তৃতীয় মত

করোনা বিশ্বসমাজে যা ঘটাতে পারে

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

করোনায় যখন বিশ্বের প্রত্যহ হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও মৃত্যুবরণ করছে, তখন করোনা-পরবর্তী বিশ্বের কথা কল্পনা করাও অসম্ভব।

আমরা উনিশ শতকে সামন্ততন্ত্রের পতন দেখেছি। কুড়ি শতকের শেষার্ধে কমিউনিস্টদের পতন দেখেছি। কিন্তু ধনতন্ত্রের সম্পূর্ণ পতন দেখিনি; তার আংশিক পতন দেখেছি।

ধনতন্ত্র সাপের মতো রূপ বদলাতে ওস্তাদ। ভিক্টোরিয়ান ক্যাপিটালিজম এখন নতুন চেহারায় ফিরে এসেছে। মাঝখানে পিপলস ক্যাপিটালিজম এবং আরও নানা নামের আড়ালে ধনতন্ত্র আত্মরক্ষা করেছে, বারবার রূপ পাল্টেছে।

এখন করোনাভাইরাসের মৃত্যু-মহামারীর মধ্যেও কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ করোনা-পরবর্তী বিশ্বের চেহারা ও চরিত্র অনুমান করার চেষ্টা করছেন। এতকাল বিশ্বজুড়ে ছিল ফ্রি মার্কেটের রাজত্ব এবং গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের একক আধিপত্য।

করোনার আবির্ভাবের আগেই চীন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের একক আধিপত্যে আঘাত লাগে।

বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ এবং চরিত্রহীন ধনী ব্যবসায়ী এবং কথা ও কাজে যার মিল নেই এমন ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ায় দেশটি শুধু গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা থাকার যোগ্যতা হারায়নি, বিশ্বে তার প্রভাব ও শক্তিও কমেছে।

ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধাশঙ্কার সময়েও ট্রাম্পের পলায়নী মনোভাব দেশে এবং বিদেশে তার যেটুকু ভাবমূর্তি ছিল তা ধ্বংস করেছে।

চীনের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করে এবং ট্রেড ওয়ার বাধিয়ে ট্রাম্প আমেরিকার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে চেয়ে আরও ভুল করছেন। ট্রেড ওয়ারে তিনি জয়ী হননি। মিত্র ইউরোপকেও তিনি সঙ্গে রাখতে পারেননি। বরং তিনি আমেরিকাকে একটি আইসোলেটেড কান্ট্রিতে পরিণত করেছেন।

করোনাভাইরাস তাকে আমেরিকার লুপ্ত প্রভাব উদ্ধারে একটা সুযোগ দিয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্শাল প্লানের দ্বারা ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি চাঙ্গা করার কাজে সাহায্য জুগিয়ে আমেরিকা পশ্চিম ইউরোপে অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের প্রসার ঘটাতে পেরেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নকে জব্দ করার জন্য সামরিক জোট ন্যাটো তৈরি করতে পেরেছিল।

কিন্তু করোনাভাইরাসের ভয়াবহ হামলার পর ট্রাম্প এ হামলাকে কোনো গুরুত্ব দিতে চাননি। এ ভাইরাস উচ্ছেদে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে আমেরিকাকে যুক্ত করতে রাজি হননি তিনি। বিশ্বের কোনো দেশকে করোনাভাইরাস দমনের কাজে ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোনো সাহায্য দেয়নি।

বরং ট্রাম্প চেয়েছেন চীনের উহান প্রদেশের নাম (যেখান থেকে করোনার উৎপত্তি বলা হয়) এ ভাইরাসের নাম হিসেবে প্রচার করে অর্থাৎ করোনাভাইরাসকে উহান ভাইরাস নাম দিয়ে এ মহামারীর জন্য চীনকে দায়ী করে তার চীনবিরোধী স্নায়ুযুদ্ধকে শক্তিশালী করে তুলতে।

ট্রাম্পের এ চেষ্টাও সফল হয়নি। চীন তার নিজ দেশে করোনাভাইরাসকে হটিয়েছে (চীন সম্পর্কে পূর্ণ সত্য জানা কঠিন) এবং করোনাকে হটানোর কাজে এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশকে সাহায্য দিয়েছে। এ সাহায্য পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও একটি। করোনাবিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য দিতে চীন কয়েকজন চিকিৎসকও পাঠিয়েছে।

কিন্তু পশ্চিমা অর্থনীতিবিদেরই ধারণা, করোনা-পরবর্তী বিশ্বে, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকা, এমনকি ল্যাটিন আমেরিকায় করোনা-প্রসূত অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে ওষুধপত্র, ডাক্তার এবং অর্থ সাহায্য নিয়ে চীনকেই এগিয়ে আসতে দেখা যাবে।

আমেরিকা এ প্রতিযোগিতায় পরাজিত হতে পারে। করোনায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত দেশ আমেরিকা। ট্রাম্প যদি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তাহলে আমেরিকার পক্ষে এ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা আরও কঠিন হবে।

আমি রাজনৈতিক পণ্ডিত নই। তবু দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে আমার ধারণা, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় ঘটবে না; কিন্তু করোনা-পরবর্তী বিশ্বের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাত থেকে ক্রমশ সরে যেতে থাকবে।

সেই নেতৃত্ব চীনের হাতে যাবে এমন কথা বলি না। চীন একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হলেও ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সে অনুসারী। কিন্তু গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্ব গ্রহণের অনেক সুবিধা চীনের হাতে থাকলেও একনায়কত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামো ইউরোপের ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছে নেতা হিসেবে তাকে গ্রহণযোগ্য করবে না।

বরং ইউরোপে ফ্রান্স ও জার্মানি যে জোট গঠন করেছে এবং যাতে কানাডা, ইতালিসহ কয়েকটি দেশ যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে, এশীয় দেশ জাপানের সহযোগিতায় এ ইউনিয়ন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা হয়ে উঠতে পারে।

তবে করোনার পর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিজেই অটুট ও অভিন্ন থাকবে কি না, সন্দেহের বিষয়। এশিয়ায় এশিয়ান ক্যাপিটালিজম এবং ইউরোপে ইউরোপিয়ান ক্যাপিটালিজম আলাদাভাবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে গড়ে উঠতে পারে।

চীন এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব হবে। করোনা পৃথিবীর শুধু রাজনৈতিক মানচিত্র নয়, অর্থনৈতিক মানচিত্রও পাল্টে দেবে।

গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম আর অটুট থাকবে না। তার একটা বড় কারণ এ ক্যাপিটালিজমের বড় ভিত্তি বিশ্বময় যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ ও বিক্রি। বর্তমানে আমেরিকার গোটা অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে তাদের বড় কর্পোরেটগুলোর মারণাস্ত্র বিক্রির মুনাফার ওপর।

এ জন্য আমেরিকাকে সারা বিশ্বে যুদ্ধ ও যুদ্ধ-উত্তেজনা বাধিয়ে রাখতে হয়। করোনার হামলায় এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ-উত্তেজনা, উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে সংঘর্ষ ও সংকট সব থমকে আছে।

কাশ্মীরে বা প্যালেস্টাইনে মাঝে মাঝে বন্দুক-কামানের নির্ঘোষ হচ্ছে বটে, তবে আগের মতো প্রত্যক্ষ হানাহানি নেই। করোনার পর যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে তাতে পশ্চিমা দেশগুলো- এমনকি আমেরিকার জনগণও আবার যুদ্ধের সূচনা চাইবে না। যুদ্ধ না হলে যুদ্ধাস্ত্র দরকার হবে না। অস্ত্র বানিয়ে দুই প্রতিপক্ষের কাছেই তার বিক্রির সুযোগ থাকবে না।

করোনার পর বিশ্বের ছোট-বড় সব দেশকেই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে এত ব্যস্ত থাকতে হবে যে, যুদ্ধবিলাস অনেকেরই সইবে না। আমেরিকা এবং ইরান দুটি দেশই করোনায় সর্বাধিক বিধ্বস্ত। ট্রাম্পের কণ্ঠে আগের যুদ্ধের হুমকি নেই। ইরানের ইমামেরাও আর হুংকার দিচ্ছেন না।

ভারতের মোদি সরকারও করোনায় এমনই নাজেহাল যে, তাদের হিন্দুত্ববাদের সহিংস প্রচার এখন স্থগিত। আমেরিকার ঘোর সমালোচক এক ল্যাটিন আমেরিকান সাংবাদিক ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, ‘আমেরিকা সারা বিশ্বে অন্যায় যুদ্ধে এত মানুষ ও রাষ্ট্রনায়কদের হত্যা করেছে যে, সেই পাপে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এত অধিক।

আমেরিকা তার হাতে মজুদ মারণাস্ত্রের জন্য গর্বিত। কথায় কথায় অন্য দেশকে হুমকি দেয়। করোনার হামলার মুখে তার কোনো মারণাস্ত্র কাজে আসছে না। করোনা প্রমাণ করেছে সে আমেরিকার মারণাস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী।’

আমার ধারণা যদি সঠিক হয়, তাহলে দেখা যাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হলে তিনি হবেন আমেরিকান ইয়েলতসিন। করোনা হবে আমেরিকার জন্য চেরনোবিল সংকট। ইয়েলতসিনের আমলে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নে ভাঙন ধরেছিল, ট্রাম্পের আমলেও তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় ঐক্যে ভাঙন ধরতে পারে।

চেরনোবিল আণবিক কেন্দ্রে দুর্ঘটনার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনৈতিক সংকটের জন্য মার্কিন কৃপাপ্রার্থী হয়ে দ্বিতীয় সুপার পাওয়ারের অবস্থান হারিয়েছিল। করোনার হামলা ট্রাম্পের আমেরিকাকে ততটা বিপর্যয়ে না ফেললেও বিশ্বনেতৃত্ব যে তার আসন বদল করে দেবে সে কথা আগেই বলেছি।

কেউ বিশ্বাস করুন আর না করুন, বিশ্বে নতুন ধারার সমাজতন্ত্রের বিকাশ ঘটবে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বা মার্কেট ইকোনমির বিপর্যয় থেকেই নতুন সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ও প্রসার লাভ ঘটবে। এশিয়া-আফ্রিকার বহু দেশকেই বেঁচে থাকার স্বার্থেই নতুন সমাজতন্ত্রী অর্থনীতি অনুসরণ করতে হবে।

এসব দেশের মধ্যে অবশ্যই বাংলাদেশ হবে একটি। করোনার বিপর্যয়ের পর বিএনপি, সুশীলসমাজ, ঐক্যজোট, জামায়াত ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আবার জোটবেঁধে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে মাথা তোলার চেষ্টা করবে। কিন্তু ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে ধনতান্ত্রিক রাজনীতিতেও যে বিপর্যয় দেখা দেবে তাতে বাংলাদেশে নতুন করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।

তরুণ প্রজন্মই এ নতুন জাগরণের পতাকা বহন করবে। আওয়ামী লীগকে এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে ফিরে যেতে হবে। নইলে করোনার পরিবর্তনের জোয়ারে তাকেও ভেসে যেতে হবে।

লন্ডন, ১২ জুলাই, রবিবার, ২০২০

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত