করোনা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চাই সামগ্রিক প্রয়াস
jugantor
করোনা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চাই সামগ্রিক প্রয়াস

  ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও তামান্না মাসতুরা  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জেলা শহর কুষ্টিয়ায় বসবাস করছেন জনাব করিম। পরিবেশ সচেতন মানুষটি এ করোনাকালীন একদিন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখতে পান- রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে ব্যবহৃত মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভসের ছড়াছড়ি!

বাংলাদেশের জেলা শহর কুষ্টিয়ায় বসবাস করছেন জনাব করিম। পরিবেশ সচেতন মানুষটি এ করোনাকালীন একদিন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখতে পান- রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে ব্যবহৃত মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভসের ছড়াছড়ি!

যেন চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটের মতোই সব মাস্ক-গ্লাভস ব্যবহার করে ফেলে দিয়ে গেছেন সমাজের কতিপয় মানুষ! কৌতূহলবশত তিনি সেসব মাস্ক-গ্লাভস কুড়াতে শুরু করেন।

নিজের সুরক্ষা মেনে টানা তিন ঘণ্টা দশ কিলোমিটার হেঁটে তিনি ১২৫টি ব্যবহৃত মাস্ক আর ডজন দুয়েক ব্যবহৃত হ্যান্ড গ্লাভস সংগ্রহ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এ অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

এত গেল এক জেলা শহরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার সংগ্রহ নমুনা। করোনা মহামারীতে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ এড়াতে হেডকাভার, গগলস, ফেসশিল্ড ও পিপিইসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় গত প্রায় ৫ মাসে সারা দেশে এরূপ ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যরে পরিমাণ ঠিক কী পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তা অতি সহজে অনুমেয় নয়।

তিনটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে পরিচালনা করা একটি সমীক্ষার মতে, শুধু ঢাকা মহানগরে গড়ে প্রতিদিন ২০৬.২১ টন করোনা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে; যা মাস শেষে প্রায় ৬ হাজার ১৮৬ দশমিক ৫১ টনে দাঁড়াচ্ছে।

করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রীর একটি বড় অংশ মানুষ রাস্তাঘাটে উন্মুক্ত জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। অথচ তারা ভাবছে না এসব বর্জ্যরে মাধ্যমে পথচারীরাও সংক্রমিত হতে পারেন। ৪৯ শতাংশের বেশি নগরবাসী অন্যান্য গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গেই তাদের ব্যবহৃত করোনা বর্জ্য রাখছে এবং তা সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করছে।

ওইসব বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে মিশে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কেউ কেউ বাড়িতে আলাদাভাবে এ করোনা বর্জ্য রাখলেও বর্জ্য সংগ্রহকারীরা তা অন্যান্য বর্জ্যরে সঙ্গেই পরিবহন ও ডাম্পিং করছে; সঙ্গে রয়েছে হাসপাতালগুলোর বিপুল পরিমাণের চিকিৎসা বর্জ্য। ফলে এসব বর্জ্য থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত, করোনা বর্জ্য মূলত ‘সংক্রামক বর্জ্য’। যদি বর্জ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে সংগ্রহকারীর সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

অপরদিকে করোনা সুরক্ষাসামগ্রী প্লাস্টিকের তৈরি যা একবারই ব্যবহারযোগ্য। এসব পণ্য ভূমিতে বা পানিতে ৪৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এসব বর্জ্য সামগ্রীর মাধ্যমে আমাদের ভূমি, জলাভূমি, নদী, সমুদ্র ও পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির জরিপ বলছে, প্রতিদিন প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। পরিমাণের দিক থেকে এটি বিশ্বে পঞ্চম। পরিবেশবিদরা বলছেন, এসব বর্জ্যরে নদী ও সাগরে যাওয়া বন্ধে দ্রুত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিতে হবে, তা না হলে বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।

এসব পলিথিন ও প্লাস্টিকসামগ্রী ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায়ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আবার এ বর্জ্যগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর পরিবেশের মারাত্মক সমস্যা দেখা দেবে। তাছাড়া সাধারণ বর্জ্যরে মতো যখন করোনা বর্জ্য উন্মুক্তভাবে পোড়ানো হয় তখন ঘটছে মারাত্মক বায়ুদূষণ।

এমন বাস্তবতায় পলিথিনের বিকল্প হিসেবে জৈব পচনশীল পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর।

একবিংশ শতাব্দীর ‘জলবায়ু রক্ষা’, ‘পরিবেশ বাঁচাও’, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত কর’, এরূপ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে ‘কোভিড-১৯’ আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ, যেখানে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে জীবন রক্ষায় ‘স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা’ ও পরিবেশ রক্ষায় ‘সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস নির্মূলের কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত মাস্কসহ অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী মানুষকে ব্যবহার করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নেয়া পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকরী, সেটাও ভাবনার বিষয়।

সমাধান খুঁজে পেতে আমরা সম্ভাব্য যেসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারি, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে- মানুষকে আরও ব্যাপকভাবে সচেতন করা, যেন তারা ব্যবহৃত মাস্ক বা করোনাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে বা আলাদা করে রাখে।

এ জন্য করোনাসহ বিভিন্ন সংক্রামক বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বাসাবাড়ির বর্জ্যকে সাধারণ বর্জ্য ও করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য-এ দুই ভাগে ভাগ করতে হবে।

করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী আলাদা একটি ব্যাগে ভরে জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে। অথবা ব্যবহারের পর বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী একটি পেপার ব্যাগে রেখে বা সামান্য পুড়িয়ে দিয়ে একটি ময়লা ফেলার ব্যাগে ফেলা উচিত, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফেলে দেয়া সামগ্রী পরিষ্কার করে আবার বাজারে বিক্রি করতে না পারে।

কারণ, ইতোমধ্যে বর্জ্যরে স্তূপ থেকে ব্যবহৃত পিপিই, মাস্ক, ও গ্লাভস সংগ্রহ করে তা পুনরায় বিক্রয় করা হচ্ছে-এমন তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় উঠে এসেছে।

ব্যক্তি সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি অতি দ্রুত সারা দেশে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাগুলোকে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঢেলে সাজাতে হবে। ধরনভেদে প্রতিটি বর্জ্য আলাদা আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং ও ধ্বংস করার ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ অধিদফতরের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে নাগরিক সমাজ, গবেষক এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের যুক্ত করে একটি ‘সংক্রামক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মনিটরিং সেল’ গঠন করা যেতে পারে। এ ছাড়া ‘চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা-২০০৮’ এবং ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮’ সংশোধন, পরিমার্জন ও পুনর্মূল্যায়ন এবং বিদ্যমান নীতিমালার যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে যত্রতত্র বর্জ্য নিক্ষেপবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এখন কথা হচ্ছে, মানুষ সচেতন হলেই অথবা এসব বর্জ্য আলাদা করে রাখলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে কি না। কারণ, যারা এ বর্জ্য নেবেন তাদের জন্য এগুলো আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সব কর্মীকে সংক্রামক বর্জ্য সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। রাস্তাঘাটে হলুদ কিংবা লাল রঙের নির্দিষ্ট বিন স্থাপন করা প্রয়োজন যা শুধু করোনা বর্জ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। করোনা বর্জ্য সংগ্রহ করতে ঢাকনা দেয়া বাক্স প্রয়োজন এবং বর্জ্য পরিবহনে করোনা বর্জ্যরে আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন; যা অবশ্যই ঢাকনাযুক্ত হতে হবে। অপসারণস্থলে করোনা বর্জ্য ফেলে দেয়ার পর ব্যবহৃত গাড়িটিতে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।

ডিসপোজেবল মাস্ক, পিপিই, ক্যাপ, শুকভার, কাপড়ের তৈরি মাস্কসহ অন্যান্য করোনা বর্জ্য গভীর মাটিতে চাপা দিতে হবে।

এ ছাড়া যে বিপুল পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলো কালার কোড অনুযায়ী পৃথকীকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন, মজুদ ও বিনষ্টকরণের আগে অটোক্লেভস মেশিনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করে বায়োসেফটিক্যাল ব্যাগে ভরে রাখতে হবে ও পরে এসব বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ফেলতে হবে। করোনা বর্জ্য এবং হাসপাতালের সব ধরনের বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ডিসপোজ করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার।

বর্তমান গাইডলাইন অনুযায়ী করোনা চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নার্স, ওয়ার্ডবয়, খাবার পরিবেশনকারী, ওষুধ বিক্রয়কর্মী, রেস্তোরাঁকর্মী ছাড়া অন্য কারও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহারের দরকার নেই। সাবান দিয়ে ঠিকঠাক হাত ধোয়াই যথেষ্ট। বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বের অন্যতম পোশাক রফতানিকারক দেশ, তাই আমরা আশা রাখতেই পারি, অনেক কারখানা হয়তো চাইলেই দেশের ১৭ কোটি মানুষের ব্যবহারের জন্য কাপড়ের মাস্ক উৎপাদন করতে পারবে। আর তা স্বল্পমূল্যে বাজারে ছাড়লে বিপুল চাহিদা থাকায় তারা লাভবান হবে এবং মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এমনকি বিদেশে রফতানির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য বাসাবাড়ি থেকে পৃথকভাবে সংগ্রহ করতে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন পচনশীল পলিথিন ব্যাগ নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল; কিন্তু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এখনও সেই ব্যাগের সংস্থান পুরোপুরি করতে পারেনি। যদিও বাংলাদেশে বর্তমানে এ ব্যাগগুলো পরীক্ষামূলকভাবে দৈনিক ২ হাজার করে উৎপাদন করা হচ্ছে।

বেসরকারিভাবে সোনালি ব্যাগ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভেস্তে যাওয়ার পথে সংক্রামক বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা; কিন্তু এ ক্রান্তিকালের দুর্ভোগ মেটাতে সরকারি জোর প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাগুলোকে একত্রিত করে যদি সীমিত পরিসরেও শুধু করোনা বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে আমাদের অন্যতম আবিষ্কার সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও সরবরাহ ত্বরান্বিত করা যায়, তাহলে আমরা পরিবেশ রক্ষায় এক বিপ্লবের সূচনা করতে সক্ষম হব। তাই আশা রাখা যায়, প্রয়োজন থেকেই আমাদের পাথেয় সৃষ্টি হবে।

সুতরাং সামগ্রিক সচেতনতা, সবার আন্তরিকতা-সহযোগিতা এবং দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নই হতে পারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও করোনা প্রতিরোধে আমাদের সফলতার মূল প্রয়াস।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : প্রফেসর, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

তামান্না মাসতুরা : প্রকল্প ইন্টার্ন ও এমএস গবেষক, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

করোনা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চাই সামগ্রিক প্রয়াস

 ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও তামান্না মাসতুরা 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের জেলা শহর কুষ্টিয়ায় বসবাস করছেন জনাব করিম। পরিবেশ সচেতন মানুষটি এ করোনাকালীন একদিন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখতে পান- রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে ব্যবহৃত মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভসের ছড়াছড়ি!
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের জেলা শহর কুষ্টিয়ায় বসবাস করছেন জনাব করিম। পরিবেশ সচেতন মানুষটি এ করোনাকালীন একদিন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখতে পান- রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে ব্যবহৃত মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভসের ছড়াছড়ি!

যেন চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটের মতোই সব মাস্ক-গ্লাভস ব্যবহার করে ফেলে দিয়ে গেছেন সমাজের কতিপয় মানুষ! কৌতূহলবশত তিনি সেসব মাস্ক-গ্লাভস কুড়াতে শুরু করেন।

নিজের সুরক্ষা মেনে টানা তিন ঘণ্টা দশ কিলোমিটার হেঁটে তিনি ১২৫টি ব্যবহৃত মাস্ক আর ডজন দুয়েক ব্যবহৃত হ্যান্ড গ্লাভস সংগ্রহ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার এ অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

এত গেল এক জেলা শহরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার সংগ্রহ নমুনা। করোনা মহামারীতে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ এড়াতে হেডকাভার, গগলস, ফেসশিল্ড ও পিপিইসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় গত প্রায় ৫ মাসে সারা দেশে এরূপ ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যরে পরিমাণ ঠিক কী পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তা অতি সহজে অনুমেয় নয়।

তিনটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে পরিচালনা করা একটি সমীক্ষার মতে, শুধু ঢাকা মহানগরে গড়ে প্রতিদিন ২০৬.২১ টন করোনা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে; যা মাস শেষে প্রায় ৬ হাজার ১৮৬ দশমিক ৫১ টনে দাঁড়াচ্ছে।

করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রীর একটি বড় অংশ মানুষ রাস্তাঘাটে উন্মুক্ত জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। অথচ তারা ভাবছে না এসব বর্জ্যরে মাধ্যমে পথচারীরাও সংক্রমিত হতে পারেন। ৪৯ শতাংশের বেশি নগরবাসী অন্যান্য গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গেই তাদের ব্যবহৃত করোনা বর্জ্য রাখছে এবং তা সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করছে।

ওইসব বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে মিশে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কেউ কেউ বাড়িতে আলাদাভাবে এ করোনা বর্জ্য রাখলেও বর্জ্য সংগ্রহকারীরা তা অন্যান্য বর্জ্যরে সঙ্গেই পরিবহন ও ডাম্পিং করছে; সঙ্গে রয়েছে হাসপাতালগুলোর বিপুল পরিমাণের চিকিৎসা বর্জ্য। ফলে এসব বর্জ্য থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত, করোনা বর্জ্য মূলত ‘সংক্রামক বর্জ্য’। যদি বর্জ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে সংগ্রহকারীর সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

অপরদিকে করোনা সুরক্ষাসামগ্রী প্লাস্টিকের তৈরি যা একবারই ব্যবহারযোগ্য। এসব পণ্য ভূমিতে বা পানিতে ৪৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এসব বর্জ্য সামগ্রীর মাধ্যমে আমাদের ভূমি, জলাভূমি, নদী, সমুদ্র ও পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির জরিপ বলছে, প্রতিদিন প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। পরিমাণের দিক থেকে এটি বিশ্বে পঞ্চম। পরিবেশবিদরা বলছেন, এসব বর্জ্যরে নদী ও সাগরে যাওয়া বন্ধে দ্রুত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিতে হবে, তা না হলে বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।

এসব পলিথিন ও প্লাস্টিকসামগ্রী ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায়ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আবার এ বর্জ্যগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর পরিবেশের মারাত্মক সমস্যা দেখা দেবে। তাছাড়া সাধারণ বর্জ্যরে মতো যখন করোনা বর্জ্য উন্মুক্তভাবে পোড়ানো হয় তখন ঘটছে মারাত্মক বায়ুদূষণ।

এমন বাস্তবতায় পলিথিনের বিকল্প হিসেবে জৈব পচনশীল পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর।

একবিংশ শতাব্দীর ‘জলবায়ু রক্ষা’, ‘পরিবেশ বাঁচাও’, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত কর’, এরূপ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে ‘কোভিড-১৯’ আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ, যেখানে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে জীবন রক্ষায় ‘স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা’ ও পরিবেশ রক্ষায় ‘সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস নির্মূলের কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত মাস্কসহ অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী মানুষকে ব্যবহার করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নেয়া পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকরী, সেটাও ভাবনার বিষয়।

সমাধান খুঁজে পেতে আমরা সম্ভাব্য যেসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারি, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে- মানুষকে আরও ব্যাপকভাবে সচেতন করা, যেন তারা ব্যবহৃত মাস্ক বা করোনাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে বা আলাদা করে রাখে।

এ জন্য করোনাসহ বিভিন্ন সংক্রামক বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বাসাবাড়ির বর্জ্যকে সাধারণ বর্জ্য ও করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য-এ দুই ভাগে ভাগ করতে হবে।

করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী আলাদা একটি ব্যাগে ভরে জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে। অথবা ব্যবহারের পর বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী একটি পেপার ব্যাগে রেখে বা সামান্য পুড়িয়ে দিয়ে একটি ময়লা ফেলার ব্যাগে ফেলা উচিত, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফেলে দেয়া সামগ্রী পরিষ্কার করে আবার বাজারে বিক্রি করতে না পারে।

কারণ, ইতোমধ্যে বর্জ্যরে স্তূপ থেকে ব্যবহৃত পিপিই, মাস্ক, ও গ্লাভস সংগ্রহ করে তা পুনরায় বিক্রয় করা হচ্ছে-এমন তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় উঠে এসেছে।

ব্যক্তি সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি অতি দ্রুত সারা দেশে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাগুলোকে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঢেলে সাজাতে হবে। ধরনভেদে প্রতিটি বর্জ্য আলাদা আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং ও ধ্বংস করার ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ অধিদফতরের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে নাগরিক সমাজ, গবেষক এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের যুক্ত করে একটি ‘সংক্রামক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মনিটরিং সেল’ গঠন করা যেতে পারে। এ ছাড়া ‘চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা-২০০৮’ এবং ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮’ সংশোধন, পরিমার্জন ও পুনর্মূল্যায়ন এবং বিদ্যমান নীতিমালার যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে যত্রতত্র বর্জ্য নিক্ষেপবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এখন কথা হচ্ছে, মানুষ সচেতন হলেই অথবা এসব বর্জ্য আলাদা করে রাখলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে কি না। কারণ, যারা এ বর্জ্য নেবেন তাদের জন্য এগুলো আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সব কর্মীকে সংক্রামক বর্জ্য সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। রাস্তাঘাটে হলুদ কিংবা লাল রঙের নির্দিষ্ট বিন স্থাপন করা প্রয়োজন যা শুধু করোনা বর্জ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। করোনা বর্জ্য সংগ্রহ করতে ঢাকনা দেয়া বাক্স প্রয়োজন এবং বর্জ্য পরিবহনে করোনা বর্জ্যরে আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন; যা অবশ্যই ঢাকনাযুক্ত হতে হবে। অপসারণস্থলে করোনা বর্জ্য ফেলে দেয়ার পর ব্যবহৃত গাড়িটিতে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।

ডিসপোজেবল মাস্ক, পিপিই, ক্যাপ, শুকভার, কাপড়ের তৈরি মাস্কসহ অন্যান্য করোনা বর্জ্য গভীর মাটিতে চাপা দিতে হবে।

এ ছাড়া যে বিপুল পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলো কালার কোড অনুযায়ী পৃথকীকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন, মজুদ ও বিনষ্টকরণের আগে অটোক্লেভস মেশিনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করে বায়োসেফটিক্যাল ব্যাগে ভরে রাখতে হবে ও পরে এসব বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ফেলতে হবে। করোনা বর্জ্য এবং হাসপাতালের সব ধরনের বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ডিসপোজ করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার।

বর্তমান গাইডলাইন অনুযায়ী করোনা চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নার্স, ওয়ার্ডবয়, খাবার পরিবেশনকারী, ওষুধ বিক্রয়কর্মী, রেস্তোরাঁকর্মী ছাড়া অন্য কারও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহারের দরকার নেই। সাবান দিয়ে ঠিকঠাক হাত ধোয়াই যথেষ্ট। বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বের অন্যতম পোশাক রফতানিকারক দেশ, তাই আমরা আশা রাখতেই পারি, অনেক কারখানা হয়তো চাইলেই দেশের ১৭ কোটি মানুষের ব্যবহারের জন্য কাপড়ের মাস্ক উৎপাদন করতে পারবে। আর তা স্বল্পমূল্যে বাজারে ছাড়লে বিপুল চাহিদা থাকায় তারা লাভবান হবে এবং মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এমনকি বিদেশে রফতানির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য বাসাবাড়ি থেকে পৃথকভাবে সংগ্রহ করতে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন পচনশীল পলিথিন ব্যাগ নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল; কিন্তু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এখনও সেই ব্যাগের সংস্থান পুরোপুরি করতে পারেনি। যদিও বাংলাদেশে বর্তমানে এ ব্যাগগুলো পরীক্ষামূলকভাবে দৈনিক ২ হাজার করে উৎপাদন করা হচ্ছে।

বেসরকারিভাবে সোনালি ব্যাগ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভেস্তে যাওয়ার পথে সংক্রামক বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা; কিন্তু এ ক্রান্তিকালের দুর্ভোগ মেটাতে সরকারি জোর প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাগুলোকে একত্রিত করে যদি সীমিত পরিসরেও শুধু করোনা বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে আমাদের অন্যতম আবিষ্কার সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও সরবরাহ ত্বরান্বিত করা যায়, তাহলে আমরা পরিবেশ রক্ষায় এক বিপ্লবের সূচনা করতে সক্ষম হব। তাই আশা রাখা যায়, প্রয়োজন থেকেই আমাদের পাথেয় সৃষ্টি হবে।

সুতরাং সামগ্রিক সচেতনতা, সবার আন্তরিকতা-সহযোগিতা এবং দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নই হতে পারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও করোনা প্রতিরোধে আমাদের সফলতার মূল প্রয়াস।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : প্রফেসর, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

তামান্না মাসতুরা : প্রকল্প ইন্টার্ন ও এমএস গবেষক, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়