‘সীমিত’ বাদ দিয়ে বাস্তবতায় আসুন

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ০২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আড়াই মাস লকডাউন শাসনে আমরা নানাভাবে সংকটের মধ্যে আছি। এ ঘরবন্দি জীবনে একরকম মানসিক অবসাদ তৈরি হয়েছে। যদি তা আরও অনির্দিষ্ট থাকে তবে অনেকের মধ্যেই মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হবে।

তা ছাড়া আমাদের মতো দেশ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থবিরতা না কাটাতে পারলে মহাসংকটে পড়তে হবে। যেখানে পুঁজিবাদী বিশ্বের মহারথী দেশগুলো মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়েও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় করে দেখছে, ধীরে ধীরে তুলে দিচ্ছে লকডাউন; সেখানে এসব দেশের আদর্শিক অনুসারী হয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকি কেমন করে! সুতরাং সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। আমরা বীরের জাতি বলে পরীক্ষামূলকভাবে বদ্ধ অর্গল ভেঙে পথে নামা শুরু করেছি করোনা সংকট যখন সবচেয়ে উত্তপ্ত অবস্থায় তখনই। যেন বলতে চাইছি- যুদ্ধই যদি করব তবে সবচেয়ে বড় শত্রুর সঙ্গেই করব।

আসলে সরকার, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ সবাই মাঝ সমুদ্রে হালভাঙা নাবিকের দশায় আছি। কোন বন্দরে বা কেমন বন্দরে নোঙর করব তা কারও কাছে স্পষ্ট নয়। আমরা দিকভ্রান্ত। শুধু আমরা কেন পুরো পৃথিবীর মানুষের একই অবস্থা। আমাদের মতো দেশ তো বটেই, অনেক সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশও ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত। কাগজে দেখলাম ইতোমধ্যে ভারতে ১২ কোটি মানুষ করোনার ছোবল প্রতিক্রিয়ায় বেকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ কি অমন বাস্তবতার বাইরে থাকবে! সরকার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে দেশবাসীর দুর্ভোগ কমানোর। কিন্তু সদিচ্ছা-চেষ্টা এসবের সঙ্গে তো বাস্তবতার মিল থাকতে হবে।

হাত-পা ছেড়ে বসে থাকলে কি অলৌকিক শক্তি এসে আমাদের সংকট থেকে উদ্ধার করবে? মুক্তিযুদ্ধে রক্ত না ঝড়িয়ে চুপচাপ আত্মগোপনে থাকলে কি কেউ ঘরে স্বাধীনতা নিয়ে আসত! তাই জীবনের ঝুঁকি মাথায় রেখে অর্থনীতির গতিসঞ্চারে আমাদের পথে নামতেই হবে। তবে এ সত্যও ভোলা যাবে না জীবিকার দায় এ সময়ে বড় হলেও জীবনের দায়কে তো আর অস্বীকার করা যাবে না। এসবের সঙ্গে আবার সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার রয়েছে।

যদি কার্যত প্রধান বিরোধী দল বলতে বিএনপির কথা বলি তবে দলঅন্তপ্রাণ কর্মী-সমর্থকের বাইরে দলটির এখন আর তেমন জনসম্পৃক্ততা নেই। এ দিক থেকে আওয়ামী লীগ অনেকটা নির্ভার থাকলেও করোনাক্রান্ত পরিবর্তিত অবস্থায় খুব নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে না। বা কৌশল ও শক্তি প্রয়োগ করে সবকিছু অনুকূলে রাখতে পারবে তেমন ভাবাও বাস্তবসম্মত হবে না। একটি মহামারীর মুখে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ভাবাবেগ মানুষকে কমই তাড়িত করবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিকতায় ও দৃঢ়তায় দেশ দৃশ্যত এগিয়ে যাচ্ছিল। তারপরও আমরা বারবার একটি বিষয়ে সতর্ক করছিলাম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দিয়ে অনেক দূর এগোনো খুব কঠিন। রাজনৈতিক তকমা আঁটা দুর্বৃত্তজন, ব্যবসায়ী ও আমলানির্ভর সরকার শেষ পর্যন্ত সংকট তৈরি করবে। বৈষম্যের শিকার অন্য অংশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তো তৈরি হতেই পারে। সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষও হতে পারে সমালোচনামুখর। করোনা যে সংকট তৈরি করেছে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরকার নীতিনির্ধারণে কৌশলী হতে না পারলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিকভাবেই ঘটে যেতে পারে।

এখন সরকারি ঘোষণায় ‘সীমিত’ভাবে শব্দটি কৌতুককর হয়ে উঠেছে। খুব কঠিন একটি সময় আমরা পার করছি। এমনিতেই তো এদেশে দুর্নীতি ও দুর্বল নীতিনির্ধারণের কারণে চিকিৎসাব্যবস্থা নাজুক অবস্থায়। তার মধ্যে করোনা টেস্টের জায়গাটি যথেষ্ট অপর্যাপ্ত ও দুর্বল। এখন প্রতিদিন যে আক্রান্ত আর মৃত্যুর পরিসংখ্যান তাতে আতঙ্কিত হতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন মাসে আরও চরম অবস্থায় পড়তে হবে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা হুহু করে বেড়ে যাবে। এমন একটি অবস্থায় অর্থনীতি সুরক্ষার স্বার্থে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। খুলে দেয়া হচ্ছে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন। বলা হচ্ছে সবকিছুই হবে সীমিত আকারে।

এ শব্দটিই এখন কৌতুকের সৃষ্টি করেছে। হয়তো সত্যিই চেষ্টা হবে নিয়ন্ত্রিতভাবে সব করা; কিন্তু ইতোমধ্যেইতো বিশ্বাসের জায়গাটি দুর্বল হয়ে গেছে। ঈদের আগে বিপণিবিতানগুলো ব্যবসায়ীদের চাপে ‘সীমিত’ভাবে খোলার ঘোষণা হল। বড় শপিংমল ক্রেতার অভাবে এমনিতেই সীমিত হয়ে পড়ল আর এ সুযোগে ছোট মার্কেট আর ফুটপাতের বেচাকেনা অবারিত হল। স্বাস্থ্যবিধি মানার বা মানানোর কোনো চেষ্টা হল না। পোশাক কারখানা ‘সীমিত’ভাবে খোলার কথা হল; কিস্তু সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যে অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হল না। ফলে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকায় গার্মেন্ট কর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে গেল। অমান্যকারীদের ওপর সরকারের ‘কঠোর ব্যবস্থা’ কাগজেই আটকে রইল। কয়েকবার ধরা খেয়ে এবার ঈদের ছুটি ঘোষণা করে বলা হল যার যার অবস্থানে থাকতে।

গণপরিবহন বন্ধ রাখা হল। তাই লুকিয়ে চুড়িয়ে, হেঁটে বা ছোটখাটো বাহনে সরকারি নিষেধাজ্ঞার ভেতরে ‘সীমিত’ভাবেই মানুষ নাড়ির টানে ছুটছিল। অবোধ বাঙালির আচরণ তো ইতোমধ্যে জানাই হয়ে গেছে; কিন্তু ঈদ ঘনিয়ে আসতেই হঠাৎ এ সরকারই অঘোষিত ও অলিখিত কড়াকড়ি শিথিল করে দিল। কী এক অদ্ভুত কারণে গণপরিবহন বন্ধ রেখে ব্যক্তিগত ও ছোট গাড়ি চলা অবমুক্ত করে দেয়া হল। মানুষের স্রোত ছুটল গ্রামের টানে। ফেরি নিয়ন্ত্রণের বদলে ফেরির সংখ্যা বেড়ে গেল। সামাজিক দূরত্ব দূরের কথা- গায়ে গা লাগিয়ে লক্ষ মানুষকে পারাপারের ব্যবস্থা করে দিল প্রকারান্তরে সরকারই। সরকারি এমন আচরণের কারণ স্পষ্ট হল। সম্ভবত অফিস-আদালত, কলকারখানা, বিপণিবিতান, গণপরিবহন খুলে দেয়ার এটি ছিল ট্রায়াল। পরবর্তী ঘোষণার আগে মানুষকে ধাতস্থ করার একটি কৌশল মাত্র।

এভাবে ‘সীমিত’ভাবে শব্দের যেন নতুন পরিভাষা তৈরি হয়ে গেল। তাই করোনা সংক্রমণের এ কঠিন সময়ে দুর্বল স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার বাংলাদেশে অর্থনৈতিক গতিশীলতার স্বার্থে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সরকার। খুলে গেল অফিস-আদালত থেকে শুরু করে সবকিছু। পৃথিবীর অনেক দেশকেই অমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্তে আসা কোনো অন্যায় নয় বলেই আমরা মনে করি। প্রকৃত প্রস্তাবে তথাকথিত ‘সীমিত’ভাবে বিষয়টিকে বজায় রাখা যাবে, পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে এতে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। সরকারের ‘কঠোর ব্যবস্থা’ মুখের কথা হিসেবেই থেকে যাবে। তাহলে কেন এসব শব্দ প্রয়োগ। আর যদি শক্তভাবে সিদ্ধান্ত বজায় রাখা না যায় তাহলে কি সরকারি আদেশ খেলো হয়ে যায় না? মাঝখান থেকে মাঠের কর্মীরা পড়ে বিপাকে।

ঈদের বেশ আগে থেকে লকডাউন মানাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পথে নামানো হল। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসল। করোনার ঝুঁকি নিয়েই দায়িত্ব পালন করতে লাগল পুলিশ বাহিনী। করোনা আক্রান্তও হলেন অনেকে। অনেকে মৃত্যুবরণ করলেন। তারপর এক সময় অদৃশ্য নির্দেশে পুলিশ বাহিনী গুটিয়ে নিলেন নিজেদের। অবাধ বিচরণ চলতে থাকল। আমরা মনে করি এভাবে সবকিছুকে খেলো করে দেয়ার মানে হয় না।

করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হবে। আমরা মরতে মরতেই বাঁচব। এ সত্য মানুষ নিশ্চয়ই মেনে নেবে। তা হলে এতসব রশি টানাটানি কেন! এমন বাস্তবতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখায়ই বা কতটুকু উপকার হবে জানি না। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের পরিবারের অনেকেই নানা পেশাজীবী। কেউ চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ দোকান মালিক বা কর্মচারী। দিন শেষে তারা ঘরে ফিরবেন। শিক্ষার্থীদের লুকাবেন কোথায় তারা? তার চেয়ে মনোযোগ দেয়া উচিত এ যুদ্ধের ময়দানে মানুষকে কতটুকু সুরক্ষা দেয়া যায় সে দিকে। চিকিৎসাব্যবস্থায় গতিসঞ্চার করা।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে জনস্বার্থে কতটা দায়িত্বশীল করতে পারবে তা নিয়ে তো ইউনাইটেড হাসপাতাল সন্দেহের অবকাশ তৈরি করে দিয়েছে। নিজেদের সুরম্য ঘরে অস্পৃশ্য করোনা রোগীদের জায়গা দিয়ে ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটাতে চায়নি। তাই প্রাসাদের বাইরে আটচালা তৈরি করে রোগীদের কষ্ট থেকে চিরতরে রেহাই দিয়েছে। আমাদের সরকারগুলো বরাবরই ধনী-বণিকদের পক্ষে। এদের রক্তবীজ তো সরকার আর রাজনৈতিক দলের মধ্যে বসত করে।

এসব বাস্তবতা মেনে সরকার পরিচালকরা সত্যিই যদি অর্থনীতি ও মানুষকে একইসঙ্গে রক্ষা করতে চান তবে স্বাস্থ্যসুরক্ষায় সরকারের পদক্ষেপের প্রতি মানুষকে আস্থাশীল করে তুলতে হবে। এ কঠিন সময়ে সরকারের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। অনেক উদাহরণের দুটি এখানে উল্লেখ করতে চাই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবরিনা ইসলাম সুইটিকে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় আইসিউর অভাবে বেঘোরে প্রাণ দিতে হল। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার করোনা রোগীদের দাফন করানোয় আত্মনিবেদিত ছিলেন। এ মহৎপ্রাণ মানুষকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক লেখাও হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি ও তার স্ত্রী করোনাক্রান্ত হলেন। স্ত্রীকে আইসিইউতে নেয়া জরুরি; কিন্তু হাসপাতাল বা রাষ্ট্র এ লেখার সময় পর্যন্ত সে সহযোগিতা তাদের দিতে পারেনি।

যেহেতু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জুন মাস করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি; সুতরাং মুখে মুখে ডংকা না বাজিয়ে কঠোর ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যবিধি মান্য করাতে হবে। অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। অল্প দিনেই অবস্থা সঙ্গীন দেখে আবার সব বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তেমন সংকটে যেন আমাদের পড়তে না হয়। তাই বেলা থাকতেই সুরক্ষিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য বলে আমরা মনে করি।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত