করোনা অনেক কিছু উন্মোচন করেছে

  খান মাহবুব ০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘বিপদে বন্ধুর পরিচয়’- এ প্রবাদ করোনাকালে বাঙালিকে নতুন করে অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। একইসঙ্গে করোনার দুর্দিনে মানুষ মানবতার যৎসামান্য দেখলেও অবাক বিস্ময়ে দেখেছে কীভাবে দুর্যোগকে পুঁজি করে মানুষ লুটপাটের ফাঁদ পাততে পারে।

মানুষের জীবন-জীবিকা যখন একসঙ্গে অস্তিত্ব নিয়ে সুতার ওপর দোদুল্যমান, এমন ভয়াবহ সময়েও মানুষ কতটা নির্দয় হতে পারে অবস্থা না দেখলে অনুমান করা যায় না। সঙ্গীন সাধারণ মানুষ গানের কথার মতো ‘চিন্তায় চিন্তায় কাটছে দিনটায়’। আর ভুয়া করোনা রিপোর্ট দিয়ে (রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক) সাহেদ গং অসহায় মানুষকে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর দিকে। বাস্তবতায় এক সাহেদ মুখে মুখে; কিন্তু অনেক সাহেদ আছে গোপনে বা বুক ফুলিয়ে। দেরিতে হলেও সাহেদ ধরা পড়েছে- এটি স্বস্তির; কিন্তু সাহেদ কেমন করে এত ফুলেফেঁপে উঠল- এমন প্রশ্ন তো উঠতেই পারে।

সাহেদের নিন্দাচর্চা এখন মানুষের মুখে মুখে; কিন্তু ভাবুন কী নিপুণতার সঙ্গেই না এ বাটপার জাতির ক্ষতি করেছে। করোনার টেস্ট ও চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও চুক্তি করেছে। অন্য কাগজপত্র যাই হোক না কেন, চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হলে পড়ে, বুঝে, সজ্ঞানেই মানুষ করে থাকে- এটাই রীতি। নানাবিধ জালিয়াতির সঙ্গে সাহেদের সংযোগ। শুধু করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট নয় বরং করোনার চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত কোটি টাকার ওপরে সরবরাহের কাজ নেয়ার তদবিরও ছিল তার। সাহেদের মূল পুঁজি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সখ্য এবং হাস্যোজ্জ্ব¡ল স্থিরচিত্র। এ কথা সত্য, বড় কর্তারা নানা কারণে হয়তো তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে, ছবি তুলেছে, কে ছবি তুলছে লক্ষ রাখা সম্ভব হয়নি; কিন্তু যারা এসবের সুযোগ তৈরি করে দেন; তাদের তালিকাটাও সামনে আসা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন তাদের নাম, যারা সাহেদকে টকশোয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক বানিয়েছেন। কেন এত বিলম্বে সাহেদ নজরে এলো- এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে বাস্তবতার নিরিখে এ কথা সত্য, বাটপারি-জালিয়াতি যদি একটা কর্ম হয় সাহেদ তার নিপুণ কারিগর।

সবচেয়ে বড় কথা, বাঙালিকে বিধাতা অপরিমেয় সহন ক্ষমতা দিয়েছেন। আমরা বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি সহ্য করেছি। ফারমার্স ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, রানা প্লাজার-রূপ সহ্য করেছি, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি সহ্য করেছি, হলমার্কসহ নানা ধরনের কেলেঙ্কারিতে সাধারণ মানুষের নাকাল দশা। গত দশ বছরে শুধু ব্যাংক খাতের ১০টি বড় কেলেঙ্কারিতে লোপাট হয়েছে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। এসব আমাদের কাছে এখন সহজ বিষয়। করোনাকালে মধ্যবিত্ত ও নিরন্ন মানুষের একটু উষ্ণতার আকাক্সক্ষা ছিল উচ্চবিত্তের কাছে; কিন্তু সেটি কাম্য মাত্রায় পাওয়া যায়নি।

সরকার সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে করোনাকালে জনগণকে সহযোগিতার জন্য। মোট ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ সাহসী পদক্ষেপ; কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে তৃণমূলের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের একটা অংশ বরাদ্দ বণ্টনের দায়িত্বে পেয়ে হরিলুটের রাজ্য কায়েম করেছে। কারও বাড়িতে তেলের খনি, চালের খনির সন্ধান মিলেছে। সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এ দেশ! এরা নিজেদের সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করে শ্রেণিশত্রুতে পরিণত হয়েছে। অন্যথায় সরকারের সহায়তার সুষম বণ্টন হলে নিরন্ন মানুষের অনিশ্চিত অপলক চেয়ে থাকা দেখতে হতো না।

জীবনের গতিই জীবনের শাশ্বত সত্য। দুর্যোগ, যুদ্ধবিগ্রহ সবকিছুর মধ্যে জীবনকে টেনে নিতে হয়- এটাই বাস্তবতা। করোনার দীর্ঘকালীন অবস্থানে আজ সংক্রমণ হার বাড়লেও লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধি- এসব শব্দগুলোর উচ্চারণ কমতে শুরু করেছে। করোনার অবস্থার পরিবর্তন না হলেও জীবনযাত্রার গতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে চলছে। এ যেন টিকে থাকার প্রয়োজনে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।

মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের হাপিত্যেশের জীবনে করোনার তাণ্ডবে ইজ্জত-আবরু নিয়ে বাঁচাই দুষ্কর। ইজ্জত ও জীবন একসঙ্গে করোনাকালে রক্ষা করা দুরূহ। মধ্যবিত্তের সহায়তা প্রয়োজন; কিন্তু হাত পাতলে, লোকে দেখলে কী ভাববে- এ ভাবনায় নিবৃত্ত হতে হয় তাকে। তাদের ‘কুল রাখি না শ্যাম রাখি’ অবস্থা। ইতোমধ্যে মধ্যবিত্ত যে উৎসবগুলো আবেগ-ভালোবাসা দিয়ে মান্য করত আপাতত তারও যবনিকাপাত ঘটেছে। করোনাকালের নববর্ষ, ঈদ-সবই চিরায়ত রূপ হারিয়ে বিবর্ণ হয়েছে। মধ্যবিত্তের জীবনের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে করোনা।

মধ্যবিত্তের মধ্যে বোধ ও বোধনের দিক থেকে উচ্চমার্গীয় একশ্রেণির সৃজনমনস্ক মধ্যবিত্ত। এদের অনেকেই নানন্দিক শিল্পের চর্চার মাধ্যমে জীবিকার খোঁজ নেয়। এর মধ্যে লেখক-প্রকাশক, শিল্পী, নকশাকারকসহ অনেকেই আছেন। করোনা এদের জীবিকাকে শুধু প্রভাবিতই করেনি, সৃজনের চিন্তার জমিনটুকুও সংকুচিত করেছে। বলা হয়ে থাকে, লেখক-প্রকাশক ও শিল্পীরা দেশজ সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে তার প্রসার ঘটায়, সরকার তাই এ শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি লৌকিকভাবে সদয় দৃষ্টি দেয়; কিন্তু করোনাকালে হতাশ হয়েছি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নার গড়ার জন্য বই ক্রয়ে ১৫০ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে গুটিকয়েক বই প্রকাশককে বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছে। মূলত কয়েকজনের জন্য বিপুল অঙ্কের বই বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপনসহ রীতিশুদ্ধ নীতির মান্যতা না করে একক উৎস নীতিতে বই ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি ও দেশের প্রথিতযশা সৃজনশীল লেখকদের প্রতিবাদে বিষয়টি আপাতত ঢিলেতালে চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এখন প্রশ্ন- কেন সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মারফত গ্রন্থতালিকা আহ্বান করে বিবেচ্য সব বইকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আনা হল না, কেন বিষয়টি সর্বজনীন হল না? এখন বিলম্বে হলেও সবার প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষ বিষয়টির একটি যৌক্তিক ও রীতিশুদ্ধ পদ্ধতি অবলম্বন করে অগ্রসর হবে। কেউ অতিরিক্ত সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে-সরকারের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ হতে পারে না। কোনো বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর সুবিধাপ্রাপ্তির তৎপরতা থাকতেই পারে; কিন্তু কর্তৃপক্ষ সবার প্রতি সমআবেদনের জন্য উদ্যোগী হবে- এমন আশা তো আমরা করতেই পারি।

বাঙালির একটা জাতীয় চরিত্র হচ্ছে- যখন কোনো সমস্যায় গভীরভাবে নিপতিত হই, তখনই টনক নড়ে। এ কালচার আমাদের বহমান সংস্কৃতির অংশ। করোনা না এলে আমরা বুঝতাম না দেশের স্বাস্থ্য খাত কতটা নাজুক। নিুমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বাজেট নিতান্ত কম নয়। অথচ সেবার জন্য ওষুধ ও যন্ত্রপাতির যেটুকু রবাদ্দ, তার কিয়দংশও নেই। হাসপাতালে লাইফ সাপোর্ট ইউনিট সীমিত থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর। হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রীর অর্থ গিলে খাচ্ছে ‘মিঠু’ ও ‘সাহেদ’ গং। চিকিৎসা খাতে চলছে নৈরাজ্য। এসব দেখার কেউ নেই। মাঝে মাঝে দু-একটা বিষয় সংবাদে এলে হইচই পড়ে যায়; কিন্তু কত জালিয়াতি, কত ভোজবাজি চলে এ সমাজে, কে খবর রাখে। রাষ্ট্রযন্ত্র যতই সুশাসন, দক্ষতা, শুদ্ধাচার, কৃচ্ছ্র, অপব্যবহার রোধ, দুর্নীতিরোধ, জবাবদিহিসহ নানা হেদায়েত মঞ্জুরি প্রচার করুক না কেন, দুর্বৃত্তরা একাট্টা। সাহেদ, ডা. সাবরিনা গং একটা নমুনা মাত্র। এ রকম অনেক সাহেদ ঘাপটি মেরে বসে আছে দেশের প্রতিটি সেক্টরে। আমাদের নীতিনৈতিকতা উন্নয়ন দর্শন সবকিছ–কে পিছিয়ে দিচ্ছে- তাও আবার আমাদের সঙ্গে নিয়েই। মতলববাজরা করোনার দুর্যোগে ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দিচ্ছে। আর জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে গত তিন মাসে ঢাকা ছেড়েছে অনেক সাধারণ মানুষ। এ মানুষ কী সহসাই নাগরিক সুবিধার জন্য আবার গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে পারবে- আমি এর উত্তর জানি না।

সরকারের উচিত করোনা-পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখার চেয়ে জীবিকা ও সুষম টিকে থাকার ওপর অগ্রাধিকার দেয়া। কারণ, আমরা না চাইলেও করোনা-পরবর্তী প্রবৃদ্ধি অর্ধেকে নেমে আসবে- বিশেষজ্ঞদের এমন ধারণা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান সত্য হলে প্রতিদিন কম-বেশি খাদ্য সংকটে ১২ হাজার মানুষ মরবে বিশ্বে। আমাদের জন্য একটু স্বস্তি যে, করোনায় আমাদের মৃত্যুহার উন্নত দেশ থেকে কম। আমাদের ফসলের উৎপাদন এ বছর কাম্য মানের। বর্তমান বৈদেশিক রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি বাংলাদেশে খাদ্য ও অতি প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে যে ১০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকার প্রয়োজন, সরকারের হাতে সে তারল্য সক্ষমতা রয়েছে। তবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ার যে তাগিদ করোনায় সৃষ্টি হয়েছে, সেই মানবিক বন্ধন থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে আছি, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এখন প্রকৃতির নিধন চলছে। মানবসৃষ্ট অনাচার প্রকৃতি আর মানছে না। তাই সমাজের নিরুপদ্রব মানুষগুলোকে প্রাগ্রসর হয়ে সব অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। করোনাকালীন এ দুর্যোগ প্রতিরোধে আমাদের জাতীয় জাগরণ দিয়েই এগিয়ে নিতে হবে। শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, সমাজের একজন হিসেবে এ বোধের মিছিলে শামিল হতে হবে, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, দেশাত্মবোধ, মমতা ও একতার বন্ধনে- তাইলেই আমরা মেহনতি মানুষের বাংলাদেশকে দেখতে পাব, নিশ্চয়ই।

খান মাহবুব : খণ্ডকালীন শিক্ষক, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত