আসামে বিজেপির সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের পুনঃপ্রকাশ

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বদরুদ্দীন উমর

একটি জাতীয় দৈনিকে নিম্নলিখিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে : ‘ভারতের আসামে দ্বিতীয় দফা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) তালিকা প্রকাশ করা হবে আজ শনিবার।

রাজ্য সরকার এরই মধ্যে জানিয়েছে, এবার নাগরিকত্ব বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন ৪৮ লাখ মানুষ, যার বেশিরভাগই মুসলমান। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, তালিকায় বাদ পড়া মুসলমানদের পাঠানো হবে বাংলাদেশে।

তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিন্দুদের ভারতে থাকতে দেয়া হবে। খবর আলজাজিরার’ (সমকাল, ৩১.০৩.২০১৮)। এটা ‘বন্ধুত্বের’ খুব চমৎকার নিদর্শনই বটে! ১৯৭২ সাল থেকেই আমরা শুনে আসছি ভারত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র! এর মূল কারণ নাকি ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করা। ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল এ কথা সর্বাংশে সঠিক।

কিন্তু ভারতের এই বদান্যতা কি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারত সরকারের মানবিক ভালোবাসা? পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাঝে কি ভারতের স্বার্থ ছিল না? এই স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই কি তারা ১৯৭১ সালে উদ্ভূত পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে কাজে লাগায়নি? এ কথা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি পরবর্তীকালে ভারত সরকারের সমগ্র নীতি ও আচরণের মধ্যে পাওয়া যায় না? এর প্রমাণ কি ভারতের আসাম রাজ্যের উপরোক্ত চক্রান্তের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমরা বাংলাদেশ সরকারের থেকে শুনে আসছি বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বন্ধুত্বের কথা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারত বাংলাদেশের প্রতি প্রতিটি সরকারের অধীনে যে আচরণ করে আসছে, নানাভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ উপেক্ষা ও পদদলিত করে নিজেদের স্বার্থ যেভাবে উদ্ধার করছে, তার মধ্যে কোথাও কি তাদের এই তথাকথিত বন্ধুত্বের পরিচয় পাওয়া যায়?

ছোটখাটো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি তারা বদান্যতা দেখিয়ে এলেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বের পরিবর্তে তার বিপরীত যে তারা পরিচয় রাখছে তার ফিরিস্তি এখানে দেয়া সম্ভব নয়।

তবে এর একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হল মিয়ানমার রাখাইনের রোহিঙ্গা বিতাড়নের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে দশ লাখ রোহিঙ্গাকে সেদেশ থেকে বিতাড়িত করেছে, হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে, তাদের জমিজমা ভিটেবাড়ি দখল করে যে চরম নির্যাতন তাদের ওপর চালাচ্ছে, তার প্রতি ভারত সরকারের সমর্থন।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে গিয়ে তাদের রোহিঙ্গা বিতাড়ন বিষয়ে প্রতিবাদ না করে, এ বিষয়ে একটি বাক্য উচ্চারণ না করে তাদের প্রকারান্তরে সমর্থনই করেছেন। এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই।

এখনও পর্যন্ত তারা মিয়ানমারের এই ফ্যাসিস্ট নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রতিবাদও করেনি। কারণ মিয়ানমারে তাদের স্বার্থ আছে এবং এই স্বার্থোদ্ধারের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে।

এদিক দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য রোহিঙ্গা বিষয়ে তাদের নীরব ভূমিকার কারণ বোঝার অসুবিধা নেই। তাছাড়া এর অন্য একটি কারণ, যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, তাদের ওপর চরম অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে, তারা মুসলমান।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুসলমানরা শুধু ভারতে নয়, দুনিয়ার সর্বত্র শত্র“বিশেষ। এ কারণেই নরেন্দ্র মোদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পরম বন্ধু।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হলেও এ হল অসম বন্ধুত্ব। সুতরাং তারা তাদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে, এটাই স্বাভাবিক। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের বন্ধুত্ব এবং বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অবন্ধুত্ব সমান্তরালভাবেই চলে আসছে।

কিন্তু মিয়ানমার অন্য ব্যাপার। সেখানে নিজেদের অবস্থান তৈরি ও শক্তিশালী করতে হলে তাদের স্বার্থ উপেক্ষার কোনো ক্ষমতা ভারতের নেই। তার পরিবর্তে মিয়ানমারকে তোয়াজ করাই তাদের প্রয়োজন।

এ কাজটিই তারা করছে এবং এজন্যই মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, সেখান থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে কোনো প্রতিবাদ করেনি। প্রতিবাদ করার কোনো তাগিদ আছে বলেও মনে হয় না।

এখন ভারতের সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকার আসাম থেকে মিয়ানমারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেখান থেকে বাংলাদেশি বিতাড়নের চক্রান্ত করছে। এই চক্রান্ত তাদের দীর্ঘদিনের। তারা এখন মনে করছে, এ চক্রান্ত কার্যকর করার সময় তাদের এসেছে। কাজেই তারা আসাম থেকে ৪৮ লাখ মুসলমান বাংলাদেশিকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পরিকল্পনা করছে।

এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, মুসলমান বিতাড়নের এই কর্মসূচি প্রসঙ্গে আসামের বিজেপিদলীয় অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই বলছেন, আসামে নাগরিক হিসবে যে হিন্দুরা নথিভুক্ত নয় তাদের বাংলাদেশে তাড়িয়ে না দিয়ে তারা ভারতে থাকতে দেবেন! এ ধরনের কথা কি কোনো সভ্য দেশের সরকার বলতে পারে? এ নীতি কি চরম সাম্প্রদায়িক নীতি নয়? এটি কি ইসরাইল কর্তৃক আরব মুসলমান বিতাড়নের সমতুল্য নয়?

অথচ ভারতের সংবিধানে ভারতকে একটি ধর্মবিযুক্ত (Secular) রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং কংগ্রেস থেকে শুরু করে বিজেপি সরকার-পূর্ব প্রত্যেক সরকারই ভারতকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মবিযুক্ত দেশ হিসেবে ঢেঁড়ি পিটিয়ে এসেছে।

লক্ষ করার বিষয়, আসাম সরকার এখন সেখান থেকে যে মুসলমান খেদাও নীতি কার্যকর করার কথা বলছে, তার বিরুদ্ধে কংগ্রেস থেকে নিয়ে সিপিএম, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সরকার পর্যন্ত কেউই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেনি, যা তাদের করা কর্তব্য ছিল সঙ্গে সঙ্গে।

বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের জনসংখ্যার অধিকাংশই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। ১৯৪৭ সালের পর থেকে তারা দলে দলে ত্রিপুরায় গিয়ে সেখানকার আদিবাসী জনগণকে পরিণত করেছে সংখ্যালঘুতে। ত্রিপুরায় সিপিএম সরকারের পূর্ববর্তী কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীরা ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত।

সিপিএমের মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী ও মানিক সরকার এবং বর্তমান বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। কিন্তু তাদের ত্রিপুরায় নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে, তাদের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর কোনো কর্মসূচি ভারতের কোনো সরকারই চিন্তা পর্যন্ত করেনি। কারণ তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু। এটাও হল ভারতের ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘ধর্মবিযুক্ততার’ নিদর্শন!

ভারত বাংলাদেশকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে নিজেদের যতই সুবিধা আদায় করুক, বাংলাদেশ দৃশ্যত তার প্রতিবাদ করছে না। ভারত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত রেখে উত্তর বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করার মতো অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

তা সত্ত্বেও তিস্তার পানির হিস্যা বাংলাদেশের পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। অথচ ভারত বাংলাদেশের কাছে যা চাইছে, বাংলাদেশ ভারতকে তা-ই দিচ্ছে। তারা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং আশুগঞ্জ নদীবন্দর নিজেদের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করছে, তারা বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত থেকে ত্রিপুরা এবং উত্তর-পূর্ব ভারত পর্যন্ত করিডর পর্যন্ত পেয়ে গেছে। এছাড়া আরও অনেক সুবিধা তারা বাংলাদেশ থেকে আদায় করে চলেছে একতরফাভাবে।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থা বড়ই অসহায়। এসব কিছুকেই সরকার যে মেনে নিচ্ছে তাই নয়, ভারতের এই একতরফা সুবিধা আদায়ের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রতিবাদ নেই।

উপরন্তু এ সবই তারা ‘দেশপ্রেমিক’ সরকার হিসেবে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টায় নিয়োজিত। এসব দেখেশুনে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তার জন্য ভারতের প্রশংসা গীত গাওয়া থেকে চমৎকার ব্যাপার আর কী হতে পারে?

৩১.০৩.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল