শিক্ষা দিবস: দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হোক

  শ্যামল শর্মা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সবাই জানি, যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণ কল্পনামাত্র। তাই একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিলেই হয়।

আগে দেখা গেছে, অনেক বড় বড় যুদ্ধে বিজয়ী শক্তি পরাজিত জাতির লাইব্রেরি ধ্বংস করে দিয়েছে যেন সে জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবগত না হতে পারে।

১৯৬২ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার তৎকালীন শিক্ষা সচিব এসএম শরিফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে প্রণয়ন করল চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি, যা শরিফ কমিশন নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে স্বৈরাচারী আইয়ুবশাহী মনের অজান্তে সেই বারুদে দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়েছিল।

‘টাকা যার শিক্ষা তার’ এ মূলমন্ত্রকে ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তাবসহ একটি সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি এদেশের জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইল তৎকালীন আইয়ুব সরকার।

এ চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত ছাত্রসমাজ ১৭ সেপ্টেম্বর (১৯৬২) হরতাল আহ্বান করে এবং এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। ইতোমধ্যে বাঙালি আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করে দিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, এটি শুধু ছাত্রদের শিক্ষা সম্পর্কিত আন্দোলন নয়, বরং এটি স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাহেন্দ্রক্ষণ।

১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় বের হয় ছাত্র-জনতার বিরাট মিছিল। মিছিলটি যখন হাইকোর্ট পার হয়ে আবদুল গণি রোডে প্রবেশ করে তখনই অতর্কিতভাবে পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেক ছাত্র।

পিচঢালা রাজপথ রক্তে সিক্ত হল। রাজপথকে নরকপুরীতে পরিণত করে পিছু হটল স্বৈরাচারী আইয়ুবশাহী সরকার। পারল না বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে। পরবর্তী সময়ে একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। আর ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত দিনটি প্রতিষ্ঠা পায় ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে।

বর্তমান বাস্তবতা : দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে আমরা পেয়েছি একটি মানচিত্র, স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি লাল-সবুজের পতাকা। পেয়েছি একটি শিক্ষা দিবস। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ দিবসটি এখন বাম প্রগতিশীলরা ছাড়া কেউ মনে রাখে না।

এমনকি এ দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে যে দিনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সেই দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবেও পালন করা হয় না। শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ এ ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই অজানা ইতিহাসের এ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা। তারা বঞ্চিত এর তাৎপর্য অনুধাবন থেকে।

প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দিবসের ৫৮ বছর পরও ছাত্রসমাজের সার্বজনীন শিক্ষার যে আকাঙ্ক্ষা, তা আজও পূরণ হয়নি। কিছুটা সংশোধন হলেও সেই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি আমলে কেরানি কর্তৃক নির্মিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বহাল আছে।

শিক্ষা এখনও বাজারে ওঠে। তবে পার্থক্য একটিই- আগে বিক্রি হতো খোলাবাজারে আর এখন বিক্রি হয় শোরুমে। হুহু করে বাড়ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ, যেখানে পড়তে প্রয়োজন প্রচুর অর্থের, দেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে যা বহন করা অসম্ভব।

অবশেষে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে গিয়ে আমরা পেয়েছি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০; যেখানে চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষায় ও কৌশলে দেয়া হয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।

শিক্ষা দিবসের চেতনায় উঠে আসা সার্বজনীন, বৈষম্যহীন, একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষাকে করা হয়েছে বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ। এ যেন নতুন বোতলে সেই পুরনো মদ! যার প্রভাবে সারা দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা- সর্বস্তরেই চরম নৈরাজ্য চোখে পড়ছে।

দেশে এখনও প্রাথমিক স্কুলের ঘাটতি রয়েছে; রয়েছে শিক্ষক সংকট। এখনও জাতীয়করণের দাবিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের আমৃত্যু অনশনে যেতে হয়, যা শিক্ষা দিবসের চেতনার পরিপন্থী।

আমাদের স্মরণে রাখা উচিত- সেদিন বাবুল, গোলাম মোস্তফাদের রক্ত রাজপথে শুকিয়ে যায়নি, সঞ্চালিত হয়েছিল জাতির ধমনিতে, মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরায়। আর ওই রক্তের স্রোত গিয়ে মিশেছিল আরেক রক্তগঙ্গায়। অবশেষে গিয়ে মিলিত হয় স্বাধীনতার মোহনায়।

তাই দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সার্বজনীন মতামতের ভিত্তিতে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা, যেখানে শিক্ষা হবে সবার জন্য অবাধ। ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সবার অধিকার’ এটি সর্বস্তরে প্রতিফলিত হোক মহান শিক্ষা দিবসে।

তাৎপর্যপূর্ণ মহান শিক্ষা দিবসের ইতিহাস মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিনটি পালনের উদ্যোগ নেয়া উচিত। শিক্ষা দিবসের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গ্রাম ও শহরের মাঝে শিক্ষা বৈষম্য দূর করতে হবে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে। হাওর, বাঁওড়, পাহাড় ও দুর্গম অঞ্চলকে কমিউনিটি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিল করে দ্বিতীয় শিফট চালু এবং সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই ৬২’র মহান শিক্ষা দিবসের সব শহীদের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য সফল হবে।

শ্যামল শর্মা : সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, যশোর জেলা শাখা

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত