করোনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
jugantor
করোনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

  ড. মো. সফিকুল ইসলাম  

১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস মহামারীতে শুধু বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয়ই ঘটছে না, এটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এ নিয়ে একাডেমিক মহলে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে।

সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন হয়। এ সময় অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন, নীতি, নিয়ম ও শাসন প্রদ্ধতি (Rules, Norms and Regimes) তৈরি হয় এ সময়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মহামারীর কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটবে কিনা?

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে মহামারী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছিল। চতুর্দশ শতকে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর উদ্ভব হয়েছিল চীনের হুবেই প্রদেশে বলে মনে করা হয়। এ মহামারীতে ওই প্রদেশের ৯০ শতাংশ এবং চীনের প্রায় অর্ধেক লোক মারা যায়। পৃথিবীর প্রায় ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

এ মহামারীতে পৃথিবীর চারটি সাম্রাজ্যের (পূর্বে উয়ান, মধ্য অঞ্চলীয় চাগাতি খানাত, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলীয় ইখয়ানাত এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলীয় গোল্ডেন হার্ড) মধ্যে পরস্পর নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয় এবং এ বিপর্যয়ের জন্য ইহুদিদের দায়ী করে তাদেরকে পৃথক করে রাখা হয়।

ফলে মঙ্গলীয়দের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। মঙ্গলীয়রা ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করে এক বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তারা বহু রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও রিলে স্টেশন নির্মাণ এবং ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল।

এছাড়া, ১৯১৮ সালে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে স্প্যানিশ ফ্লু। এ মহামারীতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায়। এর অব্যবহিত পরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

এ যুদ্ধে চারটি ইমপেরিয়াল ডাইনেস্টি- অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির হাবস্বার্গ, জার্মানির হহেনজোলার্ন, অটোম্যান এমপায়ার এবং রাশিয়ার রোমানোভসের পতন হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

অন্যান্য মহামারীর তুলনায় নোবেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মৃদু এবং মৃত্যুর হার কম। কিন্তু উন্নত ওষুধ ও চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশকেই এ মহামারী মোকাবেলায় অপ্রস্তুত দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ সংকট কিভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে?

যদিও এ বিষয়ে এখনই আলোচনা একটু তাড়াতাড়ি মনে হচ্ছে। তবে পরিবর্তনের কিছু প্রবণতা এখনই লক্ষ করা যায়। প্রথমত, এ সংকটের ফলে বিশ্বায়নের প্রতি জনসমর্থন কমে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন সাময়িক স্থগিত করার জনতুষ্টিবাদী নীতি তারই প্রতিফলন।

তাছাড়া বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, পর্যটন ও ভ্রমণকে দায়ী করা হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক সীমান্ত বন্ধ তথা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দৃঢ় করার দাবি জোরালো হচ্ছে। ফলে সীমান্তবিহীন পৃথিবীর যে দাবি তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, এ মহামারী পশ্চিমা ধারণার ওপর আঘাত করেছে। পশ্চিমা ধারণার মানে উন্নত শাসন, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও উন্নত ব্যবস্থাপনা। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো এ মহামারী মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্যভাবে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে এ দেশগুলোতেই। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণে ট্রাম্প-আটলান্টিক সম্পর্ক দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

এ মহামারীকে চীনা ভাইরাস অভিহিত করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের পীড়াপীড়ির কারণে জি-৭ এ নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তা গত ১ এপ্রিল গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইউরোপকে ট্রাম্প ভাইরাসে ধরতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, এ মহামারীতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি জনসমর্থন কমছে।

তৃতীয়ত, চীন এ মহামারীতে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ সংকট দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যে এর প্রশংসা করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রয়েছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তাদের সফলতা দেখানোর জন্য এ মহামারীতে প্রাণহানি ও অন্যান্য তথ্য গোপন করেছে।

তবে অভিযোগ যা-ই থাকুক, চীন ইতোমধ্যে ইতালি, স্পেন, সাইবেরিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিশেষজ্ঞ দল ও মেডিকেল সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এসব সহযোগিতার জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন এ মহামারী ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথমদিকে এ মহামারীকে হুমকি মনে করতে অস্বীকার, বিশেষজ্ঞ মতামত প্রত্যাখ্যান, ভুল তথ্য সরবরাহ করে এবং এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন। ফলে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে।

এছাড়া তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে এবং ডোনেশন বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। মহামারী মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। অন্যদিকে, চীন মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহ ও বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়ে বিভিন্ন দেশকে সহযোগিতা করছে।

সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চীনের নেতৃত্ব গ্রহণ করছে। এ সুযোগে দেশটি আঞ্চলিক জোট যেমন- আসিয়ান, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন এবং ১৭+১ কৌশল ব্যবহার করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে এ মহামারী মোকাবেলায় সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করতে পারে।

চতুর্থত, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ মহামারীর কারণে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এ মন্দা পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় এবং চীন যদি এ তা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা উভয়ই আবার বেইজিংয়ের অনুকূলে যেতে পারে।

এ সুযোগে বেইজিং তাদের বিশ্ব ভাবনা অনুযায়ী গ্লোবাল গভর্নেন্সের নিজস্ব নীতি বাস্তবায়ন শুরু করবে। তাদের ‘হেল্থ সিল্ক রোড’ ঘোষণা এ আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। অধিক সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বন্ধু ও সহযোগী রাষ্ট্রগুলো যদি ‘হেল্থ সিল্ক রোড’ ঘোষণায় যোগদান শুরু করে, তাহলে বিশ্ব নেতৃত্ব বেইজিংয়ের হাতে চলে যেতে পারে।

তাছাড়া ওয়াশিংটন যদি বিপদগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের চেয়ে নিজের স্বার্থে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে বৈশ্বিক হুমকিগুলো যেমন- মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তন ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার উদ্যোগ সফল হবে না, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উত্তেজনা বাড়বে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংঘর্ষ’ (Clash of Sys

tems) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে পারে, যার মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা শত্রু ও মিত্র এ প্যাটার্নে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এ মহামারীর সঙ্গে আদর্শের কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা আদর্শ যা-ই হোক, এ মহামারী মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুশাসন।

এ মহামারীতে যেখানে গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ইতালি ও স্পেন বিপর্যস্ত, সেখানে সমাজতান্ত্রিক চীন, গণতান্ত্রিক দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান এবং মিশ্র ব্যবস্থার সিঙ্গাপুর খুব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।

সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত পরবর্তী এরূপ হুমকির জন্য প্রস্তুতি নেয়া এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সুশাসন নিশ্চিতকরণে কাজ করা। এ জন্য চীনসহ অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা তার থাকতে হবে।

অতএব, মহামারী-পরবর্তী সময়ে চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী বিশ্বনেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আন্তর্জাতিক নীতি, নিয়ম ও শাসন পদ্ধতির পরিবর্তন নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারে।

কারণ চীন নিজস্ব দর্শন অনুযায়ী এগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এ পরিবর্তন চীনের পক্ষেই যাবে। তবে আশা করা যায়, চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের চেয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন হবে।

ড. মো. সফিকুল ইসলাম : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

করোনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

 ড. মো. সফিকুল ইসলাম 
১৫ মে ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস মহামারীতে শুধু বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয়ই ঘটছে না, এটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এ নিয়ে একাডেমিক মহলে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে।

সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন হয়। এ সময় অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন, নীতি, নিয়ম ও শাসন প্রদ্ধতি (Rules, Norms and Regimes) তৈরি হয় এ সময়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মহামারীর কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটবে কিনা?

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে মহামারী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছিল। চতুর্দশ শতকে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীর উদ্ভব হয়েছিল চীনের হুবেই প্রদেশে বলে মনে করা হয়। এ মহামারীতে ওই প্রদেশের ৯০ শতাংশ এবং চীনের প্রায় অর্ধেক লোক মারা যায়। পৃথিবীর প্রায় ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

এ মহামারীতে পৃথিবীর চারটি সাম্রাজ্যের (পূর্বে উয়ান, মধ্য অঞ্চলীয় চাগাতি খানাত, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলীয় ইখয়ানাত এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলীয় গোল্ডেন হার্ড) মধ্যে পরস্পর নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয় এবং এ বিপর্যয়ের জন্য ইহুদিদের দায়ী করে তাদেরকে পৃথক করে রাখা হয়।

ফলে মঙ্গলীয়দের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। মঙ্গলীয়রা ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করে এক বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তারা বহু রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও রিলে স্টেশন নির্মাণ এবং ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল।

এছাড়া, ১৯১৮ সালে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে স্প্যানিশ ফ্লু। এ মহামারীতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায়। এর অব্যবহিত পরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

এ যুদ্ধে চারটি ইমপেরিয়াল ডাইনেস্টি- অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির হাবস্বার্গ, জার্মানির হহেনজোলার্ন, অটোম্যান এমপায়ার এবং রাশিয়ার রোমানোভসের পতন হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

অন্যান্য মহামারীর তুলনায় নোবেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মৃদু এবং মৃত্যুর হার কম। কিন্তু উন্নত ওষুধ ও চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশকেই এ মহামারী মোকাবেলায় অপ্রস্তুত দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ সংকট কিভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে?

যদিও এ বিষয়ে এখনই আলোচনা একটু তাড়াতাড়ি মনে হচ্ছে। তবে পরিবর্তনের কিছু প্রবণতা এখনই লক্ষ করা যায়। প্রথমত, এ সংকটের ফলে বিশ্বায়নের প্রতি জনসমর্থন কমে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন সাময়িক স্থগিত করার জনতুষ্টিবাদী নীতি তারই প্রতিফলন।

তাছাড়া বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, পর্যটন ও ভ্রমণকে দায়ী করা হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক সীমান্ত বন্ধ তথা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দৃঢ় করার দাবি জোরালো হচ্ছে। ফলে সীমান্তবিহীন পৃথিবীর যে দাবি তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, এ মহামারী পশ্চিমা ধারণার ওপর আঘাত করেছে। পশ্চিমা ধারণার মানে উন্নত শাসন, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও উন্নত ব্যবস্থাপনা। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো এ মহামারী মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্যভাবে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে এ দেশগুলোতেই। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণে ট্রাম্প-আটলান্টিক সম্পর্ক দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

এ মহামারীকে চীনা ভাইরাস অভিহিত করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের পীড়াপীড়ির কারণে জি-৭ এ নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তা গত ১ এপ্রিল গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইউরোপকে ট্রাম্প ভাইরাসে ধরতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, এ মহামারীতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি জনসমর্থন কমছে।

তৃতীয়ত, চীন এ মহামারীতে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ সংকট দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যে এর প্রশংসা করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রয়েছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তাদের সফলতা দেখানোর জন্য এ মহামারীতে প্রাণহানি ও অন্যান্য তথ্য গোপন করেছে।

তবে অভিযোগ যা-ই থাকুক, চীন ইতোমধ্যে ইতালি, স্পেন, সাইবেরিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিশেষজ্ঞ দল ও মেডিকেল সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এসব সহযোগিতার জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন এ মহামারী ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথমদিকে এ মহামারীকে হুমকি মনে করতে অস্বীকার, বিশেষজ্ঞ মতামত প্রত্যাখ্যান, ভুল তথ্য সরবরাহ করে এবং এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর ছেড়ে দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন। ফলে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে।

এছাড়া তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে এবং ডোনেশন বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। মহামারী মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। অন্যদিকে, চীন মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহ ও বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়ে বিভিন্ন দেশকে সহযোগিতা করছে।

সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চীনের নেতৃত্ব গ্রহণ করছে। এ সুযোগে দেশটি আঞ্চলিক জোট যেমন- আসিয়ান, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন এবং ১৭+১ কৌশল ব্যবহার করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে এ মহামারী মোকাবেলায় সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করতে পারে।

চতুর্থত, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ মহামারীর কারণে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এ মন্দা পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় এবং চীন যদি এ তা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা উভয়ই আবার বেইজিংয়ের অনুকূলে যেতে পারে।

এ সুযোগে বেইজিং তাদের বিশ্ব ভাবনা অনুযায়ী গ্লোবাল গভর্নেন্সের নিজস্ব নীতি বাস্তবায়ন শুরু করবে। তাদের ‘হেল্থ সিল্ক রোড’ ঘোষণা এ আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। অধিক সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বন্ধু ও সহযোগী রাষ্ট্রগুলো যদি ‘হেল্থ সিল্ক রোড’ ঘোষণায় যোগদান শুরু করে, তাহলে বিশ্ব নেতৃত্ব বেইজিংয়ের হাতে চলে যেতে পারে।

তাছাড়া ওয়াশিংটন যদি বিপদগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের চেয়ে নিজের স্বার্থে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে বৈশ্বিক হুমকিগুলো যেমন- মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তন ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার উদ্যোগ সফল হবে না, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উত্তেজনা বাড়বে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংঘর্ষ’ (Clash of Sys

tems) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে পারে, যার মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা শত্রু ও মিত্র এ প্যাটার্নে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এ মহামারীর সঙ্গে আদর্শের কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা আদর্শ যা-ই হোক, এ মহামারী মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুশাসন।

এ মহামারীতে যেখানে গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ইতালি ও স্পেন বিপর্যস্ত, সেখানে সমাজতান্ত্রিক চীন, গণতান্ত্রিক দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান এবং মিশ্র ব্যবস্থার সিঙ্গাপুর খুব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।

সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত পরবর্তী এরূপ হুমকির জন্য প্রস্তুতি নেয়া এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সুশাসন নিশ্চিতকরণে কাজ করা। এ জন্য চীনসহ অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা তার থাকতে হবে।

অতএব, মহামারী-পরবর্তী সময়ে চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী বিশ্বনেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আন্তর্জাতিক নীতি, নিয়ম ও শাসন পদ্ধতির পরিবর্তন নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারে।

কারণ চীন নিজস্ব দর্শন অনুযায়ী এগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এ পরিবর্তন চীনের পক্ষেই যাবে। তবে আশা করা যায়, চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের চেয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন হবে।

ড. মো. সফিকুল ইসলাম : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস