করোনাকালে কেমন পোশাক পরা উচিত

  ড. মো. ইকবাল হোসেন, ড. শোয়েব আহমেদ, আবদুর রাকিব ২১ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আগে জীবাণুনাশক টানেল ব্যবহারের লক্ষ্যটি জানা যাক। মূলত দু’ধরনের টানেলের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়েছে। একটির ব্যবহার যানবাহনের ক্ষেত্রে, যেখানে যানবাহনের বহির্ভাগ জীবাণুমুক্ত করাই মূল লক্ষ্য। অপরটি জনসাধারণের জন্য।

বাইরে চলাচলকালে কোনোভাবে মানুষের পরিহিত পোশাকের বহির্ভাগে নোভেল করোনাভাইরাস অবস্থান নিলে কর্মক্ষেত্র বা বাসায় প্রবেশের আগে সেই ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার জন্য এই টানেলের ব্যবহার।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জীবাণুনাশক টানেল তৈরি করা হয়েছে। এসব টানেলে জীবাণুনাশক রাসায়নিক হিসেবে মূলত হাইপোক্লোরাইট-ই ব্যবহার করা হয়েছে।

হাইপোক্লোরাইট যে কোনো বস্তুর পৃষ্ঠতল জীবাণুমুক্ত করার জন্য একটি বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক, যা যানবাহনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।

তবে জনসাধারণের জন্য নির্মিত টানেলে এই রাসায়নিকের ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। চোখ, মুখ, শ্বাসনালি ও ত্বকের মাধ্যমে এই রাসায়নিকের মানবদেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ নানা সমস্যার কারণ হতে পারে। জনসাধারণের জন্য নির্মিত এই টানেলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা একেবারেই অনুপস্থিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এ বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত ও নিষেধ করছে। ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনার পাশাপাশি হু আরও একটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এসব টানেল ব্যবহারের কারণে মানুষের মনে একটি ভ্রান্ত নিরাপত্তার ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধে অবশ্য করণীয় বিষয়ে শিথিলতা বা গুরুত্বহীনতা চলে আসবে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এ আশঙ্কা খুবই যুক্তিসঙ্গত।

আসা যাক মূল আলোচনায়। বাইরে চলাচলকালে আমাদের পোশাকের বহির্ভাগে করোনাভাইরাস ধারণ ও বহন করার সম্ভাবনা কতটুকু? কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত জানা প্রয়োজন। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি যদি বাইরে চলাচল করে তাহলে তার হাঁচি-কাশি, কথা বলা ও প্রশ্বাসের সঙ্গে ভাইরাস ড্রপলেটস (ক্ষুদ্র জলকণা) এবং এরোসল (বায়ুবাহিত সূক্ষ্মকণা) আকারে ছড়িয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভবনা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু? করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথমত বাইরে চলাচল না করাই কাম্য। হু এবং সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনসহ বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শমতে, আক্রান্ত ব্যক্তির প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে অবশ্যই তাকে মাস্ক পরতে হবে।

এখন দেখার বিষয়, ব্যবহৃত সার্জিক্যাল বা কাপড়ের মাস্ক, আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, কথা বলা ও প্রশ্বাসের সঙ্গে নির্গত ড্রপলেটস (৫+ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার) এবং এরোসলকে (৫ মাইক্রোমিটারের সমান বা ছোট) সম্পূর্ণভাবে ধরে রাখতে সক্ষম কিনা। আমেরিকান জার্নাল অব ইনফেকশন কন্ট্রোলে প্রকাশিত আর্টিকেল মতে, মানুষের হাঁচির সঙ্গে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার ড্রপলেটস সজোরে ১০০ মিটার/সে. বেগে নির্গত হতে পারে।

কাশির সঙ্গে অনুমানিকভাবে ৩ হাজার এরোসল বের হয়ে আসতে পারে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের কথা বলার সঙ্গেও বিপুলসংখ্যক ড্রপলেটস নির্গত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় ‘Stay Healthy’ কথাটি বলার সঙ্গে ২০-৫০০ মাইক্রোমিটার ব্যাসের ড্রপলেটস নির্গত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

সুতরাং, নির্গত বহুসংখ্যক ড্রপলেটস/এরোসল বাইরে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে মাস্কের কার্যকারিতা মূল্যায়নে উচ্চ নির্গমন বেগও বিবেচনায় আসতে হবে। উচ্চ ড্রপলেটস-এরোসল সংখ্যা এবং নির্গমন বেগের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি মাস্ক পরিহিত থাকা সত্ত্বেও তা বাইরে চলে আসার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে।

তবে আক্রান্ত মাস্ক পরিহিত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় নির্দেশনামতো হাতের কনুই সঠিকভাবে চেপে ধরলে, ড্রপলেটস/এরোসল বাইরে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন হয়ে যায়। মাস্ক এবং কনুই চেপে ধরা মিলিতভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির ড্রপলেটস/এরোসল নিয়ন্ত্রণ করতে অনেকটাই সক্ষম হয়। তবে কিছুসংখ্যক বেরিয়ে আসবে, তা বিবেচনায় নেয়াই যৌক্তিক ও শ্রেয়।

হাঁচি-কাশির সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসা ড্রপলেটসগুলো ৫ মাইক্রোমিটার থেকে বড় হয়। তুলনামূলকভাবে বড় এসব ড্রপলেটস দ্রুত মাটিতে নেমে আসবে। কাজেই নির্দেশনা/পরামর্শ মতো বাইরে চলাচলকালে আমরা অন্যদের থেকে ৬ ফিট শারীরিক দূরত্ব সঠিকভাবে বজায় রাখলে, মুখ-চোখ-নাক দিয়ে ড্রপলেটস গ্রহণ এবং পোশাকে ধারণ, উভয় দিক থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।

সঠিক শারীরিক দূরত্ব থাকলে, বিশেষ করে ড্রপলেটস পোশাকে না আসা অনেকটাই নিশ্চিত, যদি না বাইরে বাতাস প্রবাহের গতিবেগ অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। কিন্তু আমাদের বাস্তব চিত্র ভিন্ন, নিয়ম-শৃঙ্খলা মানার বিষয়ে বাস্তবে আমাদের অনেকে বরাবরই উদাসীন। কাজেই একটা আশঙ্কা থেকেই যায়।

অপরদিকে, নির্গত এরোসল বা সূক্ষ্মকণা নিয়ে বিশ্লেষণটি একটু ভিন্ন। এসব কণা ৫ মাইক্রোমিটার থেকে ছোট হয় এবং ভর অনেক কম হওয়ায় বাতাসে ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান করতে সক্ষম। এমনকি বাতাসের সঙ্গে প্রবাহিত হতেও পারে। কাজে বাইরে ছড়িয়ে পড়া এই সূক্ষ্মকণা আমাদের উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা স্বস্তি দেবে। মাসিক হিসেবে বাংলাদেশের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ জুন-জুলাই মাসে ৮.৭৭-৮.৮৭ মিটার/সে.। মাসিক সর্বোচ্চ গতিবেগ ৮.৮৭ মিটার/সে. বিবেচনায় নিচ্ছি। তাছাড়া গতির প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য সূক্ষ্মকণার সর্বোচ্চ ব্যাস ৫ মাইক্রোমিটার ধরছি। এ হিসাবে গতির প্রকৃতি নির্ণয়ের নিয়ামক রেয়নল্ডস নম্বর মান সর্বোচ্চ ৫৫ হতে পারে।

সুতরাং ভাইরাস বহনকারী সূক্ষ্মকণাগুলো বাতাসের সঙ্গে ল্যামিনার বা স্তর-স্তর প্রকৃতির গতি অনুসরণ করে প্রবাহিত হবে। মানুষের চলার গতিবেগ বয়স অনুসারে ০.৯৪-১.৪৩ মিটার/সে. হয়; যা বাতাসের তুলনায় অনেক কম। ভাইরাসবাহী সূক্ষ্মকণা প্রবাহ এবং আমাদের চলা একই দিকে হলে সূক্ষ্মকণা অতি সহজেই পোশাক বেয়ে চলে যাবে। অর্থাৎ পোশাকে আটকে থাকবে না।

কিন্তু সূক্ষ্মকণা প্রবাহ এবং আমাদের দিক মুখোমুখি বা আড়াআড়ি হলে ভাইরাসবাহী সূক্ষ্মকণা আটকে যাওয়ার কিছু আশঙ্কা থাকলেও গা বেয়ে বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পিচ্ছিল ও মসৃণ ধরনের কাপড়ের পোশাক পরিধান, ভাইরাসবাহী সূক্ষ্মকণার গা বেয়ে বের হয়ে যাওয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এ সময়ে বাইরে চলাচলকালে ফুল শার্ট-প্যান্ট পরিধান করা বিজ্ঞানসম্মত।

জানা জরুরি, উল বা সোয়েটার জাতীয় অমসৃণ কাপড়ের পোশাক পরিধান করা ঝুঁকিপূর্ণ। ভাইরাসবাহী সূক্ষ্মকণা মানুষের চুলে আটকে যেতে পারে। তাই বাইরে চলার সময় মাথায় পিচ্ছিল ও মসৃণ কাপড়ের টুপি পরিধান করাও এ সময়ের জন্য বিজ্ঞানসম্মত।

যেহেতু ড্রপলেটস খুব সহজেই মাটিতে নেমে আসে, তাই বাইরে চলাচলকালে জুতার তলা এবং বহির্ভাগ সহজেই ভাইরাস ধারণ/বহন করতে পারে। সবার পূর্ণ (কাভার্ড) জুতা পরা উচিত। জুতা ও মাথার টুপি নিরাপদভাবে জীবাণুমুক্ত করা সহজেই সম্ভব।

অতএব বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আক্রান্ত ও সুস্থ উভয়পক্ষ বাইরে চলাচলকালে দায়িত্বশীল হয়ে স্বাস্থ্যবিধি বা নির্দেশনা যদি সঠিকভাবে মেনে চলে তাহলে সুস্থ মানুষের পোশাকে ভাইরাসবাহী এরোসল সূক্ষ্মকণা ধারণ ও বহন করা সাধারণত সম্ভব নয়।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় গত ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত একটি বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে একই ধরনের মতামত দেয়া হয়েছে। তবে পোশাকে তা থাকার আশঙ্কা যে একেবারে শূন্য, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

বরং বাংলাদেশে বাস্তবতা বিবেচনায় পোশাকে ভাইরাসবাহী ড্রপলেটস বা এরোসল কণা চলে আসার একটা আশঙ্কা থেকে যায়। কিন্তু তা এমন নয় যে, বহনকৃত এই কণাগুলো ওই ব্যক্তি এবং অন্যকে সংক্রমণ করে ফেলবে। অবশ্যই পালনীয় সব স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মেনে চললে পোশাকে বহনকৃত ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকা নিশ্চিতভাবেই সম্ভব।

সুতরাং জামা বা পোশাকের বহির্ভাগ জীবাণুমুক্ত করার জন্য জীবাণুনাশক টানেল স্থাপন ও ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা তাত্ত্বিকভাবে খুবই ক্ষীণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জীবাণুনাশক টানেল সম্পর্কে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। টানেল স্থাপন বিষয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে জাতীয়ভাবে একটি বিজ্ঞানসম্মত স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করতে হবে।

পরিশেষে বলব, পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি ও নির্দেশনা আমাদের জন্য কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। ভ্যাকসিন গ্রহণের পরও সুরক্ষা সুদৃঢ় করতে স্বাস্থ্যবিধির কয়েকটি নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন হবে।

স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মেনে বাইরে চলাচলকালে সাধারণ মানুষের পোশাকের বহির্ভাগে ভাইরাস ধারণ ও বহন করার আশঙ্কা খুব কম। জীবাণুনাশক টানেল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তাত্ত্বিকভাবে অনেকটাই গৌণ।

এটা অপরিহার্য কোনো প্রয়োজন নয়। তবে টানেল স্থাপন বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা এলে বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত সব বিষয় সঠিকভাবে আমলে নিয়ে তা ডিজাইন, নির্মাণ ও পরিচালনা করতে হবে। মানবদেহের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ড. মো. ইকবাল হোসেন (সহযোগী অধ্যাপক), ড. শোয়েব আহমেদ (সহযোগী অধ্যাপক), আবদুর রাকিব (প্রকৌশলী) : কেমিকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত