এমন মানবদরদি নেতা আর দেখিনি
jugantor
এমন মানবদরদি নেতা আর দেখিনি

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৫ আগস্ট ১৯৭৫। শুধু বাংলাদেশ নয়, নিকৃষ্ট-নৃশংস ও বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের দিনটি পুরো বিশ্ববাসীকে শোকাহত করার বিষয়টি কারও অজানা নয়।

মুক্তির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শাহাদতবরণের এ দিবসটি সমগ্র মানবজাতির কাছেই বিনম্র শ্রদ্ধায় অবিস্মরণীয়।

এ নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে প্যারিসের বিখ্যাত ‘লা মঁদে’ পত্রিকার রবার্ট এসকারপি, লন্ডনের ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’, ‘দ্য লিসনার’ পত্রিকার সংবাদদাতা ব্রায়ন ব্যারনসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খ্যাতির শীর্ষে অধিষ্ঠিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী এবং খ্যাতিমান সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সম্মানিত রাজনীতিক, রাষ্ট্রনায়কদের মন্তব্য এতই হৃদয়গ্রাহী ও আবেগঘন; যা শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের সমগ্র শুভ, মঙ্গল ও কল্যাণকামী বিবেকবান জনগোষ্ঠীকে অশ্রুসজলে নিরন্তর সিক্ত করে চলেছে।

বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ‘প্রাণ’ কবিতায় উপস্থাপিত অমিয় বার্তা বঙ্গবন্ধুর হৃদয় গভীরে প্রোথিত ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু সাধারণ গ্রাম-জনপদে জন্মগ্রহণ করে এ ধরিত্রীর বুকে সর্বোচ্চ উদার মানবতা-জাতীয়তাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক বিশ্বনেতার মর্যাদায় নিজেকে অভিষিক্ত করতে পেরেছেন।

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।/এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে/জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!/ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত,/বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রুময়--/মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত/যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়!’ উল্লেখিত পঙ্ক্তিসমূহ যেন বঙ্গবন্ধুকে ঘিরেই রচিত।

জেল-জুলুম-নিপীড়ন-নির্যাতনের অবর্ণনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বঙ্গবন্ধু বাঙালি মুক্তির জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার মহান স্মারকে পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে শুধু স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেননি, যুদ্ধবিধ্বস্ত লণ্ডভণ্ড দেশের পুনর্গঠনে মেধা-প্রজ্ঞা-সাহসিকতায় অভূতপূর্ব।

ইতিহাসে মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুর জীবন-চরিত বিস্ময়কর এক মহাকাব্যে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশিষ্ট কবি অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই লিখেছেন ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

প্রায় তিন হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস শুধু ভিনদেশি শাসকদের শাসনের কথা চিত্রিত করেনি, অত্যন্ত করুণভাবে উল্লেখ করেছে তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এবং এতদঞ্চলের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা-বৈষম্যের নির্মমগাথা।

আর্য, দ্রাবিড়, রাঢ়, মৌর্য, তুর্কি, পাঠান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানশাসিত এ পূর্ব বাংলাকে সবাই এক পশ্চাৎপদ সমাজে পরিণত করেছিল।

আমরা যাকে বাংলার স্বাধীন নবাব হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, তিনি বাঙালি ছিলেন না। তিনি ছিলেন তুর্কি। তার মাতৃ ও দাফতরিক ভাষা ছিল ফার্সি। এ তিন হাজার বছরের বিশ্লেষণে এটি সুস্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন সর্বপ্রথম স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্রনায়ক।

এজন্যই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার ইতিহাসে নয়, ভারতবর্ষসহ বিশ্ব-ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে সুঅধিষ্ঠিত।

যে সত্যটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সর্বজনবিদিত, তা হল আদর্শ ও নীতিবিবর্জিত এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে যারা রাজনীতিকে জীবন নির্বাহের বাহন হিসেবে বেছে নেয়, তাদের দিয়ে জাতির ভাগ্যনির্ধারণে কোনো কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একেবারেই অসম্ভব।

বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে আদর্শিক যেসব নিয়ামক এদেশের সব জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে বিমুগ্ধ করেছিল এবং প্রাণদানসহ যে কোনো ধরনের ত্যাগ-তিতিক্ষার দীক্ষা ও শক্তি-সাহস জুগিয়েছিল, তা ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিশুদ্ধ আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত নিখাদ দেশ ও মানবপ্রেমের এক সমুদ্ভব চেতনা।

বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতির শিক্ষাগুরু নন, আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মনির্ভরশীল জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক অসাধারণ কারিগর এবং পরিণত জাতিসত্তা নির্মাণের দার্শনিক।

তার আত্মত্যাগের মহিমান্বিত এ পাঠশালা চিরায়ত ও আবহমান বাংলার শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আলোর প্রজ্বলন ঘটাবেই- দৃঢ়চিত্তে এটি উচ্চারণ করা যায়।

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে মানুষকে শুধু সামাজিক জীব হিসেবে নয়, রাজনীতিক জীব হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেবাপ্রদান এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখে রাষ্ট্রক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্জনের মাধ্যমে সামগ্রিক কল্যাণ সাধনের যে নীতি ও আদর্শ, তারই সাধারণ নাম হচ্ছে সুষ্ঠু রাজনীতি।

এ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্দেশনা একটি জাতিকে যেমন দান করে সামগ্রিক উন্নয়ন-রোডম্যাপ বা রূপকল্প, তেমনি বিপরীতমুখী বা সমাজবিধ্বংসী রাজনীতিকে পরিচর্যার মাধ্যমে যে কোনো সমাজকে করতে পারে সুদূরপ্রসারী বিপন্ন ও বিপর্যস্ত।

এখানেই বঙ্গবন্ধুর সার্থকতা; তিনি শুধু স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি একটি জাতিরাষ্ট্র তথা সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা দিয়েছেন।

কেইথ গ্রিফিন এর মতে, যে কোনো জাতির অনুন্নয়নকে বুঝতে হলে তার সমাজ ইতিহাসের গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। এ উক্তির আলোকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্থকতা বিশ্লেষণে এ অঞ্চলের অতীত ইতিহাস অতীব প্রয়োজনীয় রসদ।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বহু বিদেশি পর্যটকের কাছে এ অঞ্চল খুবই আকর্ষণীয় ছিল বহুবিধ উৎপাদন সামগ্রীর জন্য। মসলিনসহ নানাবিধ সুতি-বস্ত্র, স্বর্ণ, রৌপ্য, অলঙ্কার, মসলা, নীল ইত্যাদির জন্য এটি ছিল প্রাচ্যের একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ড; কিন্তু এদেশ কেন আজ এত গরিব এবং বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে, তা উপলব্ধি করতে হবে।

মূলত, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার মূল ধারণাটাই হচ্ছে এ স্বাধীন ভূখণ্ডের মধ্যে সব জনগোষ্ঠী ও মানুষের মৌলিক যে চাহিদা, যথা- অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান ইত্যাদি নিশ্চিতকরণ।

অতীতের বৈষম্য চিত্র যদি বিশ্লেষণ না করা হয়, তা হলে বোঝা যাবে না কেন এ অঞ্চলে মানুষ এত বেশি স্বাধীনতাপিপাসু হয়েছে। ১৯৫১ সালের জরিপ অনুযায়ী, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল- বাঙালি ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ, পাঞ্জাবি ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ, উর্দু ৭ দশমিক ২ শতাংশ, সিন্ধি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পশতু ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং ইংরেজি ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

এ সারণি থেকে স্পষ্ট যে, কীভাবে এবং কেন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর অবাঙালি শাসকরা এ বাঙালির ওপর তাদের যত ক্ষোভ প্রকাশ এবং শোষণের প্রক্রিয়াকে বেছে নিয়েছে, যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং রক্তস্নাত ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

প্রতিনিয়ত আর্থ-সামাজিক প্রচণ্ড বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নিষ্পেষিত করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এদেশের আপামর জনগণ বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক কঠিন স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে টেকসই কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিশাল সাফল্য অর্জনের পথে যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা ১৯৭৫-এর নৃশংস রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে আবার একটি অগণতান্ত্রিক, অনগ্রসর এবং জঙ্গিবাদী-মৌলবাদী দেশে পরিণত করার সর্বাত্মক কৌশল বেছে নেয়।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্র ইত্যাদি আধুনিক ও প্রাগ্রসর দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে সুদৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করা না গেলে; বিভ্রান্তি ও নষ্ট কৌশল কখনও জাতিকে এগিয়ে নেয়ার পথ সুগম করতে পারে না।

বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ রেহানার নামকরণে বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং আরেক সুযোগ্য তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা এ গ্রন্থের ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন এবং দলের নেতাকর্মীদের প্রতি তার ভালোবাসার যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন; তা থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা গ্রহণের আছে।

‘কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে তার উদ্বেগ- দলের প্রত্যেক সদস্যকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন, তাদের কল্যাণে কত চিন্তিত থাকতেন, সে কথাও অকাতরে বলেছেন।

তিনি নিজের কষ্টের কথা সেখানে বলেননি। শুধু একাকী থাকার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। জেলখানায় পাগলা গারদ আছে, তার কাছেরই সেলে তাকে বন্দি রাখা হয়েছিল। সেই পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের আচার-আচরণ অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন।

এদের কারণে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতেন না। কষ্ট হতো; কিন্তু নিজের কথা না বলে তাদের দুঃখের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। মানবদরদি নেতা ছাড়া এমন বর্ণনা দেয়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়।’

সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী আবুল ফজলের ভাষায়, ‘বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও সর্বাধিক উচ্চারিত নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনি শুধু নির্মাতা নন, তার প্রধান নায়কও। ঘটনাপ্রবাহ ও নিয়তি তাকে বারবার এ নায়কের আসনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বলা যায়, যেন হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছে। শত চেষ্টা করেও তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাস দেয় না তেমন কিছু করতে। ইতিহাস নিজের অঙ্গ নিজে করে না ছেদন। শেখ মুজিব ইতিহাসের তেমন এক অচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশ্ব ইতিহাসেরও।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অধ্যাপক আবুল ফজলের এ লেখনী প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু মানসকে অনুধাবন; বিশেষ করে বর্তমান ও আগামী দিনের শিশু-কিশোর-তরুণদের নিগূঢ় উপলব্ধিতে আনা না গেলে আমাদের দায়বদ্ধতা একদিন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

এমন মানবদরদি নেতা আর দেখিনি

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
১৪ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৫ আগস্ট ১৯৭৫। শুধু বাংলাদেশ নয়, নিকৃষ্ট-নৃশংস ও বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের দিনটি পুরো বিশ্ববাসীকে শোকাহত করার বিষয়টি কারও অজানা নয়।

মুক্তির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শাহাদতবরণের এ দিবসটি সমগ্র মানবজাতির কাছেই বিনম্র শ্রদ্ধায় অবিস্মরণীয়।

এ নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে প্যারিসের বিখ্যাত ‘লা মঁদে’ পত্রিকার রবার্ট এসকারপি, লন্ডনের ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’, ‘দ্য লিসনার’ পত্রিকার সংবাদদাতা ব্রায়ন ব্যারনসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খ্যাতির শীর্ষে অধিষ্ঠিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী এবং খ্যাতিমান সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সম্মানিত রাজনীতিক, রাষ্ট্রনায়কদের মন্তব্য এতই হৃদয়গ্রাহী ও আবেগঘন; যা শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের সমগ্র শুভ, মঙ্গল ও কল্যাণকামী বিবেকবান জনগোষ্ঠীকে অশ্রুসজলে নিরন্তর সিক্ত করে চলেছে।

বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ‘প্রাণ’ কবিতায় উপস্থাপিত অমিয় বার্তা বঙ্গবন্ধুর হৃদয় গভীরে প্রোথিত ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু সাধারণ গ্রাম-জনপদে জন্মগ্রহণ করে এ ধরিত্রীর বুকে সর্বোচ্চ উদার মানবতা-জাতীয়তাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক বিশ্বনেতার মর্যাদায় নিজেকে অভিষিক্ত করতে পেরেছেন।

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।/এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে/জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!/ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত,/বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রুময়--/মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত/যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়!’ উল্লেখিত পঙ্ক্তিসমূহ যেন বঙ্গবন্ধুকে ঘিরেই রচিত।

জেল-জুলুম-নিপীড়ন-নির্যাতনের অবর্ণনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বঙ্গবন্ধু বাঙালি মুক্তির জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার মহান স্মারকে পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে শুধু স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেননি, যুদ্ধবিধ্বস্ত লণ্ডভণ্ড দেশের পুনর্গঠনে মেধা-প্রজ্ঞা-সাহসিকতায় অভূতপূর্ব।

ইতিহাসে মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুর জীবন-চরিত বিস্ময়কর এক মহাকাব্যে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশিষ্ট কবি অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই লিখেছেন ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

প্রায় তিন হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস শুধু ভিনদেশি শাসকদের শাসনের কথা চিত্রিত করেনি, অত্যন্ত করুণভাবে উল্লেখ করেছে তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এবং এতদঞ্চলের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা-বৈষম্যের নির্মমগাথা।

আর্য, দ্রাবিড়, রাঢ়, মৌর্য, তুর্কি, পাঠান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানশাসিত এ পূর্ব বাংলাকে সবাই এক পশ্চাৎপদ সমাজে পরিণত করেছিল।

আমরা যাকে বাংলার স্বাধীন নবাব হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, তিনি বাঙালি ছিলেন না। তিনি ছিলেন তুর্কি। তার মাতৃ ও দাফতরিক ভাষা ছিল ফার্সি। এ তিন হাজার বছরের বিশ্লেষণে এটি সুস্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন সর্বপ্রথম স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্রনায়ক।

এজন্যই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার ইতিহাসে নয়, ভারতবর্ষসহ বিশ্ব-ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে সুঅধিষ্ঠিত।

যে সত্যটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সর্বজনবিদিত, তা হল আদর্শ ও নীতিবিবর্জিত এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে যারা রাজনীতিকে জীবন নির্বাহের বাহন হিসেবে বেছে নেয়, তাদের দিয়ে জাতির ভাগ্যনির্ধারণে কোনো কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একেবারেই অসম্ভব।

বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে আদর্শিক যেসব নিয়ামক এদেশের সব জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে বিমুগ্ধ করেছিল এবং প্রাণদানসহ যে কোনো ধরনের ত্যাগ-তিতিক্ষার দীক্ষা ও শক্তি-সাহস জুগিয়েছিল, তা ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিশুদ্ধ আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত নিখাদ দেশ ও মানবপ্রেমের এক সমুদ্ভব চেতনা।

বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতির শিক্ষাগুরু নন, আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মনির্ভরশীল জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক অসাধারণ কারিগর এবং পরিণত জাতিসত্তা নির্মাণের দার্শনিক।

তার আত্মত্যাগের মহিমান্বিত এ পাঠশালা চিরায়ত ও আবহমান বাংলার শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আলোর প্রজ্বলন ঘটাবেই- দৃঢ়চিত্তে এটি উচ্চারণ করা যায়।

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে মানুষকে শুধু সামাজিক জীব হিসেবে নয়, রাজনীতিক জীব হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেবাপ্রদান এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখে রাষ্ট্রক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্জনের মাধ্যমে সামগ্রিক কল্যাণ সাধনের যে নীতি ও আদর্শ, তারই সাধারণ নাম হচ্ছে সুষ্ঠু রাজনীতি।

এ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্দেশনা একটি জাতিকে যেমন দান করে সামগ্রিক উন্নয়ন-রোডম্যাপ বা রূপকল্প, তেমনি বিপরীতমুখী বা সমাজবিধ্বংসী রাজনীতিকে পরিচর্যার মাধ্যমে যে কোনো সমাজকে করতে পারে সুদূরপ্রসারী বিপন্ন ও বিপর্যস্ত।

এখানেই বঙ্গবন্ধুর সার্থকতা; তিনি শুধু স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি একটি জাতিরাষ্ট্র তথা সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা দিয়েছেন।

কেইথ গ্রিফিন এর মতে, যে কোনো জাতির অনুন্নয়নকে বুঝতে হলে তার সমাজ ইতিহাসের গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। এ উক্তির আলোকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্থকতা বিশ্লেষণে এ অঞ্চলের অতীত ইতিহাস অতীব প্রয়োজনীয় রসদ।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বহু বিদেশি পর্যটকের কাছে এ অঞ্চল খুবই আকর্ষণীয় ছিল বহুবিধ উৎপাদন সামগ্রীর জন্য। মসলিনসহ নানাবিধ সুতি-বস্ত্র, স্বর্ণ, রৌপ্য, অলঙ্কার, মসলা, নীল ইত্যাদির জন্য এটি ছিল প্রাচ্যের একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ড; কিন্তু এদেশ কেন আজ এত গরিব এবং বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে, তা উপলব্ধি করতে হবে।

মূলত, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার মূল ধারণাটাই হচ্ছে এ স্বাধীন ভূখণ্ডের মধ্যে সব জনগোষ্ঠী ও মানুষের মৌলিক যে চাহিদা, যথা- অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান ইত্যাদি নিশ্চিতকরণ।

অতীতের বৈষম্য চিত্র যদি বিশ্লেষণ না করা হয়, তা হলে বোঝা যাবে না কেন এ অঞ্চলে মানুষ এত বেশি স্বাধীনতাপিপাসু হয়েছে। ১৯৫১ সালের জরিপ অনুযায়ী, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল- বাঙালি ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ, পাঞ্জাবি ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ, উর্দু ৭ দশমিক ২ শতাংশ, সিন্ধি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পশতু ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং ইংরেজি ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

এ সারণি থেকে স্পষ্ট যে, কীভাবে এবং কেন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর অবাঙালি শাসকরা এ বাঙালির ওপর তাদের যত ক্ষোভ প্রকাশ এবং শোষণের প্রক্রিয়াকে বেছে নিয়েছে, যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং রক্তস্নাত ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

প্রতিনিয়ত আর্থ-সামাজিক প্রচণ্ড বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নিষ্পেষিত করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এদেশের আপামর জনগণ বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক কঠিন স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে টেকসই কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিশাল সাফল্য অর্জনের পথে যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা ১৯৭৫-এর নৃশংস রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে দেশকে আবার একটি অগণতান্ত্রিক, অনগ্রসর এবং জঙ্গিবাদী-মৌলবাদী দেশে পরিণত করার সর্বাত্মক কৌশল বেছে নেয়।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্র ইত্যাদি আধুনিক ও প্রাগ্রসর দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে সুদৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করা না গেলে; বিভ্রান্তি ও নষ্ট কৌশল কখনও জাতিকে এগিয়ে নেয়ার পথ সুগম করতে পারে না।

বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ রেহানার নামকরণে বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং আরেক সুযোগ্য তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা এ গ্রন্থের ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন এবং দলের নেতাকর্মীদের প্রতি তার ভালোবাসার যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন; তা থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা গ্রহণের আছে।

‘কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে তার উদ্বেগ- দলের প্রত্যেক সদস্যকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন, তাদের কল্যাণে কত চিন্তিত থাকতেন, সে কথাও অকাতরে বলেছেন।

তিনি নিজের কষ্টের কথা সেখানে বলেননি। শুধু একাকী থাকার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। জেলখানায় পাগলা গারদ আছে, তার কাছেরই সেলে তাকে বন্দি রাখা হয়েছিল। সেই পাগলদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের আচার-আচরণ অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন।

এদের কারণে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতেন না। কষ্ট হতো; কিন্তু নিজের কথা না বলে তাদের দুঃখের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। মানবদরদি নেতা ছাড়া এমন বর্ণনা দেয়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়।’

সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী আবুল ফজলের ভাষায়, ‘বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও সর্বাধিক উচ্চারিত নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনি শুধু নির্মাতা নন, তার প্রধান নায়কও। ঘটনাপ্রবাহ ও নিয়তি তাকে বারবার এ নায়কের আসনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বলা যায়, যেন হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছে। শত চেষ্টা করেও তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাস দেয় না তেমন কিছু করতে। ইতিহাস নিজের অঙ্গ নিজে করে না ছেদন। শেখ মুজিব ইতিহাসের তেমন এক অচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশ্ব ইতিহাসেরও।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অধ্যাপক আবুল ফজলের এ লেখনী প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু মানসকে অনুধাবন; বিশেষ করে বর্তমান ও আগামী দিনের শিশু-কিশোর-তরুণদের নিগূঢ় উপলব্ধিতে আনা না গেলে আমাদের দায়বদ্ধতা একদিন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট