করোনা বাস্তবতায় দক্ষতা উন্নয়ন

  মো. আবুল কালাম আজাদ ৩০ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯-এর পর থেকে মে মাসের প্রথমভাগ পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৩ লাখ প্রবাসী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। দেশে ফেরার এ পাইপলাইনে আরও অনেকেই আছেন, যার প্রকৃত সংখ্যা আমাদের অজানা।

আমরা এখনও জানি না শুধু কি মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আমাদের শ্রমিকরা ফিরে আসবেন, না পৃথিবীর অন্য অংশ থেকেও ফিরতে হবে তাদের? আমাদের জানা নেই করোনা-পরবর্তী সময়ে জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা অব্যাহত থাকবে কিনা কিংবা করোনা-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় শ্রমশক্তির চাহিদাই বা কী হবে? আমরা কীভাবে প্রস্তুতি নেব ভবিষ্যতের জন্য?

আমাদের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবাসী ১৭৪টি দেশে বসবাস করছেন, যাদের বেশিরভাগই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। আমরা জানি, করোনা কাঁপন ধরিয়েছে সারা বিশ্বে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ; আর বিশ্বব্যাপী এ সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি। এ সংকটের শেষ কোথায় কিংবা তা আমাদের কোন গন্তব্যে নিয়ে যাবে তাও অজানা। সত্য কখনও কখনও গল্পের চেয়েও বেশি অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর কেউ কি কল্পনা করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের মাটিতেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও বেশি নাগরিককে হারাবে? দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় সংক্রমণের ঢেউ আবার আঘাত হানবে কিনা তাও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এটা নিশ্চিত, বেকারত্বের পরিমাণ অভাবনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যার আভাস ইতোমধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। করোনাজনিত লকডাউনে উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলো থমকে গেছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, অনেক দেশই আগামী আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিগুলোতে কর্মরত শ্রমজীবীদের বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করেছে, যা পরে সরকারিভাবে পুনর্ভরণ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার অবশ্য কর্মহীন নাগরিকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার মূলত দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করছে- অনানুষ্ঠানিক খাতে জড়িত ৫০ লাখ কর্মহীন ব্যক্তিকে ২৫০০ টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান এবং ১ কোটি ৫০ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে কর্মরতদের বেতন প্রদানের জন্য নামমাত্র সুদে ৫০০০ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেককে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।

আমরা যদি প্রবাসী শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করি, প্রথমেই চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমিকরা। মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে জ্বালানি তেলের মূল্য উৎপাদন খরচের নিচে নেমে আসা, দুবাইয়ের বাজার বন্ধ থাকা, বিমান পরিবহন কোম্পানি এমিরেটসের যাত্রী পরিবহন কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়া এবং এ বছর হজ অনুষ্ঠানে অনিশ্চয়তা অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। এর সম্মিলিত প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে জনশক্তির চাহিদা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

কৃষি ছাড়া প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় বিপুল সংখ্যায় শিল্প-কারখানা এবং উৎপাদনশীল প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকছে, যেগুলো ভবিষ্যতে দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হতে পারে। কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে করোনা আরও কমপক্ষে ২-৩ বছর স্থায়ী হতে পারে। ফলে করোনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

করোনা-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় অনেক শিল্প-কারখানা চীনের বাইরে স্থানান্তরিত হবে। জাপান ও কোরিয়া ইতোমধ্যে বিনিয়োগের জন্য নতুন স্থান খুঁজতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণে প্রয়োজন হবে নতুন ধরনের গ্যাজেট ও যন্ত্রপাতি। ২০০৭-০৮ সালের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা দ্রুত হ্রাস পেলেও অন্য অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আমরা যেটুকু ধারণা করতে পারছি, নতুন বাস্তবতায় বৈশ্বিক চাহিদা আগের তুলনায় পরিবর্তিত হবে, উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়বে, পুঁজিবাজার পুনঃগঠিত হবে এবং সর্বোপরি নতুন ধরনের উৎপাদন-সংস্কৃতি বিকশিত হবে। আগামীতে স্বাস্থ্যকর্মী, শুশ্রূষাকারী, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা, হিসাব, বিগ-ডাটা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং ব্লক চেন ইত্যাদি ক্ষেত্রে চাকরির বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অন্য বিষয়ের পাশাপাশি ওষুধ শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের গুরুত্ব বাড়বে। আমরা এ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে কতটা প্রস্তুত? কিভাবে প্রবাসীদের ফেরত আসা ঠেকানো যাবে? ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য আমাদের করণীয়ই বা কী? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া কঠিন এবং এ পরিস্থিতির জন্য তৈরি হওয়াও সমভাবে কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।

আমরা বিগত কয়েক বছরে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো শক্তিশালী করেছি। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) ও জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল (এনএইচআরডিএফ) গঠিত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেইপ) এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নানা ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে সরকার-এনজিও-উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নতুন একটি মঞ্চ ‘জেনারেশন আনলিমিটেড’ কাজ শুরু করেছে।

এনএসডিএ এ পর্যন্ত এগ্রো ফুড, সিরামিক্স, কন্সট্রাকশন, ফার্নিচার, ইনফরমাল সেক্টর, আইসিটি, লেদার অ্যান্ড লেদার গুডস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, রেডিমেড গার্মেন্ট অ্যান্ড টেক্সটাইল, টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া ও জুট সেক্টরে মোট ১৩টি শিল্প দক্ষতা পরিষদ (আইএসসি) গঠন করেছে। ইতোমধ্যে শিল্প দক্ষতা পরিষদগুলো শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী ১৯টি কর্ম ও পেশার আদর্শমান (কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ডস, সিএস) এবং বেশকিছু প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি করেছে।

এনএসডিএ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নির্দেশিকা ও পাঠ্যক্রম তৈরি করছে। এ পর্যন্ত মোট ১৬টি প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এনএসডিএ কর্তৃক নিবন্ধিত হয়েছে; আরও ৪৩টি প্রতিষ্ঠানকে কিছুদিনের মধ্যেই নিবন্ধিত করা হবে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে সারা দেশে বর্তমানে মোট ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) কাজ করছে, নির্মাণাধীন রয়েছে আরও ৪০টি টিটিসি। এছাড়াও প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য আরও ৬০টি টিটিসি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজ নির্মাণ, মোটর-ম্যাকানিক, গ্রাফিক ডিজাইন, সিভিল কন্সট্রাকশন, কনজুমার ইলেকট্রনিক্স, তৈরি পোশাক, ওয়েল্ডিং, প্লাস্টিক, ফুড অ্যান্ড ফুড প্রসেসিংসহ মোট ৫৫টি ক্যাটাগরিতে দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। দক্ষতা প্রশিক্ষণের মান ও প্রশিক্ষণ শেষে উপযুক্ত চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, চীন, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ইত্যাদি বেশক’টি দেশের সঙ্গে বিএমইটি অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে।

শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিএমইটি মোট ১৫ লাখ মানুষকে স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি গৃহকর্মীসহ প্রায় ৬ লাখ বিদেশগামী শ্রমিককে কর্মস্থলে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে বিএমইটি বছরে প্রায় ৪.৫৪ লাখ মানুষকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারে। দক্ষতা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দক্ষতা প্রশিক্ষণের আওতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

দেশীয় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদফতর, সমাজসেবা অধিদফতর, সরকারি-বেসরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, ব্র্যাক, ইউসেফসহ বিভিন্ন এনজিও প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি অর্থমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্প ‘স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ (সেইপ) ২০১৪ সালে এর কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ২০২৪ সালের মধ্যে ৯টি অগ্রাধিকার খাতে ৮,৪১,৬৮০ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। সেইপ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।

এ অভিবাসী শ্রমিকদের মিড ও হাই-লেভেল ম্যানেজারিয়াল প্রশিক্ষণ এবং দেশের অভ্যন্তরে আপ-স্কিলিংয়ের ব্যবস্থা করা এ প্রকল্পের অন্যতম কাজ। সেইপ প্রকল্পের ওয়েভিং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ লাভ করেছেন এবং প্রায় প্রত্যেকেই দেশের বাইরে উচ্চ বেতনে কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। এ পর্যন্ত সেইপ প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ ৮০ হাজার জন বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, যার শতকরা ৭২ ভাগেরই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৩০টি কম্পিট্যান্সি স্ট্যান্ডার্ডস, কম্পিট্যান্সি বেজড লার্নিং ম্যাটেরিয়াল (সিবিএলএম) ও এসেসমেন্ট টুলস প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে অর্থ বিভাগের অধীনে একটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল (এনএইচআরডিএফ) গঠন করেছে। এটি দেশে প্রচলিত আইনের অধীনে গঠিত একটি অলাভজনক কোম্পানি হিসেবে কাজ করবে।

কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে শ্রমশক্তির চাহিদার পূর্বাভাস দেয়ার সময় আসেনি এখনও। তবে আমরা অনুমান করতে পারি, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও প্রায় আড়াই ডজন হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে গবেষণা ও উন্নয়ননির্ভর ফার্মাসিউটিক্যালস, স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন, স্বাস্থ্যকর নগর, নার্সিং, কেয়ারগিভার, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কোম্পানি, আইটি, রবোটিকস, ব্লক চেইন, আইওটি ইত্যাদি ক্ষেত্র। ইতোমধ্যে আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে এবং ২০৩০ সালে এ স্থাপনাগুলোয় প্রায় ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা যায়।

উপরের আলোচনায় বিভিন্ন খাতে কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকের বৈশ্বিক চাহিদার উল্লেখ করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে আমাদের দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ চাহিদার একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ বাণিজ্যিক ও শিল্প-কারখানায় কাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় ৭০ হাজার ইলেক্ট্রিশিয়ানের প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেছে। একই সময়ে সড়ক বিভাগ প্রায় ৪ লাখ গাড়িচালক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৫ লাখ নির্মাণ শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে ৬৪০টি বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কারিগরি দুটি বিষয় এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মাধ্যমিক স্তরে স্কুল ও মাদ্রাসায় আবশ্যিক বিষয় হিসেবে কমপক্ষে একটি কারিগরি বিষয় চালুর উদ্যোগ আমাদের আশান্বিত করে। ভবিষ্যতে স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রমে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে, যেন একজন শিক্ষার্থী শ্রমবাজারের চাহিদা ও তার পছন্দ অনুযায়ী কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ পায়।

এটুআই এবং ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে সরকারি-বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে ‘জেনারেশন আনলিমিটেড নামে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এর মূল কাজ হবে ১. অভিবাসী শ্রমিক, ২. শিক্ষানবিশি, ৩. উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ৪. সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী যেমন- কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, ইমাম ও অবহেলিত জনগোষ্ঠী, ৫. চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, ৬. কারিগরি শিক্ষাকে শিক্ষাব্যবস্থার মূলস্রোতে আনা ও ৭. মিড-লেভেল ম্যানেজার তৈরি করা- এ ৭টি ক্ষেত্রে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশের অভ্যন্তরে দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা।

এক হিসাবে দেখা যায়, আনুমানিক ৩ লাখ অভিবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসবেন এবং দেশে ফেরার পাইপলাইনে থাকবেন আরও প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক। অন্য আরেকটি প্রাক্কলন অনুযায়ী, আমাদের দেশে একই সময়ে প্রায় ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অভিবাসী শ্রমিকদের মতো দেশের অভ্যন্তরেও কোভিড-১৯-এর প্রভাবে প্রায় ৩ কোটি লোক জীবিকা অর্জনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষানবিশি নীতি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আগামী ৫ বছরে আনুমানিক ১০ লাখ জনের কর্মসংস্থান করবে। ৮টি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অনলাইনে দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কিছু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে আশা করা যায়। এটুআই এর স্কিলস পোর্টালে (skills.gov.bd) প্রায় ৪ লাখ চাকরিপ্রার্থী এবং ৮০০ কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে। এ পোর্টালটি কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবহারকারীদের রিয়েল-টাইম তথ্য-উপাত্ত প্রদান করবে। ৮০০০ কওমি মাদ্রাসায় দাওরা হাদিস শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

একজন জনশক্তি রফতানি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের মতে ভবিষ্যতে স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়বে, তবে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা আকস্মিকভাবে কমে যাবে না। এ দুটো ক্ষেত্রেই আমাদের চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী, বিশেষত আইসিটি খাতে দক্ষতাসম্পন্নদের চাহিদা ও সুযোগ অনেকগুণ বেড়েছে।

এ মুহূর্তে আমাদের উচিত হবে কোভিড-১৯-পরবর্তী আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি আমাদের দক্ষ শ্রমিক এবং উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের সার্বিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা আমাদের আশাবাদী করে তোলে।

নতুন বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের দ্রুততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। আরও বেশি সংখ্যায় অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং ব্যবহারিক দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রটোকল প্রণয়ন করতে হবে।

জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং মাটিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ (এমডিবিএস) বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান দক্ষতা উন্নয়ন এবং এ কাজে সম্পৃক্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে অর্থায়ন করতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বর্তমানে সেইপ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে; জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যরাও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে লিঙ্গ সমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে এনএসডিএ, সেইপ, বিএমইটিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান এবং এটুআইর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। আমরা জানি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় জনশক্তির চাহিদা নিরূপণে কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চিরায়ত বাজারের পাশাপাশি আমাদের চীন, কম্বোডিয়া, রাশিয়া, জাপান ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। আফ্রিকা মহাদেশ এবং পূর্ব ইউরোপের বহু দেশ তাদের বিপুল পরিমাণ পতিত জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য জনশক্তি আমদানিতে আগ্রহী হতে পারে।

নেহাত জরুরি না হলে প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরে না আসার জন্য আমরা অনুপ্রাণিত করতে পারি। পাশাপাশি যেসব দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অভিবাসী শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, সেসব দেশে কার্যকর জনশক্তি-কূটনীতির প্রসার ঘটাতে পারি। আমাদের উদ্বেগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জোরদার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

অবশ্য আমাদের সব ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনেক অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন। বিএমইটিকে ফেরত আসা শ্রমিকদের রি-স্কিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বিডা, বেপজা, বেজা ও হাইটেক পার্কসহ সব কটি মন্ত্রণালয়কে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে হবে। ব্র্যাক এবং জনশক্তি রফতানিকারক এজেন্সিগুলো ইতোমধ্যে দক্ষতা উন্নয়নের মানসম্মত ব্যবস্থা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আরও বেশিসংখ্যক ট্রেডে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে তাদের এ প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, মানসম্মত প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রম, প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রশিক্ষক এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণে সম্পদের প্রাপ্যতাসহ দক্ষতা উন্নয়নের সব অনুষঙ্গ এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে এবং ২১০০ সালে ‘সোনালী ব-দ্বীপে’ পরিণত করার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এ মুহূর্ত থেকেই আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে শক্তিশালী ও সুবিন্যস্ত করে কোভিড-১৯-পরবর্তী উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।

মো. আবুল কালাম আজাদ : সাবেক মুখ্য সচিব ও সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত