চীনা বিনিয়োগে উচ্চ ব্যয় ও অস্বচ্ছতায় অবাক পাকিস্তান

  হুসেন হাক্কানী ২১ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষায় পাকিস্তান যুক্ত হয়েছিল ৬ হাজার ২০০ কোটি লাখ ডলার ব্যয়ের ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে (সিপিইসি)।’ সম্প্রতি এর বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতার প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গঠিত একটি কমিটির প্রতিবেদনে দেশটিতে চীনা বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো উচ্চমূল্যে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিপিইসি অধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বিভিন্ন বেসকারি কোম্পানি সেটআপ ব্যয় আস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। যার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষকে। পাকিস্তানিদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে চীনকে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেখানে আজ চীনের নির্দয়ভাবে অযৌক্তিক ব্যবসায় পাকিস্তানের নাগরিকরা অবাক।

একের পর এক বেসামরিক সরকার এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভারতের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান সমর্থনকারী হিসেবে চীনকে দেখিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, চীন তার জনগণকে সাহায্য করতে পাকিস্তানে নেই বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে।

‘কমিটি ফর পাওয়ার সেক্টর অডিট’ শীর্ষক ২৭৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাতে চীনা কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত ১০ হাজার কোটি পাকিস্তানি রুপি বা ৬ কোটি ২৫ লাখ ডলারের দুর্নীতির সন্ধান পাওয়া গেছে, যার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ চীনা প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সিপিইসি এবং পাকিস্তান সামরিক শক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং এজন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল অসিম সালিম বাজওয়াকে সিপিইসির প্রধান বানানো হয়েছিল।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামো তৈরি সম্পর্কিত স্পনসরদের ভুল উপস্থাপনা এবং পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাজ সমাপ্তির বিষয়ে তৎক্ষণাৎ বিবেচনা না করার কারণে কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অতিরিক্ত সেটআপ ব্যয়ের জন্য ৩ হাজার ২৪৬ কোটি পাকিস্তানি রুপি বা ২ কোটি ৪ লাখ ডলার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। ৪৮ মাসের জন্য এ প্রকল্পে সুদের ছাড় প্রদান করা হয়। সাহিওয়াল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ৩০ বছর মেয়াদকালে বার্ষিক ২ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের বাড়তি অর্থ দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা কোম্পানিগুলোর লাভের বিশালতা ছিল ধারণাতীত। পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞদের কমিটি যে দুটি প্রকল্প পরীক্ষা করেছিল, সেগুলোর উদ্বোধনের সময় মূল্য ছিল ৩০৮ কোটি ডলার। কমিটি ৪৮ হাজার ৩৬৪ কোটি রুপির অতিরিক্ত খরচ পেয়েছে, যা বর্তমান বিনিময় হারে ৩০০ কোটি ডলার।

কমিটি তার প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছিল, দুটি প্রকল্প ব্যয় থেকে ৩ হাজার ২৪৬ কোটি রুপি বা ২০ কোটি ৪ লাখ ডলার কেটে নেয়া হবে এবং রিটার্ন পেমেন্ট ফর্মুলাটি প্রকৃত নির্মাণের সময় পুনরায় প্রকাশ করার জন্য সংশোধন করা হবে। ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রকল্পগুলোতে চীনারা যে আয় করছে তা কল্পনাতীন।

শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যেতে পারে পাকিস্তান সরকার ও তাদের নেতাদের কারণে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে দেশটিকে। পাকিস্তানের অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার পথে পৌঁছেছে এবং কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

নীতি সংস্কার করার পরিবর্তে, পাকিস্তানের নেতারা আবার মহামারীর জন্য ঋণ পুনর্গঠন ও ঋণ মওকুফের সুবিধা চেয়েছিল, ঠিক যেমনটা তারা আগে সন্ত্রাস দমনে পুরস্কার হিসেবে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করে একের পর এক অর্থনৈতিক সংকট থেকে পাকিস্তানের মুক্তি পাওয়া অবাস্তব। প্রচুর সামরিক ব্যয়, গভীর দুর্নীতি এবং দায়বদ্ধতার অভাব পাকিস্তানের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।

রাজস্ব এবং ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে, চীনা বিনিয়োগগুলো দেশটির কাছে একটি নতুন দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের কর ও বিদ্যুতের শুল্ক বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে, কার্যত পাকিস্তানের জনগণকে চীনের হিংস্র আচরণের জন্য বিলটি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের তাদের নিজস্ব ও চীনের লুণ্ঠনমূলক আচরণে সাহায্য না করে। পাকিস্তানের জনগণ আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।

হুসেন হাক্কানী : হাডসন ইন্সটিটিউটে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পরিচালক

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত