স্বদেশ ভাবনা

দুর্যোগ-মহামারী দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেয়

  আবদুল লতিফ মন্ডল ২২ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতিবিদদের বরাত দিয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের আঘাত লেগেছে।

সবকিছু বন্ধ থাকায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পাঁচ কোটির বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে। ফলে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে থাকা লাখ লাখ নারী-পুরুষ আবারও গরিব হয়ে যেতে পারেন।

কারণ, বেকার হয়ে গেলে কিংবা ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে তারা আবারও দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবেন। এমন ঝুঁকিতে আছেন দেশের প্রায় অর্ধকোটি লোক। বিপুল এ জনগোষ্ঠী বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে রয়েছে।

ফলে করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যেতে পারে। এমনিতেই কয়েক বছর ধরে দেশের স্থূল দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্য হ্রাসের গতি নিম্নমুখী রয়েছে।

এখন করোনার কারণে অর্ধকোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এলে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০১৬ সালের অনুরূপ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন আশঙ্কাকে কীভাবে জয় করা যেতে পারে, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি নিম্নমুখীর চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস।

২০০৯-১০ অর্থবছরের ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার এখন দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশের সামান্য উপরে। দুই. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার ১৯৯৫-৯৬ সালের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশে।

অর্থনীতির সংজ্ঞা মোতাবেক বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তিন. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে একটি স্বীকৃত পন্থা। এটা ঠিক, এ কর্মসূচির আওতায় ক্রমান্বয়ে কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটছে এবং অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সমস্যা হল, যে হারে ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, সে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না। এতে অসহায় ও অতিদরিদ্র ভাতাভোগীদের মাথাপিছু বরাদ্দ খুব কমই বাড়ছে এবং তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

ফলে তারা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে। চার. আন্তঃবিভাগীয় বা আঞ্চলিক দারিদ্র্যবৈষম্য নিরসনে উদ্যোগের অভাব। পাঁচ. ধনী-দরিদ্রের আয়বৈষম্য বৃদ্ধি। ছয়. দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা ও ছোট পরিবার গঠনের মধ্য দিয়ে উন্নত মানের জীবনযাপনের সচেতনতার অভাব দারিদ্র্য হার হ্রাসে একটি বড় বাধা।

দেশে এক দশক ধরে যখন দারিদ্র্যহার হ্রাসে নিম্নগতি, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এলো করোনা মহামারীর আঘাত। করোনা বিস্তার রোধে ‘লকডাউনের’ কারণে কৃষি খাত বাদে অন্যসব খাতে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্যুরিজমসহ বন্ধ হয়ে পড়ে এডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা সেবা খাত। বন্ধ হয়ে যায় কাঁচাবাজার, ওষুধ, সুপারশপ ও নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকান-মার্কেট।

অধিকাংশ অফিস এবং সব ধরনের আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে অর্থনীতির সব খাতের ওপর।

এমনকি কৃষি খাতের শস্য উপখাতের প্রধান ফসল ধান উৎপাদন সন্তোষজনক হলেও করোনায় কৃষি শ্রমিকের সংকটের কারণে ধান কাটতে না পারায় ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণাঞ্চলের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারীর কারণে অস্বাভাবিক পতন ঘটেছে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি আয়ে। তৈরি পোশাকের প্রধান আমদানিকারক ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বন্ধ বা সীমিত করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এর পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোয় চামড়া, হিমায়িত মাছ, প্লাস্টিক পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কাঠ ও আসবাব শিল্প এবং শাকসবজির রফতানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এসব খাত থেকে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক সেবা, নৌজাহাজ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিমান পরিবহন ও গুদাম সংরক্ষণ, পর্যটন এবং পরিবহন যোগাযোগ সেবাসহ একগুচ্ছ আধুনিক বাণিজ্যিক কার‌্যাবলির প্রবৃদ্ধিতে সেবা খাত ধীরগতিতে হলেও একটানা অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপিতে সেবা খাতের অংশ ৫৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। লকডাউনের কারণে বলতে গেলে, বর্তমানে এ খাতের আয়ে ধস নেমেছে। ফলে এ খাতের উদ্যোক্তরা যেমন দেশেহারা হয়ে পড়েছেন, তেমনি এ খাতে নিয়োজিত কর্মচারীদের অধিকাংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পরিবহন খাতের ৫০ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সূত্রে জানা যায়। তারা ত্রাণের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। পুরো সেবা খাতের অনেক কর্মচারী ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবেন।

শুধু দেশেই নয়, করোনার কারণে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ শক্তি প্রবাসীরা। প্রবাসে থাকা প্রায় ১ কোটি শ্রমিকের উল্লেখযোগ্য অংশই বেকার হয়ে পড়বেন বলে মনে করছে বিভিন্ন মহল। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারীতে অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং তেলের দাম কমে যাওয়ায় শুধু সৌদি আরব থেকেই বিতাড়িত হবেন প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক।

সৌদি আরব ছাড়াও কাতার, ইরাক, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো মালয়েশিয়া থেকে অবৈধ শ্রমিকদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।

এরই মধ্যে কয়েকটি দেশ থেকে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরলে তারা খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ অনেক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন এবং তাদের অনেকে দরিদ্র্য শ্রেণিভুক্ত হবেন।

সরকারি হিসাবে ২০১৯ সাল শেষে দেশে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৬ লাখ ধরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হারে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪০ লাখে।

করোনার কারণে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে থাকা ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এলে দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের ২৪ শতাংশ ছুঁয়ে যাবে।

কোনো কোনো গবেষক দলের গবেষণার ফল অনুযায়ী যদি করোনার স্থায়িত্বকাল দীর্ঘায়িত হয় এবং স্প্যানিশ ফ্লুর মতো দ্বিতীয় ধাপে সেটি সংহার মূর্তি ধারণ করে, তাহলে দেশে দারিদ্র্যের হার কোন পর্যায়ে পৌঁছবে তা সময় বলে দেবে।

২০১৫ সালের জুলাইয়ে পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’ মোতাবেক দেশে যত দরিদ্র মানুষ আছে, তাদের ২৫ শতাংশের সমান মানুষ দারিদ্র্যসীমার আশপাশে থাকে।

তাদের অর্ধেক অর্থনীতি ভালো থাকলে, আয়-রোজগার ভালো হলে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করে। আবার বাকি সাড়ে ১২ শতাংশ মানুষ, যারা দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে থাকে, তারা অর্থনীতি খারাপ হলে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘায়িত খরা, প্রলয়ংকরি বন্যা হলে কিংবা বাজারে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে ওই শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দারিদ্র্যের হার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া রুখতে সরকারের উচিত হবে ওই শ্রেণির মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসা।

করোনা মোকাবেলায় এ পর্যন্ত ১ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার, যার বেশির ভাগ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ঋণ আকারে দেয়া হবে। ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে ঈদুল ফিতরের আগে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সাহায্য দেয়ার যে কর্মসূচি সরকার ঘোষণা করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

তবে এতে কমবেশি সাড়ে ৩ কোটি দরিদ্র মানুষের একটি অংশ এক মাসের খাবার সংগ্রহ করতে পারবে। যদি করোনা মহামারীর স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত হয়, যার আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে, তখন দরিদ্র মানুষের একটি অংশ হতদরিদ্রে পরিণত হবে এবং মোট হতদরিদ্রের সংখ্যা বেড়ে যাবে।

এ অবস্থায় দেশের মানুষের যে অংশটি দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে অবস্থান করছে, তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসা রোধে সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

তাদের কর্মসংস্থান ধরে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেলে সরকারের উন্নয়নমূলক সব অর্জন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত