করোনাকালে মূল্যবোধ পরীক্ষা

  এম এ খালেক ০৯ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক তরুণ কবি বলেছেন, ‘কী এক অদ্ভুত বন্দিদশা, চারদিক খোলা তবু ঘরে বসা।’ বিশ্বব্যাপী সংক্রমিত করোনা আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আড্ডাপ্রিয়-ভ্রমণবিলাসী বাংলাদেশের জনগণ এখন কার্যত ঘরবন্দি হয়ে আছে।

পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন মোবাইল ও ইন্টারনেট। কর্মহীন গৃহবন্দি হয়ে থাকা কতটা ভয়াবহ, তা সবাই বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশের মানুষকে প্রায়ই নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়; কিন্তু এবারের মহামারী যেভাবে মানুষের মূল্যবোধকে নাড়া দিয়েছে, নিকট অতীতের আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তেমনটি পারেনি।

মানুষের প্রচলিত সব মূল্যবোধ এবার পরিবর্তন হয়ে গেছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্তায়ালার ক্ষমতার নিকট মানুষ যে কতটা অসহায় বা দুর্বল, করোনা নতুন করে তারই প্রমাণ দিয়েছে। কোনো মানুষ সে যতই বিত্তবান বা ক্ষমতাবান হোক না কেন, বলতে পারছে না- করোনাভাইরাস তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

যারা এক সময় গর্ব করে বলেছিলেন- আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী; তারাও এখন তাদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। সাধারণত কোনো প্রাকৃতিক দুর্র্যোগ সংঘটিত হলে দেশের মানুষের মাঝে দু’ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। একশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা এ সময় তাদের মানবতার চূড়ান্ত রূপ প্রদর্শন করেন।

বিপন্ন প্রায় একজন মানুষের প্রতি আর একজন মানুষ কতটা সহানুভূতিসম্পন্ন হতে পারে, কিছু মানুষ তার উদাহরণ সৃষ্টি করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। আর কিছু মানুষ এরকম সংকটকালে নিজেদের হীন ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে মনের অজান্তেই নরকের কীটে পরিণত হন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীর ভিক্ষুক নজিমউদ্দিন তার ভিক্ষালব্ধ ১০ হাজার টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করে যে মানবতার পরিচয় দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। তিনি নিজের থাকার ঘর তৈরির জন্য ভিক্ষা করে এ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন।

নজিমউদ্দিন তার শেষ সম্বল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করে মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তার এ উদারতা দেখে শ্রদ্ধায় মাথা আপনা থেকেই নত হয়ে আসে। আর কিছু মানুষের স্বার্থপরতা দেখে মাথা লজ্জায় নত হয়ে আসে; বিশেষ করে, একশ্রেণির স্থানীয় জনপ্রতিনিধির আচরণ দেখে ধিক্কার জানানোর ভাষাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

এ পর্যন্ত অন্তত ৯৪ জন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে বিপন্ন মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল এবং গম চুরির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এদের বেশিরভাগই বর্তমানে আটক আছেন অথবা তাদের চেয়ারম্যান বা মেম্বারশিপ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্য পরিচালনা করছে। একজন জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন হাজারও মানুষের আস্থার প্রতীক। জনগণ বিশ্বাস করেন বলেই ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। এ সময় একজন চেয়ারম্যান বা মেম্বার যদি চাল চুরি করেন তাহলে তা মেনে নেয়া কষ্টকর।

আমরা মানুষের কোনো জঘন্য কাজ বা কুকর্ম দেখলে বলি, পাশবিক কর্ম; অর্থাৎ পশুর সঙ্গে তুলনা করে থাকি। কিন্তু বনের পশু অনেক ক্ষেত্রেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের চেয়েও উত্তম চরিত্রের অধিকারী, তা আমরা একটু বিশ্লষণ করলেই বুঝতে পারব।

কোনো মেয়ে ধর্ষিত হলে আমরা ধর্ষণকারীকে পশুর সঙ্গে তুলনা করে থাকি; কিন্তু আমরা কি লক্ষ করেছি, পশুদের প্রজনন স্বাভাবিক নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে পরিপালিত হয়, যা মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। ভাবতে অবাক লাগে, একজন মানুষ কীভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীকে ধর্ষণ করতে পারে? এরা কি মানুষ? পশু যদি মানুষের মতো কথা বলতে পারত তাহলে মানুষের সঙ্গে তুলনা করায় তারা নিশ্চয়ই প্রতিবাদ জানাত।

প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে। যারা এ সম্পদ পাচার করছেন, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদ ভোগ করতে পারেন না। কিন্তু তারপরও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ক্লান্তি নেই।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৯ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৮৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অন্যান্য দেশের আমানতকারীদের আমানতের হার হ্রাস পেলেও গত ১০ বছরে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ১৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা করেছেন, যা তারা সারা জীবনেও ব্যয় করতে পারবেন না।

ভোগ করতে পারুক আর না পারুক, অবৈধ সম্পদ আহরণ এক শ্রেণির মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে কোটিপতির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। অথচ স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে মাত্র দু’জন কোটিপতি ছিলেন। যারা বিদেশে টাকা পাচার করেন, তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য।

তারা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অর্থবিত্ত গড়ে তোলেন। দেশের একজন সংসদ সদস্য যখন বিদেশের মাটিতে মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন, তখন লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে। তিনি নিশ্চয়ই হঠাৎ করেই মানব পাচারকারী হননি। তাহলে দেশে থাকতে এতদিন তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়নি? সরকারসমর্থিত যুব মহিলা লীগের একজন নেত্রী সম্প্রতি টিভি টকশোতে চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদ একটি পবিত্র স্থান।

সেখানে সবার যাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। জাতীয় সংসদের মতো পবিত্র স্থানে সবাইকে যেতে দেয়াও উচিত নয়।’ তার এ বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য নির্বাচিত পদ হচ্ছে অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানিত।

সেখানে কোনো দুশ্চরিত্র, কালোবাজারি, চোরাকারবারি, ঋণখেলাপি, জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীকে যেতে দেয়া উচিত নয়। যারা দুর্যোগ মুহূর্তে দরিদ্র মানুষের জন্য দেয়া সরকারি ত্রাণের চাল বা তেল আত্মসাৎ করেছেন, তাদের ভবিষ্যতে কোনোভাবেই কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া উচিত নয়।

এজন্য প্রয়োজনে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। যারা সামান্য কয়েক বস্তা চালের লোভ সামলাতে পারেন না, তাদের কাছে দেশের মানুষের স্বার্থ নিরাপদ নয়। যে ৯৪ জন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান করছে, হয়তো তারাই শেষ নন। এমন আরও অনেকেই আছেন, যারা পর্দার অন্তরালে রয়ে গেছেন। তাদেরও চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত