কৈশোর-যৌবনেই মানবসেবার হাতেখড়ি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর
jugantor
কৈশোর-যৌবনেই মানবসেবার হাতেখড়ি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৮ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষণজন্মা মহান মানুষের খুব লম্বা তালিকা থাকে না। হাতেগোনা সংখ্যা থেকেই তাদের খুঁজে নিতে হয়। এসব কৃতী মানুষ নিজের কর্মেই সমাজে, দেশে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জ্যোতি ছড়ান। বিশ্ব ইতিহাসে এমন একজন জ্যোতির্ময় পুরুষ বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শৈশব থেকে যার সংগ্রামী আর বিপ্লবী জীবনের শুরু।

বাঙালির মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। শাসকগোষ্ঠীর কোপানলে পড়েছেন। জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন বহুবার। কিন্তু পিছু হটেননি। নেতৃত্বের অসাধারণ গুণে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আজকের লেখায় এ মহান মানুষের প্রাসঙ্গিক বিশেষ দিকটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করছি।

বর্তমানের এ মহামারী পরিস্থিতিতে করোনার কারণে জীবিকাহীন, বানভাসি-নদীভাঙনে বিপর্যস্ত অসহায় মানুষের দিকে তাকিয়ে বঙ্গবন্ধুর কথা খুব মনে পড়ছে। ছেলেবেলা থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল তার। দুস্থ মানুষের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ রাজনীতি ও রাজনীতির আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজদের সহস্রকোটি টাকা লোপাটের কাহিনী আর অসহায় মানুষদের আর্তি শুনতে হতো না।

শেখ মুজিব ১৯৩৯ সালে কলকাতা যান প্রধানত বেড়াতে। তবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করাও আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। এ সময় ছাত্রনেতা ছিলেন আবদুল ওয়াসেক। তার সঙ্গে আলাপ হয়। তাকে গোপালগঞ্জ আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। শেখ মুজিব শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জানালেন তিনি গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের শাখা গঠন করতে চান।

সিদ্ধান্ত মতো গোপালগঞ্জে ফিরে সংগঠন গড়ায় মনোযোগ দিলেন। এ সময় গোপালগঞ্জের খন্দকার শামসুদ্দীন এমএলএ সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেন। ছাত্রলীগের সভাপতি হলেন তিনি আর সম্পাদক হলেন শেখ মুজিব। প্রত্যক্ষ না হলেও মুসলিম লীগের অনেক সাংগঠনিক কাজও করতেন শেখ মুজিব। এরপর গোপালগঞ্জে গঠন করা হয় ‘মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটি’। এ কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়। এভাবে ধীরে ধীরে শেখ মুজিব রাজনীতির ভেতর প্রবেশ করতে থাকেন।

বাবা লুৎফর রহমান ছিলেন দূরদর্শী। তিনি ছেলের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে বাধা দেননি। শুধু সতর্ক করতেন লেখাপড়া যাতে ঠিকমতো চলে। অসুস্থতার কারণে দু’বছরের বেশি নষ্ট হওয়ায় শেখ মুজিবও এ সময় পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছিলেন। খেলাধুলার প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল মুজিবের। এটি পৈতৃক সূত্রেই পাওয়া। তবে তার হার্টের অসুখ থাকায় বাবা খেলায় তেমন উৎসাহ দিতেন না। মুজিব মহকুমার ভালো খেলোয়াড়দের এনে নিজ স্কুলে ভর্তি করিয়ে বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করতেন।

১৯৪১ সালে মেট্রিক পরীক্ষার সময় থেকে শেখ মুজিব বলা যায় সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন। মিটিং, মিছিল বক্তৃতা চলতে থাকে। গোপালগঞ্জের মুসলিম লীগ আর ছাত্র সমাজের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। এ সময় লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন চলছিল। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে গেছেন মুজিব।

পরীক্ষা দিয়েই তিনি রাজনীতির টানে চলে গেলেন কলকাতায়। নানা সভা-সমিতিতে যোগ দিতে থাকেন। সেখান থেকে মাদারীপুরে এসে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। এ সময় থেকে তার ঘন ঘন যোগাযোগ হতে থাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। শেখ মুজিব মেট্রিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এবার তিনি ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। তার থাকার জায়গা হয় বেকার হোস্টেলে।

এর মধ্যে নাটোর ও বালুরঘাটে ফজলুল হকের দলের সঙ্গে মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থীদের দুটো উপনির্বাচন হয়। সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি এ নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে কাজ করেন। এভাবে তিনি সোহরাওয়ার্দীর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন।

শেখ মুজিব ইসলামিয়া কলেজেও একজন ছাত্রনেতা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে পড়েন। এ সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিচয় শেখ মুজিবের জবানি থেকেই জানা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন-‘এই সময় ইসলামিয়া কলেজে আমি খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছি। অফিসিয়াল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তাদের পরাজিত করলাম। ইসলামিয়া কলেজই ছিল বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র।

পরের বছরও ১৯৪৩ সালে ইলেকশনে আনোয়ার সাহেবের অফিসিয়াল ছাত্রলীগ পরাজিত হল। তারপর আর তিন বছর কেউই আমার মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইলেকশন করেনি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের ইলেকশন হতো। আমি ছাত্রনেতাদের নিয়ে আলোচনা করে যাদের ঠিক করে দিতাম তারাই নমিনেশন দাখিল করত, আর কেউ করত না।

কারণ জানত, আমার মতের বিরুদ্ধে কারও জেতার সম্ভাবনা ছিল না। জহিরুদ্দিন আমাকে সাহায্য করত। সে কলকাতার বাসিন্দা, ছাত্রদের ওপর তার যথেষ্ট প্রভাব ছিল। নিঃস্বার্থ কর্মী বলে সবাই তাকে শ্রদ্ধাও করত। চমৎকার ইংরেজি, বাংলা ও উর্দুতে বক্তৃতা করতে পারত। জহির পরে ইসলামিয়া কলেজ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তবুও আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। কিছু দিনের জন্য সে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় রেডিওতে চাকরি নিয়ে চলে আসায় আমার খুবই অসুবিধা হয়েছিল।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ.১৬-১৭)।

দুস্থ মানুষের পাশে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। অনেক মানুষ মারা যেতে থাকে। সোহরাওয়ার্দী তখন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী। তিনি দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। গঠিত হয় সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট। ন্যায্যমূল্যের দোকান খোলা হয়। এরপর সোহরাওয়ার্দী লঙ্গরখানা খোলার নির্দেশ দেন। মুজিব লেখাপড়া আপাতত বাদ দিয়ে দুর্ভিক্ষ-পীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তার তত্ত্বাবধানে অনেক লঙ্গরখানা খোলা হয়। এখান থেকে দিনে একবার করে খাবার দেয়া হতো। মুসলিম লীগ অফিস, কলকাতা মাদ্রাসাসহ অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। এ সময় শেখ মুজিবকে সার্বক্ষণিক পরিশ্রম করতে হতো। কোনোদিন হোস্টেলে গিয়ে ঘুমাতে পারতেন, আবার কোনোদিন মুসলিম লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে রাত কাটাতেন।

শুধু কলকাতাতে নয়, শেখ মুজিব রিলিফের কাজে গোপলগঞ্জেও যান। এখানেও সাধারণ মানুষের ওপর দুর্ভিক্ষের কঠিন থাবা পড়েছিল। না খেতে পেরে অধিকাংশ মানুষই কঙ্কালসার। এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব তার সাংগঠনিক প্রতিভার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য তার আত্মজীবনীর শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।

তিনি লিখেছেন-‘গোপালগঞ্জের মুসলমানরা ব্যবসায়ী এবং যথেষ্ট ধান হয় এখানে। খেয়ে-পরে মানুষ কোনোমতে চলতে পারত। অনেকেই আমাকে পরামর্শ দিল, যদি একটা কনফারেন্স করা যায় আর সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতাদের আনা যায় তবে চোখে দেখলে এ তিন জেলার (যশোর, খুলনা, বরিশাল) লোকে কিছু বেশি সাহায্য পেতে পারে এবং লোকদের বাঁচানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে বসলাম। আলোচনা হল, সবাই বলল, এ অঞ্চলে কোনোদিন পাকিস্তানের দাবির জন্য কোনো বড় কনফারেন্স হয়নি। তাই কনফারেন্স হলে তিন জেলার মানুষের মধ্যে জাগরণের সৃষ্টি হবে। এতে দুটি কাজ হবে, মুসলিম লীগের শক্তি বাড়বে, আর জনগণও সাহায্য পাবে। সব এলাকা থেকে কিছুসংখ্যক কর্মীকে আমন্ত্রণ করা হল।

আলোচনা করে ঠিক হল, সম্মেলনে দক্ষিণ বাংলা পাকিস্তান কনফারেন্স নাম দেয়া হবে এবং তিন জেলার লোকদের দাওয়াত করা হবে। সভা আহ্বান করা হল অভ্যর্থনা কমিটি করার জন্য। বয়স্ক নেতাদের থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও একজনকে সেক্রেটারি করা হবে। প্রধান যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ রাজি হন না, কারণ খরচ অনেক হবে।

দেশে দুর্ভিক্ষ, টাকা-পয়সা তুলতে পারা যাবে না। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে আমাকেই অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান এবং যশোর জেলার মৌলভী আফসার উদ্দিন মোল্লা নামে একজন বড় ব্যবসায়ীকে সম্পাদক করা হল।

আমি কলকাতায় রওনা হয়ে গেলাম, নেতাদের দাওয়াত করার জন্য। যখন সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দাওয়াত করতে গেলাম, দেখি খাজা শাহাবুদ্দীন সেখানে উপস্থিত আছেন। শহীদ সাহেব বললেন, ‘আমি খুব ব্যস্ত, তুমি বুঝতেই পার, নিশ্চয়ই চেষ্টা করব যেতে। শাহাবুদ্দীন সাহেবকে নিমন্ত্রণ কর উনিও যাবেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও শাহাবুদ্দীন সাহেবকে বলতে হল, তিনিও রাজি হলেন।

তমিজুদ্দীন খান তখন শিক্ষামন্ত্রী, ফরিদপুর বাড়ি, তাকেও অনুরোধ করলাম, তিনিও রাজি হলেন। মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ এবং হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী সাহেবকেও দাওয়াত দিলাম। জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী (লালমিয়া), তখন কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগ রিলিফ কমিটির সম্পাদক। আমি তার সঙ্গেই রিলিফের কাজ করতাম, আমাকে খুবই বিশ্বাস করতেন। তিনি যথেষ্ট টাকা, ওষুধ ও কাপড় জোগাড় করেছিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে থাকতে হতো।

আর প্রত্যেক মহকুমায় কাপড় পাঠাতে হতো। যুদ্ধের সময় মালপত্র বুক করা কঠিন ছিল, দশ দিন ঘোরাঘুরি করলে কিছু কিছু কাপড় পাঠানোর মতো জায়গা পাওয়া যেত। অনেক সময় হিসাব-নিকাশও দেখাতে হতো। নিজের হাতে কাপড়ের গাঁটও বাঁধতে হতো। আমি কোনো কাজেই ‘না’ বলতাম না। যা হোক, তাকেও গোপালগঞ্জ যেতে অনুরোধ করলাম। তিনিও রাজি হলেন। দিন তারিখ ঠিক করে আমি বাড়ি রওনা হয়ে এলাম।

সামান্য কিছু টাকা তুললাম শহর থেকে। আমি গ্রামে বের হয়ে পড়লাম, কিছু কিছু অবস্থাশালী লোক ছিল মহকুমায়, তাদের বাড়িতে যেয়ে কিছু কিছু টাকা তুলে আনলাম। কাজ শুরু হয়ে গেছে। লোকজন চারদিকে নামিয়ে দিয়েছি। অতিথিদের খাবারের ভার আব্বাই নিলেন। তবে পাক হবে এক সরকারি কর্মচারীর বাড়িতে। পরে দুই পক্ষ হয়ে গেল।

গোলমাল শুরু হলে শেষ পর্যন্ত গোপালগঞ্জে আমাদের বাড়িতেই বন্দোবস্ত হল। প্যান্ডেল করলাম নৌকার বাদাম দিয়ে। যাদের বড় বড় নৌকা ছিল তাদের বাড়ি থেকে দুই দিনের জন্য বাদামগুলো ধার করে আনলাম। পাঁচ হাজার লোক বসতে পারে এতবড় প্যান্ডেল করলাম। খরচ খুব বেশি হল না।’

এভাবেই কৈশোরে এবং তরুণ বয়সে বঙ্গবন্ধুর মানবিক দিকগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। তিনি অক্লান্ত শ্রম দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানুষের প্রতি এমন ভালোবাসা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লালন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

কৈশোর-যৌবনেই মানবসেবার হাতেখড়ি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৮ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষণজন্মা মহান মানুষের খুব লম্বা তালিকা থাকে না। হাতেগোনা সংখ্যা থেকেই তাদের খুঁজে নিতে হয়। এসব কৃতী মানুষ নিজের কর্মেই সমাজে, দেশে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জ্যোতি ছড়ান। বিশ্ব ইতিহাসে এমন একজন জ্যোতির্ময় পুরুষ বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শৈশব থেকে যার সংগ্রামী আর বিপ্লবী জীবনের শুরু।

বাঙালির মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। শাসকগোষ্ঠীর কোপানলে পড়েছেন। জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন বহুবার। কিন্তু পিছু হটেননি। নেতৃত্বের অসাধারণ গুণে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আজকের লেখায় এ মহান মানুষের প্রাসঙ্গিক বিশেষ দিকটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করছি।

বর্তমানের এ মহামারী পরিস্থিতিতে করোনার কারণে জীবিকাহীন, বানভাসি-নদীভাঙনে বিপর্যস্ত অসহায় মানুষের দিকে তাকিয়ে বঙ্গবন্ধুর কথা খুব মনে পড়ছে। ছেলেবেলা থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল তার। দুস্থ মানুষের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ রাজনীতি ও রাজনীতির আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজদের সহস্রকোটি টাকা লোপাটের কাহিনী আর অসহায় মানুষদের আর্তি শুনতে হতো না।

শেখ মুজিব ১৯৩৯ সালে কলকাতা যান প্রধানত বেড়াতে। তবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করাও আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। এ সময় ছাত্রনেতা ছিলেন আবদুল ওয়াসেক। তার সঙ্গে আলাপ হয়। তাকে গোপালগঞ্জ আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। শেখ মুজিব শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জানালেন তিনি গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের শাখা গঠন করতে চান।

সিদ্ধান্ত মতো গোপালগঞ্জে ফিরে সংগঠন গড়ায় মনোযোগ দিলেন। এ সময় গোপালগঞ্জের খন্দকার শামসুদ্দীন এমএলএ সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেন। ছাত্রলীগের সভাপতি হলেন তিনি আর সম্পাদক হলেন শেখ মুজিব। প্রত্যক্ষ না হলেও মুসলিম লীগের অনেক সাংগঠনিক কাজও করতেন শেখ মুজিব। এরপর গোপালগঞ্জে গঠন করা হয় ‘মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটি’। এ কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়। এভাবে ধীরে ধীরে শেখ মুজিব রাজনীতির ভেতর প্রবেশ করতে থাকেন।

বাবা লুৎফর রহমান ছিলেন দূরদর্শী। তিনি ছেলের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে বাধা দেননি। শুধু সতর্ক করতেন লেখাপড়া যাতে ঠিকমতো চলে। অসুস্থতার কারণে দু’বছরের বেশি নষ্ট হওয়ায় শেখ মুজিবও এ সময় পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছিলেন। খেলাধুলার প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল মুজিবের। এটি পৈতৃক সূত্রেই পাওয়া। তবে তার হার্টের অসুখ থাকায় বাবা খেলায় তেমন উৎসাহ দিতেন না। মুজিব মহকুমার ভালো খেলোয়াড়দের এনে নিজ স্কুলে ভর্তি করিয়ে বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করতেন।

১৯৪১ সালে মেট্রিক পরীক্ষার সময় থেকে শেখ মুজিব বলা যায় সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন। মিটিং, মিছিল বক্তৃতা চলতে থাকে। গোপালগঞ্জের মুসলিম লীগ আর ছাত্র সমাজের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। এ সময় লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন চলছিল। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে গেছেন মুজিব।

পরীক্ষা দিয়েই তিনি রাজনীতির টানে চলে গেলেন কলকাতায়। নানা সভা-সমিতিতে যোগ দিতে থাকেন। সেখান থেকে মাদারীপুরে এসে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। এ সময় থেকে তার ঘন ঘন যোগাযোগ হতে থাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। শেখ মুজিব মেট্রিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এবার তিনি ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। তার থাকার জায়গা হয় বেকার হোস্টেলে।

এর মধ্যে নাটোর ও বালুরঘাটে ফজলুল হকের দলের সঙ্গে মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থীদের দুটো উপনির্বাচন হয়। সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি এ নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে কাজ করেন। এভাবে তিনি সোহরাওয়ার্দীর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন।

শেখ মুজিব ইসলামিয়া কলেজেও একজন ছাত্রনেতা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে পড়েন। এ সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিচয় শেখ মুজিবের জবানি থেকেই জানা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন-‘এই সময় ইসলামিয়া কলেজে আমি খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছি। অফিসিয়াল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তাদের পরাজিত করলাম। ইসলামিয়া কলেজই ছিল বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র।

পরের বছরও ১৯৪৩ সালে ইলেকশনে আনোয়ার সাহেবের অফিসিয়াল ছাত্রলীগ পরাজিত হল। তারপর আর তিন বছর কেউই আমার মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইলেকশন করেনি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের ইলেকশন হতো। আমি ছাত্রনেতাদের নিয়ে আলোচনা করে যাদের ঠিক করে দিতাম তারাই নমিনেশন দাখিল করত, আর কেউ করত না।

কারণ জানত, আমার মতের বিরুদ্ধে কারও জেতার সম্ভাবনা ছিল না। জহিরুদ্দিন আমাকে সাহায্য করত। সে কলকাতার বাসিন্দা, ছাত্রদের ওপর তার যথেষ্ট প্রভাব ছিল। নিঃস্বার্থ কর্মী বলে সবাই তাকে শ্রদ্ধাও করত। চমৎকার ইংরেজি, বাংলা ও উর্দুতে বক্তৃতা করতে পারত। জহির পরে ইসলামিয়া কলেজ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তবুও আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। কিছু দিনের জন্য সে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় রেডিওতে চাকরি নিয়ে চলে আসায় আমার খুবই অসুবিধা হয়েছিল।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ.১৬-১৭)।

দুস্থ মানুষের পাশে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। অনেক মানুষ মারা যেতে থাকে। সোহরাওয়ার্দী তখন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী। তিনি দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। গঠিত হয় সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট। ন্যায্যমূল্যের দোকান খোলা হয়। এরপর সোহরাওয়ার্দী লঙ্গরখানা খোলার নির্দেশ দেন। মুজিব লেখাপড়া আপাতত বাদ দিয়ে দুর্ভিক্ষ-পীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তার তত্ত্বাবধানে অনেক লঙ্গরখানা খোলা হয়। এখান থেকে দিনে একবার করে খাবার দেয়া হতো। মুসলিম লীগ অফিস, কলকাতা মাদ্রাসাসহ অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। এ সময় শেখ মুজিবকে সার্বক্ষণিক পরিশ্রম করতে হতো। কোনোদিন হোস্টেলে গিয়ে ঘুমাতে পারতেন, আবার কোনোদিন মুসলিম লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে রাত কাটাতেন।

শুধু কলকাতাতে নয়, শেখ মুজিব রিলিফের কাজে গোপলগঞ্জেও যান। এখানেও সাধারণ মানুষের ওপর দুর্ভিক্ষের কঠিন থাবা পড়েছিল। না খেতে পেরে অধিকাংশ মানুষই কঙ্কালসার। এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব তার সাংগঠনিক প্রতিভার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য তার আত্মজীবনীর শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।

তিনি লিখেছেন-‘গোপালগঞ্জের মুসলমানরা ব্যবসায়ী এবং যথেষ্ট ধান হয় এখানে। খেয়ে-পরে মানুষ কোনোমতে চলতে পারত। অনেকেই আমাকে পরামর্শ দিল, যদি একটা কনফারেন্স করা যায় আর সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতাদের আনা যায় তবে চোখে দেখলে এ তিন জেলার (যশোর, খুলনা, বরিশাল) লোকে কিছু বেশি সাহায্য পেতে পারে এবং লোকদের বাঁচানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে বসলাম। আলোচনা হল, সবাই বলল, এ অঞ্চলে কোনোদিন পাকিস্তানের দাবির জন্য কোনো বড় কনফারেন্স হয়নি। তাই কনফারেন্স হলে তিন জেলার মানুষের মধ্যে জাগরণের সৃষ্টি হবে। এতে দুটি কাজ হবে, মুসলিম লীগের শক্তি বাড়বে, আর জনগণও সাহায্য পাবে। সব এলাকা থেকে কিছুসংখ্যক কর্মীকে আমন্ত্রণ করা হল।

আলোচনা করে ঠিক হল, সম্মেলনে দক্ষিণ বাংলা পাকিস্তান কনফারেন্স নাম দেয়া হবে এবং তিন জেলার লোকদের দাওয়াত করা হবে। সভা আহ্বান করা হল অভ্যর্থনা কমিটি করার জন্য। বয়স্ক নেতাদের থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও একজনকে সেক্রেটারি করা হবে। প্রধান যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ রাজি হন না, কারণ খরচ অনেক হবে।

দেশে দুর্ভিক্ষ, টাকা-পয়সা তুলতে পারা যাবে না। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে আমাকেই অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান এবং যশোর জেলার মৌলভী আফসার উদ্দিন মোল্লা নামে একজন বড় ব্যবসায়ীকে সম্পাদক করা হল।

আমি কলকাতায় রওনা হয়ে গেলাম, নেতাদের দাওয়াত করার জন্য। যখন সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দাওয়াত করতে গেলাম, দেখি খাজা শাহাবুদ্দীন সেখানে উপস্থিত আছেন। শহীদ সাহেব বললেন, ‘আমি খুব ব্যস্ত, তুমি বুঝতেই পার, নিশ্চয়ই চেষ্টা করব যেতে। শাহাবুদ্দীন সাহেবকে নিমন্ত্রণ কর উনিও যাবেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও শাহাবুদ্দীন সাহেবকে বলতে হল, তিনিও রাজি হলেন।

তমিজুদ্দীন খান তখন শিক্ষামন্ত্রী, ফরিদপুর বাড়ি, তাকেও অনুরোধ করলাম, তিনিও রাজি হলেন। মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ এবং হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী সাহেবকেও দাওয়াত দিলাম। জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী (লালমিয়া), তখন কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগ রিলিফ কমিটির সম্পাদক। আমি তার সঙ্গেই রিলিফের কাজ করতাম, আমাকে খুবই বিশ্বাস করতেন। তিনি যথেষ্ট টাকা, ওষুধ ও কাপড় জোগাড় করেছিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে থাকতে হতো।

আর প্রত্যেক মহকুমায় কাপড় পাঠাতে হতো। যুদ্ধের সময় মালপত্র বুক করা কঠিন ছিল, দশ দিন ঘোরাঘুরি করলে কিছু কিছু কাপড় পাঠানোর মতো জায়গা পাওয়া যেত। অনেক সময় হিসাব-নিকাশও দেখাতে হতো। নিজের হাতে কাপড়ের গাঁটও বাঁধতে হতো। আমি কোনো কাজেই ‘না’ বলতাম না। যা হোক, তাকেও গোপালগঞ্জ যেতে অনুরোধ করলাম। তিনিও রাজি হলেন। দিন তারিখ ঠিক করে আমি বাড়ি রওনা হয়ে এলাম।

সামান্য কিছু টাকা তুললাম শহর থেকে। আমি গ্রামে বের হয়ে পড়লাম, কিছু কিছু অবস্থাশালী লোক ছিল মহকুমায়, তাদের বাড়িতে যেয়ে কিছু কিছু টাকা তুলে আনলাম। কাজ শুরু হয়ে গেছে। লোকজন চারদিকে নামিয়ে দিয়েছি। অতিথিদের খাবারের ভার আব্বাই নিলেন। তবে পাক হবে এক সরকারি কর্মচারীর বাড়িতে। পরে দুই পক্ষ হয়ে গেল।

গোলমাল শুরু হলে শেষ পর্যন্ত গোপালগঞ্জে আমাদের বাড়িতেই বন্দোবস্ত হল। প্যান্ডেল করলাম নৌকার বাদাম দিয়ে। যাদের বড় বড় নৌকা ছিল তাদের বাড়ি থেকে দুই দিনের জন্য বাদামগুলো ধার করে আনলাম। পাঁচ হাজার লোক বসতে পারে এতবড় প্যান্ডেল করলাম। খরচ খুব বেশি হল না।’

এভাবেই কৈশোরে এবং তরুণ বয়সে বঙ্গবন্ধুর মানবিক দিকগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। তিনি অক্লান্ত শ্রম দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানুষের প্রতি এমন ভালোবাসা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লালন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

 

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট