শিক্ষা দিবস: অজর্ন ও মনঃকষ্টের কথা

  কাজী ফারুক আহমেদ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন আজ আটান্ন বছরে পদার্পণ করছে। দুঃখ হয়, শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অনেক অর্জন সত্ত্বেও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দিনটি আজও জাতীয় শিক্ষা দিবসের স্বীকৃতি পায়নি। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, গণমুখী শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য-বঞ্চনা নিরসন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে। তবে এর আশু বা প্রত্যক্ষ কারণ ছিল, ১৯৬২ সালে শরিফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তানের পূর্ব অংশের জনগণ শিক্ষা, অর্থনীতি, সামরিক-বেসামরিক চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রে চরম বিমাতাসুলভ বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন; রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় নিষেধাজ্ঞা; নজরুলের কবিতার বিকৃতি যেমন, ‘মহাশ্মশান’-এর পরিবর্তে ‘গোরস্থান’- ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি; এর পরিবর্তে ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি, সারা দিন যেন আমি নেক হয়ে চলি’ ইত্যাদি শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিসেবীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।

এ প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতিসেবী, শিল্পী-সাহিত্যিকদের গণজাগরণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয় বাঙালি অর্থনীতিবিদদের দুই অঞ্চলের জন্য ‘দুই অর্থনীতি তত্ত্ব’। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় শরিফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট। ছাত্রসমাজ-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। প্রথমে আন্দোলন শুরু হয় ঢাকা কলেজ থেকে। তিন বছরমেয়াদি ডিগ্রি পাস কোর্স প্রবর্তনের বিরুদ্ধে ডিগ্রি ক্লাসের প্রতিবন্ধী ছাত্র এনআই চৌধুরী আন্দোলনের সূচনা করেন। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অতিরিক্ত ইংরেজিকে বোঝা মনে করে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পরীক্ষার্থীরাও এতে যুক্ত হয়। প্রথমে স্নাতক শ্রেণির ছাত্রদের লাগাতার ধর্মঘট এবং উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রদের ইংরেজি ক্লাস বর্জনের মধ্যে আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল। জুলাই ধরে এভাবেই আন্দোলন চলে। ‘তবে আন্দোলনের গুণগত পরির্তন ঘটে ১০ আগস্ট (১৯৬২)। এদিন বিকালে ঢাকা কলেজ ক্যান্টিনে স্নাতক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় শ্রেণির ছাত্রদের এক সমাবেশে। এতে সভাপতিত্ব করে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কাজী ফারুক আহমেদ। সে তার বক্তৃতায় উপস্থিত ছাত্রদের এ কথা বোঝাতে সক্ষম হয়, শিক্ষার আন্দোলন ও গণতন্ত্রের আন্দোলন একইসূত্রে গাঁথা। এ সভার পূর্ব পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনের কোনো যোগসূত্র ছিল না। কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করতেন, শুধু শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি-দাওয়া নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব’ (বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস : ড. মোহাম্মদ হাননান)।

এখানে আরও কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ এক ঘোষণাবলে পূর্ব পাকিস্তানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত সংসদগুলো বাতিল করে দেয়। বিক্ষুব্ধ ও সচেতন ছাত্রদের ঘাঁটি বলে পরিচিত অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। বিক্ষোভ সৃষ্টির ‘উস্কানিদাতা’ বলে পরিচিত অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা করা হয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর অফিস কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন কৌশল অবলম্বন করে। সামরিক শাসনে প্রকাশ্যে ছাত্র সংগঠনের নামে রাজনীতি বা আন্দোলন পরিচালনা কিংবা নির্বাচনে অংশ নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় ছাত্র আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

শিক্ষানীতি ১৯৭৪ থেকে ২০১০

বাষট্টিতে পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক কার্যক্রমে রূপান্তরের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ‘শিক্ষার নানাবিধ অভাব ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণ, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠু জাতি গঠনের নির্দেশদান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথনির্দেশের উদ্দেশ্যে’ ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের উদ্বোধন করেন। ১৯৭৩ সালের ৮ জুন কমিশন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কাছে অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট পেশ করে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ৩০ মে ১৯৭৪।

বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-এ-খুদাকে সভাপতি করে গঠিত বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশনের ওই রিপোর্ট এখন পর্যন্ত শিক্ষাসংক্রান্ত সবচেয়ে বিশদ, পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য প্রতিবেদন; কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার নিষ্ঠুরভাবে হত্যার পর ক্ষমতাসীনরা ওই নীতি বাস্তবায়নের ধারেকাছে না গিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা সংস্কারের নামে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন প্রস্তাব ও কার্যক্রম গ্রহণে লিপ্ত হয়। তা সত্ত্বেও পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিটি শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবে কোনো না কোনোভাবে ড. কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্টের শব্দ, শব্দমালা, বাক্যাংশ যুক্ত হয়েছে। কারণ তা না করে উপায় ছিল না। তবে উদ্দেশ্য সাধু না হওয়ায় ওইসব উদ্যোগ শিক্ষা ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো অবদান রাখতে পারেনি।

কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে, বিশেষ করে গত অর্ধদশকে শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অর্জন সম্ভব হয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। নবম জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনে আলোচিত হয়ে ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয় এ শিক্ষানীতি। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অর্জনের মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, ১৭ বছর আগে প্রণীত কারিকুলাম সংস্কার, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রবর্তন, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে ক্লাস শুরু, পরীক্ষার ফল প্রকাশে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ, অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অনুকূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষায় পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ইত্যাদি। সেই সঙ্গে ছাত্রী উপবৃত্তির পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে দরিদ্র ছাত্রদের জন্য উপবৃত্তি চালু, যুবশক্তিকে অধিক হারে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কোর্স চালু, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরের অনুরূপ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রেও জেন্ডারবৈষম্য হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তবে সৃজনশীল পদ্ধতি ব্যবহার, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রকৃত অগ্রগতি নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

অর্জন ও চ্যালেঞ্জ

শিক্ষা ও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অনেক অর্জন মেনে নিয়েও বিরাজিত চ্যালেঞ্জগুলো বলা চলে মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। যেমন- ১. শিক্ষায় প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প বরাদ্দ; ২. শিক্ষকতা পেশার প্রতি মেধাবীদের আকর্ষণ হ্রাস; ৩. মেধার অপচয় ও পাচার; ৪. আশঙ্কাজনক হারে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস; ৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় নানা অসঙ্গতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি; ৬. শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে ফলপ্রসূ তদারকির অনুপস্থিতি, সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতি; ৭. অনুল্লেখযোগ্য অথবা নামমাত্র শিক্ষক প্রশিক্ষণ; ৮. পাঠদানে শিক্ষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অদক্ষতা; ৯. শিক্ষকদের একাংশের হাতে শিক্ষার্থীর শারীরিক শাস্তি, মানসিক নির্যাতন; ১০. শিক্ষকদের একাংশের নৈতিক অবক্ষয়; ১১. শিক্ষা আইন-২০১০ বাস্তবায়নে ধীরগতি; ১২. শিক্ষাক্রম-পাঠ্যসূচির সঙ্গে কর্মসংস্থান-শ্রমবাজারের সংস্রবহীনতা; ১৩. শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যানে অসঙ্গতি; ১৪. শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক-প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সংযোগহীনতা; ১৫. শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার সর্বত্র স্বজনপ্রীতি ও দলীয়-কোটারি স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা।

এমডিজিতে আমাদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। তবে এসডিজি-৪ অর্জনে শিক্ষক, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ এখনও উল্লেখ করার মতো নয়। চ্যালেঞ্জের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। শিক্ষা দিবসে অভিন্ন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অগ্রসর হওয়ার প্রত্যয় উচ্চারণ করতে হবে। শিক্ষার অব্যাহত অগ্রযাত্রায় শিক্ষা দিবসের যথার্থ মূল্যায়ন হবে- কায়মনোবাক্যে এ প্রার্থনাই করি।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, প্রবীণ শিক্ষক নেতা

[email protected]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত