রোহিঙ্গা সংকটের নিষ্পত্তি হবে কবে?
jugantor
রোহিঙ্গা সংকটের নিষ্পত্তি হবে কবে?

  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মো. শামসুদ্দীন  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা

মিয়ানমারে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সেনা অভিযান এবং রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে পালিয়ে আসা আরও ৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। এই বিশাল নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা ঠিক হয়েছিল। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রস্তুত ছিল; কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে ঘোষণা দেয়ায় প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। এর প্রায় এক বছর পর ২২ আগস্ট ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুতি নেয়। মিয়ানমার ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এ উদ্যোগও সফলতার মুখ দেখেনি। এ সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রমাণ করতে হবে তারা রাখাইনের বাসিন্দা ছিল। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পক্ষে এটা প্রমাণ করা কঠিন; কারণ বহু বছর তারা নাগরিক অধিকারবঞ্চিত ছিল। যেসব রোহিঙ্গার কোনো না কোনো সনদ ছিল, তাদের নতুন নাগরিকত্ব সনদ দেয়ার কথা বলা হলেও কখনও তা দেয়া হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার ছাড়া মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী নয়। এসব দাবি পূরণে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোনো প্রচেষ্টা নেয়নি। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা তৃতীয় বছরে পদার্পণ করল।

২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গণহত্যার অপরাধ, প্রতিরোধ ও সাজাবিষয়ক সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে গাম্বিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির চলমান নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে গাম্বিয়ার মামলার প্রেক্ষিতে আইসিজে ২৩ জানুয়ারি ২০২০ একটি জরুরি ‘সাময়িক পদক্ষেপ’ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এ আদেশ জারির দিন থেকে চার মাসের মধ্যে মিয়ানমার আদালতের আদেশ অনুযায়ী যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, সেগুলো আদালতকে জানানো এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস পরপর এ বিষয়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ ছিল। গণহত্যা সনদ মেনে চলা এবং রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সব সহিংসতার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণের জন্য মিয়ানমার সরকার ৮ এপ্রিল ২০২০ তারিখে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে দুটো আলাদা আদেশে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার গত মে মাসের শেষে আইসিজেকে প্রথমবারের মতো প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার এ দূরদর্শী দিকনির্দেশনার বাস্তবায়নেই একমাত্র রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব। রোহিঙ্গা সমস্যা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করার জন্য ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের পর সারা বিশ্ব থেকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাদের পাঠানো প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছে এবং আসছে।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং দেশি এনজিওগুলো নানা বিষয় নিয়ে এ পরিস্থিতিতে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ এ সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। অনেক দেশ এ অমানবিক আক্রমণ এবং নৃশংসতাকে নিন্দা করেছে এবং নৃশংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য অনেকে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে। কিছু কিছু দেশ জাতিসংঘকে তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। অনেক দেশ রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে।

কিছু কিছু দেশ মিয়ানমারে সমস্যাসংকুল এলাকায় মানবিক সাহায্য পাঠানোর জন্য অনুমতির চেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। কয়েকটা দেশ একটা স্থায়ী সমাধানের জন্য রেজুলিউশন বানানোর ব্যাপারে জোরালো সমর্থন দিয়েছে। কেউ কেউ মানবতার বিরুদ্ধে অবরোধ এবং গণহত্যার কথা জানিয়ে তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। অনেক দেশ কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য তাদের জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে। অনেক দেশ এ সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মত পোষণ করেছে।

বর্তমানে সারা বিশ্ব রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে অবহিত। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানবতার জননী সারা বিশ্বকে এ নৃশংস ঘটনা জানানোর ব্যাপারে কূটনৈতিক ও মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি এ সমস্যার সমাধানে তার প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ, দাতা সংস্থা, আঞ্চলিক দেশগুলো- সবাই এ সমস্যার ব্যাপারে ভালোভাবে অবহিত; তবে সমাধানের ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে না এবং বাংলাদেশ এখনও এ সমস্যা নিয়ে চলছে।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিকিয়াং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সে সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের ভূমিকার কথা প্রথমবারের মতো এসেছে, যা একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য। সেখানে রোহিঙ্গা শব্দটি উহ্য রেখে বলা হয়েছে ‘মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী’। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে যাওয়ার কথা বলেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক উ জিং হাউ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, চীন মিয়ানমারকে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে বলেছে।

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো আগস্ট ২০১৭-এর পর তিনবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। তিনি নেপিডোতে অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করে এ সমস্যা সমাধানে যা কিছু সম্ভব তার সবই করার আশ্বাস দিয়েছেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী, তবে তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে হবে।

রাখাইনে তাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার ও সংবাদকর্মীদের অবারিতভাবে চলাফেরার সুযোগ দিয়ে সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নিরাপদে স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারকে বারবার বলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারত মিয়ানমারের ওপর চাপ দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গা ও অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষমূলক উত্তেজনা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয় ১৩৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দেয় ৯টি দেশ। আর ২৮টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।

মিয়ানমারের রাজনীতিতে অং সান সু চি এখনও বৌদ্ধভিক্ষু এবং সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ করতে সমর্থ হননি। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ (২০২০) পর্যন্ত মিয়ানমার পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের বেশকিছু প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ১৪৯ জন সদস্য এ বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। প্রধান প্রধান সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ছিল পার্লামেন্ট থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কোটা অপসারণ, সংবিধান সংশোধনে তাদের ভেটো ক্ষমতা রদ, যে কোনো সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদনে ৭৫ শতাংশ পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থনের নিয়মকে দুই-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা ইত্যাদি। বিতর্ক শেষে ভোটাভুটি শুরু হয়। ১০ মার্চ ২০২০ থেকে তা শুরু হয় এবং কয়েকদিন ধরে এ ভোট চলে। ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় সব সংস্কার প্রস্তাবই একে একে পার্লামেন্টে বাতিল হয়ে যায়।

২০২০ সালের পার্লামেন্টের ভোটাভুটির ফলাফল ছিল মিয়ানমারের ছোট জাতিসত্তাগুলোর জন্য একটা বড় ধাক্কা। এসব জাতিসত্তা মিয়ানমারের জন্য এমন এক সংবিধান চাইছে, যেখানে দেশটি সত্যিকারের এক ইউনিয়ন হয়ে উঠবে; কিন্তু এর বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না, কারণ পার্লামেন্টে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ আসন সেনাবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এ কারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, সাংবিধানিক পথে সংবিধান সংশোধন এবং ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক একটা সংবিধান প্রণয়ন করা সহজেই সম্ভব হবে না। এতে রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে গণ্য করা সম্ভব হবে না এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। রাখাইন স্টেট নিরাপদ না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এসব বিষয় সামনে রেখেই বাংলাদেশকে এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে চলতে হবে সমাধানের পূর্ব পর্যন্ত।

রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন এখনও অনিশ্চিত, কেননা মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে এসব রোহিঙ্গার ফেরার জন্য যে ধরনের অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন তা সৃষ্টিতে মিয়ানমার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সব দেশ সম্মত হলেও মিয়ানমারের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, সমস্যার মূলে গিয়ে সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো উদ্যোগ কিংবা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। রাখাইন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও প্রত্যাবাসনের অনুকূলে হয়নি। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে স্থানীয় জনগণ এবং বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি বা কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানা যায়নি। মিয়ানমার এখনও এসব পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে কোনোরূপ অগ্রগতি দেখাতে পারছে না।

রোহিঙ্গা সমস্যার মতো একটা জটিল এবং চলমান সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি দু’দেশের নাগরিক সমাজের পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে আস্থার অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার। মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত চীন, ভারত ও জাপান এ তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেরও সুসম্পর্ক রয়েছে।

তাই মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কোনো প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর ওপর মূল মনোযোগ দেয়া উচিত। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সবার উপস্থিতি আছে, অথচ মিয়ানমারের রাখাইনে কারও উপস্থিতি নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা জোরদার করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চীন, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানসহ বিভিন্ন দেশ ও পক্ষকে যুক্ত করে তাদের সবার সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশকে এগোতে হবে এবং যথাযথ ক্ষমতা দিয়ে রাখাইনে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের মতো মূল দুটি বিষয়ে সুরাহা হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

এখনও দাতা সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য অব্যাহত রেখেছে বলে এ সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করতে পারছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯-এর ছোবলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সমস্যা ভারাক্রান্ত, সেসব দেশ তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধান করে এ দূর দেশের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কতদিন তাদের সাহায্য অব্যাহত রাখবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

মিয়ানমার সৃষ্ট এ সমস্যা বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাধানের পূর্ব পর্যন্ত জাগিয়ে রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিশ্ববাসীর নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুত থেকে দ্রুততর হোক- বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এবং রোহিঙ্গারা সেই আশার পথে তাকিয়ে আছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মো. শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি : ডেপুটি কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, গাজীপুর

রোহিঙ্গা সংকটের নিষ্পত্তি হবে কবে?

 ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মো. শামসুদ্দীন 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
রোহিঙ্গা
ফাইল ছবি

মিয়ানমারে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সেনা অভিযান এবং রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে পালিয়ে আসা আরও ৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। এই বিশাল নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা ঠিক হয়েছিল। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রস্তুত ছিল; কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বলে ঘোষণা দেয়ায় প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। এর প্রায় এক বছর পর ২২ আগস্ট ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুতি নেয়। মিয়ানমার ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এ উদ্যোগও সফলতার মুখ দেখেনি। এ সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রমাণ করতে হবে তারা রাখাইনের বাসিন্দা ছিল। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পক্ষে এটা প্রমাণ করা কঠিন; কারণ বহু বছর তারা নাগরিক অধিকারবঞ্চিত ছিল। যেসব রোহিঙ্গার কোনো না কোনো সনদ ছিল, তাদের নতুন নাগরিকত্ব সনদ দেয়ার কথা বলা হলেও কখনও তা দেয়া হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, ক্ষতিপূরণ ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার ছাড়া মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী নয়। এসব দাবি পূরণে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোনো প্রচেষ্টা নেয়নি। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা তৃতীয় বছরে পদার্পণ করল।

২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গণহত্যার অপরাধ, প্রতিরোধ ও সাজাবিষয়ক সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে গাম্বিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির চলমান নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে গাম্বিয়ার মামলার প্রেক্ষিতে আইসিজে ২৩ জানুয়ারি ২০২০ একটি জরুরি ‘সাময়িক পদক্ষেপ’ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এ আদেশ জারির দিন থেকে চার মাসের মধ্যে মিয়ানমার আদালতের আদেশ অনুযায়ী যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, সেগুলো আদালতকে জানানো এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস পরপর এ বিষয়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ ছিল। গণহত্যা সনদ মেনে চলা এবং রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সব সহিংসতার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণের জন্য মিয়ানমার সরকার ৮ এপ্রিল ২০২০ তারিখে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে দুটো আলাদা আদেশে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার গত মে মাসের শেষে আইসিজেকে প্রথমবারের মতো প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার এ দূরদর্শী দিকনির্দেশনার বাস্তবায়নেই একমাত্র রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব। রোহিঙ্গা সমস্যা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করার জন্য ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের পর সারা বিশ্ব থেকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাদের পাঠানো প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছে এবং আসছে।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং দেশি এনজিওগুলো নানা বিষয় নিয়ে এ পরিস্থিতিতে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ এ সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। অনেক দেশ এ অমানবিক আক্রমণ এবং নৃশংসতাকে নিন্দা করেছে এবং নৃশংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য অনেকে তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে। কিছু কিছু দেশ জাতিসংঘকে তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। অনেক দেশ রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে।

কিছু কিছু দেশ মিয়ানমারে সমস্যাসংকুল এলাকায় মানবিক সাহায্য পাঠানোর জন্য অনুমতির চেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। কয়েকটা দেশ একটা স্থায়ী সমাধানের জন্য রেজুলিউশন বানানোর ব্যাপারে জোরালো সমর্থন দিয়েছে। কেউ কেউ মানবতার বিরুদ্ধে অবরোধ এবং গণহত্যার কথা জানিয়ে তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। অনেক দেশ কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য তাদের জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে। অনেক দেশ এ সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মত পোষণ করেছে।

বর্তমানে সারা বিশ্ব রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে অবহিত। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানবতার জননী সারা বিশ্বকে এ নৃশংস ঘটনা জানানোর ব্যাপারে কূটনৈতিক ও মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি এ সমস্যার সমাধানে তার প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ, দাতা সংস্থা, আঞ্চলিক দেশগুলো- সবাই এ সমস্যার ব্যাপারে ভালোভাবে অবহিত; তবে সমাধানের ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে না এবং বাংলাদেশ এখনও এ সমস্যা নিয়ে চলছে।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিকিয়াং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সে সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের ভূমিকার কথা প্রথমবারের মতো এসেছে, যা একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য। সেখানে রোহিঙ্গা শব্দটি উহ্য রেখে বলা হয়েছে ‘মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী’। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে যাওয়ার কথা বলেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক উ জিং হাউ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, চীন মিয়ানমারকে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে বলেছে।

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো আগস্ট ২০১৭-এর পর তিনবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। তিনি নেপিডোতে অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করে এ সমস্যা সমাধানে যা কিছু সম্ভব তার সবই করার আশ্বাস দিয়েছেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী, তবে তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে হবে।

রাখাইনে তাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার ও সংবাদকর্মীদের অবারিতভাবে চলাফেরার সুযোগ দিয়ে সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নিরাপদে স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারকে বারবার বলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারত মিয়ানমারের ওপর চাপ দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গা ও অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষমূলক উত্তেজনা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয় ১৩৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দেয় ৯টি দেশ। আর ২৮টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।

মিয়ানমারের রাজনীতিতে অং সান সু চি এখনও বৌদ্ধভিক্ষু এবং সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ করতে সমর্থ হননি। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ (২০২০) পর্যন্ত মিয়ানমার পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের বেশকিছু প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। ১৪৯ জন সদস্য এ বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। প্রধান প্রধান সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ছিল পার্লামেন্ট থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কোটা অপসারণ, সংবিধান সংশোধনে তাদের ভেটো ক্ষমতা রদ, যে কোনো সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদনে ৭৫ শতাংশ পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থনের নিয়মকে দুই-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা ইত্যাদি। বিতর্ক শেষে ভোটাভুটি শুরু হয়। ১০ মার্চ ২০২০ থেকে তা শুরু হয় এবং কয়েকদিন ধরে এ ভোট চলে। ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় সব সংস্কার প্রস্তাবই একে একে পার্লামেন্টে বাতিল হয়ে যায়।

২০২০ সালের পার্লামেন্টের ভোটাভুটির ফলাফল ছিল মিয়ানমারের ছোট জাতিসত্তাগুলোর জন্য একটা বড় ধাক্কা। এসব জাতিসত্তা মিয়ানমারের জন্য এমন এক সংবিধান চাইছে, যেখানে দেশটি সত্যিকারের এক ইউনিয়ন হয়ে উঠবে; কিন্তু এর বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না, কারণ পার্লামেন্টে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ আসন সেনাবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এ কারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, সাংবিধানিক পথে সংবিধান সংশোধন এবং ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক একটা সংবিধান প্রণয়ন করা সহজেই সম্ভব হবে না। এতে রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে গণ্য করা সম্ভব হবে না এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। রাখাইন স্টেট নিরাপদ না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এসব বিষয় সামনে রেখেই বাংলাদেশকে এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে চলতে হবে সমাধানের পূর্ব পর্যন্ত।

রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন এখনও অনিশ্চিত, কেননা মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে এসব রোহিঙ্গার ফেরার জন্য যে ধরনের অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন তা সৃষ্টিতে মিয়ানমার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সব দেশ সম্মত হলেও মিয়ানমারের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, সমস্যার মূলে গিয়ে সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা এবং মানসিকতার পরিবর্তন। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো উদ্যোগ কিংবা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। রাখাইন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও প্রত্যাবাসনের অনুকূলে হয়নি। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে স্থানীয় জনগণ এবং বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি বা কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানা যায়নি। মিয়ানমার এখনও এসব পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে কোনোরূপ অগ্রগতি দেখাতে পারছে না।

রোহিঙ্গা সমস্যার মতো একটা জটিল এবং চলমান সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি দু’দেশের নাগরিক সমাজের পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে আস্থার অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার। মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত চীন, ভারত ও জাপান এ তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেরও সুসম্পর্ক রয়েছে।

তাই মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কোনো প্রচেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর ওপর মূল মনোযোগ দেয়া উচিত। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সবার উপস্থিতি আছে, অথচ মিয়ানমারের রাখাইনে কারও উপস্থিতি নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা জোরদার করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চীন, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানসহ বিভিন্ন দেশ ও পক্ষকে যুক্ত করে তাদের সবার সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশকে এগোতে হবে এবং যথাযথ ক্ষমতা দিয়ে রাখাইনে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের মতো মূল দুটি বিষয়ে সুরাহা হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

এখনও দাতা সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য অব্যাহত রেখেছে বলে এ সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করতে পারছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯-এর ছোবলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সমস্যা ভারাক্রান্ত, সেসব দেশ তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধান করে এ দূর দেশের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কতদিন তাদের সাহায্য অব্যাহত রাখবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

মিয়ানমার সৃষ্ট এ সমস্যা বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাধানের পূর্ব পর্যন্ত জাগিয়ে রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিশ্ববাসীর নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দ্রুত থেকে দ্রুততর হোক- বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এবং রোহিঙ্গারা সেই আশার পথে তাকিয়ে আছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মো. শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি : ডেপুটি কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, গাজীপুর