করোনাকালে হজ
jugantor
করোনাকালে হজ

  ড. মো. মামুনুর রশীদ  

৩১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বহু দেশ, বহু ভাষাভাষী, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আগত ও বিচিত্র মনমানসিকতা সম্পন্ন মুসলিম উম্মা পবিত্র হজব্রত পালনে মক্কা নগরীতে আসেন।

মানুষের জীবনে মৃত্যু ও জন্ম একবারই, তেমনি একবারের জন্যই হজ ফরজ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ রুকন স্তম্ভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আদায় হয়। অতি সহজে বলা যায়- কথায়, কাজে, দক্ষতা ও প্রজ্ঞায় হজের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক মাপে যুক্ত হয়ে যাই।

এখানেই হজের চ্যালেঞ্জ, আবার দাওয়াইও বটে। হজের ব্যুৎপত্তিগত গূঢ় রহস্য ও ইবাদতের প্রাণ হল- আল্লাহপাকের দেয়া জুতসই পন্থায় মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতার সর্বোচ্চ স্বীকৃত অধিকার অর্জন করা যা প্রত্যেক চ্যালেঞ্জিং কার্যের ফল লাভ থেকে আসে।

পবিত্র কাবাঘরকে কেন্দ্র করে হারাম শরিফ গড়ে উঠেছে, যার পরিধি চারদিকে কয়েক কিমি. পর্যন্ত বিস্তৃত। হজব্রতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ লোকের সমাগম ঘটে, নির্দিষ্ট পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে।

প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইহরামসহ মিনা ও আরাফাতের তাঁবুতে অবস্থান; মুযদালিফার খোলা মাঠে রাত্রিযাপন; যামারাতে পাথর নিক্ষেপ; তাওয়াফ ও অন্যতম নিদর্শন সাফাহ্-মারওয়া সাই করা; কাবার চারদিকে অবস্থিত মসজিদ আল হারাম শরিফে সালাত আদায়; যিকির আসগার করা ও কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি নিয়মবদ্ধ কর্মযজ্ঞই মূল ইবাদত হিসেবে হজের অংশ।

হজের তিনটি ফরজ, ছয়টি ওয়াজিব ও বেশ কিছু সুন্নত চারটি স্থানে একক কর্ম হিসেবে সমষ্টিগতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ছড়ার ছন্দে বলা হয় : ‘তিন চার ছয়, এই তিনে হজ হয়’। কাবাঘরকে কেন্দ্র করে ঠিক নিত্য ঘূর্ণনশীল মহাজাগতিক জ্যোতিষ্কের মতো নিয়মতান্ত্রিক সাতচক্রে এক তাওয়াফ সম্পন্ন হয় এবং এটা সর্বক্ষণ চলমান থাকে।

এখানে মহাবিশ্ব ও পরমাণুর মডেল ধারণা জ্ঞানজগতে কাজ করে বলে মনে হয় অর্থাৎ সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের একাত্মতা প্রকাশ পায় তাওয়াফ কর্মে। এরূপভাবে কেউ ইচ্ছা করলে শতাধিক তাওয়াফ করতে পারেন মোট অবস্থানকালীন আর প্রতি তাওয়াফ চক্রে বূক্নে ইয়ামানীকে স্পর্শ বা ইশারা করা এবং হাযরে আস্ওয়াদ বরাবর ক্ষণকাল অপেক্ষা করা ও দোয়া করা মুখ্যকর্ম।

একটি তাওয়াফে গড়ে সময়ভেদে ১৫ থেকে ৬০ মিনিট লাগে। তাওয়াফ শেষে আল্লাহ্র প্রকৃষ্ট নিদর্শন মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দু’রাকাত সালাত আদায়, যমযমের পানি পান, হাযরে আস্ওয়াদে চুমু দেয়া, হাতিমে সালাত আদায়, মিযাবে রহমতের (ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশনের নল) সন্নিকটে দোয়া, কাবাঘরের দরজা ও মুলতাযাম স্পর্শ করে দোয়া করা ইত্যাদি বহুত মর্তবা ও জ্ঞানের কাজ। তাওয়াফ সমাপনান্তে সাফাহ্-মারওয়া সাতবার দৌড়াতে হয় যা দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান, এখানে সহজেই অনুমেয় দুই পাহাড়েই আরোহণ ও ডিঙ্গিয়ে সাতবার দৌড়ানো! এটা সত্য যে, সাতচক্রে তাওয়াফ এবং সাতবার সাফাহ্-মারওয়া সাই করা, মহাবিশ্বের সাত আসমানের গঠন ও পরিভ্রমণচক্রে আপনারে মহানরূপে যুক্ত করে। এভাবে হজব্রত জীবনে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে একজন মানুষকে মহাবিশ্ব মানের পরাক্রমশালী করে তুলে এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি জ্ঞানগত বিশ্বাস সুদৃঢ় করে।

অধিকন্তু, হজে বিধিবদ্ধ ইবাদতের বাইরে নিয়ত অনুযায়ী অধিক ইবাদত করার স্বাধীনতা দেয়া আছে, যা সূরা বাকারার ১৫৮তম আয়াতের মর্মার্থের অংশবিশেষ। এ পৃথিবীতে যদি পাঁচ দিনে সুসম্পন্ন করার সব ধরনের কঠিন কাজের একটি প্রাইওরিটি তালিকা তৈরি করা হয়, হজ পালন হবে প্রাইওরিটি তালিকার শীর্ষে। অনেক গবেষণা কাজ বা প্রযুক্তি আবিষ্কারেও কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে আর সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একক কর্ম নয়, আবার কিছু ব্যর্থও হয়।

তুলনামূলক একক সম্মিলিত কায়িক ও মেধাশ্রম দ্বারা ঘণ্টায় বাস্তবায়িত কাজের সংখ্যা ও পরিমাণ দ্বারা হজশ্রম ও সার্থকতা প্রমাণ করা যেতে পারে। সঠিক হজ একজন মানুষকে স্মার্ট, বুদ্ধিমান, সুদর্শন, গতিশীল, পবিত্র ও সব জগতে উপযুক্ততা দান করে।

নবী মোহাম্মদ (সা.) বলেন- ‘বিশুদ্ধরূপে সম্পন্ন এক মকবুল হজ সমস্ত দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু অপেক্ষা উত্তম; বেহেস্ত ব্যতীত অন্য কিছুই ইহার বিনিময় হতে পারে না’। পৃথিবী এ বছর মানব শোধনের প্রক্রিয়াগত এ রহমত হারিয়ে ফেলবে, বঞ্চিত হবে দরকারি মানুষের সুন্দর উন্নয়নের বংশানুক্রমিক জ্ঞান ও শ্রমের স্রোতধারা; যেখানে বেগবান হতে পারে ত্রুটিপূর্ণ জীবন প্রক্রিয়া- এখানেই সতর্কতার বিশেষ নজর প্রয়োজন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হজ জীবনে একবারই ফরজ। কেউ এর অধিক করল, তা নফল হিসেবে বিবেচিত হবে’। শরিয়তে আদেশ ক্রমমাত্রায়- ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ও মোস্তাহাব এবং নিষেধ ক্রমমাত্রায়-হারাম ও মাকরুহ আবার নিরপেক্ষ মাত্রায়-মুবাহ। আদেশমাত্রায় নফলের অবস্থান বেশ নিচে।

নফল হিসেবে পরিগণিত তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য সালাত, সিয়াম, সদকা, সব জনসেবামূলক সৎকর্ম ও হজ ইত্যাদি। তাহাজ্জুদ ছাড়া সব ধরনের নফল ইবাদত প্রায় সমমাত্রায় মূল্যায়িত। অতএব, সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা বা পছন্দক্রম থাকায় নিতান্ত আবশ্যক না হলে নফল হজের পরিবর্তে সমমূল্যের সহজতর নফল ইবাদত বেছে নেয়া অনেক ক্ষেত্রেই উত্তম হবে।

এক্ষেত্রে শুধু আর্থিক সামর্থ্য আছে ও শরীর ভালো আছে না ভেবে লোভ, অতিরিক্ত রাষ্ট্রসুবিধা, চালাকিভাব, ইবাদতে প্রদর্শনেচ্ছা মনোভাব, সংসার বিরাগী মনোভাব, লালসা, আসক্তি, আত্মগর্ব, সুখ্যাতি, ভ্রমণবিলাস বা আনন্দদায়ক অনিত্য বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় সাধারণ নফল হজ পালন না করা অনেক ভালো। সংসারধর্মে মানুষ নানাভাবে উপরিল্লেখিত প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

আর আল্লাহর হেদায়েতের পরিবর্তে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণই মানুষের ধ্বংসের কারণ। আবার অনুসরণ কখনও কারও নিজ প্রবৃত্তির সৃষ্টি, কারও প্রবঞ্চনায়, কারও ক্ষমতা বা শক্তি প্রয়োগের ভুল ফসল।

প্রবৃত্তি দমন ও বেহেস্ত পুরস্কারে হজ জ্ঞান, প্রমাণ ও কোরআন-সুন্নাহ আলোকে হোক, এটিই সমীচীন। উল্লেখ্য, এরূপ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাবান আলেমের সাহায্য নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সেই আলেম, যে আল্লাহর কালাম নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তাঁর ইবাদত পালন করে এবং তাঁর অসন্তুষ্টির কাজ থেকে বিরত থাকে।

পবিত্র কাবাগৃহে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আউয়াল ওয়াক্তে হয় বা সালাত সময়সূচির প্রথম ভাগেই সম্পন্ন হয়। হাজীগণ মসজিদুল হেরেম শরিফের চারদিকে অবস্থিত হোটেলে অবস্থান করেন এবং হেঁটে হেঁটে মসজিদে আসেন। এ ঋতুতে (১৪৪০ বা ১৪৪১ হি.) হেরেম এলাকায় তাপমাত্রা পূর্বাভাসে প্রায় ৩০০-৪৮০ সে. প্রান্তসীমার মধ্যে ওঠা-নামা করতে দেখা যায়।

হজে বর্তমানে পুরুষ হাজীর সংখ্যা বেশি হলেও দিন দিন মহিলা হাজীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক হাজীর উপস্থিতিতে হজ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বজায় রাখা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধৈর্যসহকারে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

নানা দেশের, নানা ভাষাভাষী, সংস্কৃতি ও হাজীদের আচার-আচরণ বিভিন্ন হওয়ায় নামাজে নারী-পুরুষদের নির্ধারিত স্থানে বসানো, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, তাওয়াফ ও সাই করানো, হাজীদের জমজমের পানি সংগ্রহ, মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে সালাত আদায়, জমজমের পানি পান, হাযরে আস্ওয়াদে চুমু দেয়া, হাতিমে সালাত আদায়, মীযাবে রহমতের সন্নিকটে দোয়া, কাবাঘরের দরজা ও মুলতাযাম স্পর্শ করে দোয়া করা, আল হারামের বিভিন্ন তলায় ও নামাজের স্থানে হাজীর সংখ্যা আনুপাতিকভাবে নিরূপণ ইত্যাদি কাজে নিরাপত্তা বাহিনী ও সহায়তাকারীদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়।

এছাড়াও নামাজের সময় হাজীগণ চলাচলের রাস্তায় নামাজের কাতার করেন অথবা হেরেম ভবনে প্রবেশের পাঁচটি মূল গেট এবং অসংখ্য ছোট ছোট গেটসহ অভ্যন্তরীণ গেট (২১০টির অধিক) দিয়ে অনুপ্রবেশের সম্মুখ স্থানে বসেন। সমভাবে চারদিকে হেরেম প্রবেশ পথে, মসজিদের গেট সংলগ্ন নামাজ প্রাঙ্গণে ও নির্দিষ্ট তাওয়াফ পথেও অধিকসংখ্যক হাজী বসে পড়েন। দূর-দুরান্ত থেকে হেঁটে বিরূপ আবহাওয়ায় মসজিদে আসতে হয় বিধায় হাজীগণও ক্লান্ত থাকেন।

যথাযথভাবে কাতারবন্দি না হওয়া অথবা এলোমেলোভাবে বসার কারণে সালাত ও চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এমন কাজে নিরাপত্তা কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। অনুরূপভাবে হেরেমের বাইরে মিনা ও আরাফাতে অবস্থান, মুযদালিফার খোলা মাঠে রাতযাপন, যামারাতে পাথর নিক্ষেপ ইত্যাদি বিধিবদ্ধ ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞসহ এসব স্থানে যাতায়াতে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী হাজীদের সহায়তা দিয়ে থাকেন।

এখানে উল্লেখ্য, হেরেম শরিফে সালাত শুরু ও আজানের মধ্যে তেমন সময় দেয়া হয় না; এশার সালাত আজানের প্রায় পরপরই অনুষ্ঠিত হয়। আর সালাত অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক আয়াতে সম্পন্ন করা হয়। জামাতে সালাত শেষ হলেই কাতার ভেঙে যায়।

সুন্নত সালাতে তেমন সময় দেয়া হয় না, যা ইচ্ছে করলে কেউ হোটেল, বাসায় অথবা ফরজ সালাতের পর মসজিদের নির্ধারিত স্থানগুলোতে আদায় করতে পারেন। এ ব্যবস্থা রাসূলের কাল থেকেই অব্যাহত আছে যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমন্বিত করা হয়েছে বলে মনে হয়। এমতাবস্থায়, হাজীদের গমনাগমনে, সঠিক জায়গায় নামাজের সারি করতে ও বসতে তথা সার্বিকভাবে সুব্যবস্থায় আনতে নিরাপত্তারক্ষী ও সহায়তাকারীরা কিছু বন্দোবস্ত ও নির্দেশমূলক শব্দ ব্যবহার করেন।

যেহেতু নিরাপত্তারক্ষীদের ভাষা আরবি, তাই তাদের নির্দেশগুলো অন্য ভাষাভাষীর হাজীগণ সহজে বুঝতে পারেন না। তবে, বিপুলসংখ্যক হাজীকে সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যে ‘সবর’ (ধৈর্য) শব্দটি সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়, যা সবাই বোঝে। এক্ষেত্রে, হজে বাংলাদেশি হাজীগণ বেশি সুবিধা পান।

হাজীদের উদ্দেশে নিরাপত্তারক্ষী ও সহায়তাকারীরা ‘উঠ্ উঠ্, রাস্তা রাস্তা, সিদা সিদা, যাও যাও, জাগা খালি’ ইত্যাদি বাংলা শব্দ সুবিন্যস্তকরণে ব্যবহার করেন, যা সব দেশের ও সব ভাষাভাষী মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হচ্ছে। অবাক করার বিষয়, এ শব্দগুলো অনেক ভাষাভাষী মানুষের কাছেই পরিচিত হয়ে উঠেছে এবং তা যথাযথভাবে হাজীগণ অনুসরণ করছেন।

এ শব্দগুলো বাংলাদেশি যারা দীর্ঘদিন যাবত সৌদিতে বসবাস করছেন তাদের কাছ থেকেই শিখে নিয়েছেন। এভাবে বাংলা শব্দ মসজিদ আল হারামে সালাতের জামাত, মসজিদের আদবসহ হজক্রমে হাজীদের সুশৃঙ্খলে আনতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হজের তিনটি ফরজ, চারটি স্থানে ও ছয়টি ওয়াজিবসহ বেশ কিছু সুন্নত আদায়ের প্রস্তুত প্রক্রিয়াতেও শব্দগুলো প্রয়োগ হচ্ছে বলে দেখা গেছে।

হজ প্রক্রিয়ায় অনেক মু’জিযা দেখা যায়। ইল্ম (সত্য জ্ঞান) অন্বেষণকারী ব্যক্তি মু’জিযা দেখতে পান যা ঈমানের ভিত্তিকে চাক্ষুষমান ও দৃঢ় করে। হজে একটি উচ্চ মজেযার বিষয় হল : এত বিপুলসংখ্যক ও নানা বৈচিত্র্যের মানুষের সমাগম; সেখানে নিরাপদে হাজীগণ বিধিবদ্ধ বিধানে বহুসংখ্যক ইবাদত কর্মযজ্ঞ অর্থপূর্ণ সূচকে সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে স্বাধীনভাবেই সম্পন্ন করছেন।

এ ঐক্যের গূঢ় মন্ত্রে বিস্মিত, অভিভূত ও কৃতজ্ঞ হতে হয়। মহা অন্তরীক্ষ যেমন নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে অনবরত সুবিন্যস্তভাবে কোনো একটিকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করছে, তেমনি জনতার এ মহাসমুদ্র সুশৃঙ্খল ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কোথা থেকে যেন সার্বক্ষণিক দেখভাল হচ্ছে।

বর্তমানে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী এক মহাআতঙ্ক। এ মুসিবত দিয়ে আল্লাহপাক আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমাদের আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য পূর্ণ সতর্কতা নিয়ে নানা মেহনতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বন করতে হবে।

এমতাবস্থায় বড় অতৃপ্তির বিষয় হল- এ বছর কোভিডে ভিন্নধারায় হজ হচ্ছে, থাকছে না আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। বিশ্ববাসী বঞ্চিত হবে নানা সুবিধা থেকে, শুনতে পাবে না- ‘উঠ্ উঠ্, রাস্তা রাস্তা, সিদা সিদা, যাও যাও, জাগা খালি’।

ভাষার কোনো আবিষ্কারক নেই, আল্লাহপাক ভাষা দিয়েছেন মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য আনতে, সেটি দেখা যায় পবিত্র এ হেরেম শরিফেও। হে পুণ্যময় ও সব রাজত্বের মালিক সর্বশক্তিমান আল্লাহ, আমাদের জীবনকে সহজ করুন, পাপ মোচন করুন, ক্ষমা করুন, দয়া করুন ও হজসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে যারা থাকেন, সবাইকে সাহায্য করুন, আমীন। ছুম্মা আমীন।।

ড. মো. মামুনুর রশীদ : অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

mamunur_hstu@yahoo.com

করোনাকালে হজ

 ড. মো. মামুনুর রশীদ 
৩১ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বহু দেশ, বহু ভাষাভাষী, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আগত ও বিচিত্র মনমানসিকতা সম্পন্ন মুসলিম উম্মা পবিত্র হজব্রত পালনে মক্কা নগরীতে আসেন।

মানুষের জীবনে মৃত্যু ও জন্ম একবারই, তেমনি একবারের জন্যই হজ ফরজ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ রুকন স্তম্ভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আদায় হয়। অতি সহজে বলা যায়- কথায়, কাজে, দক্ষতা ও প্রজ্ঞায় হজের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক মাপে যুক্ত হয়ে যাই।

এখানেই হজের চ্যালেঞ্জ, আবার দাওয়াইও বটে। হজের ব্যুৎপত্তিগত গূঢ় রহস্য ও ইবাদতের প্রাণ হল- আল্লাহপাকের দেয়া জুতসই পন্থায় মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতার সর্বোচ্চ স্বীকৃত অধিকার অর্জন করা যা প্রত্যেক চ্যালেঞ্জিং কার্যের ফল লাভ থেকে আসে।

পবিত্র কাবাঘরকে কেন্দ্র করে হারাম শরিফ গড়ে উঠেছে, যার পরিধি চারদিকে কয়েক কিমি. পর্যন্ত বিস্তৃত। হজব্রতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ লোকের সমাগম ঘটে, নির্দিষ্ট পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে।

প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইহরামসহ মিনা ও আরাফাতের তাঁবুতে অবস্থান; মুযদালিফার খোলা মাঠে রাত্রিযাপন; যামারাতে পাথর নিক্ষেপ; তাওয়াফ ও অন্যতম নিদর্শন সাফাহ্-মারওয়া সাই করা; কাবার চারদিকে অবস্থিত মসজিদ আল হারাম শরিফে সালাত আদায়; যিকির আসগার করা ও কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি নিয়মবদ্ধ কর্মযজ্ঞই মূল ইবাদত হিসেবে হজের অংশ।

হজের তিনটি ফরজ, ছয়টি ওয়াজিব ও বেশ কিছু সুন্নত চারটি স্থানে একক কর্ম হিসেবে সমষ্টিগতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ছড়ার ছন্দে বলা হয় : ‘তিন চার ছয়, এই তিনে হজ হয়’। কাবাঘরকে কেন্দ্র করে ঠিক নিত্য ঘূর্ণনশীল মহাজাগতিক জ্যোতিষ্কের মতো নিয়মতান্ত্রিক সাতচক্রে এক তাওয়াফ সম্পন্ন হয় এবং এটা সর্বক্ষণ চলমান থাকে।

এখানে মহাবিশ্ব ও পরমাণুর মডেল ধারণা জ্ঞানজগতে কাজ করে বলে মনে হয় অর্থাৎ সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের একাত্মতা প্রকাশ পায় তাওয়াফ কর্মে। এরূপভাবে কেউ ইচ্ছা করলে শতাধিক তাওয়াফ করতে পারেন মোট অবস্থানকালীন আর প্রতি তাওয়াফ চক্রে বূক্নে ইয়ামানীকে স্পর্শ বা ইশারা করা এবং হাযরে আস্ওয়াদ বরাবর ক্ষণকাল অপেক্ষা করা ও দোয়া করা মুখ্যকর্ম।

একটি তাওয়াফে গড়ে সময়ভেদে ১৫ থেকে ৬০ মিনিট লাগে। তাওয়াফ শেষে আল্লাহ্র প্রকৃষ্ট নিদর্শন মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দু’রাকাত সালাত আদায়, যমযমের পানি পান, হাযরে আস্ওয়াদে চুমু দেয়া, হাতিমে সালাত আদায়, মিযাবে রহমতের (ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশনের নল) সন্নিকটে দোয়া, কাবাঘরের দরজা ও মুলতাযাম স্পর্শ করে দোয়া করা ইত্যাদি বহুত মর্তবা ও জ্ঞানের কাজ। তাওয়াফ সমাপনান্তে সাফাহ্-মারওয়া সাতবার দৌড়াতে হয় যা দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান, এখানে সহজেই অনুমেয় দুই পাহাড়েই আরোহণ ও ডিঙ্গিয়ে সাতবার দৌড়ানো! এটা সত্য যে, সাতচক্রে তাওয়াফ এবং সাতবার সাফাহ্-মারওয়া সাই করা, মহাবিশ্বের সাত আসমানের গঠন ও পরিভ্রমণচক্রে আপনারে মহানরূপে যুক্ত করে। এভাবে হজব্রত জীবনে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে একজন মানুষকে মহাবিশ্ব মানের পরাক্রমশালী করে তুলে এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি জ্ঞানগত বিশ্বাস সুদৃঢ় করে।

অধিকন্তু, হজে বিধিবদ্ধ ইবাদতের বাইরে নিয়ত অনুযায়ী অধিক ইবাদত করার স্বাধীনতা দেয়া আছে, যা সূরা বাকারার ১৫৮তম আয়াতের মর্মার্থের অংশবিশেষ। এ পৃথিবীতে যদি পাঁচ দিনে সুসম্পন্ন করার সব ধরনের কঠিন কাজের একটি প্রাইওরিটি তালিকা তৈরি করা হয়, হজ পালন হবে প্রাইওরিটি তালিকার শীর্ষে। অনেক গবেষণা কাজ বা প্রযুক্তি আবিষ্কারেও কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে আর সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একক কর্ম নয়, আবার কিছু ব্যর্থও হয়।

তুলনামূলক একক সম্মিলিত কায়িক ও মেধাশ্রম দ্বারা ঘণ্টায় বাস্তবায়িত কাজের সংখ্যা ও পরিমাণ দ্বারা হজশ্রম ও সার্থকতা প্রমাণ করা যেতে পারে। সঠিক হজ একজন মানুষকে স্মার্ট, বুদ্ধিমান, সুদর্শন, গতিশীল, পবিত্র ও সব জগতে উপযুক্ততা দান করে।

নবী মোহাম্মদ (সা.) বলেন- ‘বিশুদ্ধরূপে সম্পন্ন এক মকবুল হজ সমস্ত দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু অপেক্ষা উত্তম; বেহেস্ত ব্যতীত অন্য কিছুই ইহার বিনিময় হতে পারে না’। পৃথিবী এ বছর মানব শোধনের প্রক্রিয়াগত এ রহমত হারিয়ে ফেলবে, বঞ্চিত হবে দরকারি মানুষের সুন্দর উন্নয়নের বংশানুক্রমিক জ্ঞান ও শ্রমের স্রোতধারা; যেখানে বেগবান হতে পারে ত্রুটিপূর্ণ জীবন প্রক্রিয়া- এখানেই সতর্কতার বিশেষ নজর প্রয়োজন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হজ জীবনে একবারই ফরজ। কেউ এর অধিক করল, তা নফল হিসেবে বিবেচিত হবে’। শরিয়তে আদেশ ক্রমমাত্রায়- ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ও মোস্তাহাব এবং নিষেধ ক্রমমাত্রায়-হারাম ও মাকরুহ আবার নিরপেক্ষ মাত্রায়-মুবাহ। আদেশমাত্রায় নফলের অবস্থান বেশ নিচে।

নফল হিসেবে পরিগণিত তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য সালাত, সিয়াম, সদকা, সব জনসেবামূলক সৎকর্ম ও হজ ইত্যাদি। তাহাজ্জুদ ছাড়া সব ধরনের নফল ইবাদত প্রায় সমমাত্রায় মূল্যায়িত। অতএব, সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা বা পছন্দক্রম থাকায় নিতান্ত আবশ্যক না হলে নফল হজের পরিবর্তে সমমূল্যের সহজতর নফল ইবাদত বেছে নেয়া অনেক ক্ষেত্রেই উত্তম হবে।

এক্ষেত্রে শুধু আর্থিক সামর্থ্য আছে ও শরীর ভালো আছে না ভেবে লোভ, অতিরিক্ত রাষ্ট্রসুবিধা, চালাকিভাব, ইবাদতে প্রদর্শনেচ্ছা মনোভাব, সংসার বিরাগী মনোভাব, লালসা, আসক্তি, আত্মগর্ব, সুখ্যাতি, ভ্রমণবিলাস বা আনন্দদায়ক অনিত্য বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় সাধারণ নফল হজ পালন না করা অনেক ভালো। সংসারধর্মে মানুষ নানাভাবে উপরিল্লেখিত প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

আর আল্লাহর হেদায়েতের পরিবর্তে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণই মানুষের ধ্বংসের কারণ। আবার অনুসরণ কখনও কারও নিজ প্রবৃত্তির সৃষ্টি, কারও প্রবঞ্চনায়, কারও ক্ষমতা বা শক্তি প্রয়োগের ভুল ফসল।

প্রবৃত্তি দমন ও বেহেস্ত পুরস্কারে হজ জ্ঞান, প্রমাণ ও কোরআন-সুন্নাহ আলোকে হোক, এটিই সমীচীন। উল্লেখ্য, এরূপ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাবান আলেমের সাহায্য নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সেই আলেম, যে আল্লাহর কালাম নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তাঁর ইবাদত পালন করে এবং তাঁর অসন্তুষ্টির কাজ থেকে বিরত থাকে।

পবিত্র কাবাগৃহে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আউয়াল ওয়াক্তে হয় বা সালাত সময়সূচির প্রথম ভাগেই সম্পন্ন হয়। হাজীগণ মসজিদুল হেরেম শরিফের চারদিকে অবস্থিত হোটেলে অবস্থান করেন এবং হেঁটে হেঁটে মসজিদে আসেন। এ ঋতুতে (১৪৪০ বা ১৪৪১ হি.) হেরেম এলাকায় তাপমাত্রা পূর্বাভাসে প্রায় ৩০০-৪৮০ সে. প্রান্তসীমার মধ্যে ওঠা-নামা করতে দেখা যায়।

হজে বর্তমানে পুরুষ হাজীর সংখ্যা বেশি হলেও দিন দিন মহিলা হাজীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক হাজীর উপস্থিতিতে হজ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বজায় রাখা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধৈর্যসহকারে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

নানা দেশের, নানা ভাষাভাষী, সংস্কৃতি ও হাজীদের আচার-আচরণ বিভিন্ন হওয়ায় নামাজে নারী-পুরুষদের নির্ধারিত স্থানে বসানো, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, তাওয়াফ ও সাই করানো, হাজীদের জমজমের পানি সংগ্রহ, মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে সালাত আদায়, জমজমের পানি পান, হাযরে আস্ওয়াদে চুমু দেয়া, হাতিমে সালাত আদায়, মীযাবে রহমতের সন্নিকটে দোয়া, কাবাঘরের দরজা ও মুলতাযাম স্পর্শ করে দোয়া করা, আল হারামের বিভিন্ন তলায় ও নামাজের স্থানে হাজীর সংখ্যা আনুপাতিকভাবে নিরূপণ ইত্যাদি কাজে নিরাপত্তা বাহিনী ও সহায়তাকারীদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়।

এছাড়াও নামাজের সময় হাজীগণ চলাচলের রাস্তায় নামাজের কাতার করেন অথবা হেরেম ভবনে প্রবেশের পাঁচটি মূল গেট এবং অসংখ্য ছোট ছোট গেটসহ অভ্যন্তরীণ গেট (২১০টির অধিক) দিয়ে অনুপ্রবেশের সম্মুখ স্থানে বসেন। সমভাবে চারদিকে হেরেম প্রবেশ পথে, মসজিদের গেট সংলগ্ন নামাজ প্রাঙ্গণে ও নির্দিষ্ট তাওয়াফ পথেও অধিকসংখ্যক হাজী বসে পড়েন। দূর-দুরান্ত থেকে হেঁটে বিরূপ আবহাওয়ায় মসজিদে আসতে হয় বিধায় হাজীগণও ক্লান্ত থাকেন।

যথাযথভাবে কাতারবন্দি না হওয়া অথবা এলোমেলোভাবে বসার কারণে সালাত ও চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এমন কাজে নিরাপত্তা কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। অনুরূপভাবে হেরেমের বাইরে মিনা ও আরাফাতে অবস্থান, মুযদালিফার খোলা মাঠে রাতযাপন, যামারাতে পাথর নিক্ষেপ ইত্যাদি বিধিবদ্ধ ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞসহ এসব স্থানে যাতায়াতে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী হাজীদের সহায়তা দিয়ে থাকেন।

এখানে উল্লেখ্য, হেরেম শরিফে সালাত শুরু ও আজানের মধ্যে তেমন সময় দেয়া হয় না; এশার সালাত আজানের প্রায় পরপরই অনুষ্ঠিত হয়। আর সালাত অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক আয়াতে সম্পন্ন করা হয়। জামাতে সালাত শেষ হলেই কাতার ভেঙে যায়।

সুন্নত সালাতে তেমন সময় দেয়া হয় না, যা ইচ্ছে করলে কেউ হোটেল, বাসায় অথবা ফরজ সালাতের পর মসজিদের নির্ধারিত স্থানগুলোতে আদায় করতে পারেন। এ ব্যবস্থা রাসূলের কাল থেকেই অব্যাহত আছে যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমন্বিত করা হয়েছে বলে মনে হয়। এমতাবস্থায়, হাজীদের গমনাগমনে, সঠিক জায়গায় নামাজের সারি করতে ও বসতে তথা সার্বিকভাবে সুব্যবস্থায় আনতে নিরাপত্তারক্ষী ও সহায়তাকারীরা কিছু বন্দোবস্ত ও নির্দেশমূলক শব্দ ব্যবহার করেন।

যেহেতু নিরাপত্তারক্ষীদের ভাষা আরবি, তাই তাদের নির্দেশগুলো অন্য ভাষাভাষীর হাজীগণ সহজে বুঝতে পারেন না। তবে, বিপুলসংখ্যক হাজীকে সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যে ‘সবর’ (ধৈর্য) শব্দটি সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়, যা সবাই বোঝে। এক্ষেত্রে, হজে বাংলাদেশি হাজীগণ বেশি সুবিধা পান।

হাজীদের উদ্দেশে নিরাপত্তারক্ষী ও সহায়তাকারীরা ‘উঠ্ উঠ্, রাস্তা রাস্তা, সিদা সিদা, যাও যাও, জাগা খালি’ ইত্যাদি বাংলা শব্দ সুবিন্যস্তকরণে ব্যবহার করেন, যা সব দেশের ও সব ভাষাভাষী মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হচ্ছে। অবাক করার বিষয়, এ শব্দগুলো অনেক ভাষাভাষী মানুষের কাছেই পরিচিত হয়ে উঠেছে এবং তা যথাযথভাবে হাজীগণ অনুসরণ করছেন।

এ শব্দগুলো বাংলাদেশি যারা দীর্ঘদিন যাবত সৌদিতে বসবাস করছেন তাদের কাছ থেকেই শিখে নিয়েছেন। এভাবে বাংলা শব্দ মসজিদ আল হারামে সালাতের জামাত, মসজিদের আদবসহ হজক্রমে হাজীদের সুশৃঙ্খলে আনতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হজের তিনটি ফরজ, চারটি স্থানে ও ছয়টি ওয়াজিবসহ বেশ কিছু সুন্নত আদায়ের প্রস্তুত প্রক্রিয়াতেও শব্দগুলো প্রয়োগ হচ্ছে বলে দেখা গেছে।

হজ প্রক্রিয়ায় অনেক মু’জিযা দেখা যায়। ইল্ম (সত্য জ্ঞান) অন্বেষণকারী ব্যক্তি মু’জিযা দেখতে পান যা ঈমানের ভিত্তিকে চাক্ষুষমান ও দৃঢ় করে। হজে একটি উচ্চ মজেযার বিষয় হল : এত বিপুলসংখ্যক ও নানা বৈচিত্র্যের মানুষের সমাগম; সেখানে নিরাপদে হাজীগণ বিধিবদ্ধ বিধানে বহুসংখ্যক ইবাদত কর্মযজ্ঞ অর্থপূর্ণ সূচকে সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে স্বাধীনভাবেই সম্পন্ন করছেন।

এ ঐক্যের গূঢ় মন্ত্রে বিস্মিত, অভিভূত ও কৃতজ্ঞ হতে হয়। মহা অন্তরীক্ষ যেমন নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে অনবরত সুবিন্যস্তভাবে কোনো একটিকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করছে, তেমনি জনতার এ মহাসমুদ্র সুশৃঙ্খল ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কোথা থেকে যেন সার্বক্ষণিক দেখভাল হচ্ছে।

বর্তমানে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী এক মহাআতঙ্ক। এ মুসিবত দিয়ে আল্লাহপাক আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমাদের আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য পূর্ণ সতর্কতা নিয়ে নানা মেহনতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বন করতে হবে।

এমতাবস্থায় বড় অতৃপ্তির বিষয় হল- এ বছর কোভিডে ভিন্নধারায় হজ হচ্ছে, থাকছে না আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। বিশ্ববাসী বঞ্চিত হবে নানা সুবিধা থেকে, শুনতে পাবে না- ‘উঠ্ উঠ্, রাস্তা রাস্তা, সিদা সিদা, যাও যাও, জাগা খালি’।

ভাষার কোনো আবিষ্কারক নেই, আল্লাহপাক ভাষা দিয়েছেন মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য আনতে, সেটি দেখা যায় পবিত্র এ হেরেম শরিফেও। হে পুণ্যময় ও সব রাজত্বের মালিক সর্বশক্তিমান আল্লাহ, আমাদের জীবনকে সহজ করুন, পাপ মোচন করুন, ক্ষমা করুন, দয়া করুন ও হজসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে যারা থাকেন, সবাইকে সাহায্য করুন, আমীন। ছুম্মা আমীন।।

ড. মো. মামুনুর রশীদ : অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

mamunur_hstu@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস