আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজার: সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু করুন

মিঠে কড়া সংলাপ

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ১৬ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের আক্রমণে বিশ্ব কুপোকাত! বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা হুমকির মুখে। বেকারত্বের হার দিনকে দিন বেড়েই চলেছে এবং তা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে বসেছে! আর এ কারণে ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোয় বড় বড় অর্থনীতিবিদের কপালেও ভাঁজ পড়েছে।

আমাদের দেশও এসব চিন্তাভাবনার বাইরে নেই! আমাদের অর্থনীতিবিদরা এবং অর্থমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রীর সামনে জাতীয় বাজেট পেশ করার সময়টি অতি সন্নিকটে। এবারের বাজেট প্রণয়ন খুবই কঠিন একটি কাজ হবে বিধায় আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে তাকে কাজটি করতে হবে।

আর এ কাজে তাকে যারা সহযোগিতা করবেন, তাদেরও আগের তুলনায় অনেক বেশি যত্ন ও দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে তা সম্পন্ন করতে হবে। ঘোলা পানিতে কেউ যাতে মাছ শিকার করতে না পারেন সে বিষয়ে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। একথা বলতে কী বোঝাতে চেয়েছি, আশা করি সংশ্লিষ্টরা তা বুঝতে পেরেছেন!

আমরা জানি, এ দেশে একশ্রেণির ব্যবসায়ী আছেন যারা এক টাকা খরচ করে সময়-সুযোগ বুঝে দশ টাকা উসুল করে নেন। ছোট-বড় সব ধরনের ওই শ্রেণির ব্যবসায়ীর মধ্যেই এমন প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন ফন্দি-ফিকিরে সরকারের পদস্থ ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বাজেট প্রণয়নের সময় তারা নিজেদের মালামালের আমদানি শুল্ক, রফতানি শুল্ক ইত্যাদি মওকুফ করানো বা কমানোর চেষ্টা চালান।

এ বিষয়ে কারও কোনো আপত্তি থাকত না, যদি ভোক্তা পর্যায়ে শুল্ক মওকুফের বা কমার সুবিধাগুলো পৌঁছাত। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যে তা হয় না সে কথাটিও সত্যি। অন্যথায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে হিমশিম খেতে হতো না।

বাজেটে সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক সেক্টরের মধ্যে অন্যতম একটি হল পুঁজিবাজার। গত কয়েকটি বাজেটেই পুঁজিবাজারের দিকে সুদৃষ্টি রেখে অনেক প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে প্রাণ ফেরানো সম্ভব হয়নি। কারণ ওইসব সুযোগ-সুবিধা প্রণোদনা Carry coal to Newcastle-এ পরিণত হয়েছে। যেমন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ Demutualisation-এর পর চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসই’র অংশবিশেষ ক্রয় করে বিশাল অঙ্কের যে অর্থ প্রদান করেছে, তার সবটার মালিকানাই স্টক ব্রোকারদের বিধায় সমুদয় অর্থ তারাই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

এভাবে প্রত্যেক ব্রোকার আট-দশ কোটি টাকা পাওয়ার পর সেই অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে আয়কর দিতে হবে না এমন কথা বলা থাকলেও বেশিরভাগ ব্রোকারই ফ্লাট দশ পার্সেন্ট কর দিয়ে সেসব অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন! তদন্ত করলে হয়তো দেখা যাবে, সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের দেয়া অর্থের দশ ভাগও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হয়নি! এক্ষেত্রে তাই আট-দশ কোটি টাকা আয়ের ওপর সর্বনিম্ন দশ ভাগ কর আরোপ যুক্তিযুক্ত হয়েছে কিনা সে প্রসঙ্গটিও এসে যায়।

অন্য ক্ষেত্রে এ পরিমাণ আয়ের আয়কর যেখানে ত্রিশ ভাগ সেক্ষেত্রে দশ ভাগ কর দিয়ে টাকা সরানোর সুযোগ দেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত সে বিষয়টিও ভেবে দেখার মতো। আবার সেই দশ ভাগ করও সবাই প্রদান করেছেন কিনা সে বিষয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ কোনো ফাঁকফোকর বের করে এখানেও কোনো কিছু করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়টিও বোধহয় তদন্তসাপেক্ষ।

এছাড়াও স্টক ব্রোকাররা আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন বা পেয়েছেন। যেমন শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে তাদের কমিশন হতে যে হারে আয়কর প্রদান করতে হতো, গত বাজেটে সে কর হারও কমানো হয়েছে বা তাদের আয়ের যে একটা অংশ জমা করতে হতো সেখানেও ছাড় দেয়া হয়েছে।

গত বাজেটে তাদের ছাড় প্রাপ্তির সব ঘটনা এখন মনে না থাকলেও সে সময়ে তারা মোটা দাগে অনেক সুবিধা পেয়েছিলেন। আর তারা সেসব সুবিধা পেয়েছিলেন পুঁজিবাজারকে গতিশীল করবেন এই শর্তে। কিন্তু হা হতোস্মি! তারা কিছুই করেননি বা করতে পারেননি। কারণ দেশের অধিকাংশ ব্রোকার হাউসই কর্পোরেট হাউসের দখলে। বড় বড় শিল্পপতিদের অনেকেই ব্রোকার হাউসের মালিক।

সুতরাং তারা সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করবেন সেটাও স্বাভাবিক। তবে সেসব সুবিধার অন্তত কিছু অংশ ভোক্তা বা তৃণমূল পর্যায়েও পৌঁছানো দরকার। যেমন গত বাজেটে পুঁজিবাজারের ব্রোকার হাউসগুলো বেশ ভালো সুবিধা পেলেও তাদের সবাই কিন্তু শেয়ার কেনাবেচায় কমিশন কমায়নি!

এক্ষেত্রে ব্রোকার হাউসগুলোর যুক্তি হল, বেচাকেনা কম বলে কমিশন হতে তাদের আয়ও কম, তাই তাদের কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ভার মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কথাটি মেনে নিলেও বলতে হয়, অতীতে তারা প্রচুর আয়-রোজগার করেছেন বিধায় মন্দার সময় এ অসুবিধা মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

অপরদিকে আয়-রোজগারের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সবারই পুঁজিবাজারই একমাত্র ভরসা, তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎসই হচ্ছে পুঁজিবাজার। আর বছরের পর বছর লোকসান গুনে এখনও তারা এ বাজারের দিকেই তাকিয়ে আছেন, তাদের প্রায় সবাই পুঁজি ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন!

পুঁজিবাজারের আরেকটি নিয়ামক শক্তি হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখান থেকে অতিসম্প্রতি নির্দেশ জারি করা হয়েছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে কোনোরূপ ক্যাশ ডিভিডেন্ড বিতরণ করতে পারবে না। অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল সেই অর্থ বিতরণ পরের বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটকে দেয়া হল।

কিন্তু প্রশ্ন হল, যেসব বিনিয়োগকারী ব্যাংকের শেয়ার ক্রয় করে ডিভিডেন্ডের আশায় পথ চেয়েছিলেন তারা কী খাবেন? এমনিই তো ব্যাংক মালিকরা নানা সুবিধা নিয়ে ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ে যে মুনাফাটুকু দেন, বিনিয়োগকারীরা এপ্রিল-মে’র আগে তা পান না। নানা টালবাহানায় ব্যাংক মালিকরাই কয়েক মাস পার করে দেন!

আর পুঁজিবাজার যেহেতু ব্যাংকের শেয়ারে ঠাসা, অর্থাৎ একক সেক্টর হিসেবে প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ শেয়ারই ব্যাংকের দখলে, সে অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের সমুদয় বিনিয়োগের তিন ভাগের এক ভাগ অর্থও ব্যাংকের শেয়ারেই বিনিয়োজিত। আর সে কারণেই বোধহয় বাংলাদেশ ব্যাংক এমন করিৎকর্মা সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে। যাতে করে এ চরম দুঃসময়েও বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রাপ্য অর্থটুকু হাতে না পান!

সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বোধহয় একটি সাবাসী দেয়াই যায়! কারণ এ ক্ষেত্রে ব্যাংক মালিকদের যাতে যথাসময়ে ডিভিডেন্ড দিতে না হয় সে ব্যবস্থা করে প্রকারান্তরে ব্যাংক মালিকদেরই খয়েরখাঁগিরি করা হয়েছে। অথচ ব্যাংকগুলোর আজকের এ দুর্দশার জন্য ব্যাংক মালিকরাই দায়ী। এজন্য কোনো বিনিয়োগকারী দায়ী না হলেও তাদের প্রাপ্যটুকুই আটকে দেয়া হল।

এ দুর্দিন ও দুঃসময়েও বিনিয়োগকারীদের কথা একবারও ভেবে দেখা হল না! তাছাড়া এভাবে ডিভিডেন্ড বিতরণ আটকে দিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করলে ব্যাংকের শেয়ার দর যে আরও পড়ে যাবে সে কথাটিও মাথায় রাখা হল না!

এসব বিষয়ে আরও কিছু বলার থাকলেও লেখাটি শেষ করার তাগিদে উপসংহার টেনে বলতে চাই, বাজেট প্রণয়নে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বনই হোক এখন সময়ের কাজ। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গেই এমন কিছু করিৎকর্মা লোক আছেন, যারা কাজের চেয়ে অকাজই বেশি করেন! যেমন এ দুঃসময়ে ডিএসই ও বিএসইসিতে বড় বড় কর্তাসহ সিনিয়র সচিব পদমর্যাদাধারী ব্যক্তিরা বসা থাকলেও তাদের কোনো নড়াচড়া লক্ষ করা যাচ্ছে না।

স্টক ব্রোকারদের কোনো কোনো প্রতিনিধি তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়ে কিছু কথাবার্তা বললেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কাউকে তেমন কিছু বলতে শোনা গেল না। দুঃসহ দুর্দিনের এ দুই-আড়াই মাস সময়ে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পরিবারের পঞ্চাশ-ষাট লাখ সদস্য কে কোথায় কীভাবে খেয়ে বা না খেয়ে থাকলেন, তাদের জন্য কেউ কোনো সাহায্য-সহযোগিতার কথা ভাবলেন না বা তাদের জন্য কেউ কিছু বললেনও না! অথচ রাষ্ট্র কর্তৃক বিএসইসির সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার চেয়ারম্যানের পদটি কিন্তু পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।

সাধারণ বিনিয়োগকারী না থাকলে বা না বাঁচলে ওই পদটি বোধহয় থাকে না বা থাকার কথা নয়! আবার ডিএসই বা সিএসইর চেয়ারম্যানের মতো ডাকসাইটে পদ-পদবিগুলোও বোধহয় শুধু স্টক ব্রোকারদের জন্য নয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও তাদের কাছে অনেক কিছু আশা করেন। কিন্তু দেশের এ দুর্যোগ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের এ দুর্দিনে তাদের জন্য কোনো কিছু করার চেষ্টা না করে তাদের কে কোথায় পর্দার অন্তরালে আছেন তা তারাই জানেন। কারণ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো কিছু করার বিষয়টি আদৌ দৃশ্যমান হচ্ছে না। যদিও তারা আজ বড় অসহায়।

এমনকি বর্তমান অবস্থায় তারা তাদের অ্যাকাউন্টের শেয়ার বিক্রি করেও পরিবারের মুখের অন্নসংস্থান করতে পারছেন না। এ অবস্থায় আমি ওইসব অসহায় বিনিয়োগকারীর কথা ভেবে আজকের লেখাটি পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে উৎসর্গ করে তাদের জন্য শুভ কামনাসহ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত