পাহাড়ধসের মৌসুম এখন

  মো. ইকবাল সরোয়ার ০৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসছে বর্ষা, বাড়ছে পাহাড়ধসের আশঙ্কা। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসজনিত মৃত্যু একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী কয়েক লাখ মানুষের আতঙ্ক বাড়ে।

তিন বছর আগে ২০১৭ সালের জুন মাসের ভয়াবহ পাহাড়ধসে রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলে মৃত্যবরণ করে ১৬৪ জন। এর মধ্যে শুধু রাঙ্গামাটি সদরেই মৃত্যবরণ করে ৫ সেনাসদস্যসহ ১২০ জন। বাংলাদেশে পাহাড়ধসের ইতিহাসে এরকম ভয়াবহ বিপর্যয় আর কখনও হয়নি।

মূলত নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়কাটা ও পাহাড়ধসের ঘটনা এবং একইসঙ্গে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১১ জুন ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪০৮ মিমি. বৃষ্টিপাতে মহানগরীর ৬টি স্থানে একসঙ্গে পাহাড়ধসে ১২৭ জন মৃত্যুবরণ করে।

এজন্য সরকারিভাবে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পাহাড়ধসের জন্য ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে পাহাড়ধস প্রতিরোধে ৩৬টি সুপারিশ প্রদান করে।

মূলত যেখানেই পাহাড় বা পাশাপাশি দুই ভূমির উচ্চতায় পার্থক্য থাকে, সেখানে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থান এবং অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পাললিক শিলার পাহাড়ে ধসের প্রবণতা বেশি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলো বালি মাটির যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে সহজেই দুর্বল হয়ে ধসে পড়ে।

কারণ বৃহত্তম চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বর্ষা মৌসুমের প্রথম কয়েকদিনের বৃষ্টিতে মাটিগুলো নরম হয়ে যায়, পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে পাহাড়ের ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করে পাহাড়ের অভ্যন্তরে চাপ ও ওজন বৃদ্ধি করে পরবর্তী সময়ে ধসে পড়ে।

তাছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়ধসে প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে যুক্ত থাকে কিছু মানবসৃষ্ট কারণও; যেমন- পাহাড় কাটা, বন উজাড়, পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপন ইত্যাদি। চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ৩০০ মিমি.র অধিক বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়। ঘনঘন ভূমিকম্প, পাহাড় কাটা ও বর্ষাকালের অতিবর্ষণ চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ধসের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৬৮ সালে কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা সড়কে প্রথম পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে, যদিও এতে কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৯০ সাল-পরবর্তী সময় থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসজনিত ক্ষয়ক্ষতি একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৬৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাহাড়ধসের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এ অঞ্চলে অধিকাংশ সময় পাহাড়ধস হয়েছে জুন-জুলাই (অর্থাৎ বর্ষাকালে) মাসে। চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বছরে প্রায় ৩০০০ মিমি. বৃষ্টিপাত হয়। এর মধ্যে জুন-জুলাই মাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়।

সাধারণত এ দুই মাসে প্রতিদিন গড়ে ২০ মিমি. করে মাসিক ৬০০ মিমি. বর্ষণ হয়। গত কয়েক বছরের পাহাড়ধসের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাহাড়ধসের সময় (জুন-জুলাই) গড় বৃষ্টিপাত থেকে সবসময় অধিক বৃষ্টি হয়েছে। যেমন- স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দুটি পাহাড়ধসের সময় ২০০৭ ও ২০১৭ সালে ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪২৫ মিমি. ও ৩৪১ মিমি.।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয় গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ শতাংশ। পূর্ববর্তী এক গবেষণায় দেখা যায়, স্বল্পকালীন (২ থেকে ৭ দিন) সময়ে দৈনিক ৪০ মিমি.র অধিক বৃষ্টিপাত পাহাড়ধসের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া মূলত বন উজাড়, পাহাড় কেটে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা তৈরি ও পাহাড়ের ঢালে জনবসতি ইত্যাদির সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি যোগ হয়ে চট্টগ্রামে পাহাড়ধস হয়ে থাকে।

পাহাড়গুলো প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরী ও এর আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পাহাড় নির্বিচারে কেটে বিনষ্ট করা হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। পাহাড় কাটার মাটি দিয়ে শহরের বিভিন্ন জলাশয় ভরাট, জমি ভরাট করে আবাসন প্রকল্প তৈরি, ইটভাটা, সড়ক যোগাযোগ নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহার করা হয়।

গত কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীর সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকাধীন পাহাড় ব্যাপকভাবে কাটা হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত হাজারো মানুষ পাহাড়ধসজনিত হতাহতের ঝুঁকিতে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড় কাটা ও পাহাড়ধসজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ি ভূমির ঢাল বৃদ্ধি পায়, মাটির বুনট হ্রাস পায়, গাছপালা নষ্ট হয় এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে দ্রুত প্রবেশ করে। যেসব পাহাড় খাড়াভাবে কাটা হয় সেসব পাহাড়ে ধসের ঝুঁকির মাত্রাও বেশি থাকে।

পরিবেশ অধিদফতরের হিসাবে চট্টগ্রাম ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে ৩০টি। এ পাহাড়গুলো বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতিসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। চট্টগ্রামে পাহাড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে। এখানে প্রায় ১২ হাজার পরিবারে ৬০-৭০ হাজার মানুষের বসবাস করে। এছাড়া মতিঝরনাসহ নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ে অনেক মানুষ বসবাস করে।

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর, জঙ্গল লতিপপুর এবং জালালাবাদসহ অধিকাংশ পাহাড়ে সারা বছরই কোনো না কোনো কৌশল অবলম্বন করে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে পাহাড় কাটা হয়। বিশেষ করে করোনাভাইরাসজনিত সাধারণ ছুটির সময় প্রায় ১২টি বিভিন্ন পাহাড়ে দখলকারীরা ৪০০-এর বেশি অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে চট্টগ্রামের ৮৮টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে।

এ সময় আরও ৯৫টি পাহাড়কে সময়ে সময়ে বিভিন্ন অংশে কাটা হয়। এর পরবর্তী ১২ বছরে পাহাড় কাটার মাত্রা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি সিডিএ পাহাড় কেটে বায়েজিদ হয়ে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৬ কিমি. সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে। এ পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম সিডিএকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা করে। পরবর্তী সময়ে এ সড়কের পাশ ধরে ব্যাপক আকারে পাহাড় কাটা শুরু হয়।

মূলত করোনাকালীন সাধারণ ছুটির এপ্রিল-মে মাসে পাহাড় কেটে প্রায় ৪০০টি ঘর তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২৪ জুন ২০২০ পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি সিদ্বান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর ও রেলওয়ে যৌথ অভিযান চালিয়ে ১৬টি পাহাড় কেটে গড়ে তোলা ৩৫০টি অবৈধ ঘর ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী ও আমার এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে শুধু খুলশী ও নাসিরাবাদ এলাকায় পাহাড় কমেছে ৫.২৩ শতাংশ। এর মধ্যে ২.৬২ শতাংশ এলাকায় নির্মিত হয়েছে ঘরবাড়ি; বাকি ২.৬১ শতাংশ এলাকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, অতিবৃষ্টি, পাহাড় কাটা ও বন উজাড় করার ফলে বৃষ্টির পানি সহজে মাটিতে প্রবেশ করে পাহাড়ি মাটির বুনটকে দুর্বল করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি করে।

যখানে পাহাড় আছে সেখানে কম-বেশি পাহাড়ধসের আশঙ্কা থেকেই যায়। পাহাড়ধস কখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, তবে আমরা যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করি তাহলে পাহাড়ধসের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব। এজন্য নিুোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে- ১. পাহাড়ি এলাকায় পানি চলাচলের পথ সবসময় নির্বিঘ্ন রাখতে হবে এবং বৃষ্টির পানি যাতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুত সময়ে নেমে যেতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে।

২. যে কোনো ধরনের পাহাড় কাটা এবং বন উজাড় সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে সবুজের আচ্ছাদন বৃদ্ধি করতে হবে। ৩. পাহাড়ধসজনিত দুর্যোগ বিষয়াবলী জাতীয় দুর্যোগ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করে পূর্বাভাস দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৪. প্রকৌশল-ভূতাত্ত্বিক-ভূগোল ও পরিবেশবিদ- এমন বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি টিম গঠন করে নিয়মিত মনিটর করতে হবে। পাহাড়ধসজনিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে। ৫. সড়কজাল বা নেট দিয়ে পাহাড়ের ঢাল রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে, পাহাড়ের ঢালে ও রাস্তার পাশে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সবসময় সচল রেখে প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে।

৬. ভূমি ব্যবহার নীতিমালার আলোকে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট জলাধার ও সিল্ট ট্র্যাপ তৈরি করে নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। ৭. পাহাড়ধস রোধে বিভিন্ন তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো আন্তঃমন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে। ৮. সর্বোপরি টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

মো. ইকবাল সরোয়ার : সহযোগী অধ্যাপক, ভূূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত