মানবপুঁজি : স্বাস্থ্য ও শিক্ষার হাল
jugantor
মানবপুঁজি : স্বাস্থ্য ও শিক্ষার হাল

  মুঈদ রহমান  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত সপ্তাহের অন্যতম হতাশাব্যঞ্জক সংবাদ হল- মানবপুঁজি সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। ১৭৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩। অথচ ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আমাদের অবস্থান ছিল ১০৬। পৃথিবীর ১৭টি দেশ এই দু’বছরে আমাদের টপকে গেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স ২০২০ আপডেট : হিউম্যান ক্যাপিটাল ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মানুষের উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা নিয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো মানবপুঁজি সূচক (HCI) প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে যেসব তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে তা চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত। অর্থাৎ করোনা মহামারী আকার ধারণ করার আগের। প্রতিবেদনটি বিশ্বের ৯৮ শতাংশ মানুষের অবস্থাকে প্রতিফলিত করেছে।

বিশ্বব্যাংকের এই মানবপুঁজি সূচক কী? খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই সূচকের মান দিয়ে আমরা বুঝতে পারি জন্মের পর একজন মানুষ যখন কর্মক্ষেত্রে যাবে তখন তার উৎপাদনশীলতা (Productivity) কত হতে পারে। এই সূচকের মান ০ থেকে ১। ০ হলে বুঝতে হবে তার কোনোই উৎপাদনশীলতা নেই, আবার ১ হলে বুঝতে হবে শতভাগ উৎপাদনশীলতা আছে। কিন্তু বাস্তবে এ দুটি চরম অবস্থা দেখতে পাওয়া যায় না।

তাই আমরা যে মানগুলো পাই তা ০-এর বেশি এবং ১-এর কম। কারও স্কোর যদি হয় ০.৬০, তাহলে বুঝতে হবে কর্মক্ষেত্রে তার উৎপাদনশীলতা হবে ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের গড় বয়স ধরা হয় ১৮ বছর। এখন দেখতে হবে আজকে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করল, ১৮ বছর বয়সে তার উৎপাদনশীলতা কত হবে। সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের স্কোর ০.৪৬, অর্থাৎ উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা ৪৬ শতাংশ। গেল বছর এই মান ছিল ৪৮ শতাংশ। আর সারা বিশ্বের উৎপাদনশীলতার গড় স্কোর হচ্ছে ০.৫৬ বা ৫৬ শতাংশ। আমরা গড় উৎপাদনশীলতা থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পিছিয়ে আছি। তাহলে উৎপাদনশীলতা কী? সেটি হল কাজ করার দক্ষতা। আপনি যদি ১ ঘণ্টায় ১০টি রুটি তৈরি করতে পারেন আর একই সময়ে আমি যদি পারি ৫টি, তাহলে বুঝতে হবে আপনার উৎপাদনশীলতা আমার দ্বিগুণ। তাই উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে নিশ্চয়ই। আমাদের অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায়ও ভালো নয়। শ্রীলংকার স্কোর ০.৬, নেপালের ০.৫০, ভারতের ০.৪৯, ভুটানের ০.৪৮। আমাদের নিচে আছে শুধু পাকিস্তান ০.৪১ ও আফগানিস্তান ০.৪০।

আমরা অনেক সময়েই বলতে অভ্যস্ত যে, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের দেশ দরিদ্র, আমাদের অর্থনীতির আকার ছোট, আমাদের জনসংখ্যা বেশি; তাই অনেক দিক দিয়েই পিছিয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। পিছিয়ে থাকা এক অর্থ আর এগিয়ে থেকে পিছিয়ে পড়ার ভিন্ন অর্থ। আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারিনি এটাই আমাদের ব্যর্থতা। আর অর্থনীতির আকারের প্রসঙ্গ যখন এলোই তখন বলা প্রয়োজন যে, মানবপুঁজি সূচকে উপরের দিককার চারটি দেশই এশিয়ার, ইউরোপ বা আমেরিকার নয়। এক নম্বরে থাকা সিঙ্গাপুরের স্কোর হল ০.৮৮, দ্বিতীয় স্থানে থাকা হংকংয়ের স্কোর ০.৮১, এর পরের অবস্থানে আছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান, তাদের স্কোর হল ০.৮০। অন্যদিকে বিশ্বের ধনী দেশ বলে বিবেচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর হল ০.৭০ এবং তার অবস্থান ৩৫তম। আর ৪৫তম অবস্থানে আছে চীন, তার স্কোর ০.৬৫। অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের তুলনা চলে না। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির পরিমাণ ২১ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর সিঙ্গাপুরের মাত্র ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে সিঙ্গাপুরের আর্থিক সঙ্গতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ৬০ ভাগের ১ ভাগ। কিন্তু মানবপুঁজি সূচকে সিঙ্গাপুর সবার শীর্ষে। আসলে সূচকের অবস্থা কেমন হবে তা নির্ভর করছে একটি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ওই দেশটির সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী তার ওপর। আপনি কোন শ্রেণির স্বার্থে কাজ করবেন কিংবা ব্যয় করবেন তার ওপর। এটা ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়েও বলা যায়। আপনি ইচ্ছা করলে সন্তানকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে বিনিয়োগ না করে আপনার অর্থ দিয়ে বাড়ি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনার বাড়ি হবে কিন্তু সন্তান মানুষ হবে না। আবার যদি এর বিপরীতটা করেন, তাহলে সন্তান মানুষ হবে কিন্তু বাড়ি হবে না। তাই আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কোন পথে এগোবেন। একটি সরকারের বেলায়ও তাই। আমরা দূর থেকে কিছু উপায় বা পরামর্শ বাতলে দিতে পারি মাত্র। বাস্তবায়ন সরকারকেই করতে হবে।

মানবপুঁজি সূচককে সমৃদ্ধ করার যে কয়টি উপাদান আছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা। কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে কারও শারীরিক অবস্থা যদি উন্নত থাকে এবং এর সঙ্গে কাজটি করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান বা শিক্ষা তার ভাণ্ডারে থাকে, তাহলে অবশ্যই উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকবে। এখন আমাদের দেখতে হবে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাত বাংলাদেশে কী অবস্থায় আছে।

একটি জরিপে দেখা গেছে, কোনো শিশু যদি জন্মের ১ হাজার দিন বা ৩৩ মাসে পর্যাপ্ত মাত্রায় পুষ্টি পেতে ব্যর্থ হয় তাহলে সে তা আর সারা জীবনেও পূরণ করতে পারবে না। তাহলে ভাবুন বাংলাদেশে কত শিশু কাঙ্ক্ষিত মাত্রার পুষ্টি থেকে বঞ্চিত! শুধু কি পুষ্টি, শিশুর জন্মকালে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, যা আমাদের অনেক শিশুর ভাগ্যেই জোটে না। পুষ্টি ও সতর্কতার কথা বাদ দিলেও স্বাস্থ্যকর পরিবেশটি কি কম গুরুত্বপূর্ণ? অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে লাখ লাখ শিশু ছোটবেলা থেকেই নানা রোগে ভোগে। এই ভোগান্তি তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তারপরের জীবনটাও সহজ নয়। আর্থিক কারণে বহু রোগকে আমরা উপেক্ষা করে চলি। পয়সার অভাবে চিকিৎসকের কাছে যেতেই ভয় পাই। ডাক্তার দেখালে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পয়সা থাকে না; ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পয়সা থাকলে ওষুধ কেনার পয়সা থাকে না; ওষুধ কিনলে খাবারের পয়সা থাকে না। তাই চিকিৎসামুখী হতে পারি না।

কিন্তু দেহে জমে থাকা রোগ আমাদের কর্মক্ষমতাকে দিন দিন হ্রাস করতে থাকে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বললাম এ কারণে যে, আজকের সুস্থ শিশু আগামীকালের উৎপাদনকারী, যা থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ উপকৃত হবে। এখানেও সরকারি মহল থেকে একটি দায়সারা জবাব আসতে পারে- আমরা গরিব দেশ। আমরা তো তা মানবো না। যে দেশের স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, সেদেশের মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত থাকবে কেন? ক’দিন আগে গণমাধ্যমে একটি খবর দেখলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন গাড়িচালক নাকি শতকোটি টাকার মালিক। খবরটি দেখে চমকে যাইনি, কারণ বাংলাদেশে পাহাড় সমান দুর্নীতির কথা সরকার স্বীকার না করলেও আমরা তা ভালো করেই জানি। কিন্তু আমার কৌতূহল হল। একজন গাড়িচালকের চাকরি দেয়া, বদলি করা কিংবা ক্রয় কমিটিতে থাকার যোগ্যতা বা ক্ষমতা নেই। যা সত্য তা হল কোনো অবৈধ লেনদেনের একজন মাধ্যম হওয়া। আমরা এও জানি, যদি ১০০ টাকার অবৈধ লেনদেনে হয় তাহলে একজন মাধ্যম হিসেবে সে খুব বেশি হলে ২০ টাকা পেতে পারে। এই ২০ টাকার মানুষেরই যদি শতকোটি টাকা হয়, তাহলে ৮০ টাকার মানুষটির কী অবস্থা? তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা।

মানবপুঁজি সূচককে প্রভাবিত করার দ্বিতীয় উপাদানটি হল মানসম্মত শিক্ষা। মান সম্পর্কে পরে আসছি, আগে শিক্ষার অবস্থাটা দেখি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ‘ড্রপ আউট’ বা ঝরে পড়া। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই কমবেশি ৪০ শতাংশ ঝরে যায়। এই ঝরে পড়ার কযেকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে : এক. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি; দুই. দুর্বল শারীরিক অবস্থা; তিন. অর্থনৈতিক দুরবস্থা; চার. মানসম্মত শিক্ষার অভাব; পাঁচ. ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বা আইসোলেশন; ছয়. স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ব্যয় বেশি অর্থাৎ একজন মনে করছে লেখাপড়া করে কী লাভ হবে, তার চেয়ে দোকানে, গ্যারেজে বা মানুষের বাসায় কাজ করলে আয় হবে। আমাদের যদি মানবপুাঁজর সূচক বাড়াতে হয়, তাহলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। শিক্ষার মান নিয়েও বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট রয়েছে। শিক্ষা অর্জনের দিক থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্কোর ৩৬৮; উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীদের বেলায় তা ৬২৫। সামান্য নোটবই ও কোচিং সেন্টার বন্ধ করার মতো সাহস আমরা দেখাতে পারেনি। উচ্চশিক্ষার বেলায়ও সরকারের উদাসীনতা চোখে পড়ার মতো। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ৩০টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য। খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অবিবেচকের মতো কাজটি করে বসল। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে একজন রেজিস্ট্রারকে, যিনি একজন কর্মকর্তা, শিক্ষক নন। আমি কোনো পেশাকেই খাটো করে দেখি না; কিন্তু কার দ্বারা কী পরিচালিত হওয়া উচিত তা জানি। আমার স্বল্প জ্ঞান দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অর্থনীতি বিষয়ে পাঠদানের চেষ্টা করছি। আমাকে যদি প্রধান বিচারপতির আসনে বসানো হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার কী হাল হবে কল্পনা করুন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হল একাডেমিক কাউন্সিল। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা কীভাবে কোন দিকে, কোন স্তরে, কোন মাত্রায় যাবে, তা নির্ধারণ করে একাডেমিক কাউন্সিল। সেই একাডেমিক কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন ভিসি। তাহলে ভিসি পদে একজন একাডেমিক ব্যক্তি থাকা উচিত, নাকি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকা উচিত? অথচ সরকার সেটা বিবেচনায় নিতে পারল না। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সম্প্রদায় তীব্রভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সরকার তা শুনবে কি না জানি না, তবে উচ্চশিক্ষার প্রতি সরকারের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

মানবপুঁজির উন্নয়ন ঘটাতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে অমঙ্গলের ছায়া আমাদের পিছু ছাড়বে না।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

মানবপুঁজি : স্বাস্থ্য ও শিক্ষার হাল

 মুঈদ রহমান 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত সপ্তাহের অন্যতম হতাশাব্যঞ্জক সংবাদ হল- মানবপুঁজি সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। ১৭৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩। অথচ ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আমাদের অবস্থান ছিল ১০৬। পৃথিবীর ১৭টি দেশ এই দু’বছরে আমাদের টপকে গেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স ২০২০ আপডেট : হিউম্যান ক্যাপিটাল ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মানুষের উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা নিয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো মানবপুঁজি সূচক (HCI) প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে যেসব তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে তা চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত। অর্থাৎ করোনা মহামারী আকার ধারণ করার আগের। প্রতিবেদনটি বিশ্বের ৯৮ শতাংশ মানুষের অবস্থাকে প্রতিফলিত করেছে।

বিশ্বব্যাংকের এই মানবপুঁজি সূচক কী? খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই সূচকের মান দিয়ে আমরা বুঝতে পারি জন্মের পর একজন মানুষ যখন কর্মক্ষেত্রে যাবে তখন তার উৎপাদনশীলতা (Productivity) কত হতে পারে। এই সূচকের মান ০ থেকে ১। ০ হলে বুঝতে হবে তার কোনোই উৎপাদনশীলতা নেই, আবার ১ হলে বুঝতে হবে শতভাগ উৎপাদনশীলতা আছে। কিন্তু বাস্তবে এ দুটি চরম অবস্থা দেখতে পাওয়া যায় না।

তাই আমরা যে মানগুলো পাই তা ০-এর বেশি এবং ১-এর কম। কারও স্কোর যদি হয় ০.৬০, তাহলে বুঝতে হবে কর্মক্ষেত্রে তার উৎপাদনশীলতা হবে ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের গড় বয়স ধরা হয় ১৮ বছর। এখন দেখতে হবে আজকে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করল, ১৮ বছর বয়সে তার উৎপাদনশীলতা কত হবে। সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের স্কোর ০.৪৬, অর্থাৎ উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা ৪৬ শতাংশ। গেল বছর এই মান ছিল ৪৮ শতাংশ। আর সারা বিশ্বের উৎপাদনশীলতার গড় স্কোর হচ্ছে ০.৫৬ বা ৫৬ শতাংশ। আমরা গড় উৎপাদনশীলতা থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পিছিয়ে আছি। তাহলে উৎপাদনশীলতা কী? সেটি হল কাজ করার দক্ষতা। আপনি যদি ১ ঘণ্টায় ১০টি রুটি তৈরি করতে পারেন আর একই সময়ে আমি যদি পারি ৫টি, তাহলে বুঝতে হবে আপনার উৎপাদনশীলতা আমার দ্বিগুণ। তাই উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে নিশ্চয়ই। আমাদের অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায়ও ভালো নয়। শ্রীলংকার স্কোর ০.৬, নেপালের ০.৫০, ভারতের ০.৪৯, ভুটানের ০.৪৮। আমাদের নিচে আছে শুধু পাকিস্তান ০.৪১ ও আফগানিস্তান ০.৪০।

আমরা অনেক সময়েই বলতে অভ্যস্ত যে, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের দেশ দরিদ্র, আমাদের অর্থনীতির আকার ছোট, আমাদের জনসংখ্যা বেশি; তাই অনেক দিক দিয়েই পিছিয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। পিছিয়ে থাকা এক অর্থ আর এগিয়ে থেকে পিছিয়ে পড়ার ভিন্ন অর্থ। আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারিনি এটাই আমাদের ব্যর্থতা। আর অর্থনীতির আকারের প্রসঙ্গ যখন এলোই তখন বলা প্রয়োজন যে, মানবপুঁজি সূচকে উপরের দিককার চারটি দেশই এশিয়ার, ইউরোপ বা আমেরিকার নয়। এক নম্বরে থাকা সিঙ্গাপুরের স্কোর হল ০.৮৮, দ্বিতীয় স্থানে থাকা হংকংয়ের স্কোর ০.৮১, এর পরের অবস্থানে আছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান, তাদের স্কোর হল ০.৮০। অন্যদিকে বিশ্বের ধনী দেশ বলে বিবেচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর হল ০.৭০ এবং তার অবস্থান ৩৫তম। আর ৪৫তম অবস্থানে আছে চীন, তার স্কোর ০.৬৫। অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের তুলনা চলে না। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির পরিমাণ ২১ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর সিঙ্গাপুরের মাত্র ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে সিঙ্গাপুরের আর্থিক সঙ্গতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ৬০ ভাগের ১ ভাগ। কিন্তু মানবপুঁজি সূচকে সিঙ্গাপুর সবার শীর্ষে। আসলে সূচকের অবস্থা কেমন হবে তা নির্ভর করছে একটি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ওই দেশটির সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী তার ওপর। আপনি কোন শ্রেণির স্বার্থে কাজ করবেন কিংবা ব্যয় করবেন তার ওপর। এটা ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়েও বলা যায়। আপনি ইচ্ছা করলে সন্তানকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে বিনিয়োগ না করে আপনার অর্থ দিয়ে বাড়ি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনার বাড়ি হবে কিন্তু সন্তান মানুষ হবে না। আবার যদি এর বিপরীতটা করেন, তাহলে সন্তান মানুষ হবে কিন্তু বাড়ি হবে না। তাই আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কোন পথে এগোবেন। একটি সরকারের বেলায়ও তাই। আমরা দূর থেকে কিছু উপায় বা পরামর্শ বাতলে দিতে পারি মাত্র। বাস্তবায়ন সরকারকেই করতে হবে।

মানবপুঁজি সূচককে সমৃদ্ধ করার যে কয়টি উপাদান আছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা। কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে কারও শারীরিক অবস্থা যদি উন্নত থাকে এবং এর সঙ্গে কাজটি করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান বা শিক্ষা তার ভাণ্ডারে থাকে, তাহলে অবশ্যই উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকবে। এখন আমাদের দেখতে হবে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাত বাংলাদেশে কী অবস্থায় আছে।

একটি জরিপে দেখা গেছে, কোনো শিশু যদি জন্মের ১ হাজার দিন বা ৩৩ মাসে পর্যাপ্ত মাত্রায় পুষ্টি পেতে ব্যর্থ হয় তাহলে সে তা আর সারা জীবনেও পূরণ করতে পারবে না। তাহলে ভাবুন বাংলাদেশে কত শিশু কাঙ্ক্ষিত মাত্রার পুষ্টি থেকে বঞ্চিত! শুধু কি পুষ্টি, শিশুর জন্মকালে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, যা আমাদের অনেক শিশুর ভাগ্যেই জোটে না। পুষ্টি ও সতর্কতার কথা বাদ দিলেও স্বাস্থ্যকর পরিবেশটি কি কম গুরুত্বপূর্ণ? অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে লাখ লাখ শিশু ছোটবেলা থেকেই নানা রোগে ভোগে। এই ভোগান্তি তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তারপরের জীবনটাও সহজ নয়। আর্থিক কারণে বহু রোগকে আমরা উপেক্ষা করে চলি। পয়সার অভাবে চিকিৎসকের কাছে যেতেই ভয় পাই। ডাক্তার দেখালে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পয়সা থাকে না; ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পয়সা থাকলে ওষুধ কেনার পয়সা থাকে না; ওষুধ কিনলে খাবারের পয়সা থাকে না। তাই চিকিৎসামুখী হতে পারি না।

কিন্তু দেহে জমে থাকা রোগ আমাদের কর্মক্ষমতাকে দিন দিন হ্রাস করতে থাকে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বললাম এ কারণে যে, আজকের সুস্থ শিশু আগামীকালের উৎপাদনকারী, যা থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ উপকৃত হবে। এখানেও সরকারি মহল থেকে একটি দায়সারা জবাব আসতে পারে- আমরা গরিব দেশ। আমরা তো তা মানবো না। যে দেশের স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, সেদেশের মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত থাকবে কেন? ক’দিন আগে গণমাধ্যমে একটি খবর দেখলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন গাড়িচালক নাকি শতকোটি টাকার মালিক। খবরটি দেখে চমকে যাইনি, কারণ বাংলাদেশে পাহাড় সমান দুর্নীতির কথা সরকার স্বীকার না করলেও আমরা তা ভালো করেই জানি। কিন্তু আমার কৌতূহল হল। একজন গাড়িচালকের চাকরি দেয়া, বদলি করা কিংবা ক্রয় কমিটিতে থাকার যোগ্যতা বা ক্ষমতা নেই। যা সত্য তা হল কোনো অবৈধ লেনদেনের একজন মাধ্যম হওয়া। আমরা এও জানি, যদি ১০০ টাকার অবৈধ লেনদেনে হয় তাহলে একজন মাধ্যম হিসেবে সে খুব বেশি হলে ২০ টাকা পেতে পারে। এই ২০ টাকার মানুষেরই যদি শতকোটি টাকা হয়, তাহলে ৮০ টাকার মানুষটির কী অবস্থা? তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা।

মানবপুঁজি সূচককে প্রভাবিত করার দ্বিতীয় উপাদানটি হল মানসম্মত শিক্ষা। মান সম্পর্কে পরে আসছি, আগে শিক্ষার অবস্থাটা দেখি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ‘ড্রপ আউট’ বা ঝরে পড়া। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই কমবেশি ৪০ শতাংশ ঝরে যায়। এই ঝরে পড়ার কযেকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে : এক. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি; দুই. দুর্বল শারীরিক অবস্থা; তিন. অর্থনৈতিক দুরবস্থা; চার. মানসম্মত শিক্ষার অভাব; পাঁচ. ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বা আইসোলেশন; ছয়. স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ব্যয় বেশি অর্থাৎ একজন মনে করছে লেখাপড়া করে কী লাভ হবে, তার চেয়ে দোকানে, গ্যারেজে বা মানুষের বাসায় কাজ করলে আয় হবে। আমাদের যদি মানবপুাঁজর সূচক বাড়াতে হয়, তাহলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। শিক্ষার মান নিয়েও বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট রয়েছে। শিক্ষা অর্জনের দিক থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্কোর ৩৬৮; উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীদের বেলায় তা ৬২৫। সামান্য নোটবই ও কোচিং সেন্টার বন্ধ করার মতো সাহস আমরা দেখাতে পারেনি। উচ্চশিক্ষার বেলায়ও সরকারের উদাসীনতা চোখে পড়ার মতো। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ৩০টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য। খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অবিবেচকের মতো কাজটি করে বসল। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে একজন রেজিস্ট্রারকে, যিনি একজন কর্মকর্তা, শিক্ষক নন। আমি কোনো পেশাকেই খাটো করে দেখি না; কিন্তু কার দ্বারা কী পরিচালিত হওয়া উচিত তা জানি। আমার স্বল্প জ্ঞান দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অর্থনীতি বিষয়ে পাঠদানের চেষ্টা করছি। আমাকে যদি প্রধান বিচারপতির আসনে বসানো হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার কী হাল হবে কল্পনা করুন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হল একাডেমিক কাউন্সিল। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা কীভাবে কোন দিকে, কোন স্তরে, কোন মাত্রায় যাবে, তা নির্ধারণ করে একাডেমিক কাউন্সিল। সেই একাডেমিক কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন ভিসি। তাহলে ভিসি পদে একজন একাডেমিক ব্যক্তি থাকা উচিত, নাকি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকা উচিত? অথচ সরকার সেটা বিবেচনায় নিতে পারল না। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সম্প্রদায় তীব্রভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সরকার তা শুনবে কি না জানি না, তবে উচ্চশিক্ষার প্রতি সরকারের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

মানবপুঁজির উন্নয়ন ঘটাতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে অমঙ্গলের ছায়া আমাদের পিছু ছাড়বে না।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়