অনলাইনে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম

  ড. মো. খোরশেদ আলম ও সুপ্রভাত হালদার ০২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস বৈশ্বিক ও স্থানীয় সব রকমের বাস্তবতায় অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দিল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকেও এখন আর শুধু করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচা বা তার চিকিৎসা নিয়েই নয় বরং ভাবতে হচ্ছে আগামী দিনের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, যোগাযোগ, ব্যবসা, ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে। বাস্তবতা আমাদের চলমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গভীরভাবে ভাবাচ্ছে, যা এখন স্থবির রয়েছে।

যে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছি করোনা দুর্যোগ-প্রসূত পরিস্থিতিতে তা চালু রাখা যাচ্ছে না। কাঠামোগত সক্ষমতা আছে এমন দেশগুলো অনলাইন বা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। এদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদিও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে যেখানে আর্থিক বিবেচনাই মুখ্য বলে মনে হয়।

এ বাস্তবতায় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন শিক্ষা বা ই-লার্নিং পদ্ধতির মাধ্যমেই কেবল শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সাম্প্রতিক নীতি-ভাবনার প্রেক্ষিতে এর সম্ভাবনা আর সমস্যাগুলো নিয়ে নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। অনলাইনে অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের কীভাবে সম্পৃক্ত রাখা যায় তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে অনলাইন জরিপ, অনলাইন ভিডিও ক্লাস ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় আমরা কিছুটা অনুসন্ধান চালিয়েছি।

কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে সমস্যাটির অস্তিত্ব ‘স্বীকার’পূর্বক তার প্রকৃতি, উপাদান, ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা জরুরি। আমাদের অভিজ্ঞতায় আর বর্তমান বাস্তবতায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে সরকার, ইউজিসি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা ও আইটি বিশেষজ্ঞরা মিলে কোনো উপযুক্ত ও অভিন্ন পন্থা উদ্ভাবন করে তাতে সবাইকে যুক্ত করতে পারলে ভালো হয়।

সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো

এক, অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমের পুরোটাই তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক-এর ‘টুলস অ্যান্ড টেকনিকস’ শিক্ষার্থীদের অনেকেরই অজানা, কারণ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গতানুগতিক পদ্ধতিতেই পাঠদান চলে। দুই, অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি ‘দ্বিমুখী আর অংশগ্রহণমূলক’ যা আমাদের নন-প্রাক্টিক্যাল একাডেমিক ডিসিপ্লিনগুলোর শিক্ষা-পদ্ধতিগত চর্চায় অনেকটাই অনুপস্থিত। ন্যূনতম চর্চা ব্যতিরেকেই হঠাৎ চালু করলে অনলাইন শিক্ষার কার্যকারিতা অনিশ্চিত হবে। তিন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন গ্রামে যেখানে ইন্টারনেটের গতি অত্যন্ত মন্থর। কারও কারও হয়তোবা উপযুক্ত ডিজিটাল ডিভাইসও নেই।

এই বাস্তবতায় গড়ে ৩০-৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণে কিছুটা সক্ষম হতে পারে। চার, অনেক শিক্ষার্থীরই উচ্চ মূল্যের ইন্টারনেট ডাটা-প্যাক কেনার সামর্থ্য নেই। ডাটা-প্যাকের মূল্য সাধ্যের মধ্যে না আনলে অনলাইন শিক্ষা-কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। পাঁচ, কোভিড-১৯ তাৎক্ষণিকভাবেই বহু মানুষকে প্রান্তিক করেছে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই অনলাইন শিক্ষা-কার্যক্রমের বাইরে থেকে গেলে তারা একটি ‘সিস্টেম্যাটিক’ বা ‘স্ট্রাকচারাল’ বৈষম্যের শিকার হবে। ছয়, অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অপারগ হলে তারা হীনম্মন্যতা আর হতাশায় ভুগতে পারে এবং তাদের মনে বঞ্চনা ও বৈষম্যের বোধ জাগতে পারে। এতে তারা উদ্যম ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে বিষণ্নতায় ভুগতে পারে।

সাত, প্রচলিত শিক্ষা-পদ্ধতির প্রেক্ষিতে কোনো শিক্ষার্থীর তথ্য-প্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতা না থাকা আর কোনো শিক্ষকের অনুরূপ চর্চা না থাকা তাদের অযোগ্যতা নয়। এটি উচ্চশিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবের ফল। আট, অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ তাড়া দেখা যাচ্ছে। স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে অনলাইন শিক্ষানীতি প্রণয়নে মনে রাখা জরুরি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতি, শিক্ষা কাঠামো, শিক্ষার্থী-প্রেক্ষিত, ইত্যাদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নয়।

এছাড়াও রয়েছে কিছু প্রশাসনিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ, যেমন- পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ইত্যাদি। কলেবর বিবেচনায় সেগুলো এখানে আলোচনা করা যাচ্ছে না।

চলমান পরিস্থিতিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন শিক্ষা বা ই-লার্নিং পদ্ধতি চালু করে একে বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করার তাগিদ দেয়। এতে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি অনেক সম্ভাবনাও রয়েছে, যেমন-

এক. তথ্যপ্রযুক্তির ন্যূনতম ধারণা থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হতে বেগ পেতে হবে না।

দুই. এইচএসসি পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই অনলাইনে সম্পন্ন করে এসেছে বলে শিক্ষার্থীদেরও অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা আছে। অনেকেরই স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও মোবাইল অ্যাপস ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আছে। তাই অনলাইন-শিক্ষা তাদের কাছে একেবারে অচেনা হবে না।

তিন. জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ২০০৮ সাল থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ম্যান্ডেট নিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছে। তাই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করবে বলে আশা করা যায়। ইউজিসিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন) সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে।

চার. করোনার উৎস চীনের উহানে লকডাউন অবস্থায় বিভিন্ন বিশ্ববদ্যালয়ের উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষকের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দেশি-বিদেশি সব শিক্ষার্থীকে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ই-কমার্স কোম্পানি আলিবাবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘Ding Talk ZJU’ নামক একটি অ্যাপ চালু করে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ লাখ মানুষকে যুক্ত করে।

অল্প সময়ের মধ্যে ৩৬৭০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয় এবং অসচ্ছল শিক্ষার্থীদেরকে এই দূরশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করতে বিনিয়োগও করে। ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কম খরচে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা হয়। প্লে-ব্যাক এবং কোর্স ওয়ার প্যাকেজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোনো লেকচারে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও পরবর্তী সময় সহযোগিতা পেতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আমাদের বাস্তবতায় কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

কয়েকদিন আগে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে একটি জরিপ করেছে। জরিপের প্রশ্নমালা দেখে মনে হয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থাকে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক করার একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হয়তো তাদের আগে থেকেই রয়েছে। তবে শিক্ষা-প্রক্রিয়া চলমান রাখতে আমরা স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু প্রস্তাব রাখছি।

প্রথমত, যাদের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা বা Wi-Fi সংযোগ নেই তাদের জন্য সরকারি ব্যবস্থায় মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তি করে খুব স্বল্প মূল্যে ডাটাপ্যাক প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, চাহিদা মোতাবেক কোর্সভিত্তিক পাঠ-সামগ্রীর পিডিএফ ফাইল সংগ্রহ করে একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপেন একসেস দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যান্সডক ও বিডিরেনের মতো প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ক ভূমিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, দ্রুত বিভাগভিত্তিক ওয়েবসাইট খুলে সেখানে একাডেমিক পরিকল্পনা, নোটিশ, সিলেবাস, ক্লাস লেকচার, এসাইনমেন্ট, হোমওয়ার্ক ইত্যাদি প্রদান করা যায়।

চতুর্থত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ সমন্বয়ে একটা কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। পঞ্চমত, অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ (যেমন-ল্যাপটপ/নোটবুক) কিনতে সরকারিভাবে দ্রুত এবং সহজতম প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদেরকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেয়া যায়। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হওয়ার নির্দিষ্ট কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীরা তা পরিশোধ করবে। এমন নয় যে করোনার সংকট শেষ হলে এই বিনিয়োগ অনর্থক হয়ে যাবে। বরং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাদান দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

পরিশেষে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে এবং চলমান কোভিড-১৯ প্রসূত বাস্তবতায় আমাদের অঙ্গীকার হোক উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা আর উদ্ভাবনী গবেষণায় তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা।

ড. মো. খোরশেদ আলম : সহকারী অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

সুপ্রভাত হালদার : সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত