করোনাকালের বাজেট ভাবনা

  এম এ খালেক ২৯ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, পৃথিবী কখনই করোনাভাইরাস থেকে পুরোপুরি পরিত্রাণ পাবে না। অর্থাৎ আমাদের করোনাভাইরাসকে সঙ্গী করেই আগামীতে বাঁচতে হবে।

যেমন, বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কখনই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সঙ্গী করেই আমাদের বাঁচতে হবে।

আমরা সেভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ইতোমধ্যেই যে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে বা আগামীতে ঘটতে যাচ্ছে, তা কোনোদিনই পূরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।

এখন প্রশ্ন হল, করোনাভাইরাসের কারণে যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন আমরা হতে যাচ্ছি, তা কি কখনও পূরণ করা সম্ভব হবে?

অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন, করোনার কারণে দেশের প্রায় সব সেক্টরের উৎপাদনযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়া আমাদের জন্য সম্ভব নাও হতে পারে।

আবার কেউ কেউ বলছেন, করোনার কারণে আমাদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তা পুষিয়ে ওঠা তেমন একটা কঠিন হবে না।

কারণ বাংলাদেশের মানুষ ইতোপূর্বেও অনেক ধরনের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করেছে। কাজেই এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৮ দশমিক ৮০ ট্রিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার=১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার)।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থা বলছে, করোনার কারণে পর্যটন খাতে সরাসরি সম্পৃক্ত ৫ কোটি মানুষ ইতোমধ্যেই বেকার হয়ে গেছে। হোটেল ও আবাসন ব্যবসা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। অন্য একটি সূত্রমতে, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী অন্তত ৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করবে। যেসব দেশ তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে, তারাই সবচেয়ে বিপাকে পড়বে।

কারণ আগামীতে বাজারে গিয়ে টাকা দিলেও খাদ্য পাওয়া যাবে না। ২০০৭-২০০৮ সালের কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। আফ্রিকার অনেক দেশের মানুষ খাদ্যের জন্য হত্যাকাণ্ডে পর্যন্ত লিপ্ত হয়েছিল। আগামীতে তেমন অবস্থার সৃষ্টি হলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

আমরা যদি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখতে পাই? দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে।

দুই মাস গৃহে অন্তরীণ থাকার কারণে সাধারণ মানুষ এখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তারা বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও বাইরে চলে আসছে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও ব্যাপকভাবে বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখার জন্য সীমিত আকারে শিল্প-কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। করোনার কারণে দরিদ্র ও কর্মহীন হয়ে পড়া প্রায় ৪ কোটি মানুষকে সরকারি উদ্যোগে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

ইতঃপূর্বে বিভিন্ন খাতের জন্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন টাকার আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত একজন সিনিয়র ব্যাংকার প্রসঙ্গক্রমে আশার বাণী শোনালেন।

তিনি বললেন, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা অতীতের যে কোনো দুর্যোগের চেয়ে বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাধারণত একটি দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমিত থাকে।

কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরো বিশ্বকে গ্রাস করেছে। পুরো বিশ্বই আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে থমকে গেছে। তবে আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

জাতি হিসেবে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা অভ্যস্ত। তিনি প্রসঙ্গক্রমে ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসের জামায়াত-বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের কথা স্মরণ করেন।

ওই সময় ঠিক একইভাবে দেশের প্রায় পুরো উৎপাদনযন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এ আন্দোলনের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা খুব শিগগিরই সম্ভব হবে না।

কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ সেই বিপর্যয় অল্পদিনের মধ্যেই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। এবারও তার ব্যত্যয় হবে না, এটাই প্রত্যাশা।

করোনা পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক মাস আমাদের খাদ্য সংকটে পড়তে হবে না বলেই মনে হয়। কারণ ইতোমধ্যে কোনো ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই হাওরাঞ্চলের ধান কাটা হয়ে গেছে।

অভ্যন্তরীণ অন্যসব ক্ষেত্রেও ধান কাটা প্রায় সম্পন্নের পথে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি ফেলে রাখা যাবে না।

সরকারি উদ্যোগে সার-বীজ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন যদি সচল রাখা যায়, তাহলে আগামী দিনে দেশ খাদ্য সংকটে পড়বে না।

করোনা সংক্রমণজনিত কারণে দেশের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, ঠিক সেসময় জাতীয় বাজেট ঘোষণার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে।

দেশের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, মানুষ যখন জীবন বাঁচানোর কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত, ঠিক তেমনি এক মুহূর্তে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করাটা কতটা যৌক্তিক হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কারণ এলোমেলো অবস্থার মধ্যে আর্থিক সেক্টরের সঠিক হিসাব-নিকাশ করা কঠিন হবে। এছাড়া করোনার কারণে দেশের অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হতে পারে তা নিরূপণ না করেই বাজেট ঘোষণা করা হলে সেই বাজেটে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত না-ও হতে পারে।

এ মুহূর্তে বরং পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট ঘোষণা না করে জুন-ডিসেম্বর এই ৬ মাসের জন্য স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট ঘোষণা করা যেতে পারে।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কার্যক্রম বজায় রেখে অন্যসব উন্নয়ন কাজ আপাতত স্থগিত রাখা যেতে পারে।

তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ স্বাস্থ্য খাতে নিয়ে আসা যেতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জানুয়ারি মাসে পূর্ণাঙ্গ নতুন বাজেট ঘোষণা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে আমাদের অর্থবছর নিয়েও বিকল্প চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়কে অর্থবছর হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। জুলাই-জুন অর্থবছর হিসেবে ধরা হলে অর্থবছরের শুরুতেই ঝড়-বাদলের সময় এসে যায়।

এতে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন অনেকটাই বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে জানুয়ারি মাসে অর্থবছরের শুরু হলে বৃষ্টি বা ঝড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিঘ্নিত করতে পারবে না।

অর্থবছরের প্রারম্ভেই যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করা যায়, তাহলে পরবর্তী সময় এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সহজ হবে। দেশের খ্যাতিমান কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হলে তাদের অনেকেই এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেন। জাতীয় স্বার্থে ইস্যুটি নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখা যেতে পারে।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত