শেয়ারবাজারের প্রতি যেভাবে আস্থা ফেরানো যায়
jugantor
অন্যমত
শেয়ারবাজারের প্রতি যেভাবে আস্থা ফেরানো যায়

  আবু আহমেদ  

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজারের প্রতি যেভাবে আস্থা ফেরানো যায়

করোনা মহামারীর কারণে মার্চের পর থেকে দুই মাসেরও অধিককাল স্টক মার্কেট বন্ধ ছিল। এ বন্ধ থাকার কারণে অনেকেই এর প্রতি ছিল অসন্তুষ্ট। কারণ করোনাকালে পৃথিবীর কোনো স্টক মার্কেটই বন্ধ ছিল না। তাহলে বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট কেন বন্ধ রাখা হয়েছিল, এ নিয়ে সবার মাঝেই প্রশ্ন দেখা দেয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এর প্রতিবাদও করেছে; কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। এর আগের সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্থাৎ প্রফেসর খায়রুল হোসেন কমিশনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় স্টক মার্কেট খোলার ব্যাপারে তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তারা হয়তো মনে করেছেন নতুন কমিশন এসে যা করার করবে। এ বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল। প্রফেসর খায়রুল হোসেন কমিশনের সময় ফ্লোর প্রাইস পড়ে গিয়েছিল। যার ফলে ৯০ শতাংশ শেয়ার ঠেকে গেল ক্রেতা না থাকার কারণে। ফলে টার্ন ওভার (প্রতিদিনের কেনাবেচা) হয়ে পড়েছিল ১০০ কোটি টাকারও নিচে। এ অবস্থার কারণে পুঁজিবাজার বলতে যা বোঝায় বা আমরা পুঁজিবাজার নিয়ে যে আশা পোষণ করি সেটি যেন নিষ্প্রভ হয়ে গেল।

প্রফেসর খায়রুল হোসেন কমিশন ১০ বছর ক্ষমতায় ছিল। তারা আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা কমিয়ে দেয় এবং প্রায় ৯০টি কোম্পানিকে আইপিওতে স্থান করে দেয়। এর মধ্যে ১০-১২টি কোম্পানি ছাড়া বাকিগুলো ছিল জাঙ্ক কোম্পানি। এ ধরনের জাঙ্ক কোম্পানির শেয়ার কিনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া কতিপয় উদ্যোক্তা আছে যাদের শুরু থেকেই নিয়ত খারাপ ছিল, তারা তাদের শেয়ারগুলো কৌশলে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে দিয়ে মূলধন নিয়ে সটকে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এবং স্টক মার্কেটে নেমে আসে হতাশা। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন বুঝে হোক, না বুঝে হোক অথবা নিজেদের সুযোগ-সুবিধার জন্যই হোক, তারা এক কোম্পানির সঙ্গে অন্য কোম্পানির মার্জার করার অনুমতি দিয়ে দেয়। যার ফলে স্টক মার্কেটে হতাশার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। মার্জার করার কারণে ইক্যুইটি বেড়ে যাওয়ার ফলে যে শেয়ারের দাম ৪০ টাকা ছিল সেটি চলে আসে ৫ টাকায়। যার কারণে বিনিয়োগকারীরা স্টক মার্কেটের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। এভাবে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন জনস্বার্থবিরোধী কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কিছুর জন্য শেয়ারবাজারে একটা হতাশা সৃষ্টি হয় এবং এজন্য কিছু বিনিয়োগকারী বিক্ষোভও করে। আমরাও এ ব্যাপারে অনেক লেখালেখি করলাম, টেলিভিশনেও অনেক কথা বলা হল। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং আগের কমিশনকে ডেকে পাঠায়। শেয়ারবাজারকে চাঙা করার জন্য তিনি কিছু দিকনির্দেশনা দিলেন। তার এ দিকনির্দেশনাগুলো ছিল অত্যন্ত চমৎকার। ছয়টি দিকনির্দেশনার মধ্যে দুটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হল, শেয়ারবাজারকে ফান্ড সাপ্লাই দেয়ার জন্য সরকারি ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউটগুলো যেমন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, আইসিবি এদেরকে সক্রিয়ভাবে শেয়ার মার্কেটে ইনভেস্টমেন্টে যেতে হবে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককেও বলা হল শেয়ারবাজারে ফান্ড প্রাপ্যতার জন্য যাতে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই নির্দেশ পালনও করল। শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরাতে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানো। এ গভীরতা বাড়ানোর জন্য গত ১৫ বছর ধরে অনেকে বলেছে, আমিও বলেছি। এখন প্রশ্ন হল, গভীরতা বাড়ানোর উপায় কী? একটা জাঙ্ক কোম্পানি যত বিরাট আকারেরই পেইড আপ ক্যাপিটাল নিয়ে আসুক না কেন, সেটি পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে পারবে না। কারণ একটি জাঙ্ক কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারে না। ফলে তাদের শেয়ারের দাম পড়ে যায়, বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়ে। কোনো কোনো জাঙ্ক কোম্পানি প্রিমিয়াম দিলেও তার শেয়ার ১০ টাকার নিচে চলে যায়। অ্যাপোলো ইস্পাত, টেক্সটাইলের মতো অনেক কোম্পানি প্রিমিয়াম দিলেও শেয়ারের দাম পড়ে গেছে। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। এগুলো দেখেও কেউ দেখে না। উচিত ছিল এ বিষয়গুলো সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের দেখা এবং পদক্ষেপ নেয়া।

যাহোক, প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় দিকনির্দেশনায় ফিরে আসি। শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়াতে হলে স্থানীয় ভালো কোম্পানি এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারের আওতায় আনতে হবে। তাহলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে। কারণ এ ধরনের কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার যোগ্য। টেক্সটাইল কোম্পানির মতো ১০টি কোম্পানিকে তালিকায় না এনে একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকায় আনা খুবই যুক্তিপূর্ণ। কেননা যতগুলো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কেটে আছে তার সব শেয়ারের দাম ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকার ওপরে। তারা বিনিয়োগকারীদের ভালো ডিভিডেন্ডও দিচ্ছে। সুতরাং শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানি তো অনেকই আছে, যার বেশিরভাগই আমাদের শেয়ারবাজারে আসেনি বা তালিকাভুক্ত হয়নি। যেমন- ইউনিলিভার, নেসলে, এইচএসবিসি, মেটলাইফ ইত্যাদি। টোটাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসার ৫০ শতাংশই মেটলাইফের অধীনে। সুতরাং মেটলাইফের মতো বীমা কোম্পানিকে না এনে ৫০টি অসুস্থ বীমা কোম্পানি এনলিস্টেড করলে কী লাভ হবে। এ ব্যাপারে কেউ কোনো কথা বলে না। ইউনিলিভার পাকিস্তানের করাচিতে এনলিস্টেড কোম্পানি, বোম্বেতে লিস্টেড কোম্পানি, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে লিস্টেড কোম্পানি, কুয়ালালামপুরে লিস্টেট কোম্পানি। তাহলে আমাদের দেশে লিস্টেড নয় কেন? সেটি পার্লামেন্ট থেকে এখন পর্যন্ত কেউ বলেনি। অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে এবং চেষ্টাও করা হয়েছিল; কিন্তু এরপর আর কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হলে তাদের প্রণোদনা দিতে হবে অথবা আইন করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। তা না হলে শেয়ারবাজারে গতি ফেরানো সম্ভব নয়।

আমাদের দেশের কোনো অর্থমন্ত্রী কি এ পর্যন্ত কোনো বহুজাতিক কোম্পানিকে ডেকেছে যে, আপনারা কেন শেয়ারবাজারের লিস্টিংয়ে আসছেন না? অথবা এদের থেকেও তো কিছু শোনা উচিত ছিল। কিন্তু এর কোনোটিই করা হয়নি। যদি করা হতো শেয়ারবাজার অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারত। দেশের বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিনিয়োগের প্রতি আস্থা ফিরে আসত।

তাহলে এর জন্য দায়ী কি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ? না তারা দায়ী নয়। কেননা তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে মিনিস্ট্রি অব ফাইন্যান্সের। কারণ তাদের অধীনে আছে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)। এনবিআর যদি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বলে যে, আপনারা শেয়ার মার্কেটে এলে এ সুবিধা পাবেন, আর যদি না আসেন তাহলে আমরা আপনার কোম্পানিতে বেশি মাত্রায় ট্যাক্স বসাব, তাহলেই তো হয়ে যায়। তারা তাদের ব্যবসা চালাতে হলে বাধ্য হয়েই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। এ রকম কোনো উদ্যোগ আজ অবধি নেয়া হয়নি। বর্তমান অর্থমন্ত্রীও দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু আজ প্রায় দেড় বছর হয়ে গেছে তিনি একটি শেয়ারও বিক্রি করতে পারেননি।

আমাদের দেশের মিডিয়াগুলোরও দোষ আছে। মিডিয়াগুলো শেয়ারবাজারের আলোচ্য বিষয়গুলোকে হেডলাইন করেনি। এর কারণ হচ্ছে, মিডিয়াতে যারা নিউজ এডিটর, যারা চিফ রিপোর্টার তারা এ লাইনের লোক নয়। তবে যারা অর্থনীতি বিট করেন তারা স্পেস পায় নিচে। যার ফলে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে থাকে।

চীন, ইন্ডিয়া তাদের শেয়ারবাজার সমৃদ্ধ করেছে সরকারি শেয়ার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। এরশাদ সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারি শেয়ার বিক্রি হয়েছে; কিন্তু পলিটিক্যাল সরকারের আমলে এ ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি, তাদের ইচ্ছাও নেই। সরকার টাকার জন্য পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধরনা দিচ্ছে। অথচ সরকারি শেয়ার বিক্রি করেই তো সরকার টাকা নিতে পারে। ওসমানী গ্লাস শিটে আইডল জায়গা পড়ে আছে। ইস্টার্ন কেবলসের বিরাট জায়গা আইডল পড়ে আছে। বাংলাদেশ বিমান পড়ে আছে। তারা বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না। কেন পারছে না? কারণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালালে এগুলোর থেকে ডিভিডেন্ড প্রত্যাশা করা দুরূহ। আমাদের দেশে সম্পদের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা দেখা দিচ্ছে এগুলোর মাধ্যমে। এতদিন পরে কেন জুটমিলগুলো বন্ধ করা হল? অনেক আগেই তো এগুলো বন্ধ করা উচিত ছিল। তাহলে সরকার বিশাল ক্ষতির হাত থেকে মুক্তি পেত।

নতুন কমিশন রুবায়েত শিবলী আসার পর জুনের প্রথম দিকে স্টক মার্কেট খুলে দেয়। এ কমিশন অনেক ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে শেয়ারবাজারে কিছুটা আস্থা এসেছে। তাদের হাতেও ক্ষমতা নেই। তারা এখন স্পষ্টই বুঝে গেছে, কোয়ালিটি স্টক লিস্টিং না হলে এ শেয়ারবাজার অতটা আস্থাশীল হবে না। এ নতুন কমিশন শেয়ারবাজারকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন দেখা যাক তারা কতদূর এগোতে পারে।

আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, শেয়ারবাজারকে সমৃদ্ধ করতে হলে কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স কমাতে হবে। সারা পৃথিবীতে কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স আমাদের থেকে অনেক কম। থাইল্যান্ডে কম, মিয়ানমারে কম, ভিয়েতনামে কম, ভারতেও কমানো হয়েছে। ইউকে’র মতো অ্যাডভান্স ইকোনমির দেশেও কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে ফেলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প আসার পর কর্পোরেট ট্যাক্স অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স যুক্তরাষ্ট্রে এখন ২০-এর নিচে। যেটি আগে ৪০ শতাংশ ছিল। আর আমাদের দেশে ৪৫ থেকে ৩৫ শতাংশ আর কোনো কোনো কোম্পানিতে ২৫ শতাংশ কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্সের অবস্থান। যার ফলে অনেক কোম্পানি তাদের লাভ অপ্রদর্শিত রেখে ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। আর এ লভ্যাংশ লুকানোর কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ পায় না। সুতরাং পলিসি মেকারদের এটা বুঝতে হবে যে, মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে, সেখানে এ ধরনের ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার কারণে যদি বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তারা কেন বিনিয়োগ করবে। আমি অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে বলব যে, পৃথিবীতে কেউ এটা প্রমাণ করতে পারেনি যে, Higher the tax rate the higher the revenue collection. ট্যাক্স রেট হাই থাকলে রেভিনিউ বেশি আসবে এটা প্রমাণিত নয়। বরং ট্যাক্স রেট কম থাকলে রেভিনিউ বেশি আসবে এটাই প্রমাণিত। কিন্তু আমাদের দেশের এনবিআর এটাকে উল্টোভাবে চিন্তা করে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এটা কাম্য হতে পারে না। শেয়ারবাজারকে তলানি থেকে টেনে তুলতে হলে আমাদের এ বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

অন্যমত

শেয়ারবাজারের প্রতি যেভাবে আস্থা ফেরানো যায়

 আবু আহমেদ 
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শেয়ারবাজারের প্রতি যেভাবে আস্থা ফেরানো যায়
ফাইল ছবি

করোনা মহামারীর কারণে মার্চের পর থেকে দুই মাসেরও অধিককাল স্টক মার্কেট বন্ধ ছিল। এ বন্ধ থাকার কারণে অনেকেই এর প্রতি ছিল অসন্তুষ্ট। কারণ করোনাকালে পৃথিবীর কোনো স্টক মার্কেটই বন্ধ ছিল না। তাহলে বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট কেন বন্ধ রাখা হয়েছিল, এ নিয়ে সবার মাঝেই প্রশ্ন দেখা দেয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এর প্রতিবাদও করেছে; কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। এর আগের সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্থাৎ প্রফেসর খায়রুল হোসেন কমিশনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় স্টক মার্কেট খোলার ব্যাপারে তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তারা হয়তো মনে করেছেন নতুন কমিশন এসে যা করার করবে। এ বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল। প্রফেসর খায়রুল হোসেন কমিশনের সময় ফ্লোর প্রাইস পড়ে গিয়েছিল। যার ফলে ৯০ শতাংশ শেয়ার ঠেকে গেল ক্রেতা না থাকার কারণে। ফলে টার্ন ওভার (প্রতিদিনের কেনাবেচা) হয়ে পড়েছিল ১০০ কোটি টাকারও নিচে। এ অবস্থার কারণে পুঁজিবাজার বলতে যা বোঝায় বা আমরা পুঁজিবাজার নিয়ে যে আশা পোষণ করি সেটি যেন নিষ্প্রভ হয়ে গেল।

প্রফেসর খায়রুল হোসেন কমিশন ১০ বছর ক্ষমতায় ছিল। তারা আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা কমিয়ে দেয় এবং প্রায় ৯০টি কোম্পানিকে আইপিওতে স্থান করে দেয়। এর মধ্যে ১০-১২টি কোম্পানি ছাড়া বাকিগুলো ছিল জাঙ্ক কোম্পানি। এ ধরনের জাঙ্ক কোম্পানির শেয়ার কিনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া কতিপয় উদ্যোক্তা আছে যাদের শুরু থেকেই নিয়ত খারাপ ছিল, তারা তাদের শেয়ারগুলো কৌশলে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে দিয়ে মূলধন নিয়ে সটকে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এবং স্টক মার্কেটে নেমে আসে হতাশা। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন বুঝে হোক, না বুঝে হোক অথবা নিজেদের সুযোগ-সুবিধার জন্যই হোক, তারা এক কোম্পানির সঙ্গে অন্য কোম্পানির মার্জার করার অনুমতি দিয়ে দেয়। যার ফলে স্টক মার্কেটে হতাশার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। মার্জার করার কারণে ইক্যুইটি বেড়ে যাওয়ার ফলে যে শেয়ারের দাম ৪০ টাকা ছিল সেটি চলে আসে ৫ টাকায়। যার কারণে বিনিয়োগকারীরা স্টক মার্কেটের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। এভাবে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন জনস্বার্থবিরোধী কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কিছুর জন্য শেয়ারবাজারে একটা হতাশা সৃষ্টি হয় এবং এজন্য কিছু বিনিয়োগকারী বিক্ষোভও করে। আমরাও এ ব্যাপারে অনেক লেখালেখি করলাম, টেলিভিশনেও অনেক কথা বলা হল। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং আগের কমিশনকে ডেকে পাঠায়। শেয়ারবাজারকে চাঙা করার জন্য তিনি কিছু দিকনির্দেশনা দিলেন। তার এ দিকনির্দেশনাগুলো ছিল অত্যন্ত চমৎকার। ছয়টি দিকনির্দেশনার মধ্যে দুটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হল, শেয়ারবাজারকে ফান্ড সাপ্লাই দেয়ার জন্য সরকারি ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউটগুলো যেমন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, আইসিবি এদেরকে সক্রিয়ভাবে শেয়ার মার্কেটে ইনভেস্টমেন্টে যেতে হবে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককেও বলা হল শেয়ারবাজারে ফান্ড প্রাপ্যতার জন্য যাতে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই নির্দেশ পালনও করল। শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরাতে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানো। এ গভীরতা বাড়ানোর জন্য গত ১৫ বছর ধরে অনেকে বলেছে, আমিও বলেছি। এখন প্রশ্ন হল, গভীরতা বাড়ানোর উপায় কী? একটা জাঙ্ক কোম্পানি যত বিরাট আকারেরই পেইড আপ ক্যাপিটাল নিয়ে আসুক না কেন, সেটি পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে পারবে না। কারণ একটি জাঙ্ক কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারে না। ফলে তাদের শেয়ারের দাম পড়ে যায়, বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়ে। কোনো কোনো জাঙ্ক কোম্পানি প্রিমিয়াম দিলেও তার শেয়ার ১০ টাকার নিচে চলে যায়। অ্যাপোলো ইস্পাত, টেক্সটাইলের মতো অনেক কোম্পানি প্রিমিয়াম দিলেও শেয়ারের দাম পড়ে গেছে। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। এগুলো দেখেও কেউ দেখে না। উচিত ছিল এ বিষয়গুলো সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের দেখা এবং পদক্ষেপ নেয়া।

যাহোক, প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় দিকনির্দেশনায় ফিরে আসি। শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়াতে হলে স্থানীয় ভালো কোম্পানি এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারের আওতায় আনতে হবে। তাহলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে। কারণ এ ধরনের কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার যোগ্য। টেক্সটাইল কোম্পানির মতো ১০টি কোম্পানিকে তালিকায় না এনে একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকায় আনা খুবই যুক্তিপূর্ণ। কেননা যতগুলো বহুজাতিক কোম্পানি মার্কেটে আছে তার সব শেয়ারের দাম ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকার ওপরে। তারা বিনিয়োগকারীদের ভালো ডিভিডেন্ডও দিচ্ছে। সুতরাং শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানি তো অনেকই আছে, যার বেশিরভাগই আমাদের শেয়ারবাজারে আসেনি বা তালিকাভুক্ত হয়নি। যেমন- ইউনিলিভার, নেসলে, এইচএসবিসি, মেটলাইফ ইত্যাদি। টোটাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসার ৫০ শতাংশই মেটলাইফের অধীনে। সুতরাং মেটলাইফের মতো বীমা কোম্পানিকে না এনে ৫০টি অসুস্থ বীমা কোম্পানি এনলিস্টেড করলে কী লাভ হবে। এ ব্যাপারে কেউ কোনো কথা বলে না। ইউনিলিভার পাকিস্তানের করাচিতে এনলিস্টেড কোম্পানি, বোম্বেতে লিস্টেড কোম্পানি, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে লিস্টেড কোম্পানি, কুয়ালালামপুরে লিস্টেট কোম্পানি। তাহলে আমাদের দেশে লিস্টেড নয় কেন? সেটি পার্লামেন্ট থেকে এখন পর্যন্ত কেউ বলেনি। অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে এবং চেষ্টাও করা হয়েছিল; কিন্তু এরপর আর কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হলে তাদের প্রণোদনা দিতে হবে অথবা আইন করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। তা না হলে শেয়ারবাজারে গতি ফেরানো সম্ভব নয়।

আমাদের দেশের কোনো অর্থমন্ত্রী কি এ পর্যন্ত কোনো বহুজাতিক কোম্পানিকে ডেকেছে যে, আপনারা কেন শেয়ারবাজারের লিস্টিংয়ে আসছেন না? অথবা এদের থেকেও তো কিছু শোনা উচিত ছিল। কিন্তু এর কোনোটিই করা হয়নি। যদি করা হতো শেয়ারবাজার অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারত। দেশের বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিনিয়োগের প্রতি আস্থা ফিরে আসত।

তাহলে এর জন্য দায়ী কি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ? না তারা দায়ী নয়। কেননা তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে মিনিস্ট্রি অব ফাইন্যান্সের। কারণ তাদের অধীনে আছে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)। এনবিআর যদি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বলে যে, আপনারা শেয়ার মার্কেটে এলে এ সুবিধা পাবেন, আর যদি না আসেন তাহলে আমরা আপনার কোম্পানিতে বেশি মাত্রায় ট্যাক্স বসাব, তাহলেই তো হয়ে যায়। তারা তাদের ব্যবসা চালাতে হলে বাধ্য হয়েই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। এ রকম কোনো উদ্যোগ আজ অবধি নেয়া হয়নি। বর্তমান অর্থমন্ত্রীও দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু আজ প্রায় দেড় বছর হয়ে গেছে তিনি একটি শেয়ারও বিক্রি করতে পারেননি।

আমাদের দেশের মিডিয়াগুলোরও দোষ আছে। মিডিয়াগুলো শেয়ারবাজারের আলোচ্য বিষয়গুলোকে হেডলাইন করেনি। এর কারণ হচ্ছে, মিডিয়াতে যারা নিউজ এডিটর, যারা চিফ রিপোর্টার তারা এ লাইনের লোক নয়। তবে যারা অর্থনীতি বিট করেন তারা স্পেস পায় নিচে। যার ফলে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে থাকে।

চীন, ইন্ডিয়া তাদের শেয়ারবাজার সমৃদ্ধ করেছে সরকারি শেয়ার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। এরশাদ সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারি শেয়ার বিক্রি হয়েছে; কিন্তু পলিটিক্যাল সরকারের আমলে এ ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি, তাদের ইচ্ছাও নেই। সরকার টাকার জন্য পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধরনা দিচ্ছে। অথচ সরকারি শেয়ার বিক্রি করেই তো সরকার টাকা নিতে পারে। ওসমানী গ্লাস শিটে আইডল জায়গা পড়ে আছে। ইস্টার্ন কেবলসের বিরাট জায়গা আইডল পড়ে আছে। বাংলাদেশ বিমান পড়ে আছে। তারা বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না। কেন পারছে না? কারণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালালে এগুলোর থেকে ডিভিডেন্ড প্রত্যাশা করা দুরূহ। আমাদের দেশে সম্পদের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা দেখা দিচ্ছে এগুলোর মাধ্যমে। এতদিন পরে কেন জুটমিলগুলো বন্ধ করা হল? অনেক আগেই তো এগুলো বন্ধ করা উচিত ছিল। তাহলে সরকার বিশাল ক্ষতির হাত থেকে মুক্তি পেত।

নতুন কমিশন রুবায়েত শিবলী আসার পর জুনের প্রথম দিকে স্টক মার্কেট খুলে দেয়। এ কমিশন অনেক ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে শেয়ারবাজারে কিছুটা আস্থা এসেছে। তাদের হাতেও ক্ষমতা নেই। তারা এখন স্পষ্টই বুঝে গেছে, কোয়ালিটি স্টক লিস্টিং না হলে এ শেয়ারবাজার অতটা আস্থাশীল হবে না। এ নতুন কমিশন শেয়ারবাজারকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন দেখা যাক তারা কতদূর এগোতে পারে।

আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, শেয়ারবাজারকে সমৃদ্ধ করতে হলে কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স কমাতে হবে। সারা পৃথিবীতে কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স আমাদের থেকে অনেক কম। থাইল্যান্ডে কম, মিয়ানমারে কম, ভিয়েতনামে কম, ভারতেও কমানো হয়েছে। ইউকে’র মতো অ্যাডভান্স ইকোনমির দেশেও কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে ফেলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প আসার পর কর্পোরেট ট্যাক্স অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স যুক্তরাষ্ট্রে এখন ২০-এর নিচে। যেটি আগে ৪০ শতাংশ ছিল। আর আমাদের দেশে ৪৫ থেকে ৩৫ শতাংশ আর কোনো কোনো কোম্পানিতে ২৫ শতাংশ কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্সের অবস্থান। যার ফলে অনেক কোম্পানি তাদের লাভ অপ্রদর্শিত রেখে ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। আর এ লভ্যাংশ লুকানোর কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ পায় না। সুতরাং পলিসি মেকারদের এটা বুঝতে হবে যে, মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে, সেখানে এ ধরনের ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার কারণে যদি বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তারা কেন বিনিয়োগ করবে। আমি অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে বলব যে, পৃথিবীতে কেউ এটা প্রমাণ করতে পারেনি যে, Higher the tax rate the higher the revenue collection. ট্যাক্স রেট হাই থাকলে রেভিনিউ বেশি আসবে এটা প্রমাণিত নয়। বরং ট্যাক্স রেট কম থাকলে রেভিনিউ বেশি আসবে এটাই প্রমাণিত। কিন্তু আমাদের দেশের এনবিআর এটাকে উল্টোভাবে চিন্তা করে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এটা কাম্য হতে পারে না। শেয়ারবাজারকে তলানি থেকে টেনে তুলতে হলে আমাদের এ বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ