আরও অধিক সংখ্যায় জিনোম সিকোয়েন্স করতে হবে

  ড. মো. আনোয়ার খসরু পারভেজ ১৬ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছরের শেষদিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে অজ্ঞাত জীবাণুর কারণে আশঙ্কাজনক হারে নিউমোনিয়া রোগী পাওয়া যেতে থাকে। পরীক্ষায় এসব রোগীর দেহে যে জীবাণু পাওয়া যায়, তা জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে সার্স-কোভ-২ ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে এ মহামারী রোগকে কোভিড-১৯ নামে অভিহিত করে। এ ভাইরাসটি পরবর্তী সময়ে বিশ্বের ২১০টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। চীনের পর ইউরোপ ও আমেরিকায় এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এরপর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। তবে চীন, ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় তুলনামূলক কম প্রাদুর্ভাব লক্ষণীয়।

দক্ষিণ এশিয়া বিশেষত বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব পরে শুরু হওয়ায় প্রস্তুতিতে খানিকটা সময়ও পাওয়া যায়। করোনার লক্ষণ সার্স-কোভ-২ দ্বারা সংক্রমিত রোগীদের বেশিরভাগই জ্বর, শুষ্ক কাশি, গলাব্যথা হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর নিউমোনিয়া, সেপটিক শক, পালমোনারি ওডাইমা, তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার সিনড্রোম, রক্ত জমাটবাঁধা এবং অঙ্গ বিকলসহ মারাত্মক অবস্থারও সৃষ্টি করতে পারে। হতে পারে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, অঙ্গ ব্যথা, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, এন্ডোক্রাইন এবং হজমের সমস্যাও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেটেব্যথা, মাথা ঘোরা, অ্যানোফিলিসের বহির্প্রকাশও ঘটতে পারে।

প্রধানত সংক্রমণ হাঁচি, কাশি (শ্বাসযন্ত্রের মাইক্রো ফোঁটা) এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমে ঘটে। ভারতের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেখানে শনাক্তকৃত ৮০ ভাগ কোভিড-১৯ রোগীর কোনো ধরনের উপসর্গ নেই। এ সংখ্যাটা বাংলাদেশে কত, তা এখনও নির্ণয় সম্ভব হয়নি। এ ভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই উপসর্গ দেখা দেয় না। আবার দেখা দিলেও তা স্বল্প মাত্রায়, যা অনেক সময় মানুষ অগ্রাহ্য করে।

এর ফলে যেটা হচ্ছে তা হল, আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় তিনি বুঝে না বুঝে সচরাচর যা করার সবই করছেন। এদিক-সেদিক যাচ্ছেন, লোকজনের সঙ্গে মিশছেন এবং তার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত হচ্ছেন। এছাড়া ফিকাল-ওরাল ট্রান্সমিশন সংক্রামিত রোগীদের প্রস্রাব এবং মল দ্বারাও অন্য কেউ আক্রান্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা সতেরো কোটিরও বেশি। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অষ্টম জনবহুল দেশ। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২.১ শতাংশ বাস করে এ ছোট্ট ভূখণ্ডে। বাংলাদেশ আয়তনে পৃথিবীর ৯২তম দেশ। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের মাত্র ০.১ শতাংশ। বিশ্বের অপরাপর কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা লক্ষ করি, রাশিয়া আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বৃহৎ। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ১১ শতাংশ।

এ বিশাল রাষ্ট্রটি বাংলাদেশ থেকে ১১৫ গুণ বড়; অথচ রাশিয়ার জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে কম। প্রথম দশটি জনবহুল দেশের মধ্যে জনসংখ্যার ঘনত্বে আমরা অবিসংবাদিতভাবে শীর্ষে। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৬৫ জন বসবাস করেন, যা চীন ও ভারত থেকেও অনেকগুণ বেশি।

জনঘনত্বের এ হার রাশিয়া থেকে ১৪০ গুণ বেশি। আমরা যদি রূপক অর্থে বলি তাহলে বলতে পারি রাশিয়ায় একটা ঘরে যদি একজন লোক বাস করেন, বাংলাদেশে একই সাইজের সেই ঘরে গড়ে ১৪০ জন বাস করেন। আমরা স্মরণ করতে পারি যে, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী পাওয়ার তথ্য প্রকাশ করে ৭ মার্চ ২০২০। আমরা লক্ষ করছি, মার্চের শেষের দিক পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগী কম পাওয়া গেলেও এপ্রিলে তা দ্রুত বাড়তে থাকে।

এর কারণ হল কোভিড-১৯ এখন সারা দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে। করোনাভাইরাস আমাদের কাছে নতুন এবং আমরা প্রতিনিয়ত এর আচরণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানছি। এ ভাইরাস সম্পর্কে আগাম মন্তব্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনেক আগাম মন্তব্যের প্রতিফলন ঘটছে না। ফলে এর শেষ কোথায়, তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

আমাদের গণমাধ্যম ও সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময়ে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের ভয়াবহতা তুলে ধরে দেশবাসীকে সতর্ক করা হচ্ছিল। বলতে দ্বিধা নেই, আমরা সেই কথা কানে নেইনি এবং খুব একটা সতর্কও হইনি। ফলে যা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই সংঘটিত হয়েছে। এখন পেছনে না তাকিয়ে সামনে তাকাতে হবে। এ মুহূর্তে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের হার কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

যেসব দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে, সেসব দেশের ট্রান্সমিশন ডাইনামিক্সের করোনা সঞ্চালন পর্যবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে ফলদায়ক হতে পারে। এটি দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার এবং মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর হবে বলে মনে করি। উপযুক্ত মডেলিং দ্বারা কোভিড-১৯ এর পূর্বাভাসও জানতে হবে। সংক্রামক সূচকের বৃদ্ধি-কমানো এবং স্থিতিশীল মাত্রা পেতে সর্বাধিক অনুমোদিত দৈনিক বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করতে হবে।

আরও মনোযোগ দিতে হবে যারা আপাতদৃষ্টে সুস্থ কিন্তু ইতোমধ্যে ভেতরে ভেতরে আক্রান্ত, তাদের শনাক্ত করা। অপ্রকাশিত উপসর্গের করোনা রোগীদের দ্বারা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বেশি হচ্ছে। এটি এখন উদ্বেগের কারণ। করোনা রোগীর যে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার পেছনে এ রোগ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো লোকজনই দায়ী। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত হটস্পটগুলোর জনসমাগম ভেঙে দিতে হবে।

শুধু রাজধানী ঢাকাতে নয়, গুরুতর রোগীদের জন্য অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন এবং আইসিইউ সারা দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখা উচিত। সংক্রমণের গ্রাফ আনুভূমিক করার এসব চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এর ফলে আমরা সময় পাব সারা দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারিত করার।

প্রতিদিন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। আমরা লক্ষ করছি, আক্রান্তের সংখ্যার সূচক ঊর্ধ্বগতিতে রয়েছে। বর্তমান এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলো আরও খারাপ ফল বয়ে আনবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও একথা বলছে। আসলে করোনার পরীক্ষা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

৩০ মার্চ পর্যন্ত উহান থেকে সৃষ্ট ভাইরাসটি এক হাজার ৪০২টি মিউটেশন হয়েছে; যার ফলে এ ভাইরাসের প্রোটিনের মধ্যে ৭২২টি পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তনের কোনো কোনো অংশ ভাইরাসটিকে আরও বেশি সংক্রামক এবং ক্ষতিকর করে তুলতে পারে। এত বেশি সংখ্যক মিউটেশনের ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে আগাম মন্তব্য কাজে আসছে না।

সম্প্রতি পিএনএএস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, নোভেল করোনাভাইরাসের তিনটি প্রধান ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে- এ, বি, সি। গবেষকরা অ্যামিনো অ্যাসিডের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে এ দাবি করেছেন। টাইপ ‘বি’ পাওয়া যাচ্ছে পূর্ব-এশিয়ার দেশগুলোয়। ‘এ’ আর ‘সি’ মূলত পূর্ব-এশিয়ার বাইরে, ইউরোপে আর আমেরিকাতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে কোন ধরনের সার্স-কোভ-২ টাইপ ভাইরাস আছে বা কোন ধরনের মিউটেশনের মাধ্যমে এটি পরিবর্তিত হচ্ছে, তা জানা যায়নি।

খুশির খবর, অতি সম্প্রতি অধ্যাপক সমীর কুমার সাহা ও ড. সেঁজুতি সাহার নেতৃত্বে বাংলাদেশ চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন দেশের প্রথম একটি করোনার জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করে ডাটাবেস জমা দেয়া হয়েছে।

ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স ব্যবহার করে খতিয়ে দেখতে হবে, জনগোষ্ঠীর শরীরের সঙ্গে ও আবহাওয়ার সঙ্গে ভাইরাস কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। এ কাজ সম্পন্ন করতে দেশে এলাকাভিত্তিক, বয়সভিত্তিক, উপসর্গ ছাড়া এবং উপসর্গসহ ব্যক্তির নমুনা থেকে আরও অধিক সংখ্যায় জিনোম সিকোয়েন্স করতে হবে এবং এটা করে যেতে হবে যতদিন না সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হয়। পরবর্তীকালে সব জিনোম ডাটা সমন্বয় ও অ্যানালিসিস করে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোভিড-১৯-এর পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি জানা সম্ভব হবে এবং এটা তুলনা করে জানা যাবে অন্যান্য দেশের জন্য তৈরিকৃত ভ্যাকসিন আমাদের জন্য কতটা কার্যকর হবে।

করোনায় আক্রান্ত সুস্থ ও অসুস্থ মানুষের শরীরের এন্টিবডি টেস্ট করাও জরুরি। কারণ এ থেকে জানা যাবে, জনগোষ্ঠীর কত অংশ উপসর্গ ছাড়া আক্রান্ত এবং কোন ধরনের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাদের শরীরে ছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযোগী চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে এ ধরনের গবেষণা অত্যাবশ্যক।

দেশের নিরিখে যেসব সংক্রমিত ব্যক্তি রোগাক্রান্ত নন এবং যারা সংক্রমণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাদের সংগৃহীত রক্তের ব্যাংক গড়ে তোলা জরুরি। এ রক্তের প্লাজমা করোনার কার্যকরী চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। উপরন্তু, এ রক্ত থেকে বিশোধিত এন্টিবডি করোনা চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে ব্যাপক উৎপাদন করা বাংলাদেশে স্বল্পপরিবর্তিত স্থানীয় গবেষণা অবকাঠামোতেই সম্ভব।

আশার কথা, দেশে এ ধরনের ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো গবেষক ও বিজ্ঞানী আছেন। তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। সেটা হল, এ গবেষণা চালিয়ে নেয়ার মতো মানসম্পন্ন গবেষণাগার দেশে নেই বললেই চলে। গবেষণা বিশেষত বায়োলজিক্যাল গবেষণার ওপর জোর দিয়েই করোনা-পরবর্তী অবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হুমকির মোকাবেলায় বিশ্বনেতাদের এখনই রূপরেখা তৈরি করতে হবে।

ড. মো. আনোয়ার খসরু পারভেজ : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; বর্তমানে প্রেষণে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত