সারা বিশ্বে সমসুযোগের চিকিৎসাব্যবস্থা চাই

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী ১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন সারা বিশ্বে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি ও মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর হাসপাতালে চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, করোনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিট নেই, আইসিইউ নেই, ভেন্টিলেটর নেই।

চিকিৎসক থেকে শুরু করে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা পোশাক নেই। রোগাক্রান্ত মৃত্যু পথযাত্রী ও মৃত প্রিয়জনের কাছে কেউ যেতে পারছে না, ভালোবাসার শেষ পরশটুকুও বুলিয়ে দিতে পারছে না। মর্গে জায়গা নেই, রাস্তার ধারে পড়ে আছে লাশ।

ডিসেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল শেষ হতে চলল। সম্প্রতি আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন এখনও পরীক্ষার পর্যায়ে আছে। তাই প্রতিষেধক হিসেবে কখনও ম্যালেরিয়া, আবার কখনও এইডসের ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

করোনা রোগী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কাকে ভেন্টিলেটর দেবে, কাকে দেবে না। আর এ কারণে বয়স্ক ব্যক্তিরা চিকিৎসাপ্রাপ্তির অগ্রাধিকার থেকে বাদ যাচ্ছে।

করোনায় তাদের মৃত্যু হার বেশি বলে, ওই সুবিধাটি তুলনামূলকভাবে কম বয়স্ক, অর্থাৎ যার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি তাকেই প্রদান করা হচ্ছে। অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে দেশে দেশে সিনিয়র সিটিজেনরাই বঞ্চিত হচ্ছে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হচ্ছে।

আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোয়ও সবার জন্য চিকিৎসাসেবা প্রদান সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে সাধারণ মুটে-মজুর, আবালবৃদ্ধবনিতা সবার ইয়া নাফসি অবস্থা।

হাসপাতালগুলোয় অন্যান্য রোগের চিকিৎসা প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে, প্রাইভেট প্রাকটিসও বন্ধ। করোনা পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মহামারী মোকাবেলায় সমগ্র বিশ্বের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা নাজুক।

শুধুই কি করোনা? এ পরিস্থিতি ছাড়াও সারা বছর পৃথিবীতে ক্যান্সার, কিডনি বা এ ধরনের ব্যয়বহুল রোগে যথোপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে কত মানুষ মৃত্যুর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন মতে, ২০১৮ সালে ৯.৬ মিলিয়ন লোক ক্যান্সারে মারা যায় এবং এর ৭০ শতাংশ সংঘটিত হয় নিু ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়। ক্যান্সার একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারলে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। নিু আয়ের দেশগুলোর ৮০ ভাগ রোগী কিডনি সংযোজন ও ডায়ালাইসিস থেকে বঞ্চিত।

আমাদের দেশের মানুষজনও খেয়ে না খেয়ে টাকা জমিয়ে, জমি বিক্রি করে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে ছুটছে। দুরারোগ্য চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে, অন্য সদস্যদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিপতিত হচ্ছে, আমরা তাদের কমপেনসেট করতে পারছি না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চিকিৎসার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় বেড়েই চলেছে। আর এতে সারা বিশ্বে প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। অর্থ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে একটি মানুষও যদি মৃত্যুবরণ করে তাহলে তো আমাদের সভ্যতাই ফিকে হয়ে যায়।

যে দেশে একটি লোক অনাহারে থাকে ও বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, তাদের তো সব আয়োজনই ব্যর্থ। আমাদের শৌর্য-বীর্য, জ্ঞান-গরিমা, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সবই মিছে।

হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে, অসুখ বিসুখ ছাড়াও একজন মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত একজন যখন দেখে আর্থিক অসচ্ছলতা ও সামাজিক মর্যাদার অভাবে মৃত্যুই তার নিয়তি এবং বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গোনা ছাড়া উপায় নেই, তখন তার এবং তার নিকটজনদের মানসিক অবস্থাটি বিবেচনার দাবি রাখে।

আমাদের কাজ করতে হবে এ জায়গাটাতেই। জাত-পাত, উঁচু-নিচু, সচ্ছল-অসচ্ছল সবার জন্য সমান চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করতে হবে। আমাদের মেধা-মনন, অর্থকড়ি ও সম্পদ কোনো খাতে বিনিয়োগ করছি?

বিশ্বের সব মানুষের নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিতে আমাদের আয়োজন কেন তলানিতে পড়ে আছে? আমরা কেন অপ্রয়োজনীয় খাতে সর্বোচ্চ উজাড় করে এ খাতের প্রস্তুতিকে অবহেলা করছি?

কেন সমস্বাস্থ্য-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছি না? আমরা উন্নতি করছি, আত্মতুষ্টির ঢেঁকুর তুলছি, ভিন্ন গোষ্ঠী, ভিন্ন দেশের ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছি; কিন্তু আজকে অনুধাবন করার সময় এসেছে- কোনো দেশ ও গোষ্ঠী, নাকি এ ধরনের মহামারী আমাদের বড় শত্রু? আমরা বিশ্ববাসী, বিশ্ব নেতৃত্ব কি আমাদের সবার শত্রুকে চিনতে পেরেছি?

দেশে দেশে যুদ্ধ, অন্যের ওপর খবরদারির জন্য সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও আয়োজনের বিপরীতে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের প্রস্তুতি নেই কেন?

পৃথিবীর জ্ঞাত ইতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ২ বিলিয়নেরও অনেক বেশি। সুইডেনভিত্তিক সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট জানায়, ২০১৭ সালে বিশ্বে সামরিক খাতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার মার্কিন ডলার।

নিরাপত্তার নামে সামরিক খাতে ব্যয় বিশ্বকে আরও অস্থির করে তুলছে। আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে- আমরা কি মানুষ বাঁচাব; নাকি যুদ্ধ ও অন্যান্য খাতে আমাদের সম্ভার বাড়িয়ে তুলব? এ প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত কি অধিক মনোযোগ দাবি করে না?

সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তো ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান লক্ষ্য ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা’। প্রত্যেক নাগরিক মানসম্পন্ন সেবা পাবে। আর্থিক অসামর্থ্যরে কারণে কেউ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না। সেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে না। কিন্তু সেটা কি বাস্তবায়ন করা গেছে?

সবার আগে ক্ষমতাধর ও সম্পদশালী দেশগুলোকে বিশ্বের সব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে শুধু কথায় বা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে একমত হতে হবে। এরপর তাদের নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যাপকভিত্তিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, জনবল বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্বের সব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সব দেশ, সংস্থা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। চিকিৎসাসেবা প্রদানে সমগ্র বিশ্বকে একটি একক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সমমানের হাসপাতাল তৈরি করতে হবে।

যে রোগীকে যে হাসপাতালে পাঠালে সুবিধা হবে, সেখানেই তাকে পাঠাতে হবে। প্রত্যেককে এক আদমের সন্তান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ক্যান্সার, কিডনি ও হার্টের জটিল অবস্থাসহ পৃথিবীতে যত রোগী আছে, তাদের ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। তাদের শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। বিনামূল্যে দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা দিতে হবে। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।

পৃথিবীর সব দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় সমসুযোগ তৈরিতে কত দিন ও কত অর্থের প্রয়োজন হবে? বিশ্ব নেতৃত্বের মানসিকতা পরিবর্তন হলে সামরিক খাতের টাকা এ খাতে লাগাতে পারলে অর্থ কোনো সমস্যাই নয়।

আর সময়? ২০, ৩০, ৪০ বছর? লাগুক, প্রবাদ আছে, A thousand miles journey starts with a single step. হ্যাঁ, শুরুটা এখনই করতে হবে। সেদিনটির অপেক্ষায় আছি, যেদিন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির পাশের বেডে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তিটিও একই হাসপাতালে ও একই ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সুবিধা পাবে।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত