সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও যত কথা
jugantor
সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও যত কথা

  একেএম শামসুদ্দিন  

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

৭ সেপ্টেম্বর সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর সিনহা হত্যার তদন্ত রিপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার পর তা জানার জন্য জনমনে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ জুলাই সিনহাকে হত্যার পর দেশের মানুষ, সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি এবং সিনহার বোনের করা মামলায় গঠিত তদন্তের খুঁটিনাটি বিষয় বেশ ঘনিষ্ঠভাবে নজরে রেখে চলেছে।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে মোড় নেয় সেদিকেও তাদের দৃষ্টি প্রখর। সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার যে প্রথম থেকেই সতর্ক ছিল, তা ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, তদন্ত চলাকালীন কোনো কথা বলা যাবে না, তাতে নাকি তদন্তে প্রভাব পড়তে পারে।

কাজেই র‌্যাব কর্তৃক হত্যা মামলার যে তদন্ত এখনও চলছে তা শেষ হওয়ার আগে সরকারি তদন্ত রিপোর্টের কোনো তথ্য যে সরকারিভাবে প্রকাশিত হবে না তা ধরেই নেয়া যায়। কিন্তু তারপরও যেসব তথ্য বাইরে প্রকাশ পেয়ে গেছে সেসব তথ্যের সত্যতা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে কি? কারণ সংবাদমাধ্যমে তদন্ত রিপোর্টের অংশগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেসব তথ্যকে বাতিল করে দেয়নি।

এ ঘটনা নিয়ে জনগণ ও মিডিয়ার উৎসাহের আরও একটি কারণ আছে। একটি মহলের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দিনে দিনে মহীরুহে পরিণত হওয়া কথিত ওসি প্রদীপের সীমাহীন নৃশংস অত্যাচারে মানুষ এতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তারা এখন সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রদীপের কী পরিণতি হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছে।

প্রশ্ন হল, এ প্রদীপরা কি একদিনেই সৃষ্টি হয়েছে? ওরা কীসের শক্তিবলে আমাদের এ স্বাধীন রাষ্ট্রটির একটি উল্লেখযোগ্য জনপদের মূর্তিমান আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়েছে? প্রদীপের জঘন্য কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি এখানে নতুন করে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। তার কীর্তিকলাপের কাহিনী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে উল্লেখিত প্রশ্নগুলো নতুন নয়; তবুও কথা থেকে যায়।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর সেই আলোচনা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। তবে এ কথা সত্য, একজন প্রদীপ কিংবা লিয়াকতকে দিয়ে সমগ্র পুলিশ সার্ভিসকে বিবেচনা করলে চলবে না। পুলিশের ভেতরও অনেক সৎ, পেশাদার ও মানবিক গুণাবলির সদস্য আছেন। সিনহা হত্যার ঘটনা নিয়ে দেশের মানুষ যেভাবে ধিক্কার জানাচ্ছে, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সেই ধিক্কারের উত্তাপ এসব পেশাদার পুলিশ সদস্যকেও তাড়িত করছে।

কর্মের খাতিরে এমন অনেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতার আছে। সে আলোকেই বলা যায়, এ ধরনের ঘটনায় তারা নিজেরাও বেশ আহত হন। এসব কর্মকর্তার সঙ্গে এখনও আমার যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন মধ্যম সারির কর্মকর্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।

পুলিশ সদস্যদের ধারাবাহিক এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলে জেনেছি, প্রদীপ-লিয়াকতদের মতো দুশ্চরিত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে কিছু করতে চাইলেও অদৃশ্য কারণে তা করা সম্ভব হয় না। প্রদীপের চাকরি জীবনের পুরোটাই ছিল বিতর্কে ভরা। কুকর্মের জন্য বারবার বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়ার পর দ্রুতই সে স্বপদে ফিরে যেতে পেরেছে।

কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল বলেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে সে করে গেছে। প্রদীপের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গ্রেফতার বাণিজ্য, লুটপাট, বিনা অপরাধে মানুষ ধরে এনে টাকা আদায় করতে না পারলে হত্যা করা ইত্যাদি কোনো অভিযোগই কারও অজানা ছিল না। প্রদীপের এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কথা নীরবে সমর্থন দিয়ে গেছেন ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তারা। তাছাড়াও প্রদীপ প্রভাবশালী কিছু রাজনীতিকেরও সুনজরে ছিলেন বরাবর।

টেকনাফ এমন একটি জনপদের নাম যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাই অবৈধ অর্থ উপার্জনের ঘোড়দৌড়ে শামিল হতে উদগ্রীব হয়ে থাকেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খুশি করে তবেই তারা সেই ঘোড়দৌড়ে শামিল হতে পারেন। প্রদীপও নাকি কোটি টাকা খরচ করেই টেকনাফের ওসির পদটি দখল করেছিলেন। কক্সবাজার জেলার থানা ও জেলা পর্যায়ের অন্যান্য পদেও এমন অর্থ উপার্জনের সুযোগ আছে।

কথিত উপার্জনের একটা অংশ যে সব মহলেই পৌঁছে তা বোঝা যায়। পৌঁছে বলেই বিভাগীয় তদন্তে কোটি টাকার লেনদেন করে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার তার নিজের বদলি আদেশ দীর্ঘদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারেন। ২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে ১০ লাখ ইয়াবা উদ্ধারের পর মাত্র ১০ হাজার পিস উদ্ধার দেখিয়ে একটি মামলা করা হয়; বাকি ৯ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা পুনরায় মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়ে বিক্রয়লব্ধ ৮ কোটি টাকা পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। এ অর্থ ভাগাভাগিতে একজন নিু পদবির সদস্য বঞ্চিত হলে সে ঘটনা প্রকাশ করে দেয়।

অতঃপর পুলিশের এক বিভাগীয় তদন্তে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপারসহ আরও দু’জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১২ জন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়; কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অন্ধকারেই থেকে যায়। এক বছর পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে অভিযুক্ত পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

উল্লেখ্য, তদন্ত চলাকালীন তিনি স্বপদেই বহাল ছিলেন। অথচ অভিযোগ প্রমাণের পরপর অন্য সদস্যরা অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান। এ বিষয়টি নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর কক্সবাজার জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনকে নিয়েও আমরা একই বিষয় লক্ষ করছি। এসপি মাসুদের বিতর্কিত ভূমিকার পরও বহাল তবিয়তে তাকে কক্সবাজারেই রেখে দেয়া হয়েছে। নৈতিকতার বিচারে পুলিশ সার্ভিস কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত কতটুকু সিদ্ধ হয়েছে তা বিবেচ্য বিষয়।

সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে প্রদীপের অপকর্ম নিয়ন্ত্রণে এসপি মাসুদ যে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, সেই দোষ থেকে তিনি নিজেকে কীভাবে রক্ষা করেন তা সময়ই বলে দেবে।

সিনহা হত্যার পর লিয়াকত ও প্রদীপের সঙ্গে তার সেলফোনের আলাপচারিতা, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তার অধীনস্থ টেকনাফ থানার ১১ দিনের সিসিটিভির ফুটেজ গায়েব হয়ে যাওয়া, পুলিশ সদস্য দ্বারা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের হাতে ইয়াবা ধরিয়ে দিয়ে গ্রেফতারের অপচেষ্টা চালানো, তারই অধীনস্থ রামু থানা পুলিশ কর্তৃক জব্দকৃত সিনহার অন্যতম সহকর্মী শিপ্রার ল্যাপটপ থেকে ব্যক্তিগত ভিডিও ফুটেজ চুরি করে (শিপ্রার প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী) অপর দুই সহকর্মী পুলিশ সুপার কর্তৃক আপত্তিজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে শিপ্রাকে হেনস্থা করার দায় থেকে মাসুদ কীভাবে অব্যাহতি পান তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে। মাসুদ সবচেয়ে গুরুতর ও অপরাধমূলক যে কাজটি করেছেন তা হল, হত্যাকাণ্ডটিকে জাস্টিফাই করার জন্য লিয়াকতের আত্মরক্ষা নাটকের পাশাপাশি ইয়াবা ও মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে বলে মিডিয়াতে মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে সিনহার চরিত্র স্খলনের চেষ্টা।

সাধারণত কোনো অফিস, সংস্থা বা সংগঠনে কোনো অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলে প্রথমেই যে কাজটি করা হয় তা হল, ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই তার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের পথকে সহজতর করে দেয়া হয়। এটি কর্তৃপক্ষের সততা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণের স্বার্থেই করা হয়ে থাকে। পুলিশ কর্তৃপক্ষও কিন্তু স্বচ্ছতার জন্য মাসুদকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে পারতেন। অথচ এ মামলাকে ঘিরে দেশের মানুষের এত সমালোচনা, জোর আপত্তি এবং দাবির মুখেও তাকে বর্তমান পদে রেখে দিয়ে পুলিশ সার্ভিস কর্তৃপক্ষ কী প্রমাণ করতে চাইছেন তা তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন!

হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ সার্ভিসের মধ্যে যাতে দূরত্বের সৃষ্টি না হয়, উভয়পক্ষই এ বিষয়ে বেশ সতর্ক ছিল। ইতোপূর্বে যা হয়নি সিনহা হত্যা ঘটনায় তা-ই হয়েছে; অর্থাৎ সেনাবাহিনী প্রধান পুলিশের আইজিপিকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। নিজেদের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতাও ছিল- তদন্ত চলাকালে তাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো আচরণ করা হবে না যেন তদন্তের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ে। এ বিষয়ে উভয়পক্ষই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে চলবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এ বিষয়ে একাধিকবার সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছেন। অথচ তারই অধীনস্থ কিছু পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তকে প্রভাবিত করার মতো ন্যক্কারজনক কাজ করে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। সিনহার সহকর্মী এবং এ মামলার অন্যতম সাক্ষী শিপ্রার কিছু ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করে দু’জন পুলিশ সুপার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে শিপ্রাকে যে মানসিক অত্যাচার করেছেন সে বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ আজ অবধি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। শিপ্রাকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করার এ বিষয়টি বর্তমানে রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে আছে। মন্দ লোকেরা বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সহজেই ম্যানেজ করা সম্ভব!

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যার পর তার পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়দের ভেতর প্রতিক্রিয়া হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ঘটনা নিয়ে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের ভেতরও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বা রাওয়া স্বাভাবিক কারণেই বেশ সোচ্চার। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের এ ক্ষোভ প্রশমিত করা এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিতের লক্ষ্যে আশ্বস্ত করার জন্য পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা ১৮ আগস্ট রাওয়া ক্লাবে রাওয়ার প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকে তারা নির্ভেজাল, প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তারা জানান, সিনহা হত্যাকাণ্ডের জন্য পুলিশ কোনো দায়িত্ব নেবে না, এ ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দায়ী! অথচ রাওয়া সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করার ১৫ দিনের মাথায় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে নেতৃত্বদানকারী সেই ডিআইজি হাবিবুর রহমানই স্বয়ং তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। তিনি কিশোরগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সিনহা খুন হওয়ার সময় ঘটনাস্থলে লিয়াকত ছিল, প্রদীপ ছিল না।

অথচ মিডিয়ায় প্রদীপের নামই বেশি আসছে। সংবাদকর্মীরা এ ঘটনার বিষয় জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন তা হল, ‘ডিউটিতে থাকার সময় পুলিশ গুলি করতেই পারে’! এখন প্রশ্ন হল, ডিউটিতে থাকার সময় ‘গুলি করা’ যদি পুলিশের পক্ষ থেকে সমর্থনযোগ্য হয় এবং সেই গুলিবর্ষণের কারণে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে পুলিশ কেন সেই ঘটনার দায়িত্ব নেবে না? কারণ ডিআইজি হাবিবের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশি ডিউটি পালন করতে গিয়েই তো লিয়াকত গুলিবর্ষণ (পুলিশের পক্ষেই) করেছিল!

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, ডিআইজি হাবিব ‘সিনহা খুনের সময় প্রদীপ ঘটনাস্থলে ছিল না’ বলে কী বোঝাতে চাইছেন? সিনহাকে গুলিবর্ষণের সময় হাজির ছিলেন না বটে; কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ১৫-১৬ মিনিটের মধ্যে প্রদীপ কী করে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হলেন সে রহস্য কি তিনি খোলাসা করেছেন? আহত সিনহার তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে তার রক্তাক্ত দেহের সঙ্গে প্রদীপ যে আচরণ করেছেন তার জবাবে তিনি কী বলবেন? তিনি প্রদীপের অপকর্মের জন্য টেকনাফের শতাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বুকফাটা আর্তনাদ কি শুনতে পান না?

এতদিন ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে যে পরিবারগুলো প্রদীপের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পায়নি, সিনহা হত্যকাণ্ডের পর সে পরিবারগুলোই এখন একের পর এক মামলা করে যাচ্ছে! প্রদীপ সম্পর্কে এমন একটি স্পর্শকাতর বক্তব্য দেয়ার আগে ডিআইজি হাবিবের এসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত ছিল। আমার মনে হয়, প্রদীপের মতো একজন হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে যে বক্তব্য রাখলে বিতর্ক হতে পারে এবং মানুষের মনে সন্দেহ বাড়তে পারে, সেরকম বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো।

তা না হলে তদন্তকাজে প্রভাবিত না করা এবং সিনহা হত্যাকাণ্ডে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দায়ী বলে পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা যে বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযাগ্য হবে না। এবং ঠিক এ কারণেই নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থেই কক্সবাজার জেলার বিতর্কিত পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদকে অবিলম্বে তার বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভেতর যে আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস বিরাজ করছে, তার অবসান ঘটাতে পারে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও যত কথা

 একেএম শামসুদ্দিন 
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

৭ সেপ্টেম্বর সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর সিনহা হত্যার তদন্ত রিপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার পর তা জানার জন্য জনমনে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ জুলাই সিনহাকে হত্যার পর দেশের মানুষ, সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি এবং সিনহার বোনের করা মামলায় গঠিত তদন্তের খুঁটিনাটি বিষয় বেশ ঘনিষ্ঠভাবে নজরে রেখে চলেছে।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে মোড় নেয় সেদিকেও তাদের দৃষ্টি প্রখর। সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার যে প্রথম থেকেই সতর্ক ছিল, তা ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, তদন্ত চলাকালীন কোনো কথা বলা যাবে না, তাতে নাকি তদন্তে প্রভাব পড়তে পারে।

কাজেই র‌্যাব কর্তৃক হত্যা মামলার যে তদন্ত এখনও চলছে তা শেষ হওয়ার আগে সরকারি তদন্ত রিপোর্টের কোনো তথ্য যে সরকারিভাবে প্রকাশিত হবে না তা ধরেই নেয়া যায়। কিন্তু তারপরও যেসব তথ্য বাইরে প্রকাশ পেয়ে গেছে সেসব তথ্যের সত্যতা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে কি? কারণ সংবাদমাধ্যমে তদন্ত রিপোর্টের অংশগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেসব তথ্যকে বাতিল করে দেয়নি।

এ ঘটনা নিয়ে জনগণ ও মিডিয়ার উৎসাহের আরও একটি কারণ আছে। একটি মহলের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দিনে দিনে মহীরুহে পরিণত হওয়া কথিত ওসি প্রদীপের সীমাহীন নৃশংস অত্যাচারে মানুষ এতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তারা এখন সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রদীপের কী পরিণতি হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছে।

প্রশ্ন হল, এ প্রদীপরা কি একদিনেই সৃষ্টি হয়েছে? ওরা কীসের শক্তিবলে আমাদের এ স্বাধীন রাষ্ট্রটির একটি উল্লেখযোগ্য জনপদের মূর্তিমান আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়েছে? প্রদীপের জঘন্য কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি এখানে নতুন করে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। তার কীর্তিকলাপের কাহিনী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে উল্লেখিত প্রশ্নগুলো নতুন নয়; তবুও কথা থেকে যায়।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর সেই আলোচনা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। তবে এ কথা সত্য, একজন প্রদীপ কিংবা লিয়াকতকে দিয়ে সমগ্র পুলিশ সার্ভিসকে বিবেচনা করলে চলবে না। পুলিশের ভেতরও অনেক সৎ, পেশাদার ও মানবিক গুণাবলির সদস্য আছেন। সিনহা হত্যার ঘটনা নিয়ে দেশের মানুষ যেভাবে ধিক্কার জানাচ্ছে, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সেই ধিক্কারের উত্তাপ এসব পেশাদার পুলিশ সদস্যকেও তাড়িত করছে।

কর্মের খাতিরে এমন অনেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতার আছে। সে আলোকেই বলা যায়, এ ধরনের ঘটনায় তারা নিজেরাও বেশ আহত হন। এসব কর্মকর্তার সঙ্গে এখনও আমার যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন মধ্যম সারির কর্মকর্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।

পুলিশ সদস্যদের ধারাবাহিক এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলে জেনেছি, প্রদীপ-লিয়াকতদের মতো দুশ্চরিত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে কিছু করতে চাইলেও অদৃশ্য কারণে তা করা সম্ভব হয় না। প্রদীপের চাকরি জীবনের পুরোটাই ছিল বিতর্কে ভরা। কুকর্মের জন্য বারবার বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়ার পর দ্রুতই সে স্বপদে ফিরে যেতে পেরেছে।

কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল বলেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে সে করে গেছে। প্রদীপের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গ্রেফতার বাণিজ্য, লুটপাট, বিনা অপরাধে মানুষ ধরে এনে টাকা আদায় করতে না পারলে হত্যা করা ইত্যাদি কোনো অভিযোগই কারও অজানা ছিল না। প্রদীপের এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কথা নীরবে সমর্থন দিয়ে গেছেন ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তারা। তাছাড়াও প্রদীপ প্রভাবশালী কিছু রাজনীতিকেরও সুনজরে ছিলেন বরাবর।

টেকনাফ এমন একটি জনপদের নাম যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাই অবৈধ অর্থ উপার্জনের ঘোড়দৌড়ে শামিল হতে উদগ্রীব হয়ে থাকেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খুশি করে তবেই তারা সেই ঘোড়দৌড়ে শামিল হতে পারেন। প্রদীপও নাকি কোটি টাকা খরচ করেই টেকনাফের ওসির পদটি দখল করেছিলেন। কক্সবাজার জেলার থানা ও জেলা পর্যায়ের অন্যান্য পদেও এমন অর্থ উপার্জনের সুযোগ আছে।

কথিত উপার্জনের একটা অংশ যে সব মহলেই পৌঁছে তা বোঝা যায়। পৌঁছে বলেই বিভাগীয় তদন্তে কোটি টাকার লেনদেন করে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার তার নিজের বদলি আদেশ দীর্ঘদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারেন। ২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে ১০ লাখ ইয়াবা উদ্ধারের পর মাত্র ১০ হাজার পিস উদ্ধার দেখিয়ে একটি মামলা করা হয়; বাকি ৯ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা পুনরায় মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়ে বিক্রয়লব্ধ ৮ কোটি টাকা পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। এ অর্থ ভাগাভাগিতে একজন নিু পদবির সদস্য বঞ্চিত হলে সে ঘটনা প্রকাশ করে দেয়।

অতঃপর পুলিশের এক বিভাগীয় তদন্তে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপারসহ আরও দু’জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১২ জন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়; কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অন্ধকারেই থেকে যায়। এক বছর পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে অভিযুক্ত পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

উল্লেখ্য, তদন্ত চলাকালীন তিনি স্বপদেই বহাল ছিলেন। অথচ অভিযোগ প্রমাণের পরপর অন্য সদস্যরা অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান। এ বিষয়টি নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর কক্সবাজার জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনকে নিয়েও আমরা একই বিষয় লক্ষ করছি। এসপি মাসুদের বিতর্কিত ভূমিকার পরও বহাল তবিয়তে তাকে কক্সবাজারেই রেখে দেয়া হয়েছে। নৈতিকতার বিচারে পুলিশ সার্ভিস কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত কতটুকু সিদ্ধ হয়েছে তা বিবেচ্য বিষয়।

সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে প্রদীপের অপকর্ম নিয়ন্ত্রণে এসপি মাসুদ যে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, সেই দোষ থেকে তিনি নিজেকে কীভাবে রক্ষা করেন তা সময়ই বলে দেবে।

সিনহা হত্যার পর লিয়াকত ও প্রদীপের সঙ্গে তার সেলফোনের আলাপচারিতা, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তার অধীনস্থ টেকনাফ থানার ১১ দিনের সিসিটিভির ফুটেজ গায়েব হয়ে যাওয়া, পুলিশ সদস্য দ্বারা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের হাতে ইয়াবা ধরিয়ে দিয়ে গ্রেফতারের অপচেষ্টা চালানো, তারই অধীনস্থ রামু থানা পুলিশ কর্তৃক জব্দকৃত সিনহার অন্যতম সহকর্মী শিপ্রার ল্যাপটপ থেকে ব্যক্তিগত ভিডিও ফুটেজ চুরি করে (শিপ্রার প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী) অপর দুই সহকর্মী পুলিশ সুপার কর্তৃক আপত্তিজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে শিপ্রাকে হেনস্থা করার দায় থেকে মাসুদ কীভাবে অব্যাহতি পান তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে। মাসুদ সবচেয়ে গুরুতর ও অপরাধমূলক যে কাজটি করেছেন তা হল, হত্যাকাণ্ডটিকে জাস্টিফাই করার জন্য লিয়াকতের আত্মরক্ষা নাটকের পাশাপাশি ইয়াবা ও মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে বলে মিডিয়াতে মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে সিনহার চরিত্র স্খলনের চেষ্টা।

সাধারণত কোনো অফিস, সংস্থা বা সংগঠনে কোনো অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলে প্রথমেই যে কাজটি করা হয় তা হল, ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই তার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের পথকে সহজতর করে দেয়া হয়। এটি কর্তৃপক্ষের সততা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণের স্বার্থেই করা হয়ে থাকে। পুলিশ কর্তৃপক্ষও কিন্তু স্বচ্ছতার জন্য মাসুদকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে পারতেন। অথচ এ মামলাকে ঘিরে দেশের মানুষের এত সমালোচনা, জোর আপত্তি এবং দাবির মুখেও তাকে বর্তমান পদে রেখে দিয়ে পুলিশ সার্ভিস কর্তৃপক্ষ কী প্রমাণ করতে চাইছেন তা তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন!

হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ সার্ভিসের মধ্যে যাতে দূরত্বের সৃষ্টি না হয়, উভয়পক্ষই এ বিষয়ে বেশ সতর্ক ছিল। ইতোপূর্বে যা হয়নি সিনহা হত্যা ঘটনায় তা-ই হয়েছে; অর্থাৎ সেনাবাহিনী প্রধান পুলিশের আইজিপিকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। নিজেদের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতাও ছিল- তদন্ত চলাকালে তাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো আচরণ করা হবে না যেন তদন্তের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ে। এ বিষয়ে উভয়পক্ষই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে চলবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এ বিষয়ে একাধিকবার সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছেন। অথচ তারই অধীনস্থ কিছু পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তকে প্রভাবিত করার মতো ন্যক্কারজনক কাজ করে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। সিনহার সহকর্মী এবং এ মামলার অন্যতম সাক্ষী শিপ্রার কিছু ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করে দু’জন পুলিশ সুপার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে শিপ্রাকে যে মানসিক অত্যাচার করেছেন সে বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ আজ অবধি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। শিপ্রাকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করার এ বিষয়টি বর্তমানে রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে আছে। মন্দ লোকেরা বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সহজেই ম্যানেজ করা সম্ভব!

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যার পর তার পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়দের ভেতর প্রতিক্রিয়া হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ঘটনা নিয়ে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের ভেতরও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বা রাওয়া স্বাভাবিক কারণেই বেশ সোচ্চার। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের এ ক্ষোভ প্রশমিত করা এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিতের লক্ষ্যে আশ্বস্ত করার জন্য পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা ১৮ আগস্ট রাওয়া ক্লাবে রাওয়ার প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকে তারা নির্ভেজাল, প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তারা জানান, সিনহা হত্যাকাণ্ডের জন্য পুলিশ কোনো দায়িত্ব নেবে না, এ ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দায়ী! অথচ রাওয়া সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করার ১৫ দিনের মাথায় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে নেতৃত্বদানকারী সেই ডিআইজি হাবিবুর রহমানই স্বয়ং তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। তিনি কিশোরগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সিনহা খুন হওয়ার সময় ঘটনাস্থলে লিয়াকত ছিল, প্রদীপ ছিল না।

অথচ মিডিয়ায় প্রদীপের নামই বেশি আসছে। সংবাদকর্মীরা এ ঘটনার বিষয় জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন তা হল, ‘ডিউটিতে থাকার সময় পুলিশ গুলি করতেই পারে’! এখন প্রশ্ন হল, ডিউটিতে থাকার সময় ‘গুলি করা’ যদি পুলিশের পক্ষ থেকে সমর্থনযোগ্য হয় এবং সেই গুলিবর্ষণের কারণে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে পুলিশ কেন সেই ঘটনার দায়িত্ব নেবে না? কারণ ডিআইজি হাবিবের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশি ডিউটি পালন করতে গিয়েই তো লিয়াকত গুলিবর্ষণ (পুলিশের পক্ষেই) করেছিল!

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, ডিআইজি হাবিব ‘সিনহা খুনের সময় প্রদীপ ঘটনাস্থলে ছিল না’ বলে কী বোঝাতে চাইছেন? সিনহাকে গুলিবর্ষণের সময় হাজির ছিলেন না বটে; কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ১৫-১৬ মিনিটের মধ্যে প্রদীপ কী করে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হলেন সে রহস্য কি তিনি খোলাসা করেছেন? আহত সিনহার তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে তার রক্তাক্ত দেহের সঙ্গে প্রদীপ যে আচরণ করেছেন তার জবাবে তিনি কী বলবেন? তিনি প্রদীপের অপকর্মের জন্য টেকনাফের শতাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বুকফাটা আর্তনাদ কি শুনতে পান না?

এতদিন ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে যে পরিবারগুলো প্রদীপের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পায়নি, সিনহা হত্যকাণ্ডের পর সে পরিবারগুলোই এখন একের পর এক মামলা করে যাচ্ছে! প্রদীপ সম্পর্কে এমন একটি স্পর্শকাতর বক্তব্য দেয়ার আগে ডিআইজি হাবিবের এসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত ছিল। আমার মনে হয়, প্রদীপের মতো একজন হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে যে বক্তব্য রাখলে বিতর্ক হতে পারে এবং মানুষের মনে সন্দেহ বাড়তে পারে, সেরকম বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো।

তা না হলে তদন্তকাজে প্রভাবিত না করা এবং সিনহা হত্যাকাণ্ডে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দায়ী বলে পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা যে বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযাগ্য হবে না। এবং ঠিক এ কারণেই নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থেই কক্সবাজার জেলার বিতর্কিত পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদকে অবিলম্বে তার বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভেতর যে আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস বিরাজ করছে, তার অবসান ঘটাতে পারে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

 

ঘটনাপ্রবাহ : মেজর সিনহার মৃত্যু