সবাই মিলে আমরা একটা পরিবার
jugantor
সবাই মিলে আমরা একটা পরিবার

  মেজর রেজাউল করিম (অব.)  

০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পুলিশবাহিনী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক শুধু কাজকর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, আমার জানামতে এমন অনেক পরিবার আছে, যে পরিবারের একটি সন্তান পুলিশবাহিনীতে এবং অন্য একটি সন্তান সেনাবাহিনীতে কাজ করছেন; আবার বাবা পুলিশ অফিসার, ছেলে আর্মি অফিসার বা ছেলে পুলিশ অফিসার, বাবা আর্মি অফিসার। এভাবে আমাদের অধিকাংশ পরিবারের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে কেউ-না-কেউ আর্মিতে আছে বা কেউ-না-কেউ পুলিশে আছে।

পুলিশ-আর্মি সম্পর্কটা পেশাগত কাজকর্মের বাইরেও অনেক বেশি বিস্তৃত। এ দেশে আমাদের আত্মীয়স্বজন-আপনজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তাই আমরা আমাদেরই কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারি না। আর আজকে হয়তো বা আমার সঙ্গে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা অন্যায় করল, আমি হয়তো তার দাঁতভাঙা জবাব দিলাম; তাতেই সবকিছুর সমাধান হবে না; বরং এতে তার বা অন্যসব পুলিশ সদস্যের অন্তরে একই ধরনের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হবে, যার ইম্প্যাক্ট ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। একইভাবে আমার সঙ্গে যদি আজকে কোনো একজন পুলিশ অফিসার খারাপ আচরণ করে, সেটার ভবিষ্যৎ ইম্প্যাক্ট তার জন্য ভালো হবে না। আমাদের চিন্তা করতে হবে আমরা একটা পরিবার, পরিবারের একটা সন্তান যদি অন্যায় করে আর তৎক্ষণাৎ যদি বিচার করা না হয় তখন অন্যসব সন্তানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে।

মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতঃপূর্বে পুলিশের হাতে সামরিক বাহিনীর কোনো অফিসার এতটা নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে নিহত হননি; তাই ঘটনাটি সবার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত সব অফিসারই এ ঘটনায় যারপরনাই মর্মাহত হয়েছেন।

মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকার ও সেনাবাহিনী দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমরা জানি, ইতোমধ্যে সেনাপ্রধান ও আইজিপি মহোদয়ের উদ্যোগে সাত আসামি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং সুষ্ঠু বিচারের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশ আমাদের দেশের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই এমন জটিল পরিস্থিতিতে ‘Justice needs to be ensured- balancing relationships amongst army and police force for ultimate peace for the nation and the future impacts of present actions must be kept in mind.’

মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের তিক্ততা তৈরি না হয় তার জন্য মাননীয় সেনাপ্রধানের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। সেনাপ্রধান এবং পুলিশের আইজি একসঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে সেনাপ্রধান অত্যন্ত সুন্দরভাবে এ ঘটনা-পরবর্তী গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিতের ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেকেই হয়তো সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন। মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেনাপ্রধান হয়তো অনেক কঠোর ভূমিকা পালন করতে পারতেন। ঘটনাস্থলে সেনাসদস্য পাঠিয়ে, নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি অন্য পন্থায় ব্যবস্থা নিতে পারতেন; কিন্তু তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনেক বেশি তিক্ততার সৃষ্টি হতো, যা ভবিষ্যতে উভয় বাহিনীর সদস্য এবং তাদের পরিবারের জন্য হয়তো ভালো ফল নিয়ে আসত না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ পুলিশ বেসামরিক প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা সমগ্র দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের উভয় বাহিনীই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং সংকটে পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই মাননীয় সেনাপ্রধান এমন একটি ভূমিকা রেখেছেন, যাতে দুই বাহিনীর মধ্যে কোনো ধরনের তিক্ততা সৃষ্টি না হয় এবং একইসঙ্গে মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ড ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন হয় এবং দোষীদের সুষ্ঠু বিচার হয়। নিঃসন্দেহে সেনাপ্রধানের এ ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার।

মেজর রেজাউল করিম ইবি (অব.) : নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

 

সবাই মিলে আমরা একটা পরিবার

 মেজর রেজাউল করিম (অব.) 
০৯ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পুলিশবাহিনী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক শুধু কাজকর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, আমার জানামতে এমন অনেক পরিবার আছে, যে পরিবারের একটি সন্তান পুলিশবাহিনীতে এবং অন্য একটি সন্তান সেনাবাহিনীতে কাজ করছেন; আবার বাবা পুলিশ অফিসার, ছেলে আর্মি অফিসার বা ছেলে পুলিশ অফিসার, বাবা আর্মি অফিসার। এভাবে আমাদের অধিকাংশ পরিবারের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে কেউ-না-কেউ আর্মিতে আছে বা কেউ-না-কেউ পুলিশে আছে।

পুলিশ-আর্মি সম্পর্কটা পেশাগত কাজকর্মের বাইরেও অনেক বেশি বিস্তৃত। এ দেশে আমাদের আত্মীয়স্বজন-আপনজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তাই আমরা আমাদেরই কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারি না। আর আজকে হয়তো বা আমার সঙ্গে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা অন্যায় করল, আমি হয়তো তার দাঁতভাঙা জবাব দিলাম; তাতেই সবকিছুর সমাধান হবে না; বরং এতে তার বা অন্যসব পুলিশ সদস্যের অন্তরে একই ধরনের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হবে, যার ইম্প্যাক্ট ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। একইভাবে আমার সঙ্গে যদি আজকে কোনো একজন পুলিশ অফিসার খারাপ আচরণ করে, সেটার ভবিষ্যৎ ইম্প্যাক্ট তার জন্য ভালো হবে না। আমাদের চিন্তা করতে হবে আমরা একটা পরিবার, পরিবারের একটা সন্তান যদি অন্যায় করে আর তৎক্ষণাৎ যদি বিচার করা না হয় তখন অন্যসব সন্তানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে।

মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতঃপূর্বে পুলিশের হাতে সামরিক বাহিনীর কোনো অফিসার এতটা নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে নিহত হননি; তাই ঘটনাটি সবার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত সব অফিসারই এ ঘটনায় যারপরনাই মর্মাহত হয়েছেন।

মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকার ও সেনাবাহিনী দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমরা জানি, ইতোমধ্যে সেনাপ্রধান ও আইজিপি মহোদয়ের উদ্যোগে সাত আসামি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং সুষ্ঠু বিচারের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশ আমাদের দেশের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই এমন জটিল পরিস্থিতিতে ‘Justice needs to be ensured- balancing relationships amongst army and police force for ultimate peace for the nation and the future impacts of present actions must be kept in mind.’

মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের তিক্ততা তৈরি না হয় তার জন্য মাননীয় সেনাপ্রধানের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। সেনাপ্রধান এবং পুলিশের আইজি একসঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে সেনাপ্রধান অত্যন্ত সুন্দরভাবে এ ঘটনা-পরবর্তী গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিতের ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেকেই হয়তো সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন। মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেনাপ্রধান হয়তো অনেক কঠোর ভূমিকা পালন করতে পারতেন। ঘটনাস্থলে সেনাসদস্য পাঠিয়ে, নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি অন্য পন্থায় ব্যবস্থা নিতে পারতেন; কিন্তু তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনেক বেশি তিক্ততার সৃষ্টি হতো, যা ভবিষ্যতে উভয় বাহিনীর সদস্য এবং তাদের পরিবারের জন্য হয়তো ভালো ফল নিয়ে আসত না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ পুলিশ বেসামরিক প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা সমগ্র দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের উভয় বাহিনীই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং সংকটে পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই মাননীয় সেনাপ্রধান এমন একটি ভূমিকা রেখেছেন, যাতে দুই বাহিনীর মধ্যে কোনো ধরনের তিক্ততা সৃষ্টি না হয় এবং একইসঙ্গে মেজর সিনহা (অব.) হত্যাকাণ্ড ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন হয় এবং দোষীদের সুষ্ঠু বিচার হয়। নিঃসন্দেহে সেনাপ্রধানের এ ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার।

মেজর রেজাউল করিম ইবি (অব.) : নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক