হালের বিশ্ব-অর্থনীতির কিছু প্রবণতা

  ডা. জাহেদ উর রহমান ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতীকী ছবি

করোনা যখন এ পৃথিবীকে একেবারে ভেঙেচুরে ফেলেছে তখনও কয়েকজন নারী সরকারপ্রধান আমাদের সামনে অসাধারণ উজ্জ্বল সাফল্য নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন অন্যতম।

সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ড দেশটি এবং এর প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন খুব আলোচিত হয়েছেন আমাদের দেশেও। তিনি প্রথম আলোচিত হয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা দেখানোর কারণে।

আর অতি সম্প্রতি করোনা মোকাবেলায় তার সাফল্যের গল্প আমাদের দেশের মিডিয়ায়ও খুব এসেছে; কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না এ মানুষটি আরেকটি অসাধারণ কাজ শুরু করেছেন গত বছর, যা এ বছরও চালু আছে এবং তিনি আমাদের জানান সেটি তিনি চালিয়ে যাবেন ভবিষ্যতেও।

তার সেই কাজের প্রসঙ্গে আসার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলে নেয়া যাক।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং সেটির ভিত্তিতে হিসাব করা মাথাপিছু আয় উন্নয়নের নির্দেশক হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে গত কয়েক দশক থেকেই। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ হয়েছে ২০০৮ সালে।

সেই সময়ের বিশ্বমন্দার মধ্যেই ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি দু’জন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ এবং অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ জাঁ পল ফিটুসিকে দায়িত্ব দেন জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিমাপের সমস্যা এবং এর বিকল্প নিয়ে প্রস্তাবনা দিতে।

২০১০ সালে বের হয় এ তিন লেখকের গবেষণার ফল ‘মিসমেজারিং আওয়ার লাইভস: হোয়াই জিডিপি ডাজন’ট অ্যাড আপ’ শিরোনামের বইয়ে।

বইটির শিরোনামই আমাদের বলে দেয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে করা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপ করার সনাতন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষের সত্যিকারে ভালো থাকার পরিমাপ নয়; তাই বিকল্প পরিমাপ পদ্ধতি জরুরি।

তার ফলেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখানোর প্রবণতা বর্তমান পৃথিবীতে বিলুপ্তই হয়ে গেছে প্রায়; কিন্তু আমাদের মতো দেশে এখনও এই ‘সেকেলে’ চর্চাটা চলছেই; সব ক্ষমতাসীনের কাছে এটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কথা বাদ দিই, দীর্ঘকাল থেকেই পুঁজিবাদী কল্যাণরাষ্ট্রগুলো সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জন্য রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত করার চেষ্টা করে গেছে ক্রমাগত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার শতভাগ দায়িত্ব নিয়ে তার নাগরিককে সেবা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

এ প্রয়োজনগুলো মেটানোর জন্য অর্থাৎ ওয়েলফেয়ার খাতে জিডিপির অন্তত ২০ শতাংশ তারা ব্যয় করে; অনেকেই করে এর চেয়ে অনেক বেশি। অথচ আমাদের দেশে এ ওয়েলফেয়ার খাতে মোট ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশেরও কম।

কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রচলিত মানদণ্ডকে আরও ছাপিয়ে গিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ২০১৯ সাল থেকে জেসিন্ডা আরডার্ন তার দেশে চালু করেছেন ‘ওয়েলবিইং বাজেট’। তার দেশের বাজেটের একেবারে কেন্দ্রে আছে তার রাষ্ট্রের প্রায় সব নাগরিকের জীবনের উঁচুমান এবং ভালো থাকা নিশ্চিত করা।

এ বছরও একইভাবেই তিনি তার বাজেট তৈরি করেছেন। গত বছরই প্রথম ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে নিউজিল্যান্ডের এ বাজেটকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়।

এরপর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব মিডিয়া এ উদ্যোগকে তাদের দেশের জন্য অনুকরণীয় বলে অনেক রিপোর্ট, সম্পাদকীয় এবং মতামত প্রকাশ করেছে। কেন আলাদা এ ‘ওয়েলবিইং বাজেট’?

নিউজিল্যান্ড তার বাজেটে মাদকাসক্তি থেকে নাগরিকদের মুক্ত করা এবং দূরে রাখার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ রাখে, শিশুদের দারিদ্র্য কমানোর জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখে। খুবই উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে নিউজিল্যান্ড নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিতের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ চালু করেছে।

এ মানসিক স্বাস্থ্য মানে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা নয়, এটির মানে হচ্ছে মানুষকে মানসিকভাবে সুখী এবং সুন্দর রাখার চেষ্টা, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে বলে ‘পজিটিভ সাইকোলজি’, সেটি নিশ্চিত করা।

এটুকু শুনে যদি আমরা অবাক হই, তাহলে আমাদের জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে। ‘ওয়েলবিইং বাজেট’-এ ডমেস্টিক ভায়োলেন্স কমানোর জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ আছে। মানুষের পারিবারিক জীবনের এ সংকটগুলো ভালোভাবে সমাধান করা গেলে মানুষকে ভালো রাখা যায় এ চিন্তা থেকে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে তারা।

একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কল্যাণে কতটা আন্তরিক হলে এভাবে ভাবতে পারে, সেটি আমাদের মতো দেশে বসে স্রেফ আকাশকুসুম কল্পনা বলে মনে হয়।

নিশ্চিতভাবেই নিউজিল্যান্ড যথেষ্ট ধনী একটা দেশ। কিন্তু শুধু ধনী হওয়াই যথেষ্ট নয়, মানুষের জন্য এ ধরনের একটা চিন্তা করার জন্য। মাথাপিছু জিডিপির বিচারে নিউজিল্যান্ডের অবস্থান পৃথিবীতে ৩৪তম। তার মানে নিউজিল্যান্ডের চেয়ে আরও ৩৩টি ধনী দেশ আছে; কিন্তু তারা কেউ এভাবে প্রায় সব মানুষকে কেন্দ্রে রেখে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজানোর কথা ভাবেনি।

কেউ কি এটা ভাবছেন এভাবে চিন্তা করা শুধু অতি উন্নত দেশের পক্ষেই সম্ভব? একেবারেই সেটা নয়। এ চিন্তার সূত্রপাত হয়েছে অত্যন্ত গরিব আমাদের পাশে এক দেশ থেকে, সেই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে এটুকু জানিয়ে রাখি ভারতের কেরালা রাজ্যটি করোনা মোকাবেলায় বিশ্বের অনেকের কাছে সত্যিকারের রোল মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

করোনাকালে কেরালার মানুষকে ভালো রাখার একটা পদক্ষেপ এখানে উল্লেখ করতে চাই। করোনায় মানুষকে যখন বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন রাখা হয়, তখন আমাদের চিন্তা তাদের খাবার সরবরাহ করা পর্যন্ত কাজ করে। কেরালায় যখন করোনা ধরা পড়তে শুরু করল তখন বিদেশ থেকে আসা সব মানুষকে তারা বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রেখেছিল।

তাদের খাবার দিয়েছিল। কিন্তু যে কথাটা বলার জন্য এ পটভূমি তৈরি সেটা হল- এ মানুষগুলো আইসোলেশনে যেন মানসিকভাবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে না পড়ে, চাঙ্গা থাকে সে জন্য তাদের জন্য নিয়মিত মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করে গেছে কেরালা সরকার।

‘একটা সরকারের কাজ হল জনগণের জীবনে সুখ নিশ্চিত করা। কোনো সরকার যদি সেটা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো যুক্তি নেই’- ১৭২৯ সালে লিখিত ভুটানের লিগ্যাল কোডে লেখা আছে কথাগুলো।

সেই দেশেই গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি তৎকালীন রাজা জিগমে সিংঘে ওয়াংচুক পৃথিবীর সামনে নিয়ে আসেন ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (জিএনএইচ)-এর ধারণা। তিনি বলেন, এ সূচক গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্টের (জিডিপি) চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, জিডিপি প্রাকৃতিক, মানবিক এবং সামাজিক পুঁজিকে মূল্যায়ন করে না। এটা অবসর সময় এবং মজুরিবিহীন কাজকে মূল্যায়ন করে না।

শুধু তাই নয়, গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করার পর ২০০৮ সালে ভুটানের যে সংবিধান প্রণীত হয়, সেটার কেন্দ্রেও আছে রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষকে ভালো রাখা। এ উদ্দেশ্যকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য ভুটানে আছে ‘মিনিস্ট্রি অব হ্যাপিনেস’; ভুটানই পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে এমন একটি মন্ত্রণালয় আছে।

ভুটানের এ ধারণা শুরুতে অনেকের কাছে খুব র‌্যাডিক্যাল মনে হলেও এটা ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। ভুটানের মতো করে না হলেও অনেক দেশ এখন তাদের জনগণের ভালো থাকা পরিমাপের চেষ্টা করছে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) পৃথিবীর ৩৭টি শক্তিশালী দেশের সংগঠন, যার মধ্যে সবচেয়ে শিল্পোন্নত ৭টি দেশও আছে। এ ৩৭টি দেশের মোট জিডিপি পৃথিবীর মোট জিডিপির অর্ধেক।

ওইসিডি তাদের সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি কেন্দ্রীয় ওয়েলবিইং ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছে তাদের জনগণের ভালো থাকা পরিমাপ করার জন্য।

এসবই হচ্ছে হালের অর্থনীতি ট্রেন্ড। সেটার সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক দর্শন কোথায় পড়ে আছে সেটা দেখা একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের অনেকের কাছেই ভীষণ কষ্টকর।

উন্নত বিশ্বের কথা বাদই দিই, কেরালার মতো রাজ্য যখন করোনার কারণে কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার চেষ্টা করেছে, আমরা তখন করোনার জন্য অত্যাবশ্যক বিষয় করোনা টেস্টে ফি বসাই, জনগণের চরম দুর্যোগে পানির দাম বাড়াই।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত