ নিজস্ব পন্থায় করোনা-সংকট মোকাবেলা করছে। দ্রুত রোগী শনাক্ত করে তাকে আলাদা করে দিলে সামাজিক সংক্রমণ বন্ধ হয়। এ রোগ প্রতিরোধে এটাই একমাত্র বড় পন্থা। অথচ আমাদের সামর্থ্য এত নেই যে, দৈনিক ২০-২৫ হাজার লোকের পরীক্ষা করা যাবে। তুরস্ক ইতোমধ্যে রুমানিয়ায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের একটি অর্ডার পেয়েছে। SDI Global Company 14.25 মিলিয়ন ডলারের এ প্রজেক্টটি ছাড়াও EU দেশে আরও ‘Fd Hospital তৈরির প্রায় ৬৫.৯ মিলিয়ন ডলারের কার্যাদেশ পেতে যাচ্ছে।

তুরস্ক মাস্ক, গ্লাভস এবং পিপিই উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে স্পেন, ইতালি ও যুক্তরাজ্যে এসব সামগ্রী উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে। শুধু যুক্তরাজ্যেই পাঠিয়েছে ৮৪ টন পিপিই। এরই মধ্যে তুরস্কের চা রফতানি ৫১ শতাংশ বেড়ে গেছে। তুরস্ক আশা করছে, ২০২০ সালে ইউরোপ এবং এশিয়া থেকে ৬০ মিলিয়ন ট্যুরিস্ট দেশটিতে ভ্রমণ করবে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে তুরস্কে ট্যুরিজম রেভিনিউ ছিল ৩৫.৫ বিলিয়ন ডলার।

করোনাভাইরাসের এমন সময়ে রেলবগিতে কনটেইনার সার্ভিস বিদেশে রফতানি ও দ্রব্য প্রেরণে সবচেয়ে সহজতর বাকু-তিবলিগি-কারস (BTK) রেল যোগাযোগ তা প্রমাণ করেছে। ইতোমধ্যে তুরস্কের ‘কারস’ থেকে ৮২টি কনটেইনার নিয়ে ৯৪০ মিটার মালবাহী ফ্রেইট ট্রেনটি আজারবাইজান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তান পৌঁছেছে। তুরস্ক ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পর্যটন এলাকাকে করোনামুক্ত ঘোষণা দিয়ে তা পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। দেশটি ইতোমধ্যে তার অনেক সমুদ্রসৈকত ও বিখ্যাত পর্যটন এলাকা করোনামুক্ত বলে অতিথিদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে সেদেশের সাধারণ মানুষ করোনার এই আঘাতের মধ্যেও আশার আলো দেখছে।

বাংলাদেশ তার বন্দরে কনটেইনার জট খুলতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। এক্ষেত্রে সড়কপথের পরিবর্তে রেলপথ পরিবেশবান্ধব ও সহজ। অন্তত দিনে ২/৩টি ট্রেন চালাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা যেতে পারে। চট্টগ্রাম থেকে ফিরতি পথে কনটেইনার কুমিল্লা, গাজীপুর ও ঢাকায় নামিয়ে দিতে পারে; যদি সেরকম আনলোডিং সুবিধা থাকে। নচেৎ ঢাকায় এনে তা ICD থেকে দ্রুত খালাস করা যায়।

পচনশীল দ্রব্যাদি ট্রেনে যশোর থেকে ঢাকায় কিংবা রংপুর, বগুড়া থেকে ঢাকায় সবজি, ফলমূল, চাল ইত্যাদি আদান-প্রদান সম্ভব। অবশ্য এসব ট্রেন চলাকালীন মানুষের ভ্রমণ শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত করতে হবে। সড়কপথ যতটুকু সম্ভব সীমিত রাখার বর্তমান কৌশল ভালো বলে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর। এজন্য দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে কৃষিতে প্রণোদনা ভালো নিঃসন্দেহে পদক্ষেপ। এতে দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা থাকবে না। ধান উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ।

বাংলাদেশে মহামারী, দুর্যোগ বারবার এসেছে। এদেশের মানুষ কষ্টসহিষ্ণু। বর্তমান দুর্যোগও আমরা সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে কাটিয়ে উঠব, এ প্রত্যাশা সবার।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (অব.) : তুরস্কে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক সামরিক অ্যাটাশে

[email protected]

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত