করোনার মাঝেই আসছে ডেঙ্গু

  ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন ১৪ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গুর প্রকোপ আমাদের দেশে আর কিছুদিনের মধ্যেই অস্বাভাবিক আর অনিয়ন্ত্রিত আকারে চলে আসতে যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার এতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়বে আর বাড়বে মৃত্যু। এবারের প্রকোপ আর ভয়াবহতা আগের তুলনায় হবে দ্বিগুণ।

গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই হয়তো পড়তে যাচ্ছেন এবারের বিপর্যয়ের মুখে। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত বা ইনফেক্টেড ডিমগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদেরই আশপাশে। এ সময়ের অল্প অল্প বৃষ্টিতে ফুটে উঠবে সেসব এডিস মশার ডিম আর পরম যত্নে বেড়ে উঠবে সেসব। করোনার মাঝেই আমরা পড়তে যাচ্ছি আরেক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

একবার ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের যে কোনো একটিতে আক্রান্ত হওয়ার পর পরেরবার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে কিংবা একই সেরোটাইপে ভিন্ন জেনোটাইপের হলেও রোগটি ডেঙ্গু হেমোরেজিক রূপ নেয়, দেখা দেয় শরীরে বডি ফ্লুইডের অসামঞ্জস্যতা। এরপর হার্ট ফেইলিউর ও মাল্টি অরগান ফেইলিউর এবং মৃত্যু। একটি সেরোটাইপে একবার আক্রান্ত হলে বা পুনঃআক্রান্ত হলে প্রতিবারই সাধারণত ছয় থেকে বারো মাস শরীরে ইমিউনিটি বা ডেঙ্গুর প্রটেকশন পাওয়া যায়। একই সেরোটাইপ ভিন্ন অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলেই শুরু হয় সমস্যা।

এসব ক্ষেত্রে ডেঙ্গুতে সমস্যা যা দেখা যায় তা হল দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়া, এতে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই কাল হয়ে দাঁড়ায়, শরীরে ফ্লুইড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যাহত হয়।

আক্রান্ত হওয়ার পর সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে মৃত্যুর আশঙ্কা কমিয়ে আনা যায়। ডেঙ্গু সম্পর্কিত যেসব মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়, তাতে প্রথমবার আক্রান্ত হওয়া ডেঙ্গু রোগের সংখ্যা খুবই কম। প্রথমবার আক্রান্ত কিনা সে হিসাব কষাও কঠিন, কেননা আগে কখন রোগী আক্রান্ত হয়েছিলেন তা হয়তো তিনি জানেন না। প্রকোপ কম ছিল বা সঠিক সিজনে হয়নি বা তিনি অল্পেই সেরে উঠেছিলেন বলে হয়তো পরীক্ষা করাননি।

যেসব টেস্ট করে প্রাথমিক নাকি সেকেন্ডারি ডেঙ্গু নির্ণয় করা হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই ইদানীং অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কারণ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর তার ইমিউন রেসপন্স বা রোগ প্রতিরোধের প্রধান দুটি মানদণ্ড অতি প্রাকৃতিক নিয়ম ভেঙে একইসঙ্গে অথবা ঠিক বিপরীতভাবে আবির্ভাব হচ্ছে। এতে রোগের প্রকার নির্ণয় দুরূহ হয়ে পড়ছে। আবার রোগীদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাসও সঠিকভাবে পাওয়া যায় না।

তাই প্রাথমিক ডেঙ্গু নাকি সেকেন্ডারি, তা বুঝে ওঠা কখনও কখনও মুশকিল হয়ে পড়ছে। এতে সঠিক ব্যবস্থা নেয়াও ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান না থাকায় আমরা এর প্রতিকারও সঠিক সময়ে সঠিকভাবে করতে পারি না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জনসাধারণ একযোগে এর প্রতিরোধে অংশ না নিলে এ থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই। এর প্রকোপ ঠেকাতে যা যা করার, সময়মতো আমাদের তা-ই করতে হবে; অন্যথায় সমস্যা মোকাবেলা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠবে। এ সমস্যা থেকে আশু পরিত্রাণ পেতে আমাদের যা যা করতে হবে তা নিম্নরূপ-

প্রথমত, আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্বে এ ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করতে হবে। আমরা জানি, ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা কেবল স্বছ, ঢেউহীন এক ফুটের কম গভীরতাসম্পন্ন পাত্রে জমাকৃত পানিতে, যেখানে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে না, সেখানে জন্মায়।

এছাড়া অব্যবহৃত টায়ার, বাটি, ফুলের টব বা তার নিচে ব্যবহৃত ডালা, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা, অব্যবহৃত টয়লেটে জমা পানি, প্লাস্টিকের পাত্র, এসি, পরিত্যক্ত পলিথিন, কনডেন্সড মিল্কের কৌটা- যেখানে পানি দুই থেকে তিন দিন জমা হতে পারে- এরকম যে কোনো কিছুতে এডিস মশা জন্মাতে পারে। সিডিসি, ডিজি হেলথের বাৎসরিক এডিস মশার সার্ভেতে বাড়ির পেছনে, ভেতরে, আঙ্গিনায়, ছাদে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে, পরিত্যক্ত বা স্বল্প ব্যবহৃত ব্যক্তিগত যানবাহনে এ মশার অস্তিত্ব মিলেছে।

দ্বিতীয়ত, সিটি কর্পোরেশনকে আমরা এক্ষেত্রে প্রায়ই দোষারোপ করি। অথচ আমাদেরই বাড়িতে বেড়ে উঠছে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় প্রকার এডিস মশা। জন্মের পর পরিপূর্ণতা পেলে উভয় মশাই জন্মস্থান থেকে উড়ে চলে যায়। পুরুষ মশা ফলের রস, গাছের রস এসব খেয়ে বেঁচে থাকে। এর মাঝে স্ত্রী মশা বাড়ির ভেতরে চলে আসে দৈনিক দু’বার এবং মানুষের আশপাশে অবস্থান করে রক্তের আশায়।

মশার ডিমের খোলস তৈরিতে প্রোটিন আবশ্যক আর তা জোগাড় হয় প্রাণী থেকে শুষে নেয়া রক্ত থেকে। স্ত্রী মশা শুধু পুরুষ মশার খোঁজে সকাল-সন্ধ্যা দিনে দু’বার ঘরের বাইরে বের হয়। পুরুষ মশা কখনও কামড়ায় না আর বাড়ির বাইরেই থাকে। সিটি কর্পোরেশন কেবল রেসিডুআল স্প্রে বা ফগিংয়ের মাধ্যমে ওইসব পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মশাকে মেরে ফেলতে পারে।

এছাড়া মশার ডিম পাড়ার স্থানগুলো, যা তাদের আওতায় থাকে, সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যথাসময়ে নষ্ট করতে পারে। তবে এতে এ রোগের প্রকোপের কোনো হেরফের হবে না, যদি না আমরা আমাদের বাড়িঘরে মশার বংশ বিস্তারের স্থান ধ্বংস করি।

তৃতীয়ত, সরকারের এ বিষয়ে একটা ভূমিকা আছে, আর তা হল সময়মতো সচেতনতা তৈরি করা। সচেতন করার সময় পার হয়ে গেলে অথবা পরে তৎপর হলে সে চেষ্টা বৃথা যাবে। প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের প্রচারে চিকিৎসক-সিটি কর্পোরেশন-মিডিয়া একযোগে কাজ করতে পারে। বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রোগ বা রোগের কারণ, রোগের ধারক, সর্বোপরি রোগের চক্র ভাঙতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও এ সংশ্লিষ্ট অন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ টিমে রাখতে হবে সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য টিম, ভাইরোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

চতুর্থত, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ আর আইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসকদের এ রোগের মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসকদের জানা থাকতে হবে এ রোগে কী কী পরীক্ষা কখন কখন করতে হবে। এ সংক্রান্ত বিশদ জ্ঞান না থাকলে, সময়মতো চিকিৎসা বা রেফারাল না করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো যাবে না। ডেঙ্গুর চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে যথাসময়ে। ডেঙ্গুতে প্রথমবার আক্রান্ত হলে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ দিন পর জ্বর সেরে গেলে প্রাথমিকভাবে কিছুই হয়নি মনে হয়।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জ্বর সেরে যাওয়ার পরপরই দেখা দিতে পারে চক্ষু লাল হওয়া বা র‌্যাশ বা অন্যান্য রক্তপাতের উপসর্গ। তবে রোগীর পূর্ব কোনো কারণ থাকলে তা ডেঙ্গুজনিত রক্তপাতকে এগ্রাভেট করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালে পুনঃভর্তি হতে হয়। ডেঙ্গুর চিকিৎসা চলাকালে আমাদের কোনো কোনো চিকিৎসক একটা মারাত্মক ভুল করে থাকেন, তা হল ফ্লুইডরি-ডিস্ট্রিবিউট হওয়ার পরও ইনফুইশন চালিয়ে যাওয়া, যার ফলে রোগীর মৃত্যু হয় কার্ডিয়াক এরেস্টে। ফ্লুইড কাটডাউন বা ইনফিউশন কখন বন্ধ করতে হবে, সেদিকে খেয়াল রাখাই ডেঙ্গু শকসিন্ড্রমে মৃত্যুকে আটকে দেয়ার অন্যতম সূত্র।

এ রোগের ক্রিটিক্যাল সময়ে প্রয়োজন হয় রক্ত বা রক্ত কণিকা। প্রকৃতপক্ষে এতে সবসময় রক্তের প্রয়োজন নেই বললেও চলে। অনুচক্রিকা (প্লাটিলেট) ৫০ হাজারের নিচে না নামলে রোগীকে এডমিশনেরও কোনো প্রয়োজন নেই। আর এর নিচে নামলে কেবল কন্সেন্ট্রেটেড অনুচক্রিকা ইনফিউজড করলেই সমাধান পাওয়া যায়। তাই প্রয়োজন ডেঙ্গু যোদ্ধাদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ।

পরিশেষে, এ মৌসুমে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে না নেয়াই ভালো। প্রকৃতপক্ষে এসব রোগে সরকারি চিকিৎসকরা ডেঙ্গু চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন, তড়িঘড়ি করে হলেও অন্তত ডেঙ্গু মৌসুমে এটি করা হয়। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হলেও ওই সময় তাদের কাছ থেকেই চিকিৎসা নেয়া শ্রেয়। এতে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা হতে পারে অনেকটাই নির্ভুল।

ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন : ভাইরাসবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নিপসম

[email protected]

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত