জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক আর কতদিন?
jugantor
জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক আর কতদিন?

  এম এ খালেক  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সম্প্রতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য জাতীয় অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি প্রকাশ করেছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের শেষ তিন মাস অর্থাৎ মার্চ-জুন সময়টি আমাদের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ছিল না। করোনা মহামারীর আঘাতে বিশ্ব অর্থনীতি আরও আগে থেকেই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে ছিল। আমাদের দেশে করোনার প্রভাব কিছুটা বিলম্বে পড়েছে।

চীনে প্রথম এ ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় গত বছর নভেম্বর মাসে। আর আমাদের দেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় এ বছর ৮ মার্চ। করোনাভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে রাতারাতি দেশের অর্থনীতি এবং মানবিক ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই ঝুঁকিতে ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ সেই অবস্থাকে ত্বরান্বিত করে।

উল্লেখ্য, গত অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুন-ডিসেম্বর ২০১৯) দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সেক্টরই ছিল নেতিবাচক ধারায় প্রবহমান। একমাত্র জনশক্তি রফতানি খাত থেকে আহরিত রেমিটেন্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল। ফলে অর্থনীতিবিদরা জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের ধারায় এক ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার শঙ্কা করছিলেন।

করোনা মহামারী শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবণতার সৃষ্টি করেছে তা নয়, বিশ্বব্যাপী এর সংক্রমণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। চীন ২০২০ সালের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি।

কারণ তারা বুঝতে পারছে না এ সংক্রমণের কারণে অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পর্যটন থেকে শুরু করে সব আর্থিক খাতই করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ-ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ার কারণে বিশ্ব রফতানি কমে গেছে।

বাংলাদেশের মতো যেসব দেশের অর্থনীতি মূলত রফতানি বাণিজ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তারা পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপাকে। স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করেছিলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বাংলাদেশ এ বছর ১ দশমিক ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। আগামী বছর এটি হবে ১ শতাংশ। বিনিয়োগ ও রেমিটেন্স আহরণের পরিমাণও কমে যেতে পারে অস্বাভাবিকভাবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছিল, বাংলাদেশ ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বলেছিল, বাংলাদেশ এ বছর ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তারা আরও বলেছিল, দক্ষিণ এশীয় আর কোনো দেশ বাংলাদেশের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। সম্প্রতি এডিবি বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আশু পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং ২০২১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ আশা করা হচ্ছে।

স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এ বছর কোনোভাবেই ২ দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি হবে না। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, এডিবি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে প্রাক্কলন করেছে তা অতি মাত্রায় উদার।

তারা মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই ৩ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি হবে না। এর বিপরীতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে হিসাব দিয়েছে, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে, তাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এ হিসাব অনেকের কাছেই বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে যেসব খাত প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে তার সব নিম্নমুখী রয়েছে।

একমাত্র রেমিটেন্স আহরণের ক্ষেত্রে এখনও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকারও বেশি রেমিটেন্স আহরিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই ২০২০) মোট ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আহরিত হয়েছে। কোনো একক মাসে এটাই সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আহরণ। এটা নিয়ে অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করছেন।

কিন্তু এটি কেন হয়েছে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? বর্তমানে বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ব্যাপকহারে শ্রমিক ছাঁটাই করছে। অনেকেই ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকেই দেশে ফিরে আসার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছেন। এসব হতভাগা শ্রমিক তাদের সঞ্চিত অর্থ একযোগে দেশে নিয়ে আসছেন বলেই রেমিটেন্স এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, কৃষি খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের বছর এটি ছিল ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। শিল্প খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আগের বছর এটি ছিল ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

সেবা খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। করোনার কারণে দেশের পরিবহন সেক্টর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও এ খাতের অবদান বেড়েছে। বাস-ট্রাক খাতে অবদান বেড়েছে ৪ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। নির্মাণ খাতে অবদান বেড়েছে ৭ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা।

সরকারি খাতের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, যা দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখে, তার হার প্রায় একই স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ৪ বছর ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সার্বিকভাবে বিনিয়োগের হার এখন ৩১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর সরকারি খাতে বিনিয়োগের হার ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। সরকারি খাতে যে বিনিয়োগ হয়েছে এটি এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হলে তা বেশি মাত্রায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু সরকারি খাতের বিনিয়োগ তুলনামূলক কম কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে দুর্নীতির মাত্রা বৃদ্ধি করে। দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ যে খুবই কম হচ্ছে, তা বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকেই প্রতীয়মান হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।

সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনাকালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও তা অর্জিত হয়নি। শিল্পে পুঁজির জোগান দেয়ার জন্য ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হয়। কারণ আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা সবসময়ই পুঁজি স্বল্পতায় ভোগেন। কিন্তু ব্যাংক তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজির জোগান দিতে পারছে না।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ শতাংশ, যদিও এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

গত ১০ বছরের মধ্যে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ এতটা নিচে আর কখনও নামেনি। গত জুন মাসে ব্যক্তি খাতের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ৯৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। আগের বছর এটি ছিল ১০ লাখ ১০ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।

প্রশ্ন হল, প্রতি বছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় কেন? আমরা কি একটি গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান পেশ করতে পারি না? দেখা যায়, পরিসংখ্যান ব্যুরো সরকারের সাফল্যকে বড় করে দেখানোর লক্ষ্যে প্রবৃদ্ধির হিসাব স্ফীত করে দেখায়। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যে কোনো পরিকল্পনার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক তথ্য-উপাত্তের ওপর।

কোনোক্রমেই ভুল বা মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়ে উদ্দেশ্য সাধন করা যায় না। সাময়িক তৃপ্তি লাভ করা যেতে পারে মাত্র। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি দূর করার জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা দিয়ে নিরপেক্ষভাবে পরিসংখ্যান প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের এ দাবি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা যেতে পারে। চলতি অর্থবছরে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি সবচেয়ে কম হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করত, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকত না। তাই এ ক্ষেত্রে আরও উদারতার পরিচয় দেয়া যেত।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক আর কতদিন?

 এম এ খালেক 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সম্প্রতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য জাতীয় অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি প্রকাশ করেছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের শেষ তিন মাস অর্থাৎ মার্চ-জুন সময়টি আমাদের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ছিল না। করোনা মহামারীর আঘাতে বিশ্ব অর্থনীতি আরও আগে থেকেই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে ছিল। আমাদের দেশে করোনার প্রভাব কিছুটা বিলম্বে পড়েছে।

চীনে প্রথম এ ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় গত বছর নভেম্বর মাসে। আর আমাদের দেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় এ বছর ৮ মার্চ। করোনাভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে রাতারাতি দেশের অর্থনীতি এবং মানবিক ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই ঝুঁকিতে ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ সেই অবস্থাকে ত্বরান্বিত করে।

উল্লেখ্য, গত অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুন-ডিসেম্বর ২০১৯) দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সেক্টরই ছিল নেতিবাচক ধারায় প্রবহমান। একমাত্র জনশক্তি রফতানি খাত থেকে আহরিত রেমিটেন্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল। ফলে অর্থনীতিবিদরা জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের ধারায় এক ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার শঙ্কা করছিলেন।

করোনা মহামারী শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবণতার সৃষ্টি করেছে তা নয়, বিশ্বব্যাপী এর সংক্রমণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। চীন ২০২০ সালের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি।

কারণ তারা বুঝতে পারছে না এ সংক্রমণের কারণে অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পর্যটন থেকে শুরু করে সব আর্থিক খাতই করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ-ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ার কারণে বিশ্ব রফতানি কমে গেছে।

বাংলাদেশের মতো যেসব দেশের অর্থনীতি মূলত রফতানি বাণিজ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তারা পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপাকে। স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করেছিলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বাংলাদেশ এ বছর ১ দশমিক ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। আগামী বছর এটি হবে ১ শতাংশ। বিনিয়োগ ও রেমিটেন্স আহরণের পরিমাণও কমে যেতে পারে অস্বাভাবিকভাবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছিল, বাংলাদেশ ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বলেছিল, বাংলাদেশ এ বছর ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তারা আরও বলেছিল, দক্ষিণ এশীয় আর কোনো দেশ বাংলাদেশের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। সম্প্রতি এডিবি বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আশু পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং ২০২১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ আশা করা হচ্ছে।

স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এ বছর কোনোভাবেই ২ দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি হবে না। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, এডিবি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে প্রাক্কলন করেছে তা অতি মাত্রায় উদার।

তারা মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই ৩ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি হবে না। এর বিপরীতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে হিসাব দিয়েছে, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে, তাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এ হিসাব অনেকের কাছেই বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে যেসব খাত প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে তার সব নিম্নমুখী রয়েছে।

একমাত্র রেমিটেন্স আহরণের ক্ষেত্রে এখনও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকারও বেশি রেমিটেন্স আহরিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই ২০২০) মোট ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আহরিত হয়েছে। কোনো একক মাসে এটাই সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আহরণ। এটা নিয়ে অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করছেন।

কিন্তু এটি কেন হয়েছে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? বর্তমানে বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ব্যাপকহারে শ্রমিক ছাঁটাই করছে। অনেকেই ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকেই দেশে ফিরে আসার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছেন। এসব হতভাগা শ্রমিক তাদের সঞ্চিত অর্থ একযোগে দেশে নিয়ে আসছেন বলেই রেমিটেন্স এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, কৃষি খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের বছর এটি ছিল ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। শিল্প খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আগের বছর এটি ছিল ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

সেবা খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। করোনার কারণে দেশের পরিবহন সেক্টর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও এ খাতের অবদান বেড়েছে। বাস-ট্রাক খাতে অবদান বেড়েছে ৪ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। নির্মাণ খাতে অবদান বেড়েছে ৭ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা।

সরকারি খাতের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, যা দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখে, তার হার প্রায় একই স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ৪ বছর ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সার্বিকভাবে বিনিয়োগের হার এখন ৩১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর সরকারি খাতে বিনিয়োগের হার ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। সরকারি খাতে যে বিনিয়োগ হয়েছে এটি এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হলে তা বেশি মাত্রায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু সরকারি খাতের বিনিয়োগ তুলনামূলক কম কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে দুর্নীতির মাত্রা বৃদ্ধি করে। দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ যে খুবই কম হচ্ছে, তা বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকেই প্রতীয়মান হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।

সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনাকালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও তা অর্জিত হয়নি। শিল্পে পুঁজির জোগান দেয়ার জন্য ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হয়। কারণ আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা সবসময়ই পুঁজি স্বল্পতায় ভোগেন। কিন্তু ব্যাংক তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজির জোগান দিতে পারছে না।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ শতাংশ, যদিও এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

গত ১০ বছরের মধ্যে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহ এতটা নিচে আর কখনও নামেনি। গত জুন মাসে ব্যক্তি খাতের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ৯৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। আগের বছর এটি ছিল ১০ লাখ ১০ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।

প্রশ্ন হল, প্রতি বছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় কেন? আমরা কি একটি গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান পেশ করতে পারি না? দেখা যায়, পরিসংখ্যান ব্যুরো সরকারের সাফল্যকে বড় করে দেখানোর লক্ষ্যে প্রবৃদ্ধির হিসাব স্ফীত করে দেখায়। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, যে কোনো পরিকল্পনার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক তথ্য-উপাত্তের ওপর।

কোনোক্রমেই ভুল বা মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়ে উদ্দেশ্য সাধন করা যায় না। সাময়িক তৃপ্তি লাভ করা যেতে পারে মাত্র। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি দূর করার জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা দিয়ে নিরপেক্ষভাবে পরিসংখ্যান প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের এ দাবি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা যেতে পারে। চলতি অর্থবছরে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি সবচেয়ে কম হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করত, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকত না। তাই এ ক্ষেত্রে আরও উদারতার পরিচয় দেয়া যেত।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক