শতফুল ফুটতে দাও

করোনার আর্থ-সামাজিক পরিবীক্ষণ

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ পেন্ডেমিক আকারে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার ফলে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কোভিড-১৯ পৃথিবীর ১৯০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে।

সৃষ্টিকর্তার কী অদ্ভুত খেয়াল যে, তিনি কখনও কখনও এমন সব রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি করেন যার ফলে মানুষ ও প্রাণীকুলের জীবন সংহার হয়। বিগত শতাব্দীতে এইডস, জিকা ভাইরাস, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি নতুন নতুন ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে যে ভাইরাসটি পৃথিবীকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে সেটা অতীতের ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে ক্ষতিকারকতার দিক থেকে তুলনা করা যায় না। অতীতের ভাইরাসগুলো পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েনি।

কারও দেহে ওইসব ভাইরাস সংক্রমিত হলে ভয়ংকর রকমের বিপর্যয় দেখা দিত। মৃত্যু হয়ে উঠত অবধারিত। কিন্তু ওইসব ভাইরাস কোভিড-১৯-এর মতো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ওইসব ভাইরাস নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে, গবেষণা করে সাফল্যও অর্জিত হয়েছে।

কোভিড-১৯-এর সমস্যা হল, এ রোগটি একেবারেই নতুন ধরনের। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এ রোগটির সঙ্গে সার্স ও মার্স ভাইরাসের তুলনা করে থাকেন। সার্স ও মার্স ভাইরাস আঞ্চলিকভাবে সংক্রমণ সৃষ্টি করলেও বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ ঘটাতে পারেনি। কোভিড-১৯-এর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসাও নেই। বিশেষ করে ওষুধ সেবন করে এ ভাইরাসকে সরাসরি প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসকরা পুরনো ব্যাধিতে ব্যবহৃত হতো এমন দু-একটি ওষুধ কোভিড-১৯-এও ব্যবহারযোগ্য বলে মনে করছেন। চিকিৎসকরা মনে করেন, এ ওষুধ যদি কোভিড আক্রান্ত রোগীকে বিলম্ব না করে খাওয়ানো হয় তাহলে তুলনামূলকভাবে অধিকতর উপকার পাওয়া যায়।

এ ছাড়া এ রোগের চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে লক্ষণভিত্তিক। এ রোগ হলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট অসহনীয় হয়ে ওঠে। চিকিৎসকরা এমতাবস্থায় রোগীকে অক্সিজেন দিয়ে রোগীর কষ্ট উপশমের চেষ্টা করেন।

যখন এ সমস্যা চরম আকার ধারণ করে তখন ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ ব্যবহার করতে হয়। যেসব রোগী আইসিইউতে চিকিৎসা নেয় তাদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। এ মৃত্যুর জন্য আইসিইউ মেশিনটি দায়ী নয়। সমস্যা হয় যখন রোগীকে আইসিইউতে পাঠানো হয় ততক্ষণে রোগীর ভাইটাল অর্গানগুলো আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় রোগীর প্রাণ রক্ষা অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।

তবে সব ক্ষেত্রে সংক্রমণের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে না। অনেকেই আইসিইউ ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সুস্থ হয়ে যান। অতি সম্প্রতি চিকিৎসকরা বুঝতে পারছেন কোভিড-১৯ মানব মস্তিষ্কেরও ক্ষতিসাধন করে।

এর ফলে এসব রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও কোনো কাজকর্ম করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে এরা অন্যদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়া অনেক রোগীর দেহেই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ভাইটাল অর্গানগুলোয় প্রদাহ সৃষ্টি হওয়ার ফলে সুস্থ হওয়া রোগীও পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কবলে পড়ে যান।

চিকিৎসকরা এ ধরনের রোগীদের ৩-৪ মাস অন্তর ফলোআপের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, অনেকে এ রোগের কিছু লক্ষণে ভোগার পর আপনা-আপনি সুস্থ হয়ে যান।

যেমন কোভিড রোগীদের মধ্যে এক পর্যায়ে প্রবল ডায়রিয়া দেখা যায়। এসব রোগী মনে করে তারা শুধু ডায়রিয়াতেই আক্রান্ত হয়েছে। খাবার স্যালাইন গ্রহণ করে এরা সুস্থ হয়ে ওঠে। সুস্থ হওয়ার পর সে ভাবতেই পারে না আসলে তার কোভিড-১৯ হয়েছিল।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ কত ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আছে বলে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা অনেক সময় সংবাদপত্রের পাতায় দেখি অমুক জায়গায় কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কোভিড-১৯-এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ সংখ্যাটিও কম নয়। এদের মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কোভিড পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হয়।

পরীক্ষাকেন্দ্রে নমুনা পাঠানোর পর কতজন সত্যি সত্যি কোভিডে আক্রান্ত ছিলেন সে তথ্য আজ পর্যন্ত কোথাও দেখিনি। এছাড়া ১৮ কোটি মানুষের দেশে সঠিক ও নির্ভুলভাবে নমুনাগুলো টেস্ট করতে পারে এমন ধরনের আরও অনেক পরীক্ষাগার প্রয়োজন। দেশের প্রায় অর্ধেক জেলাতে কোভিডের নমুনা পরীক্ষার কোনো পরীক্ষাগার নেই।

চীনে কোভিড সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর আমরা দুই মাস সময় পেয়েছিলাম। আমরা এটাও জানতাম রোগটি দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া ইউরোপের দেশ ইতালিতেও তীব্র সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। ইরানের অবস্থাও সঙ্গিন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

এসব দেখে আমাদের বোঝা উচিত ছিল রোগটি বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য আগাম প্রস্তুতিরও প্রয়োজন ছিল। এসব প্রস্তুতির মধ্যে ছিল প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষাগার তৈরি করা, কোভিড চিকিৎসার জন্য কিছু সংখ্যক হাসপাতালকে পৃথকভাবে প্রস্তুত করা, চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং নার্সদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

এছাড়া ভেন্টিলেটর এবং আইসিইউ-এর যন্ত্রপাতিসহ চিকিৎসার জন্য মূল্যবান যন্ত্রসামগ্রী সংগ্রহ করা। এ বছর মার্চ ৮ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম কোভিড রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দেখা গেল এ মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধিটির জন্য আমাদের তেমন কোনো প্রস্তুতি নেই। তাড়াহুড়া করে যা কিছু করা হয়েছে তা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা অত্যন্ত আনাড়ি।

কোভিড-১৯ কে উপলক্ষ করে ভয়াবহ দুর্নীতিরও আশ্রয় নেয়া হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ নামসর্বস্ব রিজেন্ট হাসপাতালকেও কোভিড চিকিৎসার এবং নমুনা পরীক্ষার সুযোগ দেয়া হয়। এদের মালিক পক্ষ রোগ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাদি না করেই নির্বিচারে রিপোর্ট দিতে থাকে।

চিকিৎসার ইতিহাসে এর চেয়ে জঘন্য আর কোনো দৃষ্টান্ত হতে পারে না। মিডিয়াতে এ অপকীর্তির সংবাদ প্রকাশের পর এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার বাধ্য হয়। কোভিড-১৯ পরীক্ষা করাতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগের শিকার হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শত-সহস্র মানুষ কাকডাকা ভোর থেকেই কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য লাইনে দাঁড়াত। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা বয়োবৃদ্ধ এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। এদের দুর্ভোগ ও কষ্টের সীমা ছিল না। সামান্য বুদ্ধি খরচ করে বাংলাদেশের সেরা হাসপাতালটি মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেনি। যদি সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা থাকত, তাহলে এত মানুষকে কষ্ট পোহাতে হতো না।

নমুনা সংগ্রহ শুরুর আগেই লাইনের প্রথম দিকে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের গণনা করে মোট কতজনের নমুনা গ্রহণ করা হবে, তা শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত চিহ্নিত করে অন্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলে অনেকেই অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট থেকে রেহাই পেতেন।

কোভিড চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত কিছু হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংক ছিল না এবং রোগীদের বেডের কাছ দিয়ে অক্সিজেন লাইনও স্থাপন করা ছিল না। এ কাজটিও নতুন করে করতে হয়। ফলে অনেক ক্রিটিক্যাল রোগী প্রথমদিকে অক্সিজেন পায়নি।

এবার যেসব হাসপাতাল কোভিডের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এগুলোর বেশিরভাগই নতুন হাসপাতাল। এ হাসপাতালগুলোর কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত। বিশাল হাসপাতাল ভবন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোতে অনেক কিছুরই ঘাটতি। বিশেষ করে অক্সিজেন সরবরাহ লাইন না থাকা পরিকল্পনাকারীদের বুদ্ধিহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। এ সব কিছুকে ছাড়িয়ে হাসপাতালগুলোতে লোকবল সংকটও রোগীদের বাড়তি দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংবাদপত্রে বেশ কয়েকবারই রিপোর্ট করা হয় যে, অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ও তার আত্মীয়স্বজন হাসপাতালের পর হাসপাতালে গেছেন; কিন্তু কোনো হাসপাতালেই রোগীকে ভর্তি করানো যায়নি। সব হাসপাতাল রোগীকে ফেরত দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত রোগী অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুবরণ করেছে। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

গত কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রে ছোট একটি খবর পড়েছি। খবরটি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে দামি গাড়ির মালিক; কিন্তু তাদের পকেটে কোনো নগদ অর্থ নেই। ব্যাংকে জমানো অর্থও ফুরিয়ে গেছে। এ ধরনের অনেক মানুষ এখন যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যাবে। এ ধরনের ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে কোভিড-১৯ দেখা দেয়ার পর।

যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা সরঞ্জামাদি থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া বেশ কঠিন। দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো নয়। সামাজিক ব্যবস্থাতেও রয়েছে বিশাল ফারাক। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা প্রধানত শহরে বাস করে। গ্রামের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

এমনকি নিকট আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও খুব একটা সম্পর্ক থাকে না। গ্রামাঞ্চলে যারা থাকে তারা বড় বড় ফার্মের মালিক। এসব ফার্মে শ্রমশক্তি খুব কমই ব্যবহার করা হয়। ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার এবং বীজ ও কীটনাশক ছিটানোর জন্য উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়।

দেখা যায়, এ ধরনের ফার্মগুলোতে স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানরাই সব ধরনের কাজ করে। আমি কানাডার এ ধরনের একজন ফার্মারকে জানি। তার পরিবার তার দুই মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে গঠিত। এ ফার্মার কানাডার একটি নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেছেন। তার ফার্মের সাইজ আটশ’ হেক্টর। সে মূলত গম চাষী। তাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি তোমার ফার্মে কোনো মজুর খাটাও না? সে জবাব দিয়েছিল, এই যে আমরা ক’জনই এই ফার্মের মালিক ও শ্রমিক।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দেশে জনসংখ্যার ৫ শতাংশ ফার্মিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। শহরে যারা বাস করে গ্রামের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকে না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। কোভিডের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সংকোচন ঘটেছে। যারা বড় বড় কোম্পানি ও কর্পোরেশনে কাজ করত তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছাঁটাইয়ের মধ্যে পড়েছে। ফলে এদের হাতে নগদ অর্থ আসছে না।

এ অবস্থায় গ্রামে এদের এমন কোনো আত্মীয়স্বজন বা আপনজন নেই, যাদের কাছে গিয়ে কষ্টকর বেকার জীবনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করবে। বাংলাদেশে কোভিড মহামারী শুরু হওয়ার পর অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য জেলার পরিবহন যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যারা বেকার হয়ে গেছে তাদের অনেকেই নানা রকম কলাকৌশল করে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। সেখানে তাদের আপনজনরা রয়েছে। এখন তারা এসব আপনজনদের ওপর নির্ভরশীল। এদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দামি গাড়িওয়ালা বেকার ও কপর্দকহীন হয়ে পড়া তুলনা করা যায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটেছে।

এতদসত্ত্বেও এই রাষ্ট্র বেকার মানুষদের রক্ষা করার জন্য ইউরোপের কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর মতো কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। এ বিচারে মার্কিন পুঁজিবাদ ইউরোপের কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর পুঁজিবাদের তুলনায় অনেক বেশি অমানবিক।

অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো একটি পশ্চাৎপদ দেশ বেকার ভাতার প্রচলন করতে পারেনি। কিন্তু এ দেশের মানবিক মূল্যবোধ এখনও নোংরা বাণিজ্যিকায়নের কবলে পড়েনি। এখনও এ দেশে একজন রোজগেরে ভাই বেকার ভাইটিকে সাহায্য-সহযোগিতা করে।

এ ধরনের ব্যবস্থাকে সমাজ বিজ্ঞানীরা Income sharing practice বলে চিহ্নিত করেছেন। দুনিয়ার তাবৎ পশ্চাৎপদ সমাজে এ ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান। কিছুটা দার্শনিকভাবে বলতে হয়, পশ্চাৎপদতার মধ্যেও উন্নত মানবিকতার চর্চা বহাল থাকে। অন্যদিকে খুব আধুনিক সমাজে এ রকম মানবিকতার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনায় তরুণদের ২৫ শতাংশ বেকার হয়ে পড়েছে। খুবই সম্প্রতি আইএলওর একটি জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, অন্তত ১৭ লাখ লোক বেকার হয়েছেন দেশে। কৃষি ও বস্ত্র খাতে বেকারের সংখ্যা বেশি। তরুণ বেকারত্ব ১২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ শতাংশ হয়েছে।

এশিয়ার ১৩টি দেশে দেড় কোটি তরুণ কর্মহীন। কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পাওয়ার ইঙ্গিত মেলে অনলাইন পোর্টালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কমে যাওয়া থেকে। এর পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে কর্মসংস্থানের চাহিদায়ও পরিবর্তন আসছে। করোনার অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বেশ কাবু করে ফেলেছে। সরকারকে ঋণের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। ঋণের বোঝা কমানোর জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর ফিসহ নানা রকম অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ দেখা দেবে।

এর ফলে অর্থনীতির ওপর কেমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তা বিবেচনায় না রাখলে আরও বড় বিপর্যয় হতে পারে। বিশ্ব পরিমণ্ডলেই হোক অথবা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই হোক, করোনা সবার জন্য বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে এ বিপদকে কেন্দ্র করেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি ও কৌশলের খেলা শুরু হয়েছে। সব পক্ষের সংকট অবসানে প্রয়োজন সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। কে কার ওপর টেক্কা মারতে সক্ষম- এ ধরনের চিন্তাভাবনা খুবই ক্ষতিকর হবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত