ভ্যাকসিন তৈরি, পরীক্ষা ও নীতিমালা

  সুভাষ সিংহ রায় ১২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৪ জুন ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন আয়োজিত ভ্যাকসিন সামিটে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি দ্রুত ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আহ্বান জানান এবং সংস্থাটির তহবিল বাড়াতে অনুদান দিতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। গত ২৫ মে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সহায়তা প্রদান বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শি জিনপিংয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী পরে চীনের বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে আসে। এর আগে গত ১৫ মার্চ গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে কোভিড-১৯ ঠেকানোর লড়াইয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে সার্ক নেতাদের আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

ভ্যাকসিন তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। সরকারি ও বেসরকারিভাবে সমন্বয় করে এটি প্রস্তুত করতে প্রায়ই বছরের পর বছর লেগে যায়। ছয় মাস আগে চীনের উহানে শনাক্ত হয়েছিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, করোনা মহামারী নতুন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন ছাড়া এ ভাইরাসের সংক্রমণ থামানো সম্ভব নয় বলে প্রথম থেকেই বলে আসছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। এ পরিস্থিতিতে মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে কার্যকর ভ্যাকসিনের। ইবোলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে লেগেছে সর্বসাকুল্যে ৬ বছর। এ ছাড়া জিকা ভাইরাস, চিকেনপক্স, হেপাটাইটিস বি ১৬, সার্স ভাইরাস এবং মার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কয়েকদিন ধরে ভারতের গণমাধ্যম একটি উৎসাহব্যঞ্জক সংবাদ পরিবেশন করছে। ভারতের দৈনিক আনন্দবাজার থেকে জানতে পারছি, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আরও ৬টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান; কিন্তু আপাতত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দৌড়ে তাদের পেছনে ফেলেছে ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এখন ‘ডেডলাইন’ ১৫ আগস্ট। সত্যিই যদি ভারতের স্বাধীনতা দিবসে করোনার প্রথম টিকা বাজারে আসে; বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানে তা হবে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল রেজিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ার (সিটিআরআই) ‘ম্যান্ডেটেড প্রোটোকল’ মেনে প্রাণীদেহের ওপর কোভ্যাক্সিনের সফল পরীক্ষার পর গত সপ্তাহে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর জন্য ‘সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন’-এর (সিডিএসসিও) সবুজ সংকেত পায় তারা। আরও ৬টি ভারতীয় সংস্থাও কোভিড ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসের করোনা ট্র্যাকার অনুযায়ী, বিশ্বে এ মুহূর্তে ১৪০টি ভ্যাকসিনের মধ্যে ১২৫টির বেশি প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে। ১১টি প্রথম ধাপে, ৮টি দ্বিতীয় ধাপে, ৩টি তৃতীয় ধাপে এবং একটি পরীক্ষামূলক ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। মার্কিন সংস্থা ‘মডার্না আইএনসি’র তৈরি এমআরএনএ-১২৭৩ ভ্যাকসিনও এ দৌড়ে রয়েছে। এ টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হচ্ছে আগামী মাসে। অনেকেই অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকাকেই এগিয়ে রাখছেন। আমরা জানি, মডার্নার ভ্যাকসিনও তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হচ্ছে জুলাইয়ের মাঝামাঝি। আমেরিকার শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজেসের পরিচালক অ্যান্থনি ফাউসি ভ্যাকসিনের অগ্রগতির কথা বারবার বলছেন।

আমরা জানি, চীন সব সময় এসব বিষয়ে এগিয়ে থাকে। এপ্রিলের শুরুতেই গণমাধ্যমে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এ ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। এরই মধ্যে আশার আলো দেখতে পেয়েছেন চীনের চিকিৎসকরা। চীনের ওই চিকিৎসকদের দাবি ছিল, ভাইরাসটি নির্মূলে যে নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন, তাতে তারা সফল হয়েছেন।

ট্রায়াল পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু করেছে চীন। ব্লুমবার্গ জানিয়েছিল, বেইজিং শহরের কিছু সরকারি কর্মকর্তা এবং যারা রাষ্ট্রীয় কাজে বিদেশে যাওয়া-আসা করছেন, তাদের ভ্যাকসিন গ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগেই চীন ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করতে পারে, সেটি জানা যায় মে মাসের শেষ দিকে। ওই সময় সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়- কাদের ভ্যাকসিন দেয়া হবে, সে বিষয়ে চীনের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি থেকে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হচ্ছে। চীনে এখন পর্যন্ত পাঁচটি ভ্যাকসিন হিউম্যান ট্রায়ালের পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি প্রথম দুই ধাপের ট্রায়ালে ‘সাফল্য’ পেয়েছে। ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে সাধারণত তিনটি ধাপ থাকে। চীনের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, তাদের দেশে সংক্রমণ কমে আসায় ব্রাজিলে চূড়ান্ত ধাপের ট্রায়াল চালানো হবে। এর ভেতর বেইজিংয়ে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীদের ভ্যাকসিন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যে কর্মকর্তারা এ মুহূর্তে বিদেশে আসা-যাওয়া করছেন, প্রথমে শুধু তাদের চায়না ন্যাশনাল বায়োটেক গ্রুপ বা সিএনবিজির ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছিল। পরে পরিধি বাড়িয়ে বেইজিংয়ের বিভিন্ন জেলায় কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সিনোফার্ম বড় আকারের তৃতীয় ধাপের ভ্যাকসিন পরীক্ষা শুরু করছে। এ মাসের শুরুতে সিনোফার্ম প্রাণী দেহে তাদের ভ্যাকসিন পরীক্ষা থেকে ইতিবাচক ফলের খবর প্রকাশ করে। চীনা গবেষকরা সেল সাময়িকীতে গবেষণা সংক্রান্ত নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তারা দাবি করেন, নিষ্ক্রিয় ভাইরাস থেকে তৈরি ভ্যাকসিন প্রার্থী বিবিআইবিপি-করভি সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার নিরপেক্ষ অ্যান্টিবডিকে প্ররোচিত করতে পারে। তারা বেইজিংয়ে বছরে ২০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরির কারখানা করছেন। নিজেদের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের সফলতার বিষয়ে ক্রমেই আত্মবিশ্বাস বাড়ছে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজারের। গত ৭ জুলাই (মঙ্গলবার) মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী (সিইও) অ্যালবার্ট বোরলা জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন, অক্টোবর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কর্তৃপক্ষ তাদের ভ্যাকসিন অনুমোদন দিয়ে দেবে।

এ বছরের মধ্যে ১০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক আলাপ শুরুর কথা জানান তিনি। এ মাসের শেষ দিকে বড় আকারে ভ্যাকসিনটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে ফাইজার। এতে বিশ্বের ১৫০টি স্থানের ৩০ হাজার মানুষকে ভ্যাকসিনটি দেয়া হবে। লাভের হিসাব করেই ভ্যাকসিনটির মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে ফাইজার। তবে এর প্রধান নির্বাহী অ্যালবার্ট বোরলা মনে করেন, প্রথম ডোজগুলো বিভিন্ন দেশের সরকার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের বিনামূল্যে সরবরাহ করবে।

ভ্যাকসিন সাধারণত ক্লিনিকে পৌঁছানোর আগে কয়েক বছর গবেষণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচনের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের কাজ শুরু হয়েছিল। ল্যাব বা পরীক্ষাগার থেকে ক্লিনিক পর্যন্ত একটি ভ্যাকসিনকে বিকাশচক্র পার করতে হয়, যার শুরুতেই থাকে প্রি-ক্লিনিক্যাল টেস্টিং বা প্রাকৃতিক পরীক্ষা। বিজ্ঞানীরা ইঁদুর বা বানরের মতো প্রাণীতে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করেন, যাতে এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে কিনা, তা বোঝা যায়।

সরকারি পর্যবেক্ষণ : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের জন্য বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ছিল- স্মলপক্স, রেবিস, প্লেগ, কলেরা ও টাইফয়েডের ভ্যাকসিন। ১৯০২ সালের ১ জুলাই মার্কিন কংগ্রেস ভাইরাস, সিরাম, টক্সিন এবং অনুরূপ পণ্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি আইন পাস করে; পরে অবশ্য এটা ‘বায়োলজিক্স কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত হয়।

ভ্যাকসিন তৈরি এবং পরীক্ষার পর্যায়গুলো : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাকসিন তৈরি ও পরীক্ষার জন্য বেশকিছু পর্যায়কে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ভাইরাসের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা হয়। পরবর্তী সময়ে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটিকে কান্ডিডেট ভ্যাকসিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

প্রথম পদক্ষেপ : Laboratory and Animal Studies

অনুসন্ধান পর্যায় : এ পর্যায়ে ল্যাবরেটরিতে মৌলিক গবেষণা করতে হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাতে ২-৪ বছর সময় লাগে। প্রথমে ফেডারেলের অর্থায়নে পরিচালিত একাডেমিক গবেষক এবং সরকারি বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক অথবা সিন্থেটিক অ্যান্টিজেন শনাক্ত করে; যা পরবর্তীকালে রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় সহায়তা করে।

প্রাক-ক্লিনিক্যাল পর্যায় : প্রাক-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে মূলত টিস্যু কালচার, সেল কালচার বা প্রাণিদেহে পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য ভ্যাকসিনটির নিরাপত্তা, সুরক্ষা ক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিনটি কী ধরনের ভূমিকা রাখবে- তা মূল্যায়ন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রাণিদের মধ্যে সাধারণত ইঁদুর ও বানরকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ পর্যায়ে পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকরা প্রাথমিক ধারণা পান এবং এটি মানুষের শরীরে ব্যবহার করলে কী হবে- সে সংক্রান্ত আশা দেখতে পান, যা পরবর্তী সময়ে ভ্যাকসিনের নিরাপদ ব্যবহার শুরুর পাশাপাশি নিরাপদ পদ্ধতিও আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।

Investigational New Drug এর জন্য আবেদন

আবেদনকৃত প্রতিষ্ঠানটি তাদের উৎপাদন ও পরীক্ষা প্রক্রিয়া, গবেষণা প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার এবং প্রস্তাবিত গবেষণার বিবরণ আবেদনে তুলে ধরে। আমরা জানি, বাংলাদেশে ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর’ এফডিএ-এর ভূমিকা পালন করে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কোথায় ও কীভাবে পরিচালিত হবে- সে বিষয়ে একটি পর্যালোচনা বোর্ড থাকে এবং প্রটোকল মেইনটেইন করে তার অনুমোদন নিতে হয়। আবেদন অনুমোদনের জন্য এফডিএ ৩০ দিন সময় নিয়ে থাকে। আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর ভ্যাকসিনটি তিনটি পর্যায়ে পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

পরবর্তী পদক্ষেপ : Clinical Studies with Human Subjects

ভ্যাকসিন ট্রায়ালের প্রথম পর্যায় : প্রথম পর্যায়ে ভ্যাকসিনটি বয়স্ক মানুষের একটি ছোট গ্রুপের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। ভ্যাকসিনটি যদি শিশুদের উদ্দেশেও তৈরি করা হয়, তবুও তা গবেষকরা প্রথমে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর প্রয়োগ করে থাকেন। পরবর্তীকালে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত ধাপে ধাপে কম বয়স্কদের ওপর পরীক্ষা চলতে থাকে ।

প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য হল- ভ্যাকসিনটির সেফটি নিশ্চিত করা এবং এর কারণে সৃষ্ট ক্ষতিকর দিক, ধরন এবং ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা। সীমিত পরিসরে ট্রায়াল শেষে গবেষকরা এ মডেলটি ব্যবহার করেন। পরে পরীক্ষার জন্য বাছাইকৃত অল্প কিছু মানুষকে ভ্যাকসিন পুশ করা হয় এবং তাদের প্যাথোজেন দ্বারা সংক্রমিত করা হয়। এ সময় গবেষকরা ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক অবস্থা অতি সাবধানে পর্যবেক্ষণ করেন। কিছু ক্ষেত্রে প্যাথোজেনের একটি সংশোধিত সংস্করণও ব্যবহার করেন গবেষকরা। প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল শেষে পরবর্তী পর্যায়গুলো পরীক্ষা করেন গবেষকরা।

ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ২য় পর্যায় : প্রথম পর্যায়ে সফলতা অর্জন শেষে দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি বৃহত্তর গ্রুপের ওপর ভ্যাকসিনটি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে ঝুঁকি নিয়ে এ গ্রুপের অধীনে রাখা হয়। এ পর্যায়ে এলোমেলো (random) এবং নিয়ন্ত্রিত একটি প্লেসবো গ্রুপও থাকতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোর লক্ষ্য হল- ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা, সংক্রমণ থেকে রক্ষা, প্রস্তাবিত ডোজ এবং বিতরণের পদ্ধতি মূল্যায়ন করা।

তৃতীয় পর্যায় : দ্বিতীয় ধাপের সফলতার পর ভ্যাকসিনগুলো হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়। এ পর্যায়ের পরীক্ষাগুলো এলোমেলো (random) ও ডাবল ব্লাইন্ড আকারে হয়। তৃতীয় পর্যায়ের প্রধান লক্ষ্য হল- ভ্যাকসিনটি বিশাল সংখ্যক লোকের জন্য নিরাপদ কিনা, তা মূল্যায়ন করা। এ ক্ষেত্রে বিরল কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উদঘাটন করা, যা দ্বিতীয় পর্যায়ের ধরা পড়েনি। উদাহরণস্বরূপ ভ্যাকসিনের কারণে প্রতি ১০ হাজারের মধ্যে ১ জনের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

তৃতীয় পর্যায়ের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১. ভ্যাকসিনটি রোগ প্রতিরোধ করে কিনা? ২. প্যাথোজেনের রোগ সংক্রমণ রোধ করে কিনা? ৩. অ্যান্টিবডি কিংবা প্যাথোজেন সম্পর্কিত অন্যান্য ইমিউন তৈরি করে কিনা?

পরবর্তী পদক্ষেপ : অনুমোদন এবং লাইসেন্স

তৃতীয় পর্যায়ে সফল পরীক্ষার পর ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Food and Drug Administration-FDA- বরাবর ‘বায়োলজিক্স লাইসেন্স আবেদন’ জমা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশেও অনুরূপভাবে ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর’ ভ্যাকসিন তৈরির সংশ্লিষ্ট কারখানা পরিদর্শন করবে এবং ভ্যাকসিনের লেবেলিং অনুমোদন দেবে।

লাইসেন্স অনুমোদনের পর FDA দক্ষতা, সুরক্ষা এবং বিশুদ্ধতার জন্য ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে; একই সঙ্গে তারা ভ্যাকসিনের উৎপাদনও পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে। উল্লেখ্য, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিনগুলো নিজস্বভাবে পরীক্ষা করার অধিকার FDA এর রয়েছে। আমাদের দেশের আইনেও ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর’ ভ্যাকসিন নিজস্বভাবে পরীক্ষা করার অধিকার রাখে। ভ্যাকসিন অন্যান্য ওষুধের মতোই তৈরি, পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে সাধারণত নন-ভ্যাকসিন ওষুধের চেয়ে ভ্যাকসিনের পরীক্ষা নিখুঁত হয়। কারণ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের সঙ্গে মানবিক বিষয়গুলো বেশি জড়িত থাকে। তাছাড়া রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং FDA (ফুড অ্যান্ড ড্র্যাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ভ্যাকসিনগুলোর লাইসেন্স-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য পরীক্ষা নিবিড়ভাবে করে থাকে। বাংলাদেশের ভ্যাকসিন উদ্যোগটি আশা জাগানিয়া। এখানে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হবে। আমাদের দেশে ৯টি নিবন্ধিত সিআরও (ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন) প্রতিষ্ঠান আছে। ভ্যাকসিন, অ্যান্টিজেন কিট, অ্যান্টিবডি কিট সবকিছুই সিআরও (ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন) ও বিএমআরসি (বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল) মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ‘ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে’ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে। ব্যাপারটা মোটেই তাড়াহুড়ার কাজ নয়। আমাদের বিজ্ঞানীদের কর্মপ্রচেষ্টার জয় হোক ।

সুভাষ সিংহ রায় : সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত