দক্ষ ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
দক্ষ ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে

  ড. আর এম দেবনাথ  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত দুই-তিন দিন ধরে দেশের সব কাগজের বড় খবর ‘পেঁয়াজের বাজার’। এ বাজারে গেলবারের মতো এবারও আগুন লেগেছে। যুগান্তরের গতকালের (১৮ সেপ্টেম্বর) খবরের শিরোনাম : ‘১৮ দিনের পেঁয়াজ কারসাজিতে অসাধুদের পকেট ভারি : লোপাট ৪২৪ কোটি টাকা’। কারসাজি করে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং হচ্ছে- এ অভিযোগ মোটামুটি সবার।

কেউ কেউ কারসাজি না বলে বলছেন কৃত্রিম সংকট তৈরির কথা। কারসাজি, কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেটের কাজ- এসব অভিযোগ শুধু খবরের কাগজে নয়, খোদ সরকারের। সাধারণ মানুষ এর শিকার। কারসাজি না হলে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকার পরও কেন এ আচমকা মূল্যবৃদ্ধি। কারও কারও পক্ষ থেকে ‘যুক্তি’ হিসেবে বলা হচ্ছে ভারত কর্তৃক পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের কথা।

ঠিক আছে, কিন্তু একটা কথার তো কোনো জওয়াব নেই- রফতানি বন্ধের পাঁচ মিনিট আগে যে পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ টাকা কেজি, তা পাঁচ মিনিটের মধ্যে ৫০, ৬০, ৮০, ১০০ টাকা কেজি কী করে হয়? দোকানে দোকানে আগের পণ্যের আড়াই মাসের স্টক আছে, আমদানিতে পণ্যের স্টক পাইকারি বাজারে আছে। বন্দরের বাইরে ২০ হাজার টন পেঁয়াজ চট্টগ্রামে ঢোকার কথা। এ অগ্রিম ব্যবস্থা ব্যবসায়ীরা নানা আশঙ্কা থেকে করে রেখেছেন।

এ বছরের গত ৮ মাসে ৫ লাখ টনের মতো পেঁয়াজ আমদানিকারকরা আমদানি করেছেন। দেশে উৎপাদন হয় ১৭-১৮ লাখ টন পেঁয়াজ। কিছু পেঁয়াজ নষ্ট হয় ধরে নিলেও হাতে থাকে ১৫-১৬ লাখ টন। এটাই বরাবরের হিসাব। চাহিদা-সরবরাহের তথ্য বরাবরই এ রকম বলে কাগজে দেখা যায়। তাহলে প্রশ্ন, কেন এত বড় মূল্যবৃদ্ধি? সরকারি নিয়ন্ত্রণ বলতে কি কিছুই নেই? দেশে আইনশৃঙ্খলা বলে কি কিছুই নেই? পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে? এ রকম শত শত প্রশ্ন মানুষের মনে।

কী করবে মানুষ, তাদের তো আর কিছুই করার নেই। ভোগান্তি ছাড়া তাদের কপালে আর কী আছে? পবিত্র ঈদের সময় মূল্য বৃদ্ধিজনিত যাতনায় সে ভোগে। বাজেটের সময় সে ভোগে। সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে সে ভোগে। বন্যা, অতিবৃষ্টি হলে সে ভোগে। যেমন এবারও সে ভুগেছে। শাকসবজি, তরিতরকারি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম থেকে শুরু করে সব ভোগ্যপণ্যের দাম এখন ছয় মাস আগের চেয়ে বেশি।

একশ্রেণির ব্যবসায়ী এ মহাদুর্যোগেও মানুষকে, ভোক্তাকে রেহাই দিচ্ছে না। মানুষের রোজগার নেই, হাজার হাজার লোক চাকরিচ্যুত, ব্যবসাচ্যুত ও বেকার। চূড়ান্ত অস্বাভাবিক ও দুঃস্বপ্নে দিন যাচ্ছে মানুষের করোনা মহামারীর কারণে। এ সময়ে ব্যবসায়ীদের একটি শ্রেণি যে অসামাজিক, অনৈতিক কাজটি করছে, তা তারা না করলেই কি পারত না? তাদের তো উচিত ছিল এই দুর্দিনে, অনিশ্চিত জীবনে মানুষকে একটু রেহাই দেয়া। না, তা হয়নি এবং হচ্ছে না।

এদিকে পেঁয়াজের বাজারের এ মূল্য উল্লম্ফন দেখে চট্টগ্রামের প্রশাসন খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের গুদামে হানা দেয়। দেখতে চায় কারা অনৈতিক ও অবৈধভাবে স্টক করছে। ব্যস, আর যায় কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে বাজার বন্ধ। অভিযোগ, প্রশাসন ‘বাড়াবাড়ি’ করছে। এ ঘটনা শুধু এবার নয়, গতবারও হয়েছিল যখন পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সেবার শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপস করতে হয় সরকারের। কিন্তু ‘আপস’ আপসই রয়ে গেছে। কার কথা কে শোনে?

ব্যবসায়ীদের প্রভাবশালী অংশ কবে সরকারের কথা শুনেছে? শেষ পর্যন্ত সরকার যে ব্যবস্থাটি গ্রহণ করে তা হচ্ছে ‘খোলাবাজারি’ ব্যবস্থা। ট্রাকে করে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মানুষের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণে দুষ্প্রাপ্য জিনিস বিক্রি করা। বস্তুত এর চেয়ে বড় ‘ওষুধ’ আর ‘বাজার অর্থনীতিতে’ নেই। বাজার অর্থনীতি বাজারের বিষয়, চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়। চাহিদা ও সরবরাহই ঠিক করে বাজারমূল্য। কিন্তু এ দুই ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা মাঝেমধ্যেই সংকট তৈরি করে।

বন্যা, অতিবৃষ্টি, কম আমদানি, সাময়িকভাবে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটা, কম উৎপাদন ইত্যাদি পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। বস্তুত এমন কোনো সুযোগ নেই যা অসাধু ব্যবসায়ীরা নেয় না। এটাকে তারা ‘চান্স’ হিসেবে গণ্য করে। বছরের ব্যবসা কয়েকদিনেই সেরে ফেলে। তাও আইনের ঊর্ধ্বে থেকে। কর না দিয়ে। ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে।

এ ধরনের কৃত্রিম সংকটে, মানবসৃষ্ট সংকটে একমাত্র ‘ওষুধ’ বাজার হস্তক্ষেপ (মার্কেট ইন্টারভেনশন); অর্থাৎ ঘাটতি বাজারে প্রচুর পণ্য সরকারি গুদাম থেকে ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করা। এর জন্য সরকারি গুদামে পণ্যের যথেষ্ট স্টক থাকতে হবে। আপদে-বিপদে তা বাজারে ছাড়তে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ না নিতে পারে। এটা আমাদের ক্ষেত্রে হচ্ছে।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তা করছে। টিসিবির তা করার কথা ছিল না। তাদের করার কথা ছিল আমদানি। তা বিতরণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু একটা প্রতিষ্ঠান করেছিলেন, যার নাম ছিল কনজিউমার সাপ্লাইজ কর্পোরেশন (কসকর)। আমরা সেই প্রতিষ্ঠান তুলে দিয়েছি। এমনকি ‘রেশন’ ব্যবস্থাটিও তুলে দিয়েছি, যার মাধ্যমে সবার মধ্যে সরকারি খাদ্যপণ্য বণ্টন করা হতো। এতে ‘বাজার’ পরিস্থিতি যাচ্ছেতাই হতে পারত না।

আমরা ভেবেছিলাম বাজার অর্থনীতি (মার্কেট ইকোনমি) ‘ভদ্রভাবে’ চলবে। সব ব্যবসায়ী আইন-কানুন মেনে ব্যবসা করবে। প্রতিযোগিতা শক্তি, মেধা, শ্রম ও বুদ্ধির জোরে তারা বাজারে কাজ করে টাকা কামাই করবে। বলা বাহুল্য, তা উন্নয়নশীল দেশের কোথাও সম্ভব হয়নি। তাই সম্ভবত প্রতিবেশী দেশ ভারতে গড়ে উঠেছে শক্ত একটা ‘রেশন ব্যবস্থা’, যার সুবিধা গরিব-মধ্যবিত্ত পাচ্ছে। আমাদের এ ব্যবস্থা নেই। আমরা টিসিবিকে দিয়ে ঠেকা কাজ চালাচ্ছি।

আমি মনে করি, প্রতি বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দক্ষ ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। ‘মার্কেটিং’ পদ্ধতি আমাদের বড় দুর্বল। ‘পার্চেজিং’, ‘সেলিং’, ‘ফাইন্যান্সিং’, ‘স্টোরিং’ এবং ‘ওয়ারহাউজিং’- এ ধরনের সব ‘মার্কেটিং ফাংশন’ আমাদের দুর্বল ও অদক্ষ। বলা দরকার, এদিকে আমাদের নজর কম। সারা দেশে, ঢাকা শহরে বড় বড় কাঁচাবাজার গড়ে তোলার কথা ছিল সরকারের। কৃষকদের জন্য কাঁচাবাজার গড়ে তোলার কথা ছিল। না, তা হয়নি, হচ্ছেও না।

এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, সিন্ডিকেটওয়ালারা। তবে কি ভাবব সিন্ডিকেট এভাবে টাকা ‘বানিয়ে’ শিল্পে আসুক, তাই আমরা চাই? চট্টগ্রামের পণ্য আমদানিকারকদের উদ্যোক্তা হিসেবে উত্থান অনেকটা এ কথাই মনে করিয়ে দেয়। অবশ্য এ কথাও ঠিক, বহু আমদানিকারক পণ্য ব্যবসায়ী শিল্পসম্পদ করে এখন ফতুর, ব্যাংকে ডিফল্টার, যেমন- ‘ইলিয়াস গ্রুপ’, ‘আম্বিয়া গ্রুপ’, ‘মোস্তফা গ্রুপ’, ‘মওলানা গ্রুপ’, ‘নূরজাহান গ্রুপ’ ইত্যাদি।

এ ধরনের বহু ব্যবসায়ী গ্রুপ ঢাকা ও চট্টগ্রামে কার্যরত। আজকাল ‘গ্রুপ’ পরিচয় ছাড়া ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো পরিচয় দেন না। এ পরিচয়েই তারা ব্যবসা করেন। এর আড়ালেই অসাধু আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী, এজেন্ট, আড়তদাররা ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছে। বস্তুত প্রতিটি পণ্যের জন্য একটি করে ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করে। এসব ‘সিন্ডিকেটের’ নাম খবরের কাগজেও অনেকবার ছাপা হয়েছে।

পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, গত চার মাসে ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় এক লাখ টন পেঁয়াজের আমদানিকারক। খবরের কাগজেই তাদের নাম দেখলাম। খুঁজে দেখা দরকার তারা ‘সিন্ডিকেট’ বানিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা।

শুধু পেঁয়াজ কেন- চাল, গম, ভোজ্যতেলের সিন্ডিকেট সম্পর্কে বহু গবেষণা হয়েছে। তাদের নাম ছাপা হয়েছে। চালে ৫-৭ বছর আগেই সিন্ডিকেট সদস্য ছিল ৬। গমে ছিল ৬ জন এবং সয়াবিনে ছিল ১০ জন। এ সিন্ডিকেট সদস্যদের অনেকেই এখন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক। তাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি পণ্যের চাহিদা-ভোগ এবং উৎপাদন ও আমদানির পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে সরকারকে এগোতে হবে। এ জায়গায় আমরা খুব দুর্বল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিতর্কিত। সেখানে কোনো পেশাদার লোক নেই। সরকারি বিভাগ মনের মতো করে পরিসংখ্যান দেয়। বর্তমান ক্ষেত্রে পেঁয়াজের প্রকৃত উৎপাদন কত, কত আমাদের চাহিদা এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

দক্ষ ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে

 ড. আর এম দেবনাথ 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত দুই-তিন দিন ধরে দেশের সব কাগজের বড় খবর ‘পেঁয়াজের বাজার’। এ বাজারে গেলবারের মতো এবারও আগুন লেগেছে। যুগান্তরের গতকালের (১৮ সেপ্টেম্বর) খবরের শিরোনাম : ‘১৮ দিনের পেঁয়াজ কারসাজিতে অসাধুদের পকেট ভারি : লোপাট ৪২৪ কোটি টাকা’। কারসাজি করে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং হচ্ছে- এ অভিযোগ মোটামুটি সবার।

কেউ কেউ কারসাজি না বলে বলছেন কৃত্রিম সংকট তৈরির কথা। কারসাজি, কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেটের কাজ- এসব অভিযোগ শুধু খবরের কাগজে নয়, খোদ সরকারের। সাধারণ মানুষ এর শিকার। কারসাজি না হলে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকার পরও কেন এ আচমকা মূল্যবৃদ্ধি। কারও কারও পক্ষ থেকে ‘যুক্তি’ হিসেবে বলা হচ্ছে ভারত কর্তৃক পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের কথা।

ঠিক আছে, কিন্তু একটা কথার তো কোনো জওয়াব নেই- রফতানি বন্ধের পাঁচ মিনিট আগে যে পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০ টাকা কেজি, তা পাঁচ মিনিটের মধ্যে ৫০, ৬০, ৮০, ১০০ টাকা কেজি কী করে হয়? দোকানে দোকানে আগের পণ্যের আড়াই মাসের স্টক আছে, আমদানিতে পণ্যের স্টক পাইকারি বাজারে আছে। বন্দরের বাইরে ২০ হাজার টন পেঁয়াজ চট্টগ্রামে ঢোকার কথা। এ অগ্রিম ব্যবস্থা ব্যবসায়ীরা নানা আশঙ্কা থেকে করে রেখেছেন।

এ বছরের গত ৮ মাসে ৫ লাখ টনের মতো পেঁয়াজ আমদানিকারকরা আমদানি করেছেন। দেশে উৎপাদন হয় ১৭-১৮ লাখ টন পেঁয়াজ। কিছু পেঁয়াজ নষ্ট হয় ধরে নিলেও হাতে থাকে ১৫-১৬ লাখ টন। এটাই বরাবরের হিসাব। চাহিদা-সরবরাহের তথ্য বরাবরই এ রকম বলে কাগজে দেখা যায়। তাহলে প্রশ্ন, কেন এত বড় মূল্যবৃদ্ধি? সরকারি নিয়ন্ত্রণ বলতে কি কিছুই নেই? দেশে আইনশৃঙ্খলা বলে কি কিছুই নেই? পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে? এ রকম শত শত প্রশ্ন মানুষের মনে।

কী করবে মানুষ, তাদের তো আর কিছুই করার নেই। ভোগান্তি ছাড়া তাদের কপালে আর কী আছে? পবিত্র ঈদের সময় মূল্য বৃদ্ধিজনিত যাতনায় সে ভোগে। বাজেটের সময় সে ভোগে। সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে সে ভোগে। বন্যা, অতিবৃষ্টি হলে সে ভোগে। যেমন এবারও সে ভুগেছে। শাকসবজি, তরিতরকারি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম থেকে শুরু করে সব ভোগ্যপণ্যের দাম এখন ছয় মাস আগের চেয়ে বেশি।

একশ্রেণির ব্যবসায়ী এ মহাদুর্যোগেও মানুষকে, ভোক্তাকে রেহাই দিচ্ছে না। মানুষের রোজগার নেই, হাজার হাজার লোক চাকরিচ্যুত, ব্যবসাচ্যুত ও বেকার। চূড়ান্ত অস্বাভাবিক ও দুঃস্বপ্নে দিন যাচ্ছে মানুষের করোনা মহামারীর কারণে। এ সময়ে ব্যবসায়ীদের একটি শ্রেণি যে অসামাজিক, অনৈতিক কাজটি করছে, তা তারা না করলেই কি পারত না? তাদের তো উচিত ছিল এই দুর্দিনে, অনিশ্চিত জীবনে মানুষকে একটু রেহাই দেয়া। না, তা হয়নি এবং হচ্ছে না।

এদিকে পেঁয়াজের বাজারের এ মূল্য উল্লম্ফন দেখে চট্টগ্রামের প্রশাসন খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের গুদামে হানা দেয়। দেখতে চায় কারা অনৈতিক ও অবৈধভাবে স্টক করছে। ব্যস, আর যায় কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে বাজার বন্ধ। অভিযোগ, প্রশাসন ‘বাড়াবাড়ি’ করছে। এ ঘটনা শুধু এবার নয়, গতবারও হয়েছিল যখন পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সেবার শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপস করতে হয় সরকারের। কিন্তু ‘আপস’ আপসই রয়ে গেছে। কার কথা কে শোনে?

ব্যবসায়ীদের প্রভাবশালী অংশ কবে সরকারের কথা শুনেছে? শেষ পর্যন্ত সরকার যে ব্যবস্থাটি গ্রহণ করে তা হচ্ছে ‘খোলাবাজারি’ ব্যবস্থা। ট্রাকে করে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মানুষের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণে দুষ্প্রাপ্য জিনিস বিক্রি করা। বস্তুত এর চেয়ে বড় ‘ওষুধ’ আর ‘বাজার অর্থনীতিতে’ নেই। বাজার অর্থনীতি বাজারের বিষয়, চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়। চাহিদা ও সরবরাহই ঠিক করে বাজারমূল্য। কিন্তু এ দুই ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা মাঝেমধ্যেই সংকট তৈরি করে।

বন্যা, অতিবৃষ্টি, কম আমদানি, সাময়িকভাবে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটা, কম উৎপাদন ইত্যাদি পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। বস্তুত এমন কোনো সুযোগ নেই যা অসাধু ব্যবসায়ীরা নেয় না। এটাকে তারা ‘চান্স’ হিসেবে গণ্য করে। বছরের ব্যবসা কয়েকদিনেই সেরে ফেলে। তাও আইনের ঊর্ধ্বে থেকে। কর না দিয়ে। ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে।

এ ধরনের কৃত্রিম সংকটে, মানবসৃষ্ট সংকটে একমাত্র ‘ওষুধ’ বাজার হস্তক্ষেপ (মার্কেট ইন্টারভেনশন); অর্থাৎ ঘাটতি বাজারে প্রচুর পণ্য সরকারি গুদাম থেকে ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করা। এর জন্য সরকারি গুদামে পণ্যের যথেষ্ট স্টক থাকতে হবে। আপদে-বিপদে তা বাজারে ছাড়তে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ না নিতে পারে। এটা আমাদের ক্ষেত্রে হচ্ছে।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তা করছে। টিসিবির তা করার কথা ছিল না। তাদের করার কথা ছিল আমদানি। তা বিতরণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু একটা প্রতিষ্ঠান করেছিলেন, যার নাম ছিল কনজিউমার সাপ্লাইজ কর্পোরেশন (কসকর)। আমরা সেই প্রতিষ্ঠান তুলে দিয়েছি। এমনকি ‘রেশন’ ব্যবস্থাটিও তুলে দিয়েছি, যার মাধ্যমে সবার মধ্যে সরকারি খাদ্যপণ্য বণ্টন করা হতো। এতে ‘বাজার’ পরিস্থিতি যাচ্ছেতাই হতে পারত না।

আমরা ভেবেছিলাম বাজার অর্থনীতি (মার্কেট ইকোনমি) ‘ভদ্রভাবে’ চলবে। সব ব্যবসায়ী আইন-কানুন মেনে ব্যবসা করবে। প্রতিযোগিতা শক্তি, মেধা, শ্রম ও বুদ্ধির জোরে তারা বাজারে কাজ করে টাকা কামাই করবে। বলা বাহুল্য, তা উন্নয়নশীল দেশের কোথাও সম্ভব হয়নি। তাই সম্ভবত প্রতিবেশী দেশ ভারতে গড়ে উঠেছে শক্ত একটা ‘রেশন ব্যবস্থা’, যার সুবিধা গরিব-মধ্যবিত্ত পাচ্ছে। আমাদের এ ব্যবস্থা নেই। আমরা টিসিবিকে দিয়ে ঠেকা কাজ চালাচ্ছি।

আমি মনে করি, প্রতি বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দক্ষ ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। ‘মার্কেটিং’ পদ্ধতি আমাদের বড় দুর্বল। ‘পার্চেজিং’, ‘সেলিং’, ‘ফাইন্যান্সিং’, ‘স্টোরিং’ এবং ‘ওয়ারহাউজিং’- এ ধরনের সব ‘মার্কেটিং ফাংশন’ আমাদের দুর্বল ও অদক্ষ। বলা দরকার, এদিকে আমাদের নজর কম। সারা দেশে, ঢাকা শহরে বড় বড় কাঁচাবাজার গড়ে তোলার কথা ছিল সরকারের। কৃষকদের জন্য কাঁচাবাজার গড়ে তোলার কথা ছিল। না, তা হয়নি, হচ্ছেও না।

এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, সিন্ডিকেটওয়ালারা। তবে কি ভাবব সিন্ডিকেট এভাবে টাকা ‘বানিয়ে’ শিল্পে আসুক, তাই আমরা চাই? চট্টগ্রামের পণ্য আমদানিকারকদের উদ্যোক্তা হিসেবে উত্থান অনেকটা এ কথাই মনে করিয়ে দেয়। অবশ্য এ কথাও ঠিক, বহু আমদানিকারক পণ্য ব্যবসায়ী শিল্পসম্পদ করে এখন ফতুর, ব্যাংকে ডিফল্টার, যেমন- ‘ইলিয়াস গ্রুপ’, ‘আম্বিয়া গ্রুপ’, ‘মোস্তফা গ্রুপ’, ‘মওলানা গ্রুপ’, ‘নূরজাহান গ্রুপ’ ইত্যাদি।

এ ধরনের বহু ব্যবসায়ী গ্রুপ ঢাকা ও চট্টগ্রামে কার্যরত। আজকাল ‘গ্রুপ’ পরিচয় ছাড়া ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো পরিচয় দেন না। এ পরিচয়েই তারা ব্যবসা করেন। এর আড়ালেই অসাধু আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী, এজেন্ট, আড়তদাররা ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছে। বস্তুত প্রতিটি পণ্যের জন্য একটি করে ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করে। এসব ‘সিন্ডিকেটের’ নাম খবরের কাগজেও অনেকবার ছাপা হয়েছে।

পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, গত চার মাসে ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় এক লাখ টন পেঁয়াজের আমদানিকারক। খবরের কাগজেই তাদের নাম দেখলাম। খুঁজে দেখা দরকার তারা ‘সিন্ডিকেট’ বানিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা।

শুধু পেঁয়াজ কেন- চাল, গম, ভোজ্যতেলের সিন্ডিকেট সম্পর্কে বহু গবেষণা হয়েছে। তাদের নাম ছাপা হয়েছে। চালে ৫-৭ বছর আগেই সিন্ডিকেট সদস্য ছিল ৬। গমে ছিল ৬ জন এবং সয়াবিনে ছিল ১০ জন। এ সিন্ডিকেট সদস্যদের অনেকেই এখন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক। তাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি পণ্যের চাহিদা-ভোগ এবং উৎপাদন ও আমদানির পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে সরকারকে এগোতে হবে। এ জায়গায় আমরা খুব দুর্বল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিতর্কিত। সেখানে কোনো পেশাদার লোক নেই। সরকারি বিভাগ মনের মতো করে পরিসংখ্যান দেয়। বর্তমান ক্ষেত্রে পেঁয়াজের প্রকৃত উৎপাদন কত, কত আমাদের চাহিদা এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

ঘটনাপ্রবাহ : পেঁয়াজের বাজার আবারও অস্থির

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০