স্বদেশ ভাবনা

কৃষিতে করোনা ও আম্পানের অভিঘাত

  আবদুল লতিফ মন্ডল ০৪ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারীতে যখন দেশের অর্থনীতি প্রায় পর্যুদস্ত, তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোয় তাণ্ডব চালিয়ে পরদিন সকালে নিম্নচাপে পরিণত হয়ে স্থলভাগ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় উপকূলীয় নয় এমন অনেক কয়েকটি জেলায় আঘাত হেনে ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, মাছের ঘের, মুরগির খামার, ফলের বাগানের ব্যাপক ক্ষতি করে।

তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সার্বিক কৃষি খাত (শস্য, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বন উপখাতগুলো নিয়ে গঠিত সার্বিক কৃষি খাত)। এমনিতেই গত এক দশক ধরে সার্বিক কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী।

করোনাভাইরাস ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাত কৃষিতে প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী গতিকে আরও নিম্নমুখী করে তুলবে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ দুই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি পুষিয়ে সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি কীভাবে রোধ এবং উর্ধ্বমুখী করা যায়, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গত দুই অর্থবছরে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশ প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলেও চলতি অর্থবছরে একাধিক কারণে দেশের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এক. চলতি অর্থবছরে আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলেও চাল উৎপাদনে শীর্ষে থাকা বোরোর উৎপাদন মূলত দুটি কারণে লক্ষ্যমাত্রা (২ কোটি ৪ লাখ টন) অর্জনে সক্ষম হবে না। প্রথমত, গত দুই অর্থবছরে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বোরো ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষক এবার কম জমিতে বোরো আবাদ করেছেন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ‘চলতি বোরো মৌসুমে জমি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ হেক্টর কম অর্জিত হয়েছে’; দ্বিতীয়ত, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

তাছাড়া করোনা আতঙ্ক ও দীর্ঘায়িত খরার কারণে এবার আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫-১৫ শতাংশ কমার আশঙ্কা আছে বলে মতপ্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে উপকূলীয় নয় এমন ১৭ জেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে আউশের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। নতুন করে বীজতলা তৈরির সময় না থাকায় বীজের অভাবে আউশের উৎপাদন ব্যাহত হবে। উল্লেখ্য, বছরে আউশের উৎপাদন দাঁড়ায় ২৫-৩০ লাখ টন।

এখন দেখা যাক, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সার্বিক কৃষি খাতসহ অন্য খাতে কী ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবের পর সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে সরকারি হিসাবে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০টির বেশি ব্রিজ-কালভার্ট, কয়েক হাজার কিলোমিটার বাঁধ ও সড়কপথ, অন্তত ৩০ হাজার ঘরবাড়ি, হাজার হাজার গাছপালা এবং ২৩৩টি স্থানীয় সরকার কার্যালয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত।

ক্ষতির মধ্যে রয়েছে দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল, যার মধ্যে বোরো ক্ষেতের পরিমাণ ৪৭ হাজার হেক্টর। কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুতাড়িত জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের মাছ। এর মধ্যে কেবল সাতক্ষীরা জেলায় ৪ হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে।

তাছাড়া, মাছের ঘের ভেসে যায় পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট, হাতিয়াসহ আরও কয়েকটি জেলায়। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় ভেসে যায় আউশের বীজতলা, মুগডাল, মরিচ, আলু, তরমুজ, বাঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্যের মাঠ। মরে যায় খামারের মুরগি। নষ্ট হয় শাকসবজির ক্ষেত।

রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭ হাজার ৩৮৪ হেক্টর জমির আমবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে অনেক পানের বরজ ও কলাবাগান।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বরাবরই ঢাল হয়ে দেশকে আগলে রাখে সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে গাছপালার পাশাপাশি ভেঙেছে বিভিন্ন স্থাপনা ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের অবকাঠামো। বন বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সুন্দরবনের আড়াই কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে।

গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। কৃষিতে উৎপাদনের হার অধিকতর বৃদ্ধির লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে সরকার থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়ার ফলে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৫)।

স্বাধীনতার পর কোনো বছরে এটিই ছিল কৃষিতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এরপর কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে থাকে। ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৭ এবং ৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে নেমে এলেও ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর থেকে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পাচ্ছে।

২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৯, ২ দশমিক ৪১, ১ দশমিক ৪৭, ৩ দশমিক ৮১, ২ দশমিক ৪৫, ১ দশমিক ৭৯ এবং ১ দশমিক ৯৬ শতাংশে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮)।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দাবি করেন, ‘বিগত ১০ বছরে কৃষি খাতে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।’ আর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের হিসাবে ‘বিগত ১০ বছরে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে’ (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০২০)। সাবেক ও বর্তমান দুই অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হল, সার্বিক কৃষি খাতে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে সার্বিক কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হারের অর্ধেক।

এখন প্রশ্ন হল, কীভাবে সার্বিক কৃষি খাতের নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি হার রোধ করে তা ঊর্ধ্বমুখী করা যায়? এজন্য যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. করোনা মহামারী সরকারের নীতিনির্ধারকসহ দেশবাসীকে একটা জিনিস ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, করোনায় দেশের শিল্প খাত, সেবা খাতসহ অন্যান্য খাত স্থবির হয়ে পড়লেও কৃষক করোনাভাইরাসের মধ্যেও কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রেখে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন।

আমরা ভাত, আলুভর্তা এবং সবজি খেয়েও বেঁচে থাকতে পারব। তাই আগামী বাজেটে সার্বিক কৃষি খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করতে হবে। নামমাত্র মূল্যে কৃষককে সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। এজন্য কৃষিতে সাবসিডির পরিমাণ যথেষ্ট বাড়াতে হবে।

দুই. নভেল করোনাভাইরাসের ক্ষয়ক্ষতি কাটাতে সরকার গ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। শস্য ও ফসল ব্যতীত কৃষির অন্যান্য চলতি মূলধন নির্ভরশীল খাতগুলো যথা- হর্টিকালচার অর্থাৎ মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষ, মৎস্য চাষ, পোলট্রি, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ এ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতাভুক্ত হবে। দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মূল ভূমিকা পালনকারী শস্য ও ফসল উপখাতকে এ প্রণোদনা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানেরর আঘাতে বোরো ও আউশের ক্ষতি পূরণে উপর্যুক্ত প্রণোদনার জন্য যাদের পাওয়ার যোগ্য করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে শস্য ও ফসল উৎপাদনকারীদের যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

তিন. দেশে চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আমন। সরকারি তথ্য মোতাবেক, গত অর্থবছরে আমনের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৪০ লাখ টনে; যা ওই অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত মোট চালের ৩৮ শতাংশ।

তবে এ ফসলটির উৎপাদন অনেকটা প্রকৃতি নির্ভরশীল। প্রলয়ঙ্করী বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, খরা ইতাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ ফসলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরের অভাব নেই। দেশে করোনা মহামারীর অবস্থান আগামী ডিসেম্বর বা তার বেশি সময়ের জন্য দীর্ঘায়িত হলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় আমনের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগামী আমন আবাদ থেকে যাতে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়, সেজন্য সরকারের উচিত হবে আমন চাষীদের সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেয়া।

চার. মাছ উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছলেও প্রাণিসম্পদ উপখাতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৫-১৬-২০১৯-২০) বলা হয়েছে, ‘দুধ ও মাংসের ঘাটতি যথাক্রমে ৫৭ ও ৩৭ শতাংশ বলে অনুমিত হয়’।

এ ছাড়া পোলট্রি থেকে ডিম প্রাপ্যতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে বলে এ পরিকল্পনা দলিলে উল্লেখ রয়েছে। তাই এ উপখাতের উন্নয়নে সব প্রচেষ্টা নিতে হবে। পাঁচ. আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বরাবরই ঢাল হয়ে দেশকে আগলে রাখছে সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণসহ এর রক্ষা ও উন্নয়নে সবকিছু করতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, কৃষি এখনও আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জিডিপিতে এর প্রত্যক্ষ অবদান কমে গেলেও জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের যথেষ্ট পরোক্ষ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে বৃহৎ সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিপণন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতের বৃদ্ধিতে কৃষি খাতের অবদান রয়েছে।

করোনার মতো মহামারীতে যখন অন্যসব খাত অকার্যকর হয়ে পড়বে তখন কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। তাই সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী হার রোধ এবং ঊর্ধ্বমুখী করতে আমাদের সম্ভাব্য সব চেষ্টা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব ও কলাম লেখক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ঘূর্ণিঝড় আম্পান

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত