সরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ অত্যাবশ্যক

  সুভাষ সিংহ রায় ২২ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘Poisons and medicine are oftentimes the same substance given with different intents.’- উনিশ শতকের বিখ্যাত কবি ও শিক্ষাবিদ পিটার মেরি লেথাম।

‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন/মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে’- ১৯১৯ সালে স্প্যানিশ মহামারীর সময়ে কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন এ কবিতা।

একশ’ বছর আগে স্প্যানিশ মহামারীতে কম করে হলেও পাঁচ কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এতটা উন্নতি হয়নি।

করোনাভাইরাস এ সময়ের আলোচনার অন্যতম এক বিষয়। এর প্রভাবে সারা পৃথিবীতে থমকে গেছে জীবনযাত্রা। ক্ষমতা ও সামর্থ্য যাদের বেশি, এবার তাদের ব্যবস্থাপনায়ও দুর্বলতা ধরা পড়েছে। যেসব দেশের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি ছিল তারা সফলতা দেখিয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাসিস্টের ভূমিকা বিশ্বস্বীকৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় যে তিনটি বিষয় শীর্ষে থাকে তা হল- মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফার্মেসি। দুঃখজনক হলেও সত্য, উল্লিখিত তিন পেশার মধ্যে একমাত্র ফার্মাসিস্টদের আলাদাভাবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স নিয়োগ করা হয়েছে। তিনিই বিশেষভাবে বুঝতে পেরেছিলেন স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নার্স কতটা জরুরি।

এজন্য নার্সিং এডুকেশনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের দেশ একমাত্র দেশ যেখানে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। বর্তমানে সমগ্র দেশে মাসে গড়ে ৯৫ লাখ থেকে এক কোটি সেবাগ্রহীতা কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিয়ে থাকেন। তার পরও বাস্তবতা হচ্ছে, জনবহুল বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল।

একজন ডাক্তারকে দেখতে হয় অসংখ্য রোগী। এক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি হওয়ার আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। তাছাড়া প্রেসক্রিপশন লেখাই সব নয়; বরং রোগীকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দেয়াটাও অনেক বেশি জরুরি, যা ওষুধের কার্যকারিতাকেই নিশ্চিত করে। আর এজন্যই ডাক্তার-ফার্মাসিস্ট-নার্স এই মডেলটি উন্নত স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র গ্রহণযোগ্য মডেল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে বিশ্বের ফার্মাসিস্টদের ৫৫ শতাংশ কাজ করেন ‘কমিউনিটি ফার্মাসিস্ট’ হিসেবে। ৩০ শতাংশ কাজ করেন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায়।

৫ শতাংশ কাজ করেন সরকারি সংস্থায়, ৫ শতাংশ শিক্ষা কার্যক্রমে এবং ৫ শতাংশ কাজ করেন কোম্পানি ওষুধ প্রস্তুতিতে। অথচ বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ফার্মাসিস্ট কাজ করছেন ওষুধ কোম্পানিতেই। হাসপাতাল বা কমিউনিটিতে নেই কোনো ফার্মাসিস্ট।

দেশের ফার্মাসিস্টরা সফলভাবে ওষুধ প্রস্তুত করলেও তারা সরাসরি রোগীর সেবায় ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ফলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ‘পুনঃপরীক্ষণ’ হচ্ছে না। এটি করা গেলে ওষুধ-ওষুধ বিক্রিয়া, ডোজিং, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসককে ওষুধ পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠাতে পারতেন ফার্মাসিস্টরা।

পৃথিবীতে কোভিড-১৯সহ যে কোনো রোগের ওষুধ বা ভ্যাকসিন তৈরি হলে তার পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে শুরু করে রোগীর মনিটরিং পর্যন্ত সব ধাপে কেবল ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্টরাই নিশ্চিত করতে পারেন এসবের যথাযথ নিরাপদ ও কার্যকর প্রয়োগ।

সেজন্য করোনা দুর্যোগেও ফার্মাসিস্টদের বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য চাই একজন করে ডাক্তার ও ফার্মাসিস্ট। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় এখন ৭০ হাজারেও বেশি ডাক্তার কর্মরত রয়েছেন। অথচ একজনও ফার্মাসিস্ট নেই।

২.

অন্যদিকে দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা দুই লক্ষাধিক। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের বিক্রয়/বিতরণ চলছে অবাধে। নেই কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। মানহীন, ভেজাল ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে যেমন বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের সম্মান অর্জন করেছে। উন্নয়নের অনেক সূচক যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন স্বাস্থ্যসেবা কেন পিছিয়ে থাকবে?

দীর্ঘ আলোচনা, সংগ্রাম শেষে বর্তমান সরকারের অধীনেই দেশে দেড় হাজার ফার্মাসিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া অনুমোদিত হয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে অনতিবিলম্বে ক্যাডারভুক্তকরণের মাধ্যমে এসব ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করার এখনই সময়।

দেশে ৯৮ শতাংশেরও বেশি ওষুধ বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের ১৪০টি দেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ওষুধ রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। ওষুধশিল্পকে সামগ্রিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সরকার ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় একটি এপিআই পার্ক স্থাপনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

২০০৭ সালের তথ্য অনুসারে দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের সংখ্যা ছিল ২৭৬০, যা বর্তমানে ১৩৪০০। বর্তমানে ১২টি সরকারি ও ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর গড়ে চার হাজার ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পাচ্ছেন। তবে দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে না।

জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬-তে ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশে পর্যায়ক্রমে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে ‘হাসপাতাল ফার্মেসি’ (Hospital Pharmacy) কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের জন্য বর্তমান সরকার অনেক যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ডিজি, হেলথের অধীনে ‘ডাইরেক্টরস্ ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিসেস’ গঠন করে একজন পরিচালকের নেতৃত্বে এই কার্যকরী প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে। পৃথিবীর উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দেশগুলো এটা অনেক আগে থেকেই করে আসছে।

৩.

বর্তমান সরকারের সময়ে সরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বপ্রথম ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ‘সরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ প্রদান’ শিরোনামে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল- উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের লক্ষ্যে একটি ফার্মেসি সার্ভিসেস পরিদফতর/দফতর গঠন করার জন্য গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে ‘হাসপাতাল ফার্মেসি সার্ভিস’ বাংলাদেশে চালু করার লক্ষ্যে উন্নত দেশসমূহে চালুকৃত ‘হাসপাতাল ফার্মেসি সার্ভিস’ অনুসরণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন একটি পরিদফতর/দফতর প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব (TORE) (জনবল, যানবাহন, যন্ত্রপাতি) প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল। উল্লেখ্য, এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রাপ্তির পর এ বিভাগে অধিশাখা পার-৪-এর মাধ্যমে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের কার্যক্রম গৃহীত হবে।’

(স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের স্মারক নং ৪৫.০০.০০০০.১৮২.৯৯.১০৬.০৬-২৪৫ তারিখ ০৪ নভেম্বর, ২০১৮)। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালের ২০ জানুয়ারিতে আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।

সেখানেও বলা হয়েছিল, “উন্নত দেশসমূহে চালুকৃত ‘হাসপাতাল ফার্মেসি সার্ভিস’-এর অনুসরণে বাংলাদেশের জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে একটি হাসপাতাল ফার্মেসি সার্ভিসেস পরিদফতর/দফতর গঠন করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব (TORE) (জনবল, যানবাহন, যন্ত্রপাতি) প্রেরণের জন্য সূত্রোক্ত ১নং পত্র মারফত নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।”

(স্মারক নং ৪৫.০০.০০০০.১৮২. ৯৯.১০৬.০৬-০৬)। অধিকন্তু ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদ ‘সরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ’ শিরোনামে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাবর একটি নির্দেশনামা প্রেরণ করেন। সেখানেও উল্লেখ করা হয় ‘এমতাবস্থায়, এ বিষয়ে প্রাপ্ত আবেদনপত্রের ছায়ালিপি (সংলগ্নীসহ) বিধি মোতাবেক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে এতদ্সঙ্গে প্রেরণ করা হল।’

৪.

বব ডিলনকে বলা হয় Rebel King of the Rock. তার জনপ্রিয় গানগুলোর একটি হল Blowin' In The Wind...,যার বাংলা করেছেন বাংলার বব ডিলন খ্যাত কবীর সুমন।

‘কতটা পথ পেরুলে তবে পথিক বলা যায়?

কতটা পথ পেরুলে পাখি জিরোবে তার ডানা?

কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।’

সুভাষ সিংহ রায় : ফার্মাসিস্ট

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত