দুধ ও ডিম উৎপাদনে চাই উন্নত প্রযুক্তি

  ড. চয়ন কুমার সাহা ৩০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অন্যান্য কৃষি খাতের মতো প্রাণিসম্পদ খাতও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছে, যা দেশের জিডিপির ৩.৪৭ ভাগ (১৩.৪৬ শতাংশ কৃষি জিডিপি)। অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক দুগ্ধ ও পোলট্রি শিল্পে নিজেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

দেশের ডেইরি ও পোলট্রি খামারগুলো মূলত ব্যক্তিগত বা বেসরকারি কোম্পানির মালিকানায় গড়ে উঠেছে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। দেশ আজ মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে মাছের পাশাপাশি প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগ ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে। তবে জাতীয় চাহিদা পূরণের জন্য দুধ উৎপাদনে আমরা অনেকাংশেই পিছিয়ে আছি। এ প্রেক্ষাপটে দুধ ও পোলট্রি উৎপাদন পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও লাভজনক করতে এবং ভবিষ্যতে এ খাতে উৎপাদন ধারা অব্যাহত রাখতে কিছু বিষয় এখনই ভেবে দেখা জরুরি।

মানুষের দৈনন্দিন নিরাপদ সুষম খাদ্য সরবরাহ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গরু ও পোলট্রির যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা বর্তমানে সনাতন পদ্ধতিতে করা হচ্ছে। নিরাপদ মাংস, দুধ এবং ডিম উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করতে হলে প্রাণীর আরাম নিশ্চিতকরণ ও প্রাথমিক রোগ শনাক্তকরণ, প্রাণীর নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ, দুধ ও ডিম উৎপাদনে সংগ্রহ ব্যবস্থা ও সরবরাহের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং সেইসঙ্গে খামারের টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।

আমরা যদি দুগ্ধ খামারের দিকে তাকাই, দেখব- দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছোট (৩ থেকে ৫টি) থেকে বড় আকারের (১০ থেকে ৩০০টি) খামার গড়ে উঠেছে এবং প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে ভ্যাকসিন প্রয়োগ ও প্রয়োজনে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে দুধ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।

কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অনুকূল ও আরামদায়ক (তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায়) পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় অক্সিজেন প্রবাহ না থাকায় উন্নত প্রজাতির গাভী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে দুধের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং নানা রোগের সংক্রমণ ঘটছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুধ উৎপাদন ঠিক রাখতে প্রাণীকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা উচিত। সেইসঙ্গে আর্দ্রতা ৬০ থেকে ৮০ ভাগের মধ্যে থাকা উচিত।

আর্দ্রতা ৬০ ভাগের নিচে হলে শ্লেষ্মাঝিল্লির ক্ষতি হতে পারে ও ধুলার পরিমাণ বেড়ে যাবে; অন্যদিকে আর্দ্রতা ৮০ ভাগের বেশি হলে গাভীর আরাম ব্যাহত হবে (তাপজনিত) এবং রোগজীবাণু উৎপন্ন হবে। উদাহরণস্বরূপ, শীতপ্রধান দেশগুলোয় সঠিক পরিবেশ যেখানে হলেস্টাইন গরু ৩০ থেকে ৪০ লিটার দুধ দেয়, সেখানে আমাদের দেশে একই গাভী তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ঠিক না থাকার কারণে ১৫ থেকে ২০ লিটার দুধ দিচ্ছে।

শুধু পরিবেশগত উন্নয়নের মাধ্যমে গাভীর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ অনেকটাই বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই ঘরের তাপমাত্রা কমাতে এবং আর্দ্রতা ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্যান (বৈদ্যুতিক পাখার) ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সক্ষমতা অনুযায়ী ঠাণ্ডাকরণ পদ্ধতি (প্যাড ও ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি) সংযুক্ত করা যেতে পারে। সেইসঙ্গে গাভীর সঠিক পরিমাণ সুষম ও নিরাপদ খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

গরু যেন পিছলে পড়ে আহত না হয়, সেজন্য মেঝের যথাযথ ডিজাইন করা অথবা মেঝেতে কমখরচে মাদুরের ব্যবস্থা করা উচিত। গো-খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে প্রাণীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও স্বল্প সময়ে খড় কাটার জন্য স্বল্প খরচে দেশে তৈরি যন্ত্রের (চপার মেশিন) ব্যবহার করা যেতে পারে।

এখনও বাংলাদেশে দুধ দোহানোর কাজটি হাতেই করা হয়ে থাকে, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার (এক ঘণ্টায় প্রায় ৩ থেকে ৪টি গাভীর দুধ দোহানো যায়)। তাছাড়া এতে হাতের মাধ্যমে এক গরু থেকে আরেক গরুতে রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। অথচ ছোট একটি দুধ দোহানোর যন্ত্র ব্যবহার করে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২টি গাভীর নিরাপদ দুধ দোহানো নিশ্চিত করা সম্ভব।

বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা ‘ফোরজি’ থেকে ‘ফাইভজি’তে যাচ্ছি। স্মার্টফোন এখন অনেক খামারির কাছেই আছে। পোলট্রি ও ডেইরি খামারের ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ ও সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

যেমন- গরু কিংবা মুরগির আচরণ ক্যামেরা ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘরে বসে আমরা যে কোনো জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারি। তাছাড়া বড় খামারিরা বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের ব্যবহার ইন্টারনেট অব থিঙ্কস (আইওটি) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেন্সরের মাধ্যমে ঘরে বা অফিসে বসেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

ডেইরি ও পোলট্রি শিল্প যেমন দুধ, ডিম ও মাংসের জোগান দিচ্ছে, এর বিপরীতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় আশপাশের পরিবেশের ক্ষতি করছে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনে বড় ভূমিকা রাখছে। এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ খামারিদের জন্য।

কিন্তু বর্জ্যকে সহজেই সম্পদে রূপান্তর করা যেতে পারে। যেমন ডেইরি ও পোলট্রি বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস এবং উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। সরকার যদি তরল জৈব সার জমিতে সরাসরি ব্যবহারের অনুমতি দেয়; খামারিদের তরল বায়োশ্লারির কষ্টকর ব্যবস্থাপনা অনেকাংশেই লাঘব হবে, পরিবেশের উন্নয়ন হবে এবং একইসঙ্গে খামারিরা নিজের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবে। এ লক্ষ্যে তরল জৈব সার ব্যবহারের প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে।

বস্তুত মানসম্মত দুধ ও ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার তৈরিতে এ শিল্পে খামারভেদে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আবিষ্কার অথবা অভিযোজনের দিকে নজর দিতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে শ্রমবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন কৃষি প্রকৌশলীদের নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন, ব্যবহার ও খামার ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রণীত দানাদার শস্য উৎপাদনে যান্ত্রিকীকরণের নীতিমালার পাশাপাশি অতি গুরুত্বপূর্র্ণ হর্টিকালচার ফসল, প্রাণিজ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগে যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা করা প্রয়োজন।

দানাদার শস্য উৎপাদনে যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি অতি গুরুত্বপূর্ণ হর্টিকালচার ফসল, প্রাণিজ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন ব্যবস্থাপনা যান্ত্রিকীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে কৃষি প্রকৌশলীদের জন্য সমন্বিত সুযোগ তৈরি করা হলে দুধ ও ডিম উৎপাদনে টেকসই যান্ত্রিকীকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের পথ সুগম হবে। এর ফলে অবধারিতভাবে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে আরও এগিয়ে যাবে।

ড. চয়ন কুমার সাহা : অধ্যাপক, কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত