স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফার্মাসিস্টদের অবদানের মূল্যায়ন হোক
jugantor
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফার্মাসিস্টদের অবদানের মূল্যায়ন হোক

  মো. শামীম আলম খান  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বেই দিবসটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে।

শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। যারা কোনো সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে বি ফার্ম (ব্যাচেলর অব ফার্মেসি) পাস করে থাকেন, তাদের বলা হয় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বা এ-গ্রেড ফার্মাসিস্ট।

এসব ফার্মাসিস্টের ফার্মেসি কাউন্সিল অফ বাংলাদেশ থেকে এ-গ্রেড ফার্মাসিস্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেয়া হয়ে থাকে, যা পরবর্তী কর্মজীবনে দরকার হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে থাকে।

এবার আসি বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস সম্পর্কে। সারা বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ/ফ্যাকাল্টি, ফার্মাসিস্টদের অঙ্গ-সংগঠন, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিসহ ওষুধ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালন করে থাকে।

করোনা মহামারীর কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দিবসটি ভিন্নভাবে পালিত হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব মাথায় রেখে দিবসসংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ড ভার্চুয়ালি সম্পন্ন করা হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশনের (এফআইপি) উদ্যোগে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত তুরস্কের ইস্তান্বুলের একটি সম্মেলনে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো, ২৫ সেপ্টেম্বর এফআইপির জন্মদিন, যে সংগঠনটি ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেজন্য ২৫ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ১০ম বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস।

এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘Transforming Global Health’- বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দাও। এ লক্ষ্যে সারা বিশ্বে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কাজ করে যাচ্ছেন। এফআইপির প্রেসিডেন্ট ডোমিনিক জর্ডান বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য নিরাপদ, কার্যকরী, মানসম্পন্ন ও সহজলভ্য ওষুধ সারা বিশ্বের প্রত্যেকের কাছে পৌঁছাতে ফার্মাসিস্টদের অবদান সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।’

আমার সুযোগ হয়েছিল এফআইপির একজন সদস্য হিসেবে ২০১১ সালে ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত এ ফেডারেশনের ৭১তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার।

সারা বিশ্বের সহস্রাধিক গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, যারা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিভিন্ন শাখা যেমন- প্রডাকশন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স, প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, রেগুলেটরি অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরঅ্যান্ডডি), ওষুধ বিক্রয় ও বিপণনে কর্মরত, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ওষুধ বিজ্ঞানী, ওষুধ প্রশাসনে কর্মরত রিটেল গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এবং হসপিটাল ফার্মাসিস্টসহ আরও অনেকের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল সম্মেলনটি।

প্রত্যেকে তাদের গবেষণালব্ধ বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাদের ভেতর নতুন ড্রাগ ডেভেলপমেন্টের উপস্থাপনগুলো বৈশ্বিক স্বাস্থ্যরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর এফআইপি একাধিকবার এ ধরনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।

এসব বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে জানা যাবে সারা বিশ্বের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা Comprehensive Health Service অর্থাৎ একটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা বলতে যা বোঝায়, সেক্ষেত্রে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন।

উন্নত বিশ্বে এসব গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এমবিবিএস ডাক্তারের পাশাপাশি রোগীর স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ওষুধ সম্পর্কিত উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অনেকে নিশ্চয়ই জানেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনা থেকে মুক্তিলাভের পর করোনাকালীন তিনি যাদের সেবা, উপদেশ ও সহযোগিতায় আরোগ্য লাভ করেছেন, তাদের কথা বলতে গিয়ে তিনি ফার্মাসিস্টদের কথাও উল্লেখ করেছেন।

এবার দেখা যাক এ করোনাকালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে ভূমিকা রাখছে। সবাই জানেন, আমাদের দেশে মার্চের দিকে যখন করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায় এবং মার্চ-এপ্রিলের দিকে লকডাউন দেয়া হয় তখন বেশিরভাগ অফিস ও কারখানা বন্ধ থাকলেও ওষুধ উৎপাদন এবং বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থা চালু ছিল।

এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সত্যিকার অর্থে মানুষের প্রতি, করোনা ও অন্যান্য রোগীর প্রতি সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে।

আমাদের দেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা মুখে মাস্ক বেঁধে নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে শুধু রোগীরা যাতে তাদের কাঙ্ক্ষিত ওষুধ প্রয়োজনমতো বাসার সামনের ওষুধের দোকান থেকে পান- এ উদ্দেশ্যে এর উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলে গেছেন নিজ নিজ ওষুধ কারখানায়, ঢাকা থেকে টঙ্গী, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, এমনকি নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত, যেখানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি।

যখনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান থেকে করোনা রোগীর চিকিৎসায় নতুন ওষুধের কথা বলা হচ্ছে, তখনই আমাদের দেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা যত দ্রুত সম্ভব প্রস্তুত করে তার সরবরাহ নিশ্চিত করছেন।

অনেকেই আইভারম্যাকটিন, হাইড্রোক্সিল ক্লোরোকুইন বা ডক্সিসাইক্লিন ইত্যাদি ওষুধের কথা জানেন। এ ওষুধগুলো খুবই পুরনো; কিন্তু নির্দেশনা আসায় করোনা চিকিৎসায় নতুন করে ব্যবহৃত হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু একটি কথা না বললেই নয়, অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ যেমন- রেমডিসিভির, ফেভিপিরাভিরের মতো ওষুধের অল্প সময়ে উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করেছেন দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

শুনেছি, রেমডিসিভির আমাদের দেশে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও করোনা রোগীর চিকিৎসায় রফতানি হচ্ছে। রফতানি কথাটি আসাতে একটি কথা শেয়ার করতে চাচ্ছি। করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বে লকডাউন ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রফতানি আয় কমে গেছে।

ওষুধ শিল্পও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০১৯-২০ সালে বাংলাদেশের ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার ২৩ হাজার কোটি টাকার উপরে এবং ২০১৮-১৯ সালে রফতানির পরিমাণ ছিল ১৩০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। আমাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধ এখন ১৪৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে। আর এ ওষুধের গুণগত মান ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

গত সপ্তাহে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ভার্চুয়াল মিটিংয়ে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে জানতে পারি, করোনাকালীন রফতানির জন্য যেসব পণ্য রয়েছে, তার মধ্যে ওষুধশিল্পই আছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় এবং ওই মিটিংয়ে ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মেধা, শ্রম ও দক্ষতাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হিসেবে বিষয়টি আমার জন্য সত্যিই আনন্দের। উল্লেখ্য, গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টনির্ভর এ শিল্প খাত দেশের ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ রফতানিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শেষ করার আগে হসপিটাল গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা নিয়ে কিছু বলতে চাই। আমাদের দেশে বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালে ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ বা ‘ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট’ কর্মরত আছেন। আসলে উন্নত দেশগুলোতে এটি নতুন নয়, যুক্তরাজ্যের কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এসব গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট তাদের ফার্মাকোলজিক্যাল, টক্সিকোলোজিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি, বায়োফার্মাসিটিকস্ সমৃদ্ধ জ্ঞান তাদের বি ফার্ম/এম ফার্ম ক্লাসে শিখে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে ইন্টার্নি/ইনপ্যাল্ট ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে রোগীর স্বাস্থ্যসেবায় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। রোগীর ওষুধবিষয়ক জিজ্ঞাসা যেমন ডোজ বা মাত্রা, মাত্রার সমন্বয়, ওষুধ সেবনের নিয়মাবলি, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ ওষুধের যাবতীয় নির্দেশাবলি রোগীকে দিয়ে থাকেন।

সরকারি হাসপাতালগুলোতেও যদি গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে আমাদের দেশের সর্বস্তরের রোগীদের জন্য পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার এক বিশেষ দিক উন্মোচিত হবে। আশা করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক নীতিনির্ধারকরা গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন।

আজ বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে একটি কথাই বলতে চাই- বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা ছড়িয়ে দিতে এবং একটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের জ্ঞান, শিক্ষা ও দক্ষতা এ দেশের ওষুধশিল্প খাতকে যেমন উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাবে, তেমনি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। আর এটাই হচ্ছে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

মো. শামীম আলম খান : গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক কনসালটেন্ট

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফার্মাসিস্টদের অবদানের মূল্যায়ন হোক

 মো. শামীম আলম খান 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বেই দিবসটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে।

শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। যারা কোনো সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে বি ফার্ম (ব্যাচেলর অব ফার্মেসি) পাস করে থাকেন, তাদের বলা হয় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বা এ-গ্রেড ফার্মাসিস্ট।

এসব ফার্মাসিস্টের ফার্মেসি কাউন্সিল অফ বাংলাদেশ থেকে এ-গ্রেড ফার্মাসিস্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেয়া হয়ে থাকে, যা পরবর্তী কর্মজীবনে দরকার হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে থাকে।

এবার আসি বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস সম্পর্কে। সারা বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ/ফ্যাকাল্টি, ফার্মাসিস্টদের অঙ্গ-সংগঠন, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিসহ ওষুধ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালন করে থাকে।

করোনা মহামারীর কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দিবসটি ভিন্নভাবে পালিত হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব মাথায় রেখে দিবসসংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ড ভার্চুয়ালি সম্পন্ন করা হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশনের (এফআইপি) উদ্যোগে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত তুরস্কের ইস্তান্বুলের একটি সম্মেলনে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো, ২৫ সেপ্টেম্বর এফআইপির জন্মদিন, যে সংগঠনটি ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেজন্য ২৫ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ১০ম বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস।

এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘Transforming Global Health’- বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দাও। এ লক্ষ্যে সারা বিশ্বে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কাজ করে যাচ্ছেন। এফআইপির প্রেসিডেন্ট ডোমিনিক জর্ডান বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য নিরাপদ, কার্যকরী, মানসম্পন্ন ও সহজলভ্য ওষুধ সারা বিশ্বের প্রত্যেকের কাছে পৌঁছাতে ফার্মাসিস্টদের অবদান সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।’

আমার সুযোগ হয়েছিল এফআইপির একজন সদস্য হিসেবে ২০১১ সালে ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত এ ফেডারেশনের ৭১তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার।

সারা বিশ্বের সহস্রাধিক গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, যারা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিভিন্ন শাখা যেমন- প্রডাকশন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স, প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, রেগুলেটরি অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরঅ্যান্ডডি), ওষুধ বিক্রয় ও বিপণনে কর্মরত, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ওষুধ বিজ্ঞানী, ওষুধ প্রশাসনে কর্মরত রিটেল গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এবং হসপিটাল ফার্মাসিস্টসহ আরও অনেকের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল সম্মেলনটি।

প্রত্যেকে তাদের গবেষণালব্ধ বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাদের ভেতর নতুন ড্রাগ ডেভেলপমেন্টের উপস্থাপনগুলো বৈশ্বিক স্বাস্থ্যরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর এফআইপি একাধিকবার এ ধরনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।

এসব বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে জানা যাবে সারা বিশ্বের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা Comprehensive Health Service অর্থাৎ একটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা বলতে যা বোঝায়, সেক্ষেত্রে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন।

উন্নত বিশ্বে এসব গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এমবিবিএস ডাক্তারের পাশাপাশি রোগীর স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ওষুধ সম্পর্কিত উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অনেকে নিশ্চয়ই জানেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনা থেকে মুক্তিলাভের পর করোনাকালীন তিনি যাদের সেবা, উপদেশ ও সহযোগিতায় আরোগ্য লাভ করেছেন, তাদের কথা বলতে গিয়ে তিনি ফার্মাসিস্টদের কথাও উল্লেখ করেছেন।

এবার দেখা যাক এ করোনাকালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে ভূমিকা রাখছে। সবাই জানেন, আমাদের দেশে মার্চের দিকে যখন করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায় এবং মার্চ-এপ্রিলের দিকে লকডাউন দেয়া হয় তখন বেশিরভাগ অফিস ও কারখানা বন্ধ থাকলেও ওষুধ উৎপাদন এবং বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থা চালু ছিল।

এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সত্যিকার অর্থে মানুষের প্রতি, করোনা ও অন্যান্য রোগীর প্রতি সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে।

আমাদের দেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা মুখে মাস্ক বেঁধে নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে শুধু রোগীরা যাতে তাদের কাঙ্ক্ষিত ওষুধ প্রয়োজনমতো বাসার সামনের ওষুধের দোকান থেকে পান- এ উদ্দেশ্যে এর উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলে গেছেন নিজ নিজ ওষুধ কারখানায়, ঢাকা থেকে টঙ্গী, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, এমনকি নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত, যেখানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি।

যখনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান থেকে করোনা রোগীর চিকিৎসায় নতুন ওষুধের কথা বলা হচ্ছে, তখনই আমাদের দেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা যত দ্রুত সম্ভব প্রস্তুত করে তার সরবরাহ নিশ্চিত করছেন।

অনেকেই আইভারম্যাকটিন, হাইড্রোক্সিল ক্লোরোকুইন বা ডক্সিসাইক্লিন ইত্যাদি ওষুধের কথা জানেন। এ ওষুধগুলো খুবই পুরনো; কিন্তু নির্দেশনা আসায় করোনা চিকিৎসায় নতুন করে ব্যবহৃত হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু একটি কথা না বললেই নয়, অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ যেমন- রেমডিসিভির, ফেভিপিরাভিরের মতো ওষুধের অল্প সময়ে উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করেছেন দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

শুনেছি, রেমডিসিভির আমাদের দেশে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও করোনা রোগীর চিকিৎসায় রফতানি হচ্ছে। রফতানি কথাটি আসাতে একটি কথা শেয়ার করতে চাচ্ছি। করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বে লকডাউন ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রফতানি আয় কমে গেছে।

ওষুধ শিল্পও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০১৯-২০ সালে বাংলাদেশের ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার ২৩ হাজার কোটি টাকার উপরে এবং ২০১৮-১৯ সালে রফতানির পরিমাণ ছিল ১৩০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। আমাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধ এখন ১৪৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে। আর এ ওষুধের গুণগত মান ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

গত সপ্তাহে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ভার্চুয়াল মিটিংয়ে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে জানতে পারি, করোনাকালীন রফতানির জন্য যেসব পণ্য রয়েছে, তার মধ্যে ওষুধশিল্পই আছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় এবং ওই মিটিংয়ে ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মেধা, শ্রম ও দক্ষতাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হিসেবে বিষয়টি আমার জন্য সত্যিই আনন্দের। উল্লেখ্য, গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টনির্ভর এ শিল্প খাত দেশের ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ রফতানিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শেষ করার আগে হসপিটাল গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা নিয়ে কিছু বলতে চাই। আমাদের দেশে বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালে ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ বা ‘ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট’ কর্মরত আছেন। আসলে উন্নত দেশগুলোতে এটি নতুন নয়, যুক্তরাজ্যের কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এসব গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট তাদের ফার্মাকোলজিক্যাল, টক্সিকোলোজিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি, বায়োফার্মাসিটিকস্ সমৃদ্ধ জ্ঞান তাদের বি ফার্ম/এম ফার্ম ক্লাসে শিখে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে ইন্টার্নি/ইনপ্যাল্ট ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে রোগীর স্বাস্থ্যসেবায় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। রোগীর ওষুধবিষয়ক জিজ্ঞাসা যেমন ডোজ বা মাত্রা, মাত্রার সমন্বয়, ওষুধ সেবনের নিয়মাবলি, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ ওষুধের যাবতীয় নির্দেশাবলি রোগীকে দিয়ে থাকেন।

সরকারি হাসপাতালগুলোতেও যদি গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে আমাদের দেশের সর্বস্তরের রোগীদের জন্য পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার এক বিশেষ দিক উন্মোচিত হবে। আশা করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক নীতিনির্ধারকরা গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন।

আজ বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে একটি কথাই বলতে চাই- বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা ছড়িয়ে দিতে এবং একটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের জ্ঞান, শিক্ষা ও দক্ষতা এ দেশের ওষুধশিল্প খাতকে যেমন উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাবে, তেমনি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। আর এটাই হচ্ছে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

মো. শামীম আলম খান : গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক কনসালটেন্ট