করোনায় অর্থনীতির সংকোচন
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
করোনায় অর্থনীতির সংকোচন

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

১৩ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে অনেক ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের ঘটনাই আছে। এ সময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা হল বিশ্বব্যাপী ‘কোভিড-১৯’জনিত মহামারী। কোভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধ করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। বিশ্বের কয়েকটি নামকরা ওষুধ কোম্পানি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উদ্যোগে টিকা আবিষ্কারের লক্ষ্যে বেশ কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।

একবার টিকা নিলে সেই টিকা কতদিন পর্যন্ত বা কত বছর পর্যন্ত টিকা গ্রহণকারীকে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, সেটা কেউ স্পষ্ট করে বলছে না। তবে এ টিকা থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার দাবি এখন পর্যন্ত টিকা আবিষ্কারকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়নি। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এ ভাইরাসের আক্রমণ চলতেই থাকবে এবং মানবজাতিকে এ সংক্রমণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হবে। হতে পারে এর ব্যাপকতা হ্রাস পাবে।

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বুবনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাবের ফলে ইউরোপের জনসংখ্যা থেকে পাঁচ কোটি মনুষ হারিয়ে গিয়েছিল। এ রোগটিকে ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ও বলা হতো। ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এ বহু মানুষ মারা যাওয়ার ফলে ইউরোপের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ভূমিদাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটে এবং শ্রমের মুক্তবাজার সৃষ্টি হয়। ভারতবর্ষেও আঞ্চলিকভাবে কখনও কখনও প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটত। নিঃসন্দেহে এটি একটি মরণঘাতী মহামারী ছিল।

তবে যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে প্লেগ রোগটি দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারত না। ব্রিটিশ শাসনামলেও বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটত। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকদের একটি বড় গুণ ছিল- উপনিবেশের বড় বড় সমস্যা জানা ও বোঝার জন্য জ্ঞাণী-গুণী লোকদের দিয়ে কমিশন গঠন করা হতো। আমি বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্টের মুদ্রিত কপি অনেকই পড়ে দেখেছি। ইন্টারের স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্টসহ অনেক রিপোর্ট আমার পড়ে দেখার সুযোগ হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্লেগ কমিশন রিপোর্ট, ইন্ডিগো কমিশন রিপোর্ট, কন্ডিশন্স অফ লোয়ার ক্লাসেস অফ পিপ্ল ইন বেঙ্গল (১৮৬৮)। প্লেগ কমিশন জানতে চেষ্টা করেছে জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা বেশি প্লেগ সংক্রমণের শিকার হয়। আবার অন্যদিকে কারা প্লেগে কম সংক্রমিত হয়। প্লেগ কমিশন রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি প্লেগে আক্রান্ত হতো মুদি দোকানদারসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকানিরা। মুদি দোকান, যেখান থেকে মানুষ চাল-ডাল, তেল-নুন, হলুদ মরিচ ইত্যাদি ক্রয় করত, সেই দোকানগুলো ইঁদুরের জন্য ছিল খুব আকর্ষণীয়। ইঁদুর থেকেই দোকানদার বা দোকান কর্মচারীর দেহে প্লেগের সংক্রমণ ঘটত।

প্লেগের সংক্রমণ সবচেয়ে কম দেখতে পাওয়া গেছে বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে। আমার ছোটবেলায় অনেক বেদে পরিবার দেখেছি। এরা নৌকায় বাস করত। নদীপথে বেদেরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত। সাপের খেলা দেখিয়ে দাঁতের পোকা বের করে এবং সিঙ্গা লাগিয়ে বেদেরা এক ধরনের চিকিৎসা করত। তখন সচেতনতা কম থাকায় মানুষ বেদেদের কথায় বিশ্বাস করত। এসব করে বেদেরা যা রোজগার করত সেটা তাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব কম ছিল না। এখন নদীগুলো মরে গেছে, মানুষ আধুনিক চিকিৎসার ওপর আস্থাবান হয়ে উঠেছে, ফলে বেদে সম্প্রদায়ের পক্ষে পুরনো কাজ কারবার করে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। প্লেগ কমিশনের রিপোর্ট থেকে জানা যায় বেদেরা খুব কমই প্লেগে আক্রান্ত হতো।

কারণ নৌকায় চলতে গিয়ে তারা যদি শুনত কোনো একটি স্থানে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, তারা সেখানে নৌকা ভেড়াত না এবং যত দ্রুত সম্ভব নৌকা চালিয়ে বিপজ্জনক এলাকা থেকে দূরে চলে যেত। এভাবে বেদেরা তাদের জীবন রক্ষা করতে পেরেছিল। বেদেদের বেঁচে থাকার এ কৌশলের সঙ্গে কোয়ারেন্টিন ও লকডাউনের মাধ্যমে সংক্রমণ হ্রাস কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে পদ্ধতি এখন অবলম্বন করা হয় সেগুলোর মিল রয়েছে।

গত দুই-তিন দিন আগে সংবাদপত্রে একটি খবর ছিল চীনের আউটার মঙ্গোলিয়ার একটি গ্রামে প্লেগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে এবং প্লেগে একজনের মৃত্যু ঘটেছে। গ্রামটিকে লকডাউন করা হয়েছে। আমাদের লকডাউনের সঙ্গে চীনের লকডাউনের কোনো তুলনাই হয় না। আমরা লকডাউন ঘোষণা করি, কিন্তু তা থেকে সুফল পাওয়ার জন্য যেসব নিয়মবিধি মেনে চলতে হয় সেগুলো মান্য না করাই আমাদের অভ্যাস। ফলে এ থেকে খুব বেশি একটা সুফল পাওয়া যায় না। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকার ফলে এ সময়ে সংক্রমণ কম হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে লকডাউনের মতো ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্রভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তবে পূর্বাহ্নে পরিকল্পনা করে নিলে এর বাস্তবায়ন অনেক বেশি ফলদায়ক হতে পারে। পুরনো ঢাকার বনেদিদের এলাকা হিসেবে পরিচিত র‌্যাংকিং স্ট্রিট এলাকায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু লকডাউনের সময়ও লোকজন সেখানে যাওয়ার এবং সেখান থেকে বের হওয়ারও চেষ্টা করেছে। অজুহাত ছিল জরুরি প্রয়োজন। জরুরি প্রয়োজন হলে কাউকে নিষেধ করা কঠিন। তবে লকডাউন শুরু করার আগে ১০-১৫ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ তৈরি করে কেবল তাদের দ্বারা জরুরি প্রয়োজনীয় কাজগুলো করানো হলে এবং এর জন্য সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিলে লকডাউন আরও অনেক বেশি সফল হতে পারত।

১১ আগস্টের সংবাদপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছোট সংবাদ ছিল, ব্রিটেনে মন্দার ঘোষণা আসছে। এ সংবাদ থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই এমন ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের পর এমন ঘোষণা এবারেই প্রথম। করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর কারণে দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স। বুধবার ১২ আগস্ট তারা যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করবে (এ লেখাটি লিখছি ১২ তারিখ সকালে) তাতে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্রিটিশ অর্থনীতি ২১ শতাংশ সংকুচিত হবে, এমন খবর আসবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে প্রথম ত্রৈমাসিকে দেশটির জিডিপি ২.২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। মার্চে লকডাউন আরোপ করার জেরেই এমনটা হয়েছে। আর পরপর দুটি ত্রৈমাসিকে জিডিপি সংকুচিত হলে তাকে মন্দা হিসেবে দেখেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একইভাবে অর্থনীতির সংকোচন ঘটছে। এ সংকোচনের অনেক কারণ। অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক’বছর ধরে। বল্গাহীনভাবে আর্থিক খাতে যেভাবে নিয়মনীতি ভঙ্গ করে কিছু গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাংকগুলোকে ব্যক্তি খাত এবং সরকারি খাতে অর্থের জোগান দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। করোনার প্রকোপে বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ ঘোষিত হওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত হল অনানুষ্ঠানিক খাত। এ খাতটি সেবা খাত হিসেবেও পরিচিত। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হকার, খুদে ব্যবসায়ী, পরিবহন কর্মী, গৃহকর্মীসহ বিচিত্র কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত মানুষগুলো বেকার হয়ে গেছে। এদের অনেকের দৈনন্দিন রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। পাড়ার ভেতরে কয়েক মাস আগেও কাউকে ভিক্ষা করতে দেখতাম না। অবশ্য কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ছয়-সাতজনের একটি প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক দল উচ্চস্বরে গান গেয়ে ভিক্ষা করতে আসত। এদের আমরা পেশাদার ভিক্ষুক বলতে পারি।

এদের সঞ্চিত অর্থও আছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা ছেলে ও মেয়েদের কেউ কেউ ভাত ভিক্ষা করছে। নিঃসন্দেহে এরা পেশাদার ভিক্ষুক নয়। তারা ভাতের পরিবর্তে টাকা চাইতে পারত। কিন্তু টাকা জোগাড় করে চাল-ডাল কিনে রান্না করার মতো সঙ্গতি তারা হারিয়ে ফেলেছে। এরা হল সেইসব মানুষ যারা দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠেছিল, কিন্তু করোনার অভিঘাতে আবার দরিদ্র হয়ে গেছে। লক্ষণটা ভালো নয়। একটি দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা আমাদের মাথার ওপর ডমিকেলসের তরবারির মতো ঝুলছে। একসময় ভাবতাম, বাংলাদেশে ১৯৭৪-এর পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। এখন সে আস্থায় চিড় ধরেছে। বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও যে সংকোচনের মধ্যে পড়েছে তার লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।

এ কথা সত্য, করোনার মধ্যেও কিছু ভিন্নধর্মী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হয়েছে। যেমন মাস্ক তৈরি করা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না। মনে হচ্ছে একটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার কবলে আমরা পড়তে যাচ্ছি। এ সময় যদি করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকে তাহলে মন্দাও অব্যাহত থাকবে। সরকার আশু সমাধান হিসেবে কিছু প্রণোদনার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি হল কেইনসীয় ধারার অনুসরণ। ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দিতে সরকার যে তালিকা করেছিল, তা থেকে টাকা দেয়া হয়েছে ৩৫ লাখ ব্যক্তিকে। যাদের দেয়া গেল না তার জন্য দায়ী আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা।

নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পরামর্শ অনুযায়ী টাকা বিতরণ করে দারিদ্র্য হ্রাস করা সম্ভব, এ রকম নীতির ওপর আমার বিশ্বাস খুবই কম। যারা বাধ্য হয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয ভোগকে সংকুচিত করে রাখতে বাধ্য হয়েছিল, তারা এ আড়াই হাজার টাকা পেয়ে কী করবে? তাদের প্রথম কাজটি হবে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ। অর্থাৎ উৎপাদন নয় ভোগ। একজন পুরনো অর্থনীতিবিদ জে বি সে (J B SAY)-এর সূত্র ছিল Supply creates its own demand. এ ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হল চাহিদা সৃষ্টি করা, কিন্তু সরবরাহ বৃদ্ধি করে। সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য কিছু উৎপাদন করতে হবে এবং উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। এটা হলে অনেকেই কাজ পাবে। কাজ পেলে আয় হবে। আয় হলে জিনিসপত্র কেনার সামর্থ্য হবে।

এভাবে অর্থনীতি আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনেকে এত আধুনিক হয়েছেন যে পুরনো অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো উৎসাহ বোধ করেন না। এর ফলে পুরনো অর্থনীতিবিদদের ভালো চিন্তাগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। গ্রামে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। প্রবাদটি হল, ‘পুরানো চাল ভাতে বাড়ে।’ বাংলাদেশের এই সংকটে জে বি সের তত্ত্ব কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার জন্য পরিকল্পনা কমিশন খুব দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীনের উৎপাদন দায়িত্ব প্রথা পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। আভিজাত্যহীন অর্থনীতির একজন ছাত্রের এ পরামর্শ দেশের অভিজাত অর্থনীতিবিদরা হয়তো হেসেই উড়িয়ে দেবেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

করোনায় অর্থনীতির সংকোচন

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
১৩ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে অনেক ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের ঘটনাই আছে। এ সময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা হল বিশ্বব্যাপী ‘কোভিড-১৯’জনিত মহামারী। কোভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধ করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। বিশ্বের কয়েকটি নামকরা ওষুধ কোম্পানি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উদ্যোগে টিকা আবিষ্কারের লক্ষ্যে বেশ কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।

একবার টিকা নিলে সেই টিকা কতদিন পর্যন্ত বা কত বছর পর্যন্ত টিকা গ্রহণকারীকে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, সেটা কেউ স্পষ্ট করে বলছে না। তবে এ টিকা থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার দাবি এখন পর্যন্ত টিকা আবিষ্কারকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়নি। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এ ভাইরাসের আক্রমণ চলতেই থাকবে এবং মানবজাতিকে এ সংক্রমণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হবে। হতে পারে এর ব্যাপকতা হ্রাস পাবে।

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বুবনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাবের ফলে ইউরোপের জনসংখ্যা থেকে পাঁচ কোটি মনুষ হারিয়ে গিয়েছিল। এ রোগটিকে ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ও বলা হতো। ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এ বহু মানুষ মারা যাওয়ার ফলে ইউরোপের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ভূমিদাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটে এবং শ্রমের মুক্তবাজার সৃষ্টি হয়। ভারতবর্ষেও আঞ্চলিকভাবে কখনও কখনও প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটত। নিঃসন্দেহে এটি একটি মরণঘাতী মহামারী ছিল।

তবে যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে প্লেগ রোগটি দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারত না। ব্রিটিশ শাসনামলেও বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটত। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকদের একটি বড় গুণ ছিল- উপনিবেশের বড় বড় সমস্যা জানা ও বোঝার জন্য জ্ঞাণী-গুণী লোকদের দিয়ে কমিশন গঠন করা হতো। আমি বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্টের মুদ্রিত কপি অনেকই পড়ে দেখেছি। ইন্টারের স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্টসহ অনেক রিপোর্ট আমার পড়ে দেখার সুযোগ হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্লেগ কমিশন রিপোর্ট, ইন্ডিগো কমিশন রিপোর্ট, কন্ডিশন্স অফ লোয়ার ক্লাসেস অফ পিপ্ল ইন বেঙ্গল (১৮৬৮)। প্লেগ কমিশন জানতে চেষ্টা করেছে জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা বেশি প্লেগ সংক্রমণের শিকার হয়। আবার অন্যদিকে কারা প্লেগে কম সংক্রমিত হয়। প্লেগ কমিশন রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি প্লেগে আক্রান্ত হতো মুদি দোকানদারসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকানিরা। মুদি দোকান, যেখান থেকে মানুষ চাল-ডাল, তেল-নুন, হলুদ মরিচ ইত্যাদি ক্রয় করত, সেই দোকানগুলো ইঁদুরের জন্য ছিল খুব আকর্ষণীয়। ইঁদুর থেকেই দোকানদার বা দোকান কর্মচারীর দেহে প্লেগের সংক্রমণ ঘটত।

প্লেগের সংক্রমণ সবচেয়ে কম দেখতে পাওয়া গেছে বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে। আমার ছোটবেলায় অনেক বেদে পরিবার দেখেছি। এরা নৌকায় বাস করত। নদীপথে বেদেরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত। সাপের খেলা দেখিয়ে দাঁতের পোকা বের করে এবং সিঙ্গা লাগিয়ে বেদেরা এক ধরনের চিকিৎসা করত। তখন সচেতনতা কম থাকায় মানুষ বেদেদের কথায় বিশ্বাস করত। এসব করে বেদেরা যা রোজগার করত সেটা তাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব কম ছিল না। এখন নদীগুলো মরে গেছে, মানুষ আধুনিক চিকিৎসার ওপর আস্থাবান হয়ে উঠেছে, ফলে বেদে সম্প্রদায়ের পক্ষে পুরনো কাজ কারবার করে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। প্লেগ কমিশনের রিপোর্ট থেকে জানা যায় বেদেরা খুব কমই প্লেগে আক্রান্ত হতো।

কারণ নৌকায় চলতে গিয়ে তারা যদি শুনত কোনো একটি স্থানে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, তারা সেখানে নৌকা ভেড়াত না এবং যত দ্রুত সম্ভব নৌকা চালিয়ে বিপজ্জনক এলাকা থেকে দূরে চলে যেত। এভাবে বেদেরা তাদের জীবন রক্ষা করতে পেরেছিল। বেদেদের বেঁচে থাকার এ কৌশলের সঙ্গে কোয়ারেন্টিন ও লকডাউনের মাধ্যমে সংক্রমণ হ্রাস কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে পদ্ধতি এখন অবলম্বন করা হয় সেগুলোর মিল রয়েছে।

গত দুই-তিন দিন আগে সংবাদপত্রে একটি খবর ছিল চীনের আউটার মঙ্গোলিয়ার একটি গ্রামে প্লেগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে এবং প্লেগে একজনের মৃত্যু ঘটেছে। গ্রামটিকে লকডাউন করা হয়েছে। আমাদের লকডাউনের সঙ্গে চীনের লকডাউনের কোনো তুলনাই হয় না। আমরা লকডাউন ঘোষণা করি, কিন্তু তা থেকে সুফল পাওয়ার জন্য যেসব নিয়মবিধি মেনে চলতে হয় সেগুলো মান্য না করাই আমাদের অভ্যাস। ফলে এ থেকে খুব বেশি একটা সুফল পাওয়া যায় না। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকার ফলে এ সময়ে সংক্রমণ কম হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে লকডাউনের মতো ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্রভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তবে পূর্বাহ্নে পরিকল্পনা করে নিলে এর বাস্তবায়ন অনেক বেশি ফলদায়ক হতে পারে। পুরনো ঢাকার বনেদিদের এলাকা হিসেবে পরিচিত র‌্যাংকিং স্ট্রিট এলাকায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু লকডাউনের সময়ও লোকজন সেখানে যাওয়ার এবং সেখান থেকে বের হওয়ারও চেষ্টা করেছে। অজুহাত ছিল জরুরি প্রয়োজন। জরুরি প্রয়োজন হলে কাউকে নিষেধ করা কঠিন। তবে লকডাউন শুরু করার আগে ১০-১৫ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ তৈরি করে কেবল তাদের দ্বারা জরুরি প্রয়োজনীয় কাজগুলো করানো হলে এবং এর জন্য সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিলে লকডাউন আরও অনেক বেশি সফল হতে পারত।

১১ আগস্টের সংবাদপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছোট সংবাদ ছিল, ব্রিটেনে মন্দার ঘোষণা আসছে। এ সংবাদ থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই এমন ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটের পর এমন ঘোষণা এবারেই প্রথম। করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর কারণে দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স। বুধবার ১২ আগস্ট তারা যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করবে (এ লেখাটি লিখছি ১২ তারিখ সকালে) তাতে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্রিটিশ অর্থনীতি ২১ শতাংশ সংকুচিত হবে, এমন খবর আসবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে প্রথম ত্রৈমাসিকে দেশটির জিডিপি ২.২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। মার্চে লকডাউন আরোপ করার জেরেই এমনটা হয়েছে। আর পরপর দুটি ত্রৈমাসিকে জিডিপি সংকুচিত হলে তাকে মন্দা হিসেবে দেখেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একইভাবে অর্থনীতির সংকোচন ঘটছে। এ সংকোচনের অনেক কারণ। অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক’বছর ধরে। বল্গাহীনভাবে আর্থিক খাতে যেভাবে নিয়মনীতি ভঙ্গ করে কিছু গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাংকগুলোকে ব্যক্তি খাত এবং সরকারি খাতে অর্থের জোগান দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। করোনার প্রকোপে বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ ঘোষিত হওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত হল অনানুষ্ঠানিক খাত। এ খাতটি সেবা খাত হিসেবেও পরিচিত। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হকার, খুদে ব্যবসায়ী, পরিবহন কর্মী, গৃহকর্মীসহ বিচিত্র কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত মানুষগুলো বেকার হয়ে গেছে। এদের অনেকের দৈনন্দিন রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। পাড়ার ভেতরে কয়েক মাস আগেও কাউকে ভিক্ষা করতে দেখতাম না। অবশ্য কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ছয়-সাতজনের একটি প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক দল উচ্চস্বরে গান গেয়ে ভিক্ষা করতে আসত। এদের আমরা পেশাদার ভিক্ষুক বলতে পারি।

এদের সঞ্চিত অর্থও আছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা ছেলে ও মেয়েদের কেউ কেউ ভাত ভিক্ষা করছে। নিঃসন্দেহে এরা পেশাদার ভিক্ষুক নয়। তারা ভাতের পরিবর্তে টাকা চাইতে পারত। কিন্তু টাকা জোগাড় করে চাল-ডাল কিনে রান্না করার মতো সঙ্গতি তারা হারিয়ে ফেলেছে। এরা হল সেইসব মানুষ যারা দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠেছিল, কিন্তু করোনার অভিঘাতে আবার দরিদ্র হয়ে গেছে। লক্ষণটা ভালো নয়। একটি দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা আমাদের মাথার ওপর ডমিকেলসের তরবারির মতো ঝুলছে। একসময় ভাবতাম, বাংলাদেশে ১৯৭৪-এর পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। এখন সে আস্থায় চিড় ধরেছে। বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও যে সংকোচনের মধ্যে পড়েছে তার লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।

এ কথা সত্য, করোনার মধ্যেও কিছু ভিন্নধর্মী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হয়েছে। যেমন মাস্ক তৈরি করা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না। মনে হচ্ছে একটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার কবলে আমরা পড়তে যাচ্ছি। এ সময় যদি করোনা সংক্রমণ অব্যাহত থাকে তাহলে মন্দাও অব্যাহত থাকবে। সরকার আশু সমাধান হিসেবে কিছু প্রণোদনার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি হল কেইনসীয় ধারার অনুসরণ। ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দিতে সরকার যে তালিকা করেছিল, তা থেকে টাকা দেয়া হয়েছে ৩৫ লাখ ব্যক্তিকে। যাদের দেয়া গেল না তার জন্য দায়ী আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা।

নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পরামর্শ অনুযায়ী টাকা বিতরণ করে দারিদ্র্য হ্রাস করা সম্ভব, এ রকম নীতির ওপর আমার বিশ্বাস খুবই কম। যারা বাধ্য হয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয ভোগকে সংকুচিত করে রাখতে বাধ্য হয়েছিল, তারা এ আড়াই হাজার টাকা পেয়ে কী করবে? তাদের প্রথম কাজটি হবে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ। অর্থাৎ উৎপাদন নয় ভোগ। একজন পুরনো অর্থনীতিবিদ জে বি সে (J B SAY)-এর সূত্র ছিল Supply creates its own demand. এ ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হল চাহিদা সৃষ্টি করা, কিন্তু সরবরাহ বৃদ্ধি করে। সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য কিছু উৎপাদন করতে হবে এবং উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। এটা হলে অনেকেই কাজ পাবে। কাজ পেলে আয় হবে। আয় হলে জিনিসপত্র কেনার সামর্থ্য হবে।

এভাবে অর্থনীতি আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনেকে এত আধুনিক হয়েছেন যে পুরনো অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো উৎসাহ বোধ করেন না। এর ফলে পুরনো অর্থনীতিবিদদের ভালো চিন্তাগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। গ্রামে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। প্রবাদটি হল, ‘পুরানো চাল ভাতে বাড়ে।’ বাংলাদেশের এই সংকটে জে বি সের তত্ত্ব কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার জন্য পরিকল্পনা কমিশন খুব দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীনের উৎপাদন দায়িত্ব প্রথা পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। আভিজাত্যহীন অর্থনীতির একজন ছাত্রের এ পরামর্শ দেশের অভিজাত অর্থনীতিবিদরা হয়তো হেসেই উড়িয়ে দেবেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ