ঘটনা, রটনা, নাকি বিভ্রান্তি?

  একেএম শামসুদ্দিন ০১ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

১৫ মে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য লুকোচুরির কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, মনগড়া অপপ্রচারের মাধ্যমে সবাইকে বিভ্রান্ত করাই এ মহলটির মূল উদ্দেশ্য। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসল তথ্যকে টুইস্ট করে চারদিকে গুজব ছড়াচ্ছে।

তিনি যোগ করেন, ‘২৪ ঘণ্টার হিসাবে যারাই মারা যাচ্ছেন, ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে সবাই করোনায় মারা গেছে। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর পর টেস্ট করে দেখা যাচ্ছে পজিটিভ এবং নেগেটিভ দুটোই আসছে। এসব মৃত্যু নিয়েও অনেকে মিথ্যাচার করছে।’

ওবায়দুল কাদের একজন সজ্জন ব্যক্তি। সুবক্তাও বটে। দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যিনি একাধারে সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যই নন বরং বাংলাদেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদকও।

তার যে কোনো বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক। তার কথার ওপর শুধু নিজ দলের সমর্থকদেরই আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে কেন? দেশের সাধারণ মানুষও তার কথা বিশ্বাস করতে চায়।

কাজেই তিনি যে গুজব, রটনা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি ইঙ্গিত করে বিভ্রান্তি ও অপতৎপরতার পরিকল্পনার কথা বলেছেন এ দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা তা বিশ্বাস করতে চাই; কিন্তু মুশকিল হল, সরকারের বিভিন্ন দফতর-অধিদফতরের অধিকর্তা এবং মন্ত্রিপরিষদের কোনো কোনো সদস্য করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা শুনে শ্রোতা হিসেবে আমরা যে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাই, সেই বিভ্রান্তি দূর করবে কে? ওবায়দুল কাদের সাহেব করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কথা বলেছেন।

তার কথা অনুসারে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর পর টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ আসে, আবার নেগেটিভও আসে। এখন কথা হল, যেসব মৃত ব্যক্তির রেজাল্ট পজিটিভ আসে, সেই মৃত্যুর সংখ্যা কি টেস্ট রেজাল্টের পরদিন স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ঘোষণা করা হয়? অর্থাৎ করোনায় মৃত্যুর মোট সংখ্যার সঙ্গে কি অন্তর্ভুক্ত করা হয়? যদি অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে তাহলে ব্রিফিংয়ের সময় আলাদাভাবে উল্লেখ করলে আর বিভ্রান্তি থাকে না।

কিন্তু অদ্যাবধি এরূপ ঘোষণা করা হয়েছে সে রকম ঘটনার কথা আমাদের জানা নেই। কাজেই সাধারণ মানুষ যদি স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঘোষিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তাহলে কি খুব বেশি অন্যায় বলা যাবে?

আমরা প্রতিদিনই করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংবাদ শুনতে পাই। কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই এসব মৃত ব্যক্তির করোনা টেস্ট করিয়ে থাকেন। কিন্তু আফসোস, এসব ব্যক্তির টেস্ট রেজাল্ট আজও জনসম্মুখে প্রকাশ করে মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ কর্তৃপক্ষ নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৩ মে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিক করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে এমন একটি গবেষণা প্রতিবেদনের খবর প্রকাশ করেছে।

খবরে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের (সিজিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে করোনা উপসর্গ নিয়ে ৮ মার্চ থেকে ১২ মে পর্যন্ত ৯২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে এ সংখ্যা হয়তো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রশ্ন হল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি কোথাও ঘোষণা করেছে, এ ৯২৯ জন মৃত ব্যক্তির কতজনের করোনা টেস্ট করা হয়েছে এবং কতজনের রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছে? গুণীজনরা বলে গেছেন, বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা না করার অর্থ হল, বিভ্রান্তি ছড়ানোর পথকে আরও সুগম করে দেয়া।

১৫ মে ঢাকার অপর একটি দৈনিক পত্রিকা ১ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই করোনা সন্দেহে ১২১ জনের মৃত্যুর খবর ছাপিয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জন করোনায় সংক্রমিত হয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হাসপাতালের পরিচালক এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতও করেছেন। আমরা জানি ২ এপ্রিল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে করোনা রোগীদের চিকিৎসা শুরু হয়েছে।

হাসপাতালটির পরিচালক বলেছেন, ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১২১ জন। টেস্টের মাধ্যমে ১৮ জন করোনা আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ করোনায় সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন।’

প্রশ্ন হল, ‘কেউ কেউ করোনায় সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন’ বলে হাসপাতালের পরিচালক এমন কথা বলবেন কেন? বার্ন ইউনিট শুধু করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্যই নির্ধারিত এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে আগত রোগীদেরই শুধু ভর্তি করা হয় এ ইউনিটে।

তাহলে তো ভর্তির পরই রোগীর করোনা টেস্ট সম্পন্ন করে চিকিৎসা শুরু করার কথা। এ ক্ষেত্রে পরিচালকের এমন কথা বলার সুযোগ কোথায় যে, ‘মৃত ১২১ জনের মধ্যে কেউ কেউ করোনায় সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন।’ তিনি কিন্তু সব মৃত ব্যক্তির করোনা টেস্ট করানো হয়েছিল কিনা এবং এর মধ্যে কতজনের নেগেটিভ রেজাল্ট এসেছে সে কথা পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। যদি টেস্ট করা হতো এবং নেগেটিভ রেজাল্ট আসত তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, পরিচালক মহোদয় তার বক্তব্যে সে কথা বলতেন এবং পত্রিকার খবরে নিশ্চয়ই তার উল্লেখ থাকত।

উল্লেখ্য, ৫ মে ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা সন্দেহ নিয়ে ভর্তি হওয়া ২৮ জনের আরও একটি মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ৪ জনের করোনা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে তখন জানানো হয়েছিল। বাকি ২৪ জনের মধ্যে অনুরূপভাবে ‘কেউ কেউ করোনা সংক্রমিত থাকতে পারেন’ বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হলেও পরবর্তী সময়ে ওই ২৪ জনের পরীক্ষার ফলাফল আজও আমরা জানতে পারিনি।

খোদ ঢাকার বুকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে দেশের অন্যান্য হাসপাতালের কী পরিস্থিতি তা সহজেই অনুমান করা যায়। পাঠক, করোনা নিয়ে দেশের মানুষ এমনিতেই ভীষণ চিন্তিত ও আতঙ্কিত।

এরূপ পরিস্থিতিতে মানুষ সঠিক তথ্য জানার জন্য আগ্রহী হবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি মৃত ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কী ছিলেন না সে বিষয়ে এমন অস্পষ্ট বক্তব্য দেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে দোষের কিছু দেখি না।

রটনা বা গুজব মানুষকে বিভ্রান্ত করে; কিন্তু কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা, অস্পষ্টতা, সঠিক তথ্যের অভাব সব মিলিয়েও কিন্তু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। চারদিকের এমন অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গুজব ঠিকই তার জায়গা করে নেয়। অর্থাৎ গুজব সৃষ্টি ও ছড়ানোর সুযোগ আমরাই করে দেই। একটা কথা মনে রাখতে হবে, সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ওপর ভর করে কখনও গুজব সৃষ্টি হয় না। গুজব সর্বদাই অর্ধ সত্য বা আংশিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়।

তা না হলে মানুষ গুজব বিশ্বাস করবে কেন? কিছু সঠিক তথ্য যদি মানুষের জানা থাকে, রটনাকারীরা তখন সেই অর্ধ কিংবা আংশিক সত্য তথ্যের সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য সাধন করবে এমন কিছু মনগড়া তথ্য যোগ করে দিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেয় যেন মানুষ বিশ্বাস করে। কিছু সত্য তথ্য যেহেতু জানা আছে, তাই মানুষ মনগড়া বাকি তথ্যগুলোকেও সঠিক বলে মনে করতে চায়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ সত্য তথ্যের অভাবই গুজব সৃষ্টিতে সহায়তা করে। গুজব দু’ভাবে ছড়ায়।

রটনাকারীর মাধ্যমে এবং সাধারণ মানুষের অনুমানের ওপর ভর করে। অনুমানের ওপর ভর করে ছড়ানো গুজব হল, মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো তথ্য গোপন করে কিংবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মানুষকে সঠিক তথ্য জানার অধিকার থেকে যখন বঞ্চিত করা হয়, মানুষ তখন সহজাত প্রবৃত্তি থেকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য অনুমাননির্ভর তথ্য বা ঘটনা বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং তা একজন থেকে দু’জন, দু’জন থেকে চারজন করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে; ফলে গুজবের সৃষ্টি হয়।

করোনা পরিস্থিতিতে লক্ষ করা গেছে, এ উভয় ধরনের গুজবই মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে চোখ রাখলে বোঝা যায়। প্রশ্ন হল, এ গুজব সৃষ্টির জন্য আমরা কাকে দোষী সাব্যস্ত করব? যারা গুজব ছড়ায়, নাকি গুজব সৃষ্টির পথ যারা তৈরি করে দেয়?

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার যথাসাধ্য সব চেষ্টাই করে যাচ্ছে। এ মহাদুর্যোগে নিম্নআয়ের মানুষকে আর্থিক সহায়তাদানের এক মহৎ উদ্যোগও গ্রহণ করেছে; কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ৫০ লাখ পরিবারকে, পরিবার প্রতি ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের শুরুতেই যেন এ মহৎ উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

আর্থিক সহায়তার জন্য প্রকৃত পরিবারের তালিকা তৈরি করা নিয়ে এক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, মোবাইল ফোনের একই সিমের বিপরীতে একাধিক পরিবারের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দুর্নীতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এ তালিকা সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিরাই তৈরি করেছেন। এখন সরকারি দলের অনেক নেতাকে বেশ সন্তুষ্টচিত্তে বলতে শোনা যাচ্ছে, দুর্নীতি হওয়ার আগেই সরকার দুর্নীতি ঠেকিয়ে দিয়েছে। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারেন; কিন্তু তালিকা তৈরিতে যারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সে বিষয় কিন্তু এখনও কোনো স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়নি। সরকারি দল বা সরকার কী বরাবরের মতো দোষী ব্যক্তিদের শুধু বহিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সে বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু না বলায় অপরাধীদের শাস্তির বিষয়ে দেশবাসী এখনও বিভ্রান্তির মধ্যে আছে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত