মিঠে কড়া সংলাপ

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ৩০ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলায় মুরব্বিদের মুখে শুনতাম, অসুখ-বিসুখ সবার, আর সাবধানতা যার যার। অর্থাৎ মানুষের জন্য অসুখ-বিসুখ অবধারিত এবং তা থেকে সাবধানতা অবলম্বনসহ তা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে গ্রহণ করা উচিত। আবার, আমার মা বলতেন, ‘মানুষ আপন হলেও অসুখ আপন নয়।’

আজ থেকে ৬০-৬৫ বছর আগে এসব কথা প্রচলনের কারণ ছিল, সে সময়ে কলেরা ও গুটিবসন্ত রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত! বসন্ত রোগের ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ত। আর কলেরা রোগীর বর্জ্যে বসা মাছি রোগটি ছড়িয়ে দিত।

সুতরাং ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে সে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পারলে সে ব্যক্তি বা পরিবারকে তার খেসারত দিতে হতো। আজ এতদিন পরও সেসব কথার যৌক্তিকতা ক্ষুণ্ন হয়নি। বরং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনা নামক যে ব্যাধিটি বিশ্ববাসীকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, তাতে করে সেই পুরনো কথাই নতুন করে বলতে হচ্ছে।

দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ১১ মার্চ। অতঃপর সরকার বিভিন্নভাবে তা মোকাবেলা করে চলেছে। রোগটি ভীষণ ছোঁয়াচে বিধায় লকডাউন ঘোষণার মাধ্যমে জনমানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বেকার-অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা দেয়াসহ সরকারি পর্যায়ে অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষকে খাদ্যসামগ্রীসহ নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে।

তাছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে অনেক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এসব কাজে এগিয়ে এসেছেন, তারাও ত্রাণসামগ্রী বিলি-বণ্টন করেছেন। আবার বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও অসহায় খেটে খাওয়া মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হয়নি; অতি জনসংখ্যার এ দেশে সবাইকে সাহায্য দেয়া সম্ভব হয়নি।

নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও অনেকে হাত পেতে এসব সাহায্য গ্রহণ করতে পারেননি। আবার অনেকে চাইলেও তা পাননি। কারণ আমাদের মতো দেশে এসব ত্রাণসামগ্রী কোনোকালেই সঠিকভাবে বিতরণ করা সম্ভব হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখ বা দল চিনে তা বিতরণ করা হয়েছে! এমনকি এবার দল বা মুখ চিনে বিতরণ না করে সব শ্রেণির অভাবী মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করে মাঠে নামা হলেও সার্বিকভাবে তা সম্ভব হয়নি। কিছুটা হেরফের রয়েই গেছে।

অনেক অভাবী মানুষকে বাদ দিয়ে সচ্ছল আত্মীয়স্বজনের নামে দশ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। প্রকৃত অভাবী ব্যক্তি শত চেষ্টা করেও একটি রেশন কার্ড হাতে পায়নি। অপরদিকে একই পরিবারের তিন-চার সদস্যের নামে সেসব কার্ড বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে! অনেকে আবার তিন-চার জায়গায় পরিচয়পত্র জমা দিয়েও কোনো জায়গা থেকেই ত্রাণ-সাহায্য পায়নি!

রাজনীতি করে খাওয়া একশ্রেণির মানুষের কারণেই এসব ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় সরকারকে অবশেষে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতে হয়েছে! যাক সে কথা। এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি।

দেশে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে অসহায় মানুষকে সহযোগিতা দেয়াসহ দুই মাস লকডাউন করে রাখা হয়েছে। আর এ সময়ে মাঝেমধ্যে কিছুটা ছাড় দিয়ে আবার কড়াকড়ি আরোপ করে এতদিন চালানো হয়েছে! এ সময়কালে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে অনেকে নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে কাজের জন্য রাস্তায় নেমে এসেছেন। অনেককেই বলতে শোনা গেছে, ‘না খেয়ে মরার চেয়ে করোনায় মরব’!

বলা বাহুল্য, অভাবের তাড়নাতেই তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে এসব বলেছেন। কারণ পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা দুঃখ-কষ্টে আছেন। কাজ করে খাওয়া ছাড়া তাদের গতি নেই। কারণ পাঁচ-সাত সদস্যের কোনো পরিবারের পক্ষেই মাসের পর মাস এভাবে ছিটেফোঁটা সরকারি সাহায্যের ওপর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সরকারের কী করা উচিত বা কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত সে বিষয়ে কিছু বলাই আমার আজকের লেখাটির মূল উদ্দেশ্য।

লেখাটি যখন পত্রিকায় পাঠাতে যাব তখনই জানতে পারলাম, সরকার লকডাউন তুলে নিয়ে ৩১ তারিখ থেকে শর্তসাপেক্ষে অফিস-আদালত-দোকানপাট খুলে দিচ্ছে। সীমিত পর্যায়ে গণপরিবহনও চালু করা হচ্ছে। ৩০ তারিখের পর থেকে আর সরকারি ছুটি বাড়ানো হচ্ছে না।

আমি মনে করি, সিদ্ধান্তটি সঠিক ও সুবিবেচিত। কারণ এক্ষেত্রে ঘরে বসে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ভেঙে খাওয়া সক্ষম ব্যক্তিদের সঙ্গে খেটে খাওয়া মানুষের তুলনা করলে চলবে না। আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা আরও কিছুদিন লকডাউন মেনে নিলে বা মেনে চললেও দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের পক্ষে তা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া একনাগাড়ে প্রায় তিন মাস ঘরে বসে কাটানো সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্যই প্রায় অসম্ভব! তাই সরকারি সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী।

এতদিন দীর্ঘসময় সরকারি ছুটি থাকা সত্ত্বেও কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেরই ছুটি বলতে কিছু ছিল না। যেমন পুলিশ বাহিনীকে এ সময়েও নিরলস কাজ করতে হয়েছে। ডাক্তারদের ছুটি বলতে কিছু ছিল না। ব্যাংকারদেরও কাজ করতে হয়েছে। আর এসব করতে তাদের সবাইকে, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপকভাবে করোনায় আক্রান্ত হতে হয়েছে। অনেক সংবাদকর্মীও এ তালিকা থেকে বাদ পড়েননি। আবার ঘরে বসে থাকা অনেকেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

এসব কথা বিবেচনা করে মনে হচ্ছে, ‘সাবধানের মার নেই’- এ দৃষ্টিভঙ্গিতে ধীরেসুস্থে সবকিছু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ করোনাভাইরাস সহজে পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না। আর তাই যদি হয়, তাহলে যার যার অবস্থান থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন মেনে কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া ছাড়া করারই বা কী আছে? একটি দেশ, একটি জাতির জীবন থেকে একটি বছরের চার ভাগের একভাগ সময় তো চলেই গেল।

ধনী দেশের অবস্থাই এক্ষেত্রে যেহেতু ত্রাহি ত্রাহি, তাদের দৃঢ় ও মজবুত অর্থনীতিই যখন মুখ থুবড়ে পড়ছে, সেক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সামলানো একান্ত অপরিহার্য। এ অবস্থায় মানুষের জীবন ও জীবিকা উভয়ই রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ করতে হচ্ছে। করোনা নামক বিষাক্ত সাপকেও মারতে হবে, আবার লাঠিটাও ভাঙা চলবে না! এখন দেখা যাক সরকার এ কাজে কীভাবে কতটা সফল হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকারকে এ কাজে সফল হতে হলে আরও কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। অফিস-আদালত খোলা রাখাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর যেসব অনুমতি দেয়া হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে কেউ নিয়মাচারের ব্যত্যয় ঘটালেই শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারের যেসব বিভাগের লোকজন এতদিন শুয়ে-বসে বেতন গুনেছেন, তাদের শরীরে কিন্তু জং ধরে গেছে!

আমি এ বিষয়ে শুধু একটি বিভাগের কথা উল্লেখ করেই লেখাটি শেষ করব। আর তা হল বিদ্যুৎ বিভাগ। পুলিশসহ আরও কিছু বিভাগ যেখানে নিরলস কাজ করছে, সরকারের ওই বিভাগটি তখন শুয়ে-বসে বিদ্যুৎ বিল বানিয়ে চলেছে! এসব নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদও প্রকাশ পেয়েছে। আবার বিদ্যুৎ বিতরণসহ আনুষঙ্গিক কাজও একইভাবে করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ দেশ ও সরকারের একটি অতি জরুরি এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিভাগ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কষ্ট লাঘবে তারা কতদূর কী করেছে বা করছে সে হিসাবটি করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে মফস্বলের ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা যে অতি আমলাগিরি প্রদর্শন করে দায়িত্ব পালন করছেন তার প্রমাণ আছে। পাবনা পৌর আওয়ামী লীগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি গত দুই মাসের বিদ্যুৎ ভোগান্তির ফিরিস্তি আমার কাছে তুলে ধরায় আমি বিষয়টি জেনে-বুঝে নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করলে আমাকে নিতান্তই আমলা বুঝ দেয়া হল! আমিও নজরদারি শুরু করে দেখলাম, ওই এলাকায় দিনে সাত-আটবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কোনোরূপ ঝড়-বৃষ্টি-বাদল ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না! একটু ঝড়-বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই।

শহরের ভিআইপি এলাকায় সরবরাহ ঠিক থাকলেও আশপাশে এভাবেই বিদ্যুৎ বিতরণে বেহাল দশা । আর এ সময়ে বিষয়টি দেখার কেউ আছে বলেও মনে হয় না। আমাকে এ বিষয়ে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বলেছেন, মফস্বল এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণসহ রক্ষণাবেক্ষণ কাজের খরচের হিসাব নেয়ার ব্যবস্থা করলে এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটত। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলাম। কারণ আমাদের ট্যাক্সের টাকা বিদ্যুৎ বিভাগ অপচয় করছে কিনা সে বিষয়টিও মানুষের জানা দরকার।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বালিশ কেলেঙ্কারি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পর্দা কেলেঙ্কারির মতো এ দুঃসময়ে আড়ালে-আবডালে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে বা অন্য কোথাও সরকারি অর্থ ব্যবহারে হেরফের হচ্ছে কিনা বা ঘোলা পানিতে কেউ মাছ শিকার করছেন কিনা সেসব বিষয়ও দেখা দরকার। এতদিন যেহেতু অনেকটা হাত গুটিয়ে রাখা হয়েছিল, এখন হাত খুলে সব ক্ষেত্রের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোই হবে কাজের কাজ। আর দেশের ১৬ কোটি মানুষ যদি ঘুরে দাঁড়ানোর কাজে সরকারের পাশে থেকে সরকারকে সহযোগিতা করে তাহলে সরকারের পক্ষেও ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত