করোনাকালের ঈদ

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ২৩ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

করোনা মহামারী সারা পৃথিবীকেই নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মানুষের যাপিত জীবনে এনেছে পরিবর্তন। হোম কোয়ারেন্টিন আর লকডাউন শব্দের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে। পরিচিত করিয়েছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামে একটি নতুন ধারণার সঙ্গে। আর সবকিছুর মধ্যে এ অদৃশ্য শত্রু করোনা ছড়িয়েছে মৃত্যুভীতি।

বাংলাদেশের ধর্মপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয় মানুষের চিরচেনা দিনগুলোকেও এলোমেলো করে দিয়েছে। এ সময়টি একটি প্রতীকী শব্দ ‘করোনাকাল’ নামে হয়তো ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এমন করোনাকালেই এবার বাঙালির সামনে উপস্থিত হল সবচেয়ে বড় ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ।

ইতিহাস বলে, নানা যুগে রমজানের ঈদ বাংলায় বিভিন্ন বৈচিত্র্যে পালিত হয়েছে। সময়ের ব্যবস্থাপনাতেই তেমন আয়োজন ছিল। অতীতে গ্রামগঞ্জে ঈদ উৎসবের ছিল একটি আটপৌরে রূপ। ছোটদের এবং বৌ-ঝিদের নতুন পোশাক পাওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হতো। না পেলেও ক্ষতি নেই, হাতেগোনা পুরনো পোশাকের মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত ভালো তা ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়া হতো। ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে ইস্ত্রির কাজ সারা হতো অনায়াশেই।

ঈদের নামাজ, এবাড়ি ওবাড়ি খাওয়া, ঈদ মেলায় যাওয়ার মধ্যে ছেলে-বুড়োদের আনন্দ ছড়িয়ে যেত। নাগরিক ঈদ উৎসবে হয়তো কিছুটা ভিন্নতা ছিল।

আঠারো শতকে ঢাকার ঈদ উৎসবের বিশেষত্বের কথা জানা যায়। মূলত ঢাকার নায়েব-ই-নাজিমের নেতৃত্বে ঈদ মিছিল বের হতো নিমতলী প্রাসাদ থেকে। নায়েবে নাজিম সওয়ার হতেন হাতির পিঠে, সভাসদরা ঘোড়ায়, পেছনে থাকত বাদক দল আর উৎসুক জনতা। দু’পাশের বাড়িঘর থেকে অভিবাদন জানান হতো। এ অবস্থারও রূপান্তর হয়। খুব রমরমা ঈদ উৎসব পালিত হতো উনিশ শতকের ঢাকায়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লার মাঠে কত্থক নাচের জন্য মঞ্চ সাজান হতো। আয়োজন হতো হিজড়া নাচের।

হতো নৌকাবাইচ আর ঘুড়ি ওড়ানোর বিশেষ আয়োজন। সিনেমা হলগুলো ঈদ উপলক্ষে ফুলনাইট টিকিট দিত। অর্থাৎ এক টিকিটে সারারাত সিনেমা দেখা। এসব অনেক আগেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এসে মানুষের জীবনযাত্রার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে অনেকগুণ। কেনায় আর উপহারে ছোট থেকে বড় অনেকেই একাধিক সেট পোশাক পেয়ে থাকে ঈদে। খাবার দাবারেও ঐশ্বর্য বেড়েছে।

ঈদ কেনাকাটার জন্য বিপুল সম্ভারে আর আয়োজনে সাজে শপিংমলগুলো। মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় নানা রকম মার্কেট তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। অনেক সামর্থ্যবান আজকাল ঈদ শপিংয়ে দেশের বাইরেও যান।

এমন এক অগ্রগতির ধারায় করোনাকাল বড় রকম ছন্দপতন ঘটিয়েছে। স্থবির করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন। প্রকৃত অর্থে ঈদুল ফিতরের উৎসব শুরু হয় রমজান মাসের শুরু থেকেই। রমজান হচ্ছে ঈদের আগমনী সুর। করোনা রমজানকেও উৎসবের আঙ্গিকে উদযাপিত হতে দেয়নি।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে মসজিদগুলোতে মুসল্লির সংখ্যা সীমিত করে দেয়া হয়েছে। চিরায়ত তারাবি নামাজে পরিবর্তন ঘটেছে এবার। এভাবে ঈদ উৎসবের প্রেক্ষাপট রচনার একটি অনুষঙ্গ বিবর্ণ হয়ে যায়।

ইফতারি নিয়ে সাজসাজ প্রস্তুতি থাকে রাজধানী থেকে ছোট-বড় শহরে। নামকরা রেস্টুরেন্ট ও মৌসুমী দোকানগুলোয় হরেকরকম ইফতারির মেলা বসে। এবার তা একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। সাহরির সময় কোনো রেস্টুরেন্ট খুলতে দেখা যায়নি এবার।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীর প্রতি আবেদন ছিল- এবার যেন কেউ নাড়ির টানে শেকড়ের দিকে ছুটে না যান। নিজেদের আটকে রাখেন নিজ নিজ অবস্থানে। আগে ঈদযাত্রা সুখকর করার জন্য সরকারি উদ্যোগ থাকত। সড়ক বিভাগ ব্যস্ত থাকত রাস্তাঘাট মেরামতিতে। সাধারণ ট্রেনের বাইরেও বিশেষ ট্রেন চালু থাকত। রেলস্টেশনে সারারাত জেগে টিকিটের জন্য মানুষ লাইন দিত। সংবাদকর্মীরা সেসবের সচিত্র রিপোর্ট করার জন্য ছোটাছুটি করতেন।

ট্রেনগুলোয় গাদাগাদি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসতে হাসতে মানুষ ছুটত গ্রামের ঠিকানায়। দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার জন্য বিশাল বিশাল লঞ্চ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেত। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে কোনো কোনো সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হতো। বিরোধী দল গলা উঁচু করত- সরকার সঠিকভাবে ঈদযাত্রার আয়োজনে ব্যর্থ হয়েছে বলে লাগাতার বিবৃতি-বক্তৃতা দিতে থাকত।

করোনাকালে এসবের কোনো কিছুই করতে হল না। নাড়ির টান অনুভব করা দুরন্ত মানুষ যাতে পাগলের মতো ছুটে হোম কোয়ারেন্টিন বা লকডাউন ভঙ্গ না করেন; তাই সব গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে তা কিছুসংখ্যক মানুষের দীর্ঘ অভ্যাসে পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি। করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাকে থোড়াই কেয়ার করে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন পায়ে হেঁটে অথবা পণ্যবাহী ট্রাক কিংবা ছোটখাটো বাহনে সওয়ার হয়ে।

গ্রামমুখী মানুষ অ্যাম্বুলেন্স বহনকারী ফেরি দখল করে দম বন্ধ করা গাদাগাদির মধ্যে নদী পাড়ি দিচ্ছেন, এ চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। করোনাকালে এ এক ভয়াবহ চিত্র।

সীমিতভাবে দোকানপাট আর শপিংমল খুলে দিলেও তেমন বেচাকেনা হয়নি। আমি জানি না, দশ ভাগের বেশি মানুষ এবার ঈদের পোশাক কিনেছে কিনা। অনেক সাধারণ মানুষেরই জীবিকা বন্ধ। বেঁচে থাকার জন্য ত্রাণের অপেক্ষা করছে। মধ্যবিত্তও আর্থিকভাবে তেমন সুখে নেই। এর ফলে এবার ঈদের রমরমা খাবারের আয়োজনেও অনেকটা ছেদ পড়বে। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় এবার আটকে থাকবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই।

ঈদের পোশাক পরে ছোটদের এবাড়ি-ওবাড়ি বা পথে পথে ছোটাছুটি করার চিরচেনা ছবি এবার আমরা দেখব না।

জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের কোনো ঈদগাহ প্রস্তুত করার প্রয়োজন নেই এবার। মসজিদে সামাজিক দূরত্ব মেনে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। নামাজান্তে কোলাকুলি করা এবার তো নিষিদ্ধই।

এভাবে করোনাকাল বাঙালির ঈদুল ফিতর উদযাপনে একটি ভিন্ন ধারা তৈরি করল। ভবিষ্যতের ইতিহাস লেখক আরেকটি পরিবর্তিত রূপের কথাই হয়তো বর্ণনা করবেন।

হয়তো অভ্যাসের এ পরিবর্তন ভবিষ্যতের ঈদ উদযাপনের রীতি পদ্ধতি আর আয়োজনে একটি ভিন্ন প্রভাব নিয়ে আসবে। প্রচলিত সংস্কৃতির সঙ্গে এটি হবে একটি নতুন সংস্কৃতিবোধের মিশ্রণ। অবশ্য যুগে যুগে সাংস্কৃতিক রূপান্তর বা সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ নানাভাবেই ঘটে।

এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত