গণপরিবহনে করোনা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা
jugantor
গণপরিবহনে করোনা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

  ড. মো. ইকবাল হোসেন  

১২ জুন ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গণপরিবহন আমাদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। গণপরিবহন ও স্টেশন প্রাঙ্গণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় প্রক্রিয়ায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।

করোনার প্রাদুর্ভাবের পর সংক্রমণ প্রতিরোধে ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী গণপরিবহন বন্ধ ছিল। দীর্ঘসময় পর ১ জুন থেকে কিছু বিধিনিষেধ নিয়ে সীমিতভাবে গণপরিবহন পুনরায় চালু হয়েছে।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চিত্র ভয়াবহ হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা সংক্রমণ নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়াবে।

আবার অনেকে সংক্রমণ রোধে পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তাতেও অসম্পূর্ণতা রয়েছে। গণপরিবহন এড়িয়ে চলার একটি চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। অচিরেই মানুষ নিরুপায় হয়ে হয়তো গণপরিবহনের দিকে ধাবিত হবে।

গণপরিবহনও গতি লাভ করবে। তাই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত গণপরিবহনে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা জরুরি। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের নির্দেশনার আলোকে প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় উপস্থাপন করছি।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো: ১. যাত্রীদের করোনার লক্ষণ-উপসর্গগুলো জানানো। কেউ সংক্রমিত হলে গণপরিবহন ব্যবহার করা উচিত নয়, এ বিষয়টি বোঝানো;

২. বুথ বা কাউন্টারগুলোতে পরিবহন কর্মীদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিরাপদ কাচ বা প্লাস্টিক প্যানেলের পেছনে থাকা;

৩. যানের ভেতরে চালকের জন্য সুরক্ষা দেয়াল বা বেষ্টনী স্থাপন করা, যদি চালকের স্থানটি যাত্রী থেকে ভৌতভাবে পৃথক না হয়ে থাকে;

৪. প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য বিধিনিষেধগুলো যাত্রীদের সুবিধার্থে সম্পূর্ণ স্টেশন প্রাঙ্গণে দৃষ্টি আকর্ষণীভাবে প্রদর্শন করে রাখা;

৫. স্টেশন প্রাঙ্গণ এবং যানের অভ্যন্তরে যাত্রীদের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

যেমন- ব্যস্ত সময়ে যানের সংখ্যা বাড়ানো, যাত্রাপ্রতি সর্বোচ্চ যাত্রী সংখ্যা কমানো, যানে আসন গ্রহণের সময় পেছনের দিক প্রথমে পূর্ণ করা এবং একটি খালি রেখে আসন গ্রহণ করা ইত্যাদি;

৬. কর্মীদের, বিশেষ করে যাদের পক্ষে যাত্রী থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়, তাদের জন্য মাস্ক সহজলভ্য করা;

৭. যানের ভেতরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং ফিল্টারবিহীন এয়ার রিসারকুলেশন থাকলে তা বন্ধ রাখা ও মুক্ত বায়ুপ্রবাহ কার্যকর করা;

৮. যানের বাইরে হাতধোয়ার ব্যবস্থা রাখা এবং ভেতরে স্যানিটাইজার রাখা। প্রয়োজনীয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কোনো কারণে সম্ভব না হলে যাত্রীদের মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা।

যান-স্টেশনের বিভিন্ন অংশের পৃষ্ঠতল ভাইরাসবাহী ড্রপলেটস (জলকণা) ও অ্যারোসল (সূক্ষ্মকণা) দ্বারা সহজেই দূষিত হতে পারে। চীনা গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ২৫-২৭ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা এবং ৩০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় করোনাভাইরাস প্লাস্টিক, স্টেইনলেস স্টিল, গ্লাস, সিরামিক, সার্জিক্যাল মাস্ক ও ল্যাটেক্স গ্লাভসজাতীয় পদার্থে ৭ দিন, কটন ফ্যাব্রিকে ৪ দিন, এবং কাঠে ৫ দিন সক্রিয় থাকতে সক্ষম।

কাজেই বিভিন্ন সময়ে এসব দূষিত পৃষ্ঠতলের সংস্পর্শে যাত্রী ও কর্মী পরোক্ষভাবে করোনা সংক্রমিত হতে পারে। সুতরাং সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে পৃষ্ঠতলের জন্য একটি আবশ্যকীয় নিয়মিত ক্লিনিং (পরিষ্কার) ও ডিস্ইনফেকশন (জীবাণুনাশ) ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশবিশেষ।

সাধারণভাবে কোনো বস্তুর পৃষ্ঠতল থেকে জীবাণু, ময়লা দ্রব্য ও অন্যান্য বহিরাগত দ্রব্য দূরীকরণ প্রক্রিয়াকে ক্লিনিং বলা হয়। অপরদিকে, পৃষ্ঠতলে উপস্থিত জীবাণু যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় (মেরে ফেলা) করাকে বলা হয় ডিস্ইনফেকশন।

পৃষ্ঠতলে বিদ্যমান ময়লা দ্রব্য জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করতে বাধা সৃষ্টি করে। তাই অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ডিস্ইনফেকশনের জন্য প্রথমে ক্লিনিং প্রক্রিয়ায় পৃষ্ঠতল থেকে ময়লা দ্রব্য দূর করে নিতে হয়। আবার শক্তিশালী রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশন একত্রেও সম্পন্ন করা যায়।

মনে রাখতে হবে, ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশন কারিগরি বিষয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নির্ধারিত কর্মী দল দিয়েই নিয়মিতভাবে তা সম্পন্ন হতে হবে।

একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মপরিধি ও প্রক্রিয়া থাকতে হবে। স্টেশন ও যানের ঘনঘন স্পর্শ হওয়া বস্তু বা পৃষ্ঠতলগুলো অবশ্যই নিয়মিত ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশনের আয়ত্তে থাকতে হবে। ঘনঘন স্পর্শ হওয়ার মতো স্থানগুলো- যানের আসন, বেন্ডিং-এলিভেটর বাটন ও সব হাত রাখার স্থান; যানের মেঝে; যানের সম্পূর্ণ প্রবেশদ্বার ও আনুষঙ্গিক পৃষ্ঠতল; প্রবেশ সিঁড়ি, হাতল ও ভাড়া বা টিকিট সংগ্রহ বাক্স; সুইচ; চেয়ার-টেবিল; ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের হাতল; ডেস্ক-কাউন্টার; বাথরুমের প্রবেশদ্বার-হাতল ও কল/ট্যাপ; টেলিফোন ও কম্পিউটার কি-বোর্ড ইত্যাদি।

ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশন কর্মীদের যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পরিধান করতে হবে। ক্লিনিং ধাপ প্রথমে থাকবে, যার লক্ষ্য হবে ডিস্ইনফেকশনকে কার্যকর করতে পৃষ্ঠতল থেকে ময়লা দ্রব্য দূর করা। তবে এ প্রক্রিয়ায় জীবাণুও স্থানান্তরিত হতে পারে, যা দ্বারা আবার অদূষিত স্থানও দূষিত হতে পারে।

তাই সম্পূর্ণ ক্লিনিং প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হতে হয়। ক্লিনিং বর্জ্য জীবাণু ধারণ করতে পারে এবং তা সঠিকভাবে পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। স্থানগুলো ময়লামুক্ত হলে ক্লিনিং এড়িয়ে সরাসরি ডিস্ইনফেকশন শুরু করা যায়।

সঠিক ডিসইনফেক্ট্যান্ট (জীবাণুনাশক) নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) কর্তৃক নিবন্ধিত বেশকিছু কার্যকর ডিসইনফেক্ট্যান্ট রয়েছে। SARS-Cov-2 ভাইরাসের জন্য নির্ধারিত ডিসইনফেক্ট্যান্ট প্রথমে বিবেচনায় নিতে হবে।

যদি তা সহজলভ্য না হয়, Rhinovirus বা Human Coronavirus-এর ডিসইনফেক্ট্যান্ট নির্বাচন করা যায়। নিবন্ধিত ডিসইনফেক্ট্যান্ট ব্যবহার করাই উত্তম। তবে এসব ডিসইনফেক্ট্যান্টের প্রাপ্যতা ও দাম একটি ইস্যু হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প কিছু সুযোগ রয়েছে।

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত সহজলভ্য একটি রাসায়নিক। নিষ্প্রাণ পৃষ্ঠতলে Human Coronavirus নিষ্ক্রিয় করতে এটি স্বীকৃত। দাম ও সহজলভ্যতার বিবেচনায় ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণও ব্যবহার করা যায়। এই দ্রবণ প্রয়োজনীয় ঘনমাত্রার হলে তা কার্যকর হয়। শতকরা ২ ভাগ ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণ ব্যবহারের বিষয়টি নিউয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের নির্দেশনায় রয়েছে।

তবে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল শতকরা ০.০৫-০.১ ভাগ দ্রবণ ব্যবহারের বিষয়ে বলেছে। ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণ কোনো পৃষ্ঠতলের জন্য ক্ষতিকর হলে তা ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

মনে রাখা জরুরি, ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। তাই ব্যবহারের কিছু সময় (৩০ মিনিট) আগেই এই দ্রবণ বানিয়ে নেয়া শ্রেয়। একদিনের পুরাতন দ্রবণ পরিত্যাগ করা উচিত।

ডিস্ইনফেকশন প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক বিষয় জানতে হবে। বৈজ্ঞানিকভাবে এ প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে বিভক্ত- ১. ডিসইনফেক্ট্যান্ট সম্পূর্ণ পৃষ্ঠতলজুড়ে প্রয়োগ করা; ২. জীবাণু নিষ্ক্রিয় করতে প্রয়োগকৃত ডিসইনফেক্ট্যান্টকে প্রয়োজনীয় একটি সময় দেয়া; ৩. সবশেষে পৃষ্ঠতলকে নিরপেক্ষ তরল দিয়ে মুছে ফেলা। ১ম ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে ২য় ধাপে অবশ্যই প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে।

সুতরাং কার্যকর ডিসইনফেক্শনের জন্য সঠিক ডিসইনফেক্ট্যান্ট নির্বাচন, প্রয়োজনীয় ঘনমাত্রার ব্যবহার, পৃষ্ঠতলজুড়ে প্রয়োগ ও জীবাণু নিষ্ক্রিয়ের জন্য নির্ধারিত সময় দেয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। ডিস্ইনফেকশন প্রক্রিয়ার বর্জ্য অবশ্যই যথাযথভাবে পরিত্যাগ করতে হবে।

পরিশেষে বলব, আমাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। নিয়মিত কার্যক্রমে আমাদের ফিরতে হবে। গণপরিবহন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম, এটা এড়িয়ে চলা বেশিদিন হয়তো সম্ভব হবে না। তাই যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গণপরিবহনে সংক্রমণ ঝুঁকি কমিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।

ড. মো. ইকবাল হোসেন : সহযোগী অধ্যাপক, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট

[email protected]

গণপরিবহনে করোনা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

 ড. মো. ইকবাল হোসেন 
১২ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গণপরিবহন আমাদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। গণপরিবহন ও স্টেশন প্রাঙ্গণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় প্রক্রিয়ায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
 

করোনার প্রাদুর্ভাবের পর সংক্রমণ প্রতিরোধে ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী গণপরিবহন বন্ধ ছিল। দীর্ঘসময় পর ১ জুন থেকে কিছু বিধিনিষেধ নিয়ে সীমিতভাবে গণপরিবহন পুনরায় চালু হয়েছে।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চিত্র ভয়াবহ হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা সংক্রমণ নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়াবে।
 

আবার অনেকে সংক্রমণ রোধে পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তাতেও অসম্পূর্ণতা রয়েছে। গণপরিবহন এড়িয়ে চলার একটি চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। অচিরেই মানুষ নিরুপায় হয়ে হয়তো গণপরিবহনের দিকে ধাবিত হবে।

গণপরিবহনও গতি লাভ করবে। তাই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত গণপরিবহনে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা জরুরি। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের নির্দেশনার আলোকে প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় উপস্থাপন করছি।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো: ১. যাত্রীদের করোনার লক্ষণ-উপসর্গগুলো জানানো। কেউ সংক্রমিত হলে গণপরিবহন ব্যবহার করা উচিত নয়, এ বিষয়টি বোঝানো;

২. বুথ বা কাউন্টারগুলোতে পরিবহন কর্মীদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিরাপদ কাচ বা প্লাস্টিক প্যানেলের পেছনে থাকা;

৩. যানের ভেতরে চালকের জন্য সুরক্ষা দেয়াল বা বেষ্টনী স্থাপন করা, যদি চালকের স্থানটি যাত্রী থেকে ভৌতভাবে পৃথক না হয়ে থাকে;

৪. প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য বিধিনিষেধগুলো যাত্রীদের সুবিধার্থে সম্পূর্ণ স্টেশন প্রাঙ্গণে দৃষ্টি আকর্ষণীভাবে প্রদর্শন করে রাখা;

৫. স্টেশন প্রাঙ্গণ এবং যানের অভ্যন্তরে যাত্রীদের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

যেমন- ব্যস্ত সময়ে যানের সংখ্যা বাড়ানো, যাত্রাপ্রতি সর্বোচ্চ যাত্রী সংখ্যা কমানো, যানে আসন গ্রহণের সময় পেছনের দিক প্রথমে পূর্ণ করা এবং একটি খালি রেখে আসন গ্রহণ করা ইত্যাদি;

৬. কর্মীদের, বিশেষ করে যাদের পক্ষে যাত্রী থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়, তাদের জন্য মাস্ক সহজলভ্য করা;

৭. যানের ভেতরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং ফিল্টারবিহীন এয়ার রিসারকুলেশন থাকলে তা বন্ধ রাখা ও মুক্ত বায়ুপ্রবাহ কার্যকর করা;

৮. যানের বাইরে হাতধোয়ার ব্যবস্থা রাখা এবং ভেতরে স্যানিটাইজার রাখা। প্রয়োজনীয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কোনো কারণে সম্ভব না হলে যাত্রীদের মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা।

যান-স্টেশনের বিভিন্ন অংশের পৃষ্ঠতল ভাইরাসবাহী ড্রপলেটস (জলকণা) ও অ্যারোসল (সূক্ষ্মকণা) দ্বারা সহজেই দূষিত হতে পারে। চীনা গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ২৫-২৭ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা এবং ৩০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় করোনাভাইরাস প্লাস্টিক, স্টেইনলেস স্টিল, গ্লাস, সিরামিক, সার্জিক্যাল মাস্ক ও ল্যাটেক্স গ্লাভসজাতীয় পদার্থে ৭ দিন, কটন ফ্যাব্রিকে ৪ দিন, এবং কাঠে ৫ দিন সক্রিয় থাকতে সক্ষম।

কাজেই বিভিন্ন সময়ে এসব দূষিত পৃষ্ঠতলের সংস্পর্শে যাত্রী ও কর্মী পরোক্ষভাবে করোনা সংক্রমিত হতে পারে। সুতরাং সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে পৃষ্ঠতলের জন্য একটি আবশ্যকীয় নিয়মিত ক্লিনিং (পরিষ্কার) ও ডিস্ইনফেকশন (জীবাণুনাশ) ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশবিশেষ।

সাধারণভাবে কোনো বস্তুর পৃষ্ঠতল থেকে জীবাণু, ময়লা দ্রব্য ও অন্যান্য বহিরাগত দ্রব্য দূরীকরণ প্রক্রিয়াকে ক্লিনিং বলা হয়। অপরদিকে, পৃষ্ঠতলে উপস্থিত জীবাণু যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রটোজোয়া নিষ্ক্রিয় (মেরে ফেলা) করাকে বলা হয় ডিস্ইনফেকশন।

পৃষ্ঠতলে বিদ্যমান ময়লা দ্রব্য জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করতে বাধা সৃষ্টি করে। তাই অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ডিস্ইনফেকশনের জন্য প্রথমে ক্লিনিং প্রক্রিয়ায় পৃষ্ঠতল থেকে ময়লা দ্রব্য দূর করে নিতে হয়। আবার শক্তিশালী রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশন একত্রেও সম্পন্ন করা যায়।

মনে রাখতে হবে, ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশন কারিগরি বিষয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নির্ধারিত কর্মী দল দিয়েই নিয়মিতভাবে তা সম্পন্ন হতে হবে।

একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মপরিধি ও প্রক্রিয়া থাকতে হবে। স্টেশন ও যানের ঘনঘন স্পর্শ হওয়া বস্তু বা পৃষ্ঠতলগুলো অবশ্যই নিয়মিত ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশনের আয়ত্তে থাকতে হবে। ঘনঘন স্পর্শ হওয়ার মতো স্থানগুলো- যানের আসন, বেন্ডিং-এলিভেটর বাটন ও সব হাত রাখার স্থান; যানের মেঝে; যানের সম্পূর্ণ প্রবেশদ্বার ও আনুষঙ্গিক পৃষ্ঠতল; প্রবেশ সিঁড়ি, হাতল ও ভাড়া বা টিকিট সংগ্রহ বাক্স; সুইচ; চেয়ার-টেবিল; ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের হাতল; ডেস্ক-কাউন্টার; বাথরুমের প্রবেশদ্বার-হাতল ও কল/ট্যাপ; টেলিফোন ও কম্পিউটার কি-বোর্ড ইত্যাদি।

ক্লিনিং ও ডিস্ইনফেকশন কর্মীদের যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পরিধান করতে হবে। ক্লিনিং ধাপ প্রথমে থাকবে, যার লক্ষ্য হবে ডিস্ইনফেকশনকে কার্যকর করতে পৃষ্ঠতল থেকে ময়লা দ্রব্য দূর করা। তবে এ প্রক্রিয়ায় জীবাণুও স্থানান্তরিত হতে পারে, যা দ্বারা আবার অদূষিত স্থানও দূষিত হতে পারে।

তাই সম্পূর্ণ ক্লিনিং প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হতে হয়। ক্লিনিং বর্জ্য জীবাণু ধারণ করতে পারে এবং তা সঠিকভাবে পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। স্থানগুলো ময়লামুক্ত হলে ক্লিনিং এড়িয়ে সরাসরি ডিস্ইনফেকশন শুরু করা যায়।

সঠিক ডিসইনফেক্ট্যান্ট (জীবাণুনাশক) নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) কর্তৃক নিবন্ধিত বেশকিছু কার্যকর ডিসইনফেক্ট্যান্ট রয়েছে। SARS-Cov-2 ভাইরাসের জন্য নির্ধারিত ডিসইনফেক্ট্যান্ট প্রথমে বিবেচনায় নিতে হবে।

যদি তা সহজলভ্য না হয়, Rhinovirus বা Human Coronavirus-এর ডিসইনফেক্ট্যান্ট নির্বাচন করা যায়। নিবন্ধিত ডিসইনফেক্ট্যান্ট ব্যবহার করাই উত্তম। তবে এসব ডিসইনফেক্ট্যান্টের প্রাপ্যতা ও দাম একটি ইস্যু হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প কিছু সুযোগ রয়েছে।

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত সহজলভ্য একটি রাসায়নিক। নিষ্প্রাণ পৃষ্ঠতলে Human Coronavirus নিষ্ক্রিয় করতে এটি স্বীকৃত। দাম ও সহজলভ্যতার বিবেচনায় ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণও ব্যবহার করা যায়। এই দ্রবণ প্রয়োজনীয় ঘনমাত্রার হলে তা কার্যকর হয়। শতকরা ২ ভাগ ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণ ব্যবহারের বিষয়টি নিউয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের নির্দেশনায় রয়েছে।

তবে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল শতকরা ০.০৫-০.১ ভাগ দ্রবণ ব্যবহারের বিষয়ে বলেছে। ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণ কোনো পৃষ্ঠতলের জন্য ক্ষতিকর হলে তা ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

মনে রাখা জরুরি, ক্লোরিন ব্লিচ দ্রবণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। তাই ব্যবহারের কিছু সময় (৩০ মিনিট) আগেই এই দ্রবণ বানিয়ে নেয়া শ্রেয়। একদিনের পুরাতন দ্রবণ পরিত্যাগ করা উচিত।

ডিস্ইনফেকশন প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক বিষয় জানতে হবে। বৈজ্ঞানিকভাবে এ প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে বিভক্ত- ১. ডিসইনফেক্ট্যান্ট সম্পূর্ণ পৃষ্ঠতলজুড়ে প্রয়োগ করা; ২. জীবাণু নিষ্ক্রিয় করতে প্রয়োগকৃত ডিসইনফেক্ট্যান্টকে প্রয়োজনীয় একটি সময় দেয়া; ৩. সবশেষে পৃষ্ঠতলকে নিরপেক্ষ তরল দিয়ে মুছে ফেলা। ১ম ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে ২য় ধাপে অবশ্যই প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে।

সুতরাং কার্যকর ডিসইনফেক্শনের জন্য সঠিক ডিসইনফেক্ট্যান্ট নির্বাচন, প্রয়োজনীয় ঘনমাত্রার ব্যবহার, পৃষ্ঠতলজুড়ে প্রয়োগ ও জীবাণু নিষ্ক্রিয়ের জন্য নির্ধারিত সময় দেয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। ডিস্ইনফেকশন প্রক্রিয়ার বর্জ্য অবশ্যই যথাযথভাবে পরিত্যাগ করতে হবে।

পরিশেষে বলব, আমাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। নিয়মিত কার্যক্রমে আমাদের ফিরতে হবে। গণপরিবহন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম, এটা এড়িয়ে চলা বেশিদিন হয়তো সম্ভব হবে না। তাই যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গণপরিবহনে সংক্রমণ ঝুঁকি কমিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।

ড. মো. ইকবাল হোসেন : সহযোগী অধ্যাপক, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট

[email protected]