পাট শিল্পে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক

  ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী সরকার পরিচালিত পাটকলগুলোর শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক বা অবসায়নের ঘোষণা দিয়েছেন, যার ফলে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমজীবী মানুষ এককালীন অর্থের বিনিময়ে চাকরিচ্যুত হবেন।

মন্ত্রীর ঘোষণা মোতাবেক, ২০১৪ সাল থেকে অবসরে যাওয়া ৮ হাজার ৯৫৪ জন শ্রমিক ও বর্তমানে কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের প্রাপ্য সব বকেয়া ও শ্রমিকের পিএফ খাতের জমা, গ্র্যাচুইটি এবং সেসঙ্গে গ্র্যাচুইটির ওপর ২৭ শতাংশ হারে অধিক সুবিধা একসঙ্গে প্রদানের শর্তে এ অবসায়ন বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য মন্ত্রণালয় ৬ হাজার কোটি টাকা দাবি করলেও তজ্জন্য বরাদ্দ আসছে ৫০০০ কোটি টাকা।

মন্ত্রী আরও বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা মোতাবেক মিলগুলো আধুনিকায়ন করা হবে এবং সেগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে পিপিপি, যৌথ উদ্যোগ, জিটুজি ও লিজ মডেলে পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হবে। নতুন উদ্যোগে অবসায়নকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ দেয়া হবে। ইত্যবসরে দৈনিক বা ঘণ্টা বা উৎপাদন ক্ষমতার ভিত্তিতে শ্রমিকদের নিয়োগ অব্যাহত থাকবে।

এক সময়ে বিজেএমসির অধীনে ৭৭টি জুটমিল চালু ছিল। অব্যাহত লোকসানের পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলোর কিছু বিক্রি বা বন্ধ করে এখন সংখ্যাটা দাঁড়াল ২৫টিতে, অর্থাৎ মিলপ্রতি গড়ে ১ হাজার শ্রমিক কর্মচ্যুত হচ্ছেন। বিগত ১০ বছরে শুধু একবার জুটমিল কর্পোরেশন লাভের মুখ দেখলেও মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। রফতানির পরিমাণ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা, যা গত বছরে ৫৯২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। গড় উৎপাদন ছিল শ্রমিক প্রতি শূন্য দশমিক ৩৪ টন; যার বিপরীতে বিজেএমএ ও বিজিএমকে যথাক্রমে ছিল ৬ দশমিক ৪৫ টন ও ৪ দশমিক ০১ টন।

এ দুরবস্থার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট তিনটি পক্ষ তিন ধরনের ভাষ্য দিয়েছে। সরকারের মতে, এ অব্যাহত লোকসান দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদরা মনে করেন সমস্যাটা পাট শিল্পের নয়, সমস্যা হচ্ছে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও লুটপাট। শ্রমিকদের কাছ থেকেও অনুরূপ অভিযোগ পাওয়া গেছে। করদাতাদের কোনো ভাষ্য জানা না গেলেও বিগত সময়ের গবেষণায় দেখা গেছে, জুটমিলগুলোর দুরবস্থার কারণ হচ্ছে ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক নেতাদের দুর্বৃত্তপনা, বেপরোয়া লুটপাট, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নিয়োগ, মজুরির অস্বাভাবিক হার, অস্বাভাবিক অনুপস্থিতি ও ঘূর্ণায়ন ভুতুড়ে শ্রমিক নিয়োগ এবং বিজেএমসির অদক্ষতা, সম্পদের অযাচিত ব্যবহার, পাটক্রয়ে দুর্নীতি ও বিপণনে অদক্ষতা। এখানে লুটপাট ও বিজেএমসির ঠাট-পাটের কথাও উল্লেখ আছে, পাটের সঙ্গে এতসবের কাকতালীয় সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। এ খাতে পুরনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও অনিয়ম লোকসানের জন্য দায়ী হলেও কোনো কোনো নেতা তাকে ‘সরকারের ভেতরে একটি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র বলে’ চিহ্নিত করেছে। যে যা বলুক না কেন আসল সমস্যাটি হচ্ছে ব্যবস্থাপনায়, যার ভার জনগণকে বছরের পর বছর বহন করে যেতে হয়েছে। সরকারের ভর্তুকিটা অবশ্য সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে এদ্দিন মেনে নেয়া হয়েছে। এখন আর তা মেনে নেয়া যাচ্ছে না। বিজেএসএ বা বিজিএমএ পরিচালিত কারখানাগুলোর তুলনায় বিজেএমসির পাটকলগুলোর সমগ্র উৎপাদনে অবদান ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, কর্মীর সংখ্যা ৬৭ শতাংশ এবং রফতানিতে অবদান যৎসামান্য

(৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ)।

এ প্রেক্ষাপটে সরকারি এ সিদ্ধান্ত হয়তো আরও বহু আগে নেয়া প্রয়োজন ছিল; বিশেষত, যুগের পর যুগ যখন বিজেএমসি নিয়ন্ত্রিত পাটকলগুলো জনগণের টাকায় অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত। বহুবার তাদের বহু আকারে সাহায্য বা প্রণোদনা দেয়া সত্ত্বেও অবস্থার উন্নয়ন ঘটেনি। তাই অতি বড় ও কষ্টদায়ক শৈল্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে। মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মতে, প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ প্রবর্তনের আগ পর্যন্ত মিলগুলোর পূর্ণজীবনের আশা অতি ক্ষীণ। বিগত দিনগুলোয় প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের দুর্দশা বিবেচনা করলে মনে হবে- হয় আমাদের বেসরকারি পাট খাতের রমরমা অবস্থার সূচনা হবে কিংবা আমরা সম্পূর্ণই কাঁচাপাট রফতানিকারক দেশে পরিণত হব।

আন্দোলনকারী শ্রমিকরা অবস্থা উন্নয়নের জন্য আরও এক বছর সময় চেয়ে প্রকান্তরে অবসায়নকে গ্রহণ করেছে। এ পাট শিল্পের সঙ্গে এ দেশের সর্বস্তরের মানুষের এক ধরনের যোগসূত্র ছিল এবং রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দৃষ্টি এ খাতে নিবন্ধ ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমার তিনটি গবেষণার কাজ পাট শিল্পের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। আমার গবেষণাকালে বা পরে পাট শিল্পের জন্য কোনো সুখবর ছিল না। এসব অব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও যারা মাঠ পর্যায়ে ছিল, তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল। কোনো পক্ষই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। শ্রমিকদের বর্তমানের প্রতিশ্রুতিও সে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষের নামে আর ব্যয়িত হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো ভিত্তি নেই। পাটচাষীদের প্রসঙ্গ বা চোরাচালানের প্রসঙ্গ তুলেও কিছু করার নেই। এ ব্যাপারে বহু আগেই লাভ-লোকসানের হিসাব নয়; একটা কস্ট ইফেকটিভ বিশ্লেষণ হওয়ারও প্রয়োজন ছিল। আমার ধারণা, সেরকম কিছু হলে বহু আগেই পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হতো। এগুলো চালু রাখার একমাত্র কারণ ছিল কর্মসংস্থান। ইতোমধ্যে পূর্ণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়তো করা যেত। বিকল কিংবা মান্দাতার আমলের যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের প্রয়াসও ফলপ্রসূ হয়নি। তাই আজকের পরিণামের জন্য ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকরা বহুলাংশে দায়ী; রাজনীতিও হয়তো দায়ী ছিল।

এ অবসায়নের ফলে ব্যবস্থাপকরা হয়তো ভিন্ন চাকরিতে চলে যাবেন। বিজেএমসিও হয়তো বহাল তবিয়তে থাকবে। পাটচাষ ও শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনে অন্তত বিজেএমসির অদক্ষতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির খতিয়ান জাতির কাছে উন্মোচন প্রয়োজন, প্রয়োজন রয়েছে শ্রমিক নেতৃত্ব-ব্যবস্থাপকদের যোগসাজশের ইতিহাস উদ্ঘাটন। তাহলে দেখা যাবে জনগণের কর হিসেবে প্রদত্ত অর্থ কোথায় কীভাবে অপচয় হয়েছে; আমলা নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেশন কি ব্যাপক হারে এ শিল্পের ব্যর্থতায় অবদান রেখেছে। দেশীয় বাজার সম্প্রসারণ ও বিদেশি বাজার সম্প্রসারণে কী প্রয়াস নেয়া হয়েছে, তা প্রায়ই অজ্ঞাত। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পাটকলগুলো যদি মুনাফার মুখ দেখতে পারে, তাহলে সরকারি পাটকলগুলো অন্তত ব্রেক ইভেন বা ‘না লাভ না লোকসান’ পর্যায়ে চলতে পারল না কেন?

ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত