মানব মনস্তত্ত্ব ও করোনার শিক্ষা
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
মানব মনস্তত্ত্ব ও করোনার শিক্ষা

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২২ মে ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মনস্তত্ত্ববিদ না হলেও মানবাচরণ সম্বন্ধে জনগণ সাধারণ জ্ঞান রাখেন। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় গ্রহণযোগ্য না হলেও মানুষ মানবাচরণ সম্পর্কিত কিছু ধারণা বিশ্বাস করেন।

যেমন- অন্ধকারে চলতে ভয় পেলে মানুষ সশব্দে গান গায়, বিপদে পড়লে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে মনে সাহস পান, বিপৎকালে মানুষ অন্যায় কাজ করতে পারেন না, বিপৎকাল পার করে ভালো কাজ করার কথা ভাবেন।

তবে বাংলাদেশে করোনাকালের মানব মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করলে এ বিষয়গুলো সক্রিয় মনে হয় না। কারণ, অদৃশ্য করোনাভাইরাসের কাছে বিশ্ব আজ পরাজিত। করোনা কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন। নিহতের চেয়ে বহুগুণ বেশি সংক্রমিতরা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
 

এমন দুঃসময়ে বারবার ছুটি ঘোষণা করে ঘরে থাকতে বলার সরকারি আহ্বান পালিত হচ্ছে না। কোনো সরকারি তদারকিও নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষ নিজে সংক্রমিত হয়ে অন্যদেরকেও সংক্রমিত করছেন।
 

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সীমিত লকডাউনে করোনা উপেক্ষা করে তারা শপিংমলে ছুটছেন। এ কেমন মনস্তত্ত্ব! জীবনের চেয়ে কি নতুন পোশাক বেশি জরুরি? রিকশাওয়ালা বা ফেরিওয়ালাদের পেটের তাগিদে রাস্তায় বের হওয়াকে দোষ দেয়া যায় না। কিন্তু শিক্ষিত সচ্ছল লোকজন করোনাকালে ঈদ শপিংয়ে গেলে সে মনস্তত্ত্ব অনুধাবনে কপালে ভাঁজ পড়ে।

মরণাপন্ন মানুষ অনুশোচনায় পুড়েন। সুস্থ হতে পারলে ভালো কাজ করার কথা ভাবেন। বিপৎকালে মানুষ মন্দকাজ করার চিন্তা করে না। দেশে করোনার আক্রমণে প্রতিদিন মানুষ মরছে ও সংক্রমিত হচ্ছে।
 

নিষ্ঠুর করোনা দলমত-পেশা-শ্রেণি নির্বিশেষে সবাইকে আক্রমণ করছে। এমন মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে কী করে মানুষ তার স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব ভুলে গরিবের ত্রাণ চুরি করছে? জনপ্রতিনিধি হয়ে ক্ষুধার্ত দুস্থের খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ করছে!
 

দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল গরিবদের না দিয়ে জনপ্রতিনিধিরা তাদের আত্মীয়স্বজন ও আস্থাভাজনদের নামে উত্তোলন করে গোপনে বিক্রয় করছে!
 

পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী, তারা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির কার্ড বিতরণেও করেছে ব্যাপক দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্ব। এদের কেউ কেউ ধরা পড়েছেন। যাদের দু-চারজন ‘ম্যানেজ’ করে বাঁচলেও দু’-চারজনের শাস্তিও হয়েছে। কাজেই মারাত্মক বৈশ্বিক মহামারী হলেও করোনা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বা জনপ্রতিনিধিদের মনে মৃত্যুভয় জাগাতে পারেনি। বিষয়টি মনস্তত্ত্ববিদদের জন্য নতুন গবেষণার বিষয়।

জনপ্রতিনিধিদের এমন মনস্তত্ত্বের কারণটি কী? তারা কি মৃত্যুকে ভয় পান না? হ্যাঁ, অবশ্যই ভয় পান। তাহলে ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি করছেন কেন? এ প্রশ্নের সাদামাটা উত্তর হল, মৃত্যুকে ভয় পেলেও এরা দুর্নীতিকে ভয় পান না।
 

কারণ, তারা যে প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, তারা তা ভালোই জানেন। দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির গতিবিধি সম্পর্কেও তারা অবহিত।

আরও জানেন হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ব্যাংক লুট, বালিশ মেগা দুর্নীতি, পর্দা মহাদুর্নীতি, পাপিয়া কাহিনী, জিকে শামীম, খালেদ ও ক্যাসিনোকাণ্ডসহ অন্যসব দুর্নীতি সম্পর্কেও।
 

সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়ম করে যে প্রশ্রয় পাওয়া যায়, সে বিষয়টি আমলে নিয়ে এরা ভেবেছেন ত্রাণ চুরি করেও পার পাওয়া যাবে।

সরকার করোনার আবির্ভাবের অনেক আগেই দুর্নীতির প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও বাস্তবে সরকারদলীয় জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় তাদের সবাইকে শাস্তি দিতে পারেনি।

তবে একাধিক নতুন প্রজন্মের আমলার ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে এবং কিছুসংখ্যক ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের ত্রাণ আত্মসাতের অপরাধে শাস্তি হয়েছে। তাহলেও মৃত্যুভয় ও দুর্নীতিকে জনপ্রতিনিধিরা এক করে দেখছেন না।

জনপ্রতিনিধিদের মতো সামাজিক অপরাধীরাও করোনাকালে তাদের অপরাধকর্ম অব্যাহত রেখেছে। অপরাধপ্রবণতার সাম্প্রতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে অপরাধীদের মনস্তত্ত্বে করোনার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।

করোনার আবির্ভাবের পর খুন, ধর্ষণসহ সামাজিক অপরাধ কমেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে। যেমন করোনাকালের আগে ও পরে পত্রিকায় প্রকাশিত খুন-ধর্ষণের খবরে সংখ্যাগত পার্থক্য উল্লেখযোগ্য না হলেও সম্প্রতি গণধর্ষণের হার আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।

কিছু সাম্প্রতিক উদাহরণ দেয়া যায়। রাজধানীর মুগদায় রাজীব ঘোষ আপন বড় ভাই জীবন ঘোষকে হত্যা করেছে, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সৌদি আরব ফেরত স্বামী ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে কলেজপড়ুয়া স্ত্রী তানজিলা আক্তার রিতুকে, মেহেরপুরের গাংনীর পূর্বমালসাদহের গৃহবধূ চম্পা খাতুনকে হত্যা করেছে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা, সিলেটের জৈন্তাপুরে সরকারদলীয় নেত্রী সুমি বেগম পর্নোগ্রাফিতে জড়িত থাকার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, বরগুনায় শিশুকন্যাকে গাছে বেঁধে মাকে গণধর্ষণকারীদের মূল ধর্ষক জহুরুল আকনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব, পুলিশ গ্রেফতার করেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কুলতলির বিধবা নারীকে গণধর্ষণে জড়িত ধর্ষক গোলাম রব্বানিকে, কুয়াকাটার মহিমপুরে রাখাইন ছাত্রী ধর্ষণকারী কলেজছাত্র আল আমিন গ্রেফতার হয়েছে। এভাবে বলতে থাকলে অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। এতে প্রমাণিত হয়, করোনা ভয়াবহ মহামারী হয়েও বাংলাদেশি অপরাধীদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি; বরং কিছু অপরাধীর পিপিই পরিধান করে করোনার নমুনা সংগ্রহের নামে বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতি করার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই ভয় পাওয়ার পরিবর্তে করোনাকে ব্যবহার করে অপরাধীরা অপরাধ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক, করোনা কি মানুষকে কিছুই শেখাতে পারেনি? কেবলই প্রাণসংহার করছে? বিষয়টি এতটা নেতিবাচকভাবে দেখা ঠিক হবে না।

করোনা বিশ্বমানব সমাজের সাধারণ মেডিকেল জ্ঞান বৃদ্ধি করেছে। কীভাবে রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ানো যায়, কীভাবে শরীর সুস্থ রাখা যায়, কীভাবে সাবানে হাত ধুয়ে সংক্রমণ রোধ করা যায়- এ বিষয়গুলো সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মাইকিং করে দেশে দেশে প্রচারিত হয়েছে। গণমাধ্যমে অব্যাহতভাবে স্বাস্থ্যবিধির ঘোষণা দেয়ায় এ সম্পর্কে মানুষের প্রাথমিক জ্ঞান বেড়েছে।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস মানুষকে গৃহবন্দি রেখে করোনা তাদের দিয়েছে নিরবচ্ছিন্ন অবসর। এত বেশি অবসরে অনভ্যস্ত অনেকে বিরক্ত হচ্ছেন। তবে বুদ্ধিমানরা সময়টাকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন।

এর মধ্যে রমজান মাস থাকায় ধর্মবিশ্বাসীরা মনোযোগ দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মকর্ম করছেন। পাঠকরা বই পড়ে, লেখকরা লেখার কাজ করে সময় কাটাচ্ছেন। আর এর সঙ্গে যাদের ডিশ এবং ইন্টারনেট সংযোগ আছে তারা পছন্দের নাটক, সিনেমা, গান, খবরসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন অনেকেই।

এ কারণে ফেসবুক ব্যবহারে গতিশীলতা বেড়েছে। ফোনে ফোনে সবাই সামাজিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর নিচ্ছেন। ফলে করোনাকালের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অধিকতর মজবুত হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। একটি বই লেখার কাজ করছিলাম।
 

কারোনাকালে কাজটি প্রায় শেষপর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এর সঙ্গে পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ লিখছি। একঘেয়েমি দূর করার জন্য নিজের এলাকা ছেড়ে সাহিত্যে অনুপ্রবেশ করে কিছু কবিতা ও অনুগল্প লিখেছি।
 

অবসর আরও বাড়লে একটি মিনি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার কথা ভাবছি। এর মধ্যে মাত্র দু’একবার ঘরের বাইরে ওষুধ কিনতে ও বাজার করতে গেছি। কাজেই কষ্ট হলেও আমার গৃহবন্দি করোনাকাল মন্দ কাটছে না।

পত্রিকাগুলো এখনও স্বরূপে প্রকাশিত হচ্ছে না। যুগান্তর কলামের পৃষ্ঠা কমিয়ে দিয়েছে। অনেক দৈনিক সাহিত্যের পাতা প্রকাশ না করায় পাঠকরা গল্প-কবিতার স্বাদবঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে আজকের লেখাটি করোনাকালে গৃহবন্দি অবস্থায় আমার লেখা ১২০ শব্দের একটি অনুগল্প দিয়ে শেষ করছি।

মন খারাপ

জনপ্রতিনিধি হওয়ার চলমান প্রক্রিয়ায় জব্বার সাহেব ইউপি চেয়ারম্যান হন। ভোটারদের সমর্থন লাগেনি। এলাকার দাপুটে কর্মীরাই তাকে চেয়ারম্যান বানিয়েছে। করোনার আবির্ভাবের পর স্বভাব বদলে তিনি জনসেবায় ব্যাকুল।
 

বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেন। সবাইকে দেন সুপরামর্শ। চেয়ারম্যানের এমন জনদরদি রূপ অভূতপূর্ব। করোনা পরীক্ষার জন্য তার এলাকার ২৫ জনের নমুনা সংগৃহীত হয়েছে।
 

দু-একটি রিপোর্ট পজিটিভ হলে এলাকা ‘লকডাউন’ হবে। আসবে গরিবের ত্রাণ। এ চিন্তায় জব্বার চেয়ারম্যানের ঘুম হয় না। ত্রাণ বিতরণের পূর্বপ্রস্তুতিতে তিনি মহাব্যস্ত।
 

ত্রাণসামগ্রী রাখার জায়গা থাকা সত্ত্বেও নিজ বাগানবাড়ির গোপন গোডাউন খালি করিয়েছেন। তিনটি বঙ্খাটের পেট থেকে বালিশ আর লেপ সরিয়ে ফেলেছেন। ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি সুসম্পন্ন হওয়ার পরদিন রিপোর্ট এলো।

সব নেগেটিভ। এলাকা নিরাপদ। কেবল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমন সুখবরে সবাই খুশি হলেও জব্বার চেয়ারম্যান বিমর্ষ হয়ে পড়লেন।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

দেশপ্রেমের চশমা

মানব মনস্তত্ত্ব ও করোনার শিক্ষা

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২২ মে ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মনস্তত্ত্ববিদ না হলেও মানবাচরণ সম্বন্ধে জনগণ সাধারণ জ্ঞান রাখেন। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় গ্রহণযোগ্য না হলেও মানুষ মানবাচরণ সম্পর্কিত কিছু ধারণা বিশ্বাস করেন।

যেমন- অন্ধকারে চলতে ভয় পেলে মানুষ সশব্দে গান গায়, বিপদে পড়লে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে মনে সাহস পান, বিপৎকালে মানুষ অন্যায় কাজ করতে পারেন না, বিপৎকাল পার করে ভালো কাজ করার কথা ভাবেন।

তবে বাংলাদেশে করোনাকালের মানব মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করলে এ বিষয়গুলো সক্রিয় মনে হয় না। কারণ, অদৃশ্য করোনাভাইরাসের কাছে বিশ্ব আজ পরাজিত। করোনা কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন। নিহতের চেয়ে বহুগুণ বেশি সংক্রমিতরা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

এমন দুঃসময়ে বারবার ছুটি ঘোষণা করে ঘরে থাকতে বলার সরকারি আহ্বান পালিত হচ্ছে না। কোনো সরকারি তদারকিও নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষ নিজে সংক্রমিত হয়ে অন্যদেরকেও সংক্রমিত করছেন।

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সীমিত লকডাউনে করোনা উপেক্ষা করে তারা শপিংমলে ছুটছেন। এ কেমন মনস্তত্ত্ব! জীবনের চেয়ে কি নতুন পোশাক বেশি জরুরি? রিকশাওয়ালা বা ফেরিওয়ালাদের পেটের তাগিদে রাস্তায় বের হওয়াকে দোষ দেয়া যায় না। কিন্তু শিক্ষিত সচ্ছল লোকজন করোনাকালে ঈদ শপিংয়ে গেলে সে মনস্তত্ত্ব অনুধাবনে কপালে ভাঁজ পড়ে।

মরণাপন্ন মানুষ অনুশোচনায় পুড়েন। সুস্থ হতে পারলে ভালো কাজ করার কথা ভাবেন। বিপৎকালে মানুষ মন্দকাজ করার চিন্তা করে না। দেশে করোনার আক্রমণে প্রতিদিন মানুষ মরছে ও সংক্রমিত হচ্ছে।

নিষ্ঠুর করোনা দলমত-পেশা-শ্রেণি নির্বিশেষে সবাইকে আক্রমণ করছে। এমন মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে কী করে মানুষ তার স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব ভুলে গরিবের ত্রাণ চুরি করছে? জনপ্রতিনিধি হয়ে ক্ষুধার্ত দুস্থের খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ করছে!

দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল গরিবদের না দিয়ে জনপ্রতিনিধিরা তাদের আত্মীয়স্বজন ও আস্থাভাজনদের নামে উত্তোলন করে গোপনে বিক্রয় করছে!

পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী, তারা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির কার্ড বিতরণেও করেছে ব্যাপক দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্ব। এদের কেউ কেউ ধরা পড়েছেন। যাদের দু-চারজন ‘ম্যানেজ’ করে বাঁচলেও দু’-চারজনের শাস্তিও হয়েছে। কাজেই মারাত্মক বৈশ্বিক মহামারী হলেও করোনা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বা জনপ্রতিনিধিদের মনে মৃত্যুভয় জাগাতে পারেনি। বিষয়টি মনস্তত্ত্ববিদদের জন্য নতুন গবেষণার বিষয়।

জনপ্রতিনিধিদের এমন মনস্তত্ত্বের কারণটি কী? তারা কি মৃত্যুকে ভয় পান না? হ্যাঁ, অবশ্যই ভয় পান। তাহলে ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি করছেন কেন? এ প্রশ্নের সাদামাটা উত্তর হল, মৃত্যুকে ভয় পেলেও এরা দুর্নীতিকে ভয় পান না।

কারণ, তারা যে প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, তারা তা ভালোই জানেন। দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির গতিবিধি সম্পর্কেও তারা অবহিত।

আরও জানেন হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ব্যাংক লুট, বালিশ মেগা দুর্নীতি, পর্দা মহাদুর্নীতি, পাপিয়া কাহিনী, জিকে শামীম, খালেদ ও ক্যাসিনোকাণ্ডসহ অন্যসব দুর্নীতি সম্পর্কেও।

সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়ম করে যে প্রশ্রয় পাওয়া যায়, সে বিষয়টি আমলে নিয়ে এরা ভেবেছেন ত্রাণ চুরি করেও পার পাওয়া যাবে।

সরকার করোনার আবির্ভাবের অনেক আগেই দুর্নীতির প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও বাস্তবে সরকারদলীয় জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় তাদের সবাইকে শাস্তি দিতে পারেনি।

তবে একাধিক নতুন প্রজন্মের আমলার ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে এবং কিছুসংখ্যক ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের ত্রাণ আত্মসাতের অপরাধে শাস্তি হয়েছে। তাহলেও মৃত্যুভয় ও দুর্নীতিকে জনপ্রতিনিধিরা এক করে দেখছেন না।

জনপ্রতিনিধিদের মতো সামাজিক অপরাধীরাও করোনাকালে তাদের অপরাধকর্ম অব্যাহত রেখেছে। অপরাধপ্রবণতার সাম্প্রতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে অপরাধীদের মনস্তত্ত্বে করোনার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না।

করোনার আবির্ভাবের পর খুন, ধর্ষণসহ সামাজিক অপরাধ কমেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে। যেমন করোনাকালের আগে ও পরে পত্রিকায় প্রকাশিত খুন-ধর্ষণের খবরে সংখ্যাগত পার্থক্য উল্লেখযোগ্য না হলেও সম্প্রতি গণধর্ষণের হার আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।

কিছু সাম্প্রতিক উদাহরণ দেয়া যায়। রাজধানীর মুগদায় রাজীব ঘোষ আপন বড় ভাই জীবন ঘোষকে হত্যা করেছে, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সৌদি আরব ফেরত স্বামী ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে কলেজপড়ুয়া স্ত্রী তানজিলা আক্তার রিতুকে, মেহেরপুরের গাংনীর পূর্বমালসাদহের গৃহবধূ চম্পা খাতুনকে হত্যা করেছে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা, সিলেটের জৈন্তাপুরে সরকারদলীয় নেত্রী সুমি বেগম পর্নোগ্রাফিতে জড়িত থাকার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, বরগুনায় শিশুকন্যাকে গাছে বেঁধে মাকে গণধর্ষণকারীদের মূল ধর্ষক জহুরুল আকনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব, পুলিশ গ্রেফতার করেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কুলতলির বিধবা নারীকে গণধর্ষণে জড়িত ধর্ষক গোলাম রব্বানিকে, কুয়াকাটার মহিমপুরে রাখাইন ছাত্রী ধর্ষণকারী কলেজছাত্র আল আমিন গ্রেফতার হয়েছে। এভাবে বলতে থাকলে অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। এতে প্রমাণিত হয়, করোনা ভয়াবহ মহামারী হয়েও বাংলাদেশি অপরাধীদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি; বরং কিছু অপরাধীর পিপিই পরিধান করে করোনার নমুনা সংগ্রহের নামে বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতি করার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই ভয় পাওয়ার পরিবর্তে করোনাকে ব্যবহার করে অপরাধীরা অপরাধ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক, করোনা কি মানুষকে কিছুই শেখাতে পারেনি? কেবলই প্রাণসংহার করছে? বিষয়টি এতটা নেতিবাচকভাবে দেখা ঠিক হবে না।

করোনা বিশ্বমানব সমাজের সাধারণ মেডিকেল জ্ঞান বৃদ্ধি করেছে। কীভাবে রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ানো যায়, কীভাবে শরীর সুস্থ রাখা যায়, কীভাবে সাবানে হাত ধুয়ে সংক্রমণ রোধ করা যায়- এ বিষয়গুলো সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মাইকিং করে দেশে দেশে প্রচারিত হয়েছে। গণমাধ্যমে অব্যাহতভাবে স্বাস্থ্যবিধির ঘোষণা দেয়ায় এ সম্পর্কে মানুষের প্রাথমিক জ্ঞান বেড়েছে।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস মানুষকে গৃহবন্দি রেখে করোনা তাদের দিয়েছে নিরবচ্ছিন্ন অবসর। এত বেশি অবসরে অনভ্যস্ত অনেকে বিরক্ত হচ্ছেন। তবে বুদ্ধিমানরা সময়টাকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন।

এর মধ্যে রমজান মাস থাকায় ধর্মবিশ্বাসীরা মনোযোগ দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মকর্ম করছেন। পাঠকরা বই পড়ে, লেখকরা লেখার কাজ করে সময় কাটাচ্ছেন। আর এর সঙ্গে যাদের ডিশ এবং ইন্টারনেট সংযোগ আছে তারা পছন্দের নাটক, সিনেমা, গান, খবরসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন অনেকেই।

এ কারণে ফেসবুক ব্যবহারে গতিশীলতা বেড়েছে। ফোনে ফোনে সবাই সামাজিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর নিচ্ছেন। ফলে করোনাকালের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অধিকতর মজবুত হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। একটি বই লেখার কাজ করছিলাম।

কারোনাকালে কাজটি প্রায় শেষপর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এর সঙ্গে পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ লিখছি। একঘেয়েমি দূর করার জন্য নিজের এলাকা ছেড়ে সাহিত্যে অনুপ্রবেশ করে কিছু কবিতা ও অনুগল্প লিখেছি।

অবসর আরও বাড়লে একটি মিনি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার কথা ভাবছি। এর মধ্যে মাত্র দু’একবার ঘরের বাইরে ওষুধ কিনতে ও বাজার করতে গেছি। কাজেই কষ্ট হলেও আমার গৃহবন্দি করোনাকাল মন্দ কাটছে না।

পত্রিকাগুলো এখনও স্বরূপে প্রকাশিত হচ্ছে না। যুগান্তর কলামের পৃষ্ঠা কমিয়ে দিয়েছে। অনেক দৈনিক সাহিত্যের পাতা প্রকাশ না করায় পাঠকরা গল্প-কবিতার স্বাদবঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে আজকের লেখাটি করোনাকালে গৃহবন্দি অবস্থায় আমার লেখা ১২০ শব্দের একটি অনুগল্প দিয়ে শেষ করছি।

মন খারাপ

জনপ্রতিনিধি হওয়ার চলমান প্রক্রিয়ায় জব্বার সাহেব ইউপি চেয়ারম্যান হন। ভোটারদের সমর্থন লাগেনি। এলাকার দাপুটে কর্মীরাই তাকে চেয়ারম্যান বানিয়েছে। করোনার আবির্ভাবের পর স্বভাব বদলে তিনি জনসেবায় ব্যাকুল।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেন। সবাইকে দেন সুপরামর্শ। চেয়ারম্যানের এমন জনদরদি রূপ অভূতপূর্ব। করোনা পরীক্ষার জন্য তার এলাকার ২৫ জনের নমুনা সংগৃহীত হয়েছে।

দু-একটি রিপোর্ট পজিটিভ হলে এলাকা ‘লকডাউন’ হবে। আসবে গরিবের ত্রাণ। এ চিন্তায় জব্বার চেয়ারম্যানের ঘুম হয় না। ত্রাণ বিতরণের পূর্বপ্রস্তুতিতে তিনি মহাব্যস্ত।

ত্রাণসামগ্রী রাখার জায়গা থাকা সত্ত্বেও নিজ বাগানবাড়ির গোপন গোডাউন খালি করিয়েছেন। তিনটি বঙ্খাটের পেট থেকে বালিশ আর লেপ সরিয়ে ফেলেছেন। ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি সুসম্পন্ন হওয়ার পরদিন রিপোর্ট এলো।

সব নেগেটিভ। এলাকা নিরাপদ। কেবল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমন সুখবরে সবাই খুশি হলেও জব্বার চেয়ারম্যান বিমর্ষ হয়ে পড়লেন।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]